বিশ্বায়নের প্রসারে যে তিনটি বিষয় সর্বাধিক আলোচিত, সেগুলি হল : ১. বিশ্বায়ন কেমন করে বিভিন্ন দেশগুলির মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করে (অর্থাত্ আমেরিকা, জাপান এবং ইউরোপের কিছু দেশের তুলনায় বিশ্বের বাকী দেশগুলির অর্থনৈতিক ব্যবধান কতটা বাড়ছে), ২. বিশ্বায়ন কেমন করে দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি করে (অর্থাত্ কোন দেশের বিশ্বায়িত অর্থনীতি রূপায়নের সাফল্যে মুষ্টিমেয় লাভবান মানুষের সঙ্গে সর্বসাধারণের অর্থনৈতিক ব্যবধান কতটা বেড়েছে), এবং ৩. বিশ্বায়নের দৌলতে কোন দেশের সরকারের প েতার নিজস্ব পুঁজির পুনর্বণ্টনের অধিকার কতটা খর্ব হয়েছে (অর্থাত্ বিশ্বব্যাঙ্ক আই.এম.এফ.-এর দ্বারা বলপূর্বকভাবে অর্থনৈতিক গঠনবিন্যাসের চাপে দেশের জনহিতকর প্রকল্পে ব্যয় করার মতা কমেছে)৷ গবেষণার ঘাটতি না-থাকা সত্ত্বেও বিশ্বায়নের ফলে উদ্ভূত সমস্যা বিষয়ক প্রশ্ন তিনটের সর্বসম্মত উত্তর পাওয়া যায় না৷
না-পাওয়াটাই স্বাভাবিক৷ তবে বিশ্বায়নের যে ফলগুলি সম্বন্ধে দ্বিমত খুবই কম সেগুলি হল শ্রমিকদের নিম্ন বেতনদানকারী কারখানার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি, শিশু শ্রমিকের প্রাদুর্ভাব এবং কারাগার ব্যবস্থার প্রসার৷ দশ বছর আগে যত সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে নেমেছেন, আজকের দুনিয়ায় সেই সম্ভাব্য সংখ্যা থেকে তিরিশ কোটির বেশীসংখ্যক মানুষ বিশ্বায়নের আশীর্বাদে নেমে গেছেন দারিদ্র্য সীমার নীচে৷
অপরাধের পিছনে অর্থনৈতিক কারণটি সর্বজনবিদিত৷ বিশেষ করে চুরি-ছিনতাই-রাহাজানি, লুটপাট ইত্যাদি অপরাধগুলি দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রত্যভাবে যুক্ত৷ সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নাগরিক হিতসাধানকারী প্রকল্পগুলি (যেমন বেকারভাতা-সমেত অন্যান্য ভাতা) অপরাধ প্রতিরোধে সাহায্য করে, কিন্তু পুঁজিবাদী এবং প্রতিযোগী অর্থনীতির (আমেরিকার) েেত্র দমননীতিই অপরাধ প্রতিহত করার একমাত্র উপায়৷
এই রচনায় আমি আমেরিকার কারাগারব্যবস্থার অভাবনীয় প্রসার নিয়ে আলোচনা করব৷ এখানে আমরা দেখতে পাব যে পুঁজিবাদী অর্থনীতির পুণ্যভূমি আমেরিকাতে, মুক্ত সমাজের আদর্শ আমেরিকাতে, মানবাধিকারের পরাকাষ্ঠা আমেরিকাতে কারাগার ব্যবস্থার কি সাংঘাতিক প্রসার ঘটে চলেছে৷ আলোচিত হবে এর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং বিশেষ করে সাংস্কৃতিক দিকগুলি৷ এই আলোচনা আজকের দুনিয়ায় প্রাসঙ্গিক, কারণ সফল বিশ্বায়নের প্রথম শর্ত হল সংস্কৃতিরপ্তানী৷ সুতরাং আমেরিকার এই 'কারাগারপ্রীতির' সংস্কৃতিটি পৃথিবীর দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷
গত শতাব্দীর শেষ দুই দশক থেকে আমেরিকার কারাগারব্যবস্থার বৃদ্ধি এমনই সাংঘাতিক রূপ নিয়েছে যে সেটাকে কারাগারতন্ত্র বলা যেতে পারে৷ বাস্তবে কারাগারতন্ত্র প্রসারের পরিধি ও আকস্মিকতায় রীতিমত আশঙ্কিত হয়ে পড়তে হয়৷ ভেবে সত্যিই আশ্চর্য হতে হয় যে, আমেরিকায় গত দুই দশক ধরে যখন অপরাধের হার কমছে (সরকারী দাবী) কিংবা অপরিবর্তিত (বেসরকারী পরিসংখ্যান) তখন অস্বচ্ছতায় ভরা কারাগারতন্ত্রের কেন প্রসার ঘটে চলেছে৷
প্রাতিষ্ঠানিক দিক দিয়ে দেখলে কারাগার ব্যবস্থা অনাথাশ্রম, আতুরাশ্রম, মানসিক চিকিত্সালয়, ড্রাগ পুনর্বাসন কেন্দ্র ইত্যাদি সমাজনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলিরই শ্রেণীভুক্ত৷ আমেরিকার েেত্র সমাজনিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলির উন্মেষের সঙ্গে শিল্পোন্নয়নের সমসাময়িকতার যোগসূত্র দেখানো হয় ধর্মের ভিত্তিতে৷ মতবাদটা এই রকম যে, আমেরিকা যখন গ্রামীণ ও কৃষিজীবী সমাজব্যবস্থা থেকে শিল্পায়িত নগর সভ্যতার দিকে এগোচ্ছিল তখন ধমর্ীয় (খ্রিষ্টীয়) আদর্শের নিগড়ে বাঁধা গ্রামীণ জীবন সংকটের সম্মুখীন হয়ে পড়ে৷ নগর জীবনে নৈতিক উত্কর্ষ, যেমন আজ্ঞানুবর্তিতা, ধর্মভীরুতা, কর্তব্যপরায়ণতা এবং সর্বোপরি যৌন বিশুদ্ধতা রার বিশেষ প্রয়োজন অনুভূত হল৷ এইসব ধমর্ীয় আদর্শ থেকে বিচু্যত নগরের মানুষদের জন্য সমাজসংস্কারকেরা তাই বিভিন্ন রকমের সমাজনিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবনের প্রস্তাব করলেন৷ এইসব নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলির প্রকৃত স্বরূপ সম্বন্ধে সমাজসংস্কারকেরা যাই ভেবে থাকুন না কেন, বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলির নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া এতটাই ব্যভিচারী যে, নিয়ন্ত্রিত মানুষেরা দাসের পর্যায়ে পড়ে৷
মার্কসীয় সমাজতাত্তি্বকদের ব্যাখ্যা হল এই যে, এইসব নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের উদ্ভবের পেছনে আছে এমনসব পরিকল্পিত বিন্যাস যার দ্বারা বিত্তহীন (শ্রমিক শ্রেণীর) মানুষদেরকে ধনতন্ত্রের প েব্যবহার করা যেতে পারে৷ এঁদের মতে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলি আসলে আমেরিকার ঐতিহ্যগত বর্ণবৈষম্যবাদী দাসপ্রথা টিকিয়ে রাখার ভিত্তিভূমি৷ এই প্রতিষ্ঠানগুলি দাসপ্রথাকে অবিচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা নিয়েই সৃষ্ট, তাই এর প্রতিটি প্রক্রিয়াই দাসপ্রথাকে বহাল রাখার দৃষ্টিতে দেখা উচিত৷ আমরা আমেরিকার কারাগারতন্ত্রের বিশাল ব্যাপ্তির পেছনে এই সত্যটাই ল্য করি৷
আমেরিকায় গত শতাব্দীর ষাটের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ফলে কৃষ্ণাঙ্গরা নাগরিক অধিকার অর্জন করলেও এতে তাদের বিন্দুমাত্র অগ্রগতি হয় নি৷ বরং তারা আরো পিছিয়ে পড়েছে৷ এর প্রমাণ জীবনের প্রতিটি েেত্রই পাওয়া যায়৷ ১৯৫০-এর দশকে যেখানে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ বেকার ছিল সেটাই ১৯৯০ সালে বেড়ে তিনগুণ হয়েছে৷ বিত্ত এবং ব্যক্তিগত পুঁজির েেত্রও কৃষ্ণাঙ্গরা ১৯৫০-এর তুলনায় ১৯৯০-এ অনেক বেশী ভঙ্গুর, অল্পবয়সীদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়া সন্তান জন্মের হার৷ অন্যদিকে যে মর্মন্তুদ ঘটনার শিকার হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক-যুবতীরা, সেটা হল মাদকদ্রব্যের নেশা৷ কৃষ্ণাঙ্গরা বেশীর ভাগ েেত্র মাদকদ্রব্যের শিকার হওয়ার পেছনে কারণগুলি গত সংখ্যায় বিস্তৃতভাবে আলোচনা করেছি৷ এখানে শুধু সংেেপ বলি যে, অভিভাবকহীন, গৃহহীন ও অনাথাশ্রমে বড় হয়ে ওঠার কারণে কৃষ্ণাঙ্গরা মাদকদ্রব্যের সহজ শিকার হয়৷ আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে মাদকদ্রব্যের নেশা একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা৷ মাদকদ্রব্যের ব্যবহারে নেশাগ্রস্ত মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতির ফলে তার সমস্ত কর্মমতা নিঃশেষ হয়ে যায়৷ সেই সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন হতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধমূলক কার্যকলাপের হার বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ ফলে এদের ঠাঁই হয় কারাগারে৷ আমেরিকা তার দেশের এক ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিষেধক হিসেবে কারাগারের ব্যবহারকেই শ্রেয় মনে করে৷
আমেরিকাতে আজ বিশ ল মানুষ কারাবন্দী৷ তার মানে পৃথিবীতে আশি ল কারাবন্দী মানুষের এক চতুর্থাংশই আছে আমেরিকায়৷ এ না হলে আর 'সভ্যতার' দায়! পৃথিবীর এক চতুর্থাংশ অপরাধী মানুষকে 'সংশোধন' করার গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছে আমেরিকা৷ কারণ আমেরিকায় কারাগারকে সংশোধন কেন্দ্র বলা হয়৷ এই বিশ লরে মধ্যে অর্ধেক বন্দী কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ৷ এক চতুর্থাংশ বর্ণময় (পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে ল্যাটিনো ও এশিয়ান), বাকী এক চতুর্থাংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মহিলা কারাবন্দীদের তিন চতুর্থাংশ কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাকিরা (দশ শতাংশেরও কম) শ্বেতাঙ্গ৷ সেই সঙ্গে আরো একটি ভয়াবহ পরিসংখ্যান হল এই যে, যেখানে ১৯৮০ সালে আমেরিকায় মোট ১৮ ল মানুষ ছিল বিচারাধীন, সেখানে এদের সংখ্যা বর্তমানে ৬৫ ল৷ অর্থাত্ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের পাঁচ শতাংশই বিচারাধীন৷ কৃষ্ণাঙ্গ পরিসংখ্যানের হিসেবে প্রতি দশজনের মধ্যে একজন এবং যুবকদের (১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের) েেত্র প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন বিচারাধীন৷
এতগুলো মানুষকে ধরপাকড় করা থেকে নিয়ে আদালতে অভিযুক্ত করা, জুরি নির্বাচন করে বিচার চালানো, শাস্তি দিয়ে বড় বড় জেলগুলো ভরে ফেলার এবং সেখানে তাদের দিয়ে দাসত্ব করানোর মত এক অতিকায় ব্যবস্থার জন্য স্বাভাবিকভাবেই সরকারি আয়ের এক বিশাল অংশ কারাগারতন্ত্রকে বহাল রাখতে ব্যয় করতে হয়৷ এই কারণেই আমেরিকা সরকার স্বাস্থ্য ও শিার মত গুরুত্বপূর্ণ জনহিতকর কর্মসূচী থেকে ব্যয় কমিয়ে কারাগারতন্ত্রের প্রসারে তা নিয়োগ করছে৷ নতুন কারাগার স্থাপন, বিদ্যমান কারাগারগুলির সংস্কার (যাতে বন্দীদের উপর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নজর রাখা যায়), পুলিশ-বাহিনী এবং আইন-আদালতের স্ফীতিকরণ ইত্যাদিতে মাত্র দুই দশকে সরকারের ব্যয় সত্তর কোটি ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে চার শ' চলি্লশ কোটি ডলার৷
আর একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হল এই যে, আমেরিকায় যেখানে কারাবন্দীর সংখ্যা বিশ ল সেখানে আইন-আদালত-কারাগার প্রণালীর সঙ্গে প্রত্যভাবে যুক্ত সরকারী বেতনভোগী কর্মচারীর সংখ্যাও বিশ ল৷ এর মধ্যে সাতল সরাসরি কারাগারতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত৷ এই সংখ্যার বিশালতার একটা ধারণা পাওয়া যাবে যদি বলা যায় যে সরাসরি কারাগারতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত যত মানুষ আমেরিকায় আছে তার সমানসংখ্যক মানুষ ওয়ালমার্টের মত সুবিশাল বিশ্বব্যাপী বণ্টনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত৷
মার্কিন সরকারের কারাগারতন্ত্রের প্রতি অনুরাগের আরো দু'চারটে উদাহরণ দিলে এই অনুরাগটি যে স্রেফ উন্মাদনা সেটা বুঝতে সুবিধা হবে৷ আমেরিকার 'উদারতম' প্রদেশ ক্যালিফোর্নিয়ার কারাগারতন্ত্র চালাতে বছরে পাঁচ শ' কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়৷ এই পরিমাণটি ক্যালিফোর্নিয়ার মত এক বিশাল প্রদেশের সাধারণ তহবিলের ছয় শতাংশ৷ ১৯৯৪ সাল থেকে নিয়ে এখন অবধি ওই প্রদেশই তার কারাগারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির চেয়ে অধিক ব্যয় করে আসছে৷ বর্তমানে এই প্রদেশে কারাগারকমর্ীর সংখ্যা সমাজসেবকদের থেকে যে বেশী সেটা বলাই বাহুল্য৷ আরো একটি উদাহরণ, ১৯৯৭ সালে কলোম্বিয়ার একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যত সংখ্যক ছাত্র ভর্তি হয়েছে তার থেকে তিনগুণ বেশী সংখ্যক মানুষ জেলে গেছে৷ ওই প্রদেশে কৃষ্ণাঙ্গদের কারাবন্দী করার হার হল প্রতি এক ল েতিন হাজার৷ অন্যভাবে বলতে গেলে প্রদেশটির আয়তনের সমান আর একটি দেশ ইংল্যান্ডে যদি এই হারে কারাবন্দী করা হয় তাহলে সেখানকার কারাবন্দীর সংখ্যা বর্তমানে ৬৫ হাজারের জায়গায় দাঁড়াত ১২ ল৷
আমেরিকা যেখানে কারাবন্দী করে রাখার পরিসংখ্যানে এক নম্বর স্থান অধিকার করে আছে এবং যার সংখ্যা ক্রমশ বছর বছর বেড়েই চলেছে সেখানে বিস্ময়করভাবে কারাগারব্যবস্থার উপর কোন তাত্পর্যপূর্ণ গবেষণা হচ্ছে না৷ গবেষণা না-হওয়াটা আরো বেশী আশ্চর্যের এই কারণে যে, আমেরিকার সমাজবিজ্ঞানীরা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কারাবন্দীদের নিয়ে গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন৷ এ বিষয়ে অবশ্য কভ ব্রাউন, ম্যালকম এক্স, পিরি থমাস, এলরিজ কেভার এবং এ্যনজেলা ডেভিস প্রমুখ তাঁদের রচনায় নিজেদের কারাজীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে আলোকপাত করতে সাহায্য করেছেন৷
অথচ আশির দশক থেকে কারাগারব্যবস্থা যতই ব্যপ্ত হতে থাকল, কারাবন্দীদের উপর সমাজ ও জাতিগত গবেষণা ততই হ্রাস পেতে শুরু করল৷ বর্তমানে আমেরিকায় এ-নিয়ে শুধুই মনোরঞ্জনকারী ও গোয়েন্দা গল্প-মার্কা টি.ভি. সিরিয়াল তৈরী হয়৷ সুসংহত বিতর্ক কিংবা পণ্ডিতসুলভ গবেষণা না-হওয়ার কারণ হল এই যে, মার্কিন সরকার এইসব কারাগারে সংশোধনের (মনে রাখবেন আমেরিকায় জেলের পোশাকি নাম সংশোধন প্রতিষ্ঠান) নামে যে কি ধরনের অরাজকতা চালাচ্ছে তা জনগণের কাছ থেকে স্বাভাবিক ভাবেই লুকিয়ে রাখতে চায়৷ স্তরীভূত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বারা সরকার কারাগারগুলিকে জনমাধ্যমের কাছে দুর্ভেদ্য করে রেখেছে৷ বরং আইন-আদালত-পুলিশ-কারাগার এবং জনমাধ্যমের মধ্যে এক ধরনের অাঁতাত গড়ে উঠেছে, যা নিয়ে একটু পরে আলোচনা করছি৷ সেই সঙ্গে সরকারের 'অলিখিত নির্দেশে' বিশ্ববিদ্যালগুলিও এ নিয়ে গবেষণার প্রতি বিশেষ উত্সাহ দেখায় না৷ তার উপর যদি এ বিষয়ে গবেষণার জন্য সরকারি অনুদান ও বৃত্তিও না-থাকে তাহলে তো গোদের উপর বিষফোঁড়া৷ সেেেত্র কোন গবেষকই-বা কারাগার সম্বন্ধে গবেষণা করার মত অন্ধকার কাজে নিজেকে লিপ্ত করবেন?
অবশ্য পণ্ডিতমহলে কারাগার সম্বন্ধীয় গবেষণায় অনীহাটি শুধুই যে সরকারি বাধা-বিঘ্নজনিত কারণে সেটা সর্বৈব সত্য নয়৷ তাই যদি হত তাহলে চরম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সাংবাদিক ড্যানিয়েল বার্গনার লুজিয়ানার কুখ্যাত অ্যাঙ্গোলা জেলে দশমাস অবস্থান করে তাঁর বইতে (গড অফ দ্যা রোডিয়ো) যদি বন্দীদের দুর্দশার এবং তাদের উপর নতুন নতুন অত্যাচারের অনুসন্ধানের তথ্য পেতে পারেন, তাহলে সমাজবিজ্ঞানী এবং নৃতত্ত্ববিদদের কারাগারগুলিতে হানা দেওয়ার চেষ্টার অভাবটিতো চোখে পড়ার মত৷ এর একটি কারণ অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মানুষ নিয়ে গবেষণার েেত্র প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য কমিটিগুলি কারাবন্দীদের উপর গবেষণা করার অনুমতি দেন না৷ এটাই হল সরকারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বোঝাপড়া৷ অনুমতি না-দেওয়ার অজুহাতটি অবশ্য প্রায়শঃই মানবাধিকারের ভাষায় সিঞ্চিত_'গবেষণা পদ্ধতির দ্বারা কারাবন্দীদের উপর অতিরিক্ত মানসিক চাপের সৃষ্টি হবে বলে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করা হল৷' আর একটি কারণ হল বিদ্বত্জনের মধ্যে নিজেদেরকে জেলের পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারে অরুচি৷ কারাবন্দীদের উপর গবেষণার জন্য যাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হবে তাদের অপরাধ তিন প্রকার; তারা আইন ভঙ্গ তো করেছেই, তার উপর তারা দরিদ্র এবং সেই সঙ্গে বেশীর ভাগ েেত্র কৃষ্ণাঙ্গ৷
গবেষকেরা জেলে গিয়ে কাজ করছেন না, কিন্তু জেলের বাইরে যে দুনিয়া তার উপর জেলের প্রভাব নিয়ে বেশ কিছু সমীা করেছেন৷ এই সমীাগুলির মধ্যে একটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে যা বাবা-মায়ের কারাদণ্ডের ফলে সন্তানের যে কি দুরবস্থা হয়, তার৷ ১৯৯১ থেকে ২০০০-এর মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা কারাবন্দীর হার ল্য করার মত বেড়েছে৷ আমেরিকায় মোট মহিলা কারাবন্দীদের মধ্যে সত্তর শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ৷ এদেরই গর্ভজাত তেইশ লাখ শিশু হল আমেরিকার সেই অভিশপ্ত নাগরিক, যাদের মধ্যে আটান্ন শতাংশের গড় বয়স আট বছর৷
সুতরাং এক বিশালসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ শিশু আগে যেখানে বাবার অভিভাবকত্ব থেকে বঞ্চিত হত, আজ সেখানে তারা শিশু মনের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় মাতৃস্নেহ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে৷ বেড়ে উঠছে অভিভাবকহীন, স্নেহ-বঞ্চিত এক ক্রমবর্ধমান প্রজন্ম যারা সদা আশঙ্কিত, অশিষ্ট, এবং আত্মরার্থে আগ্রাসী মনোভাবাপন্ন৷ সুকুমার বৃত্তির উন্মেষের স্থানে ক্রোধ ও ঘৃণা তাদের মনকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখে৷ ফলে অপরাধের চক্রবু্যহে এরা ঘুরে মরছে সদাই, বংশপরম্পরায় জেলে যাচ্ছে৷ জেল থেকে যদিও-বা মুক্তি পাচ্ছে কিন্তু অপরাধীর তকমা-অাঁটা মানুষের প্রতি চরম প্রতিকূল সমাজে এরা বেশীদিন মুক্ত থাকতে পারে না৷ ধীরে ধীরে জেলই হয়ে যায় তাদের জন্য চিরকালের ঠাঁই৷
এখানে মনে হতে পারে যে, কারাগারতন্ত্র প্রসারিত হওয়ার জন্যই কৃষ্ণাঙ্গরা ক্রমশঃ শ্বেতাঙ্গদের দৃষ্টি থেকে অপসারিত হচ্ছে৷ কারাগারতন্ত্র সে-দায়িত্ব পালনে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে ঠিকই, তবে সেই সঙ্গে আবাসস্থলের পৃথকীকরণের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের গতিবিধি নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়, যাকে গ্যেটোকরণ পদ্ধতি বলা যেতে পারে৷ একবিংশ শতাব্দীতেও আমেরিকায় আবাসস্থলের পৃথকীকরণ সুস্পষ্ট৷ এখনো বেশীর ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ শ্বেতাঙ্গপ্রধান আবাসস্থল থেকে বহুদূরে বাস করে৷ এক প্রকার নিয়মমাফিকভাবে কৃষ্ণাঙ্গরা বড় বড় শহরের প্রান্তরে ঘনীভূত৷
আমেরিকার মোট কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যার চলি্লশ শতাংশ বাস করে ঊনত্রিশটি মহানগরে৷ এরা ওখানে প্রথম এসেছিল চাকরির আশায়৷ অতি নিম্নবেতনে নিম্ন দতার কাজ করে বস্তির পরিবেশে বংশ পরম্পরায় জীবন ধারণ করে আসছিল৷ এই নিম্নদতার কাজগুলি প্রায়শঃই মজুরদের৷ কিন্তু ধীরে ধীরে স্বয়ংচল যন্ত্রের সাহায্যে কলকারখানাগুলি যতই অধিক থেকে অধিকতর যন্ত্রচালিত হতে থাকল, কৃষ্ণাঙ্গরাও তত বেশী সংখ্যায় বেকার হতে থাকে৷ এদের এমনিতেই চাষবাসের জমি ছিল না৷ অবশ্য থাকবে ভাবাটাই মূর্খতা৷ কারণ এরাই তো ক্রীতদাস হয়ে চাষ করত মনিবদের জমি৷ আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর মুক্তি পেয়ে সবার আগে চাষের এলাকা ত্যাগ করে প্রাণে বেঁচেছিল৷ না ছিল সঞ্চয়, সম্পত্তি তো দূর অস্ত, পেল না কোন তিপূরণ৷ এক দিক দিয়ে দেখতে গেলে তেখামারে দাসত্বের পর কল-কারকানায় দাসত্ব শুরু হল৷ সে সংস্থান সংকুচিত হয়ে সেবাকেন্দ্রিক অর্থনীতির (যেমন নানা রকমের বীমা, কেবল টি.ভি., ইন্টারনেট ইত্যাদি) প্রচলন বাড়তে থাকলে কৃষ্ণাঙ্গরা অধিক বেকার হয়ে পড়তে থাকে৷ শহরের প্রান্তিকতম প্রদেশে এরা কঠোরতম পুলিশি নজরদারি দ্বারা বেষ্টিত৷
শ্বেতাঙ্গরাও ধারে কাছে থাকে না এবং পারতপ েএইসব এলাকা এড়িয়ে চলে৷ এইসমস্ত গ্যেটো বা বস্তিতে শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটিই সতর্কবাণী শোনে, 'পুলিশ হইতে সাবধান'৷ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে অপরাধ করার শিাই হল এদের জীবন ধারণের অবলম্বন৷ প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়াও সহজ নয়৷ বিশেষ করে মানুষের উপর নজরদারি-প্রযুক্তিতে ওই দেশ যখন ভীষণরকমের উন্নত৷ তাই জীবনধারণের জন্য কৃত অপরাধে তাদের জেলে যেতে হয়৷ জেলে সংশোধনের নামে যেটা হয় তাহলো অপরাধ প্রবৃত্তির বৃদ্ধি৷ সুতরাং জেল থেকে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধ এবং জেলে ফেরত-যাওয়ার চক্রটি সৃষ্টি হয়৷
এবার দেখা যাক বৃহত্সংখ্যক কারাবন্দীর সন্তানদের পরিণতি৷ একটু আগেই বলেছি যে তেইশ লাখের মত কৃষ্ণাঙ্গ শিশু বেড়ে উঠছে যাদের বাবা-মা কারাবন্দী৷ তার ওপর এরা বেশীরভাগ েেত্রই গ্যেটোতে বড় হয়৷ এরা যে অপরাধ করবে (বা করানো হবে) সেটা ভবিতব্য৷ সে-অপরাধের ধরন যথেষ্টই হিংসাত্মক৷ বিশেষ করে যে-দেশে অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ প্রচুর, সহজলভ্য এবং নাগরিকেরা অস্ত্রের (আগ্নেয়াস্ত্রের) মালিক হওয়ার উত্সাহটি সংবিধান থেকেই পেয়ে থাকেন, সেখানে (আমেরিকায়) হিংসাত্মক অপরাধ ঘটার সম্ভাবনা বেশী হতে বাধ্য বৈকি৷ দরিদ্র শ্রেণীর মধ্যে হিংসাত্মক আক্রমণের বিশেষত্বটি হল এই যে, আক্রান্ত মানুষটি প্রায়শঃই আক্রমণকারীর কাছের লোক অথবা পূর্ব পরিচিত৷ আবার দারিদ্র্যের সঙ্গে মানুষখুনের ঘটনাতে এটাও দেখা যায় যে, খুনী হয়ত মানুষটিকে বেশীর ভাগ েেত্রই ভাল করে জানত, এমনকি হয়ত আত্মীয়তাও ছিল৷ এইসব ভয়ঙ্কর অপরাধ এক মুহূর্তের রাগেই যে ঘটে যায় তার পেছনে থাকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনা৷ যে-মানুষটি চাকরীহীন তার মরমে আঘাতটা সব থেকে বেশী হয় কাছের লোকের দুর্দশা দেখলে৷ আবার এই আঘাতই ক্রোধ রূপে চরম বিপর্যয় আনতে পারে যদি কাছের কেউ কিংবা পরিচিত প্রতিবেশী বেকার দরিদ্র মানুষটির দুর্বলতম স্থানে খোঁচা দেয়৷ এক মুহূর্তের ক্রোধে হয়তো একজন খুন হয়ে গেল৷ এটিকে ক্রোধ না-বলে আত্মঘাতী পদপে বলাটাই যথাযথ৷
আবার শারীরিক আক্রমণের মত হিংসাত্মক ঘটনা অপরিচিত মানুষদের প্রতিও ঘটতে পারে৷ অনুপাতে অনেক কম হলেও আমেরিকায় তা ঘটে৷ বছরে লাধিক শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গদের হাতে খুন হয়৷ এর মনস্তাত্তি্বক কারণটি হল এই যে আমেরিকায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্য বর্ণের ভিত্তিতে বিভক্ত৷ কৃষ্ণাঙ্গদের উপর পুলিশি আগ্রাসন যত বাড়বে ততই শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গ আক্রমণের শিকার হবে, শ্বেতাঙ্গরা পুলিশি আগ্রাসনের প্রতীক হবে৷ এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে আর একটি চক্র; দমননীতি থেকে প্রতিশোধস্পৃহা এবং আরো অধিক দমননীতি৷ কৃষ্ণাঙ্গদের মতো একটি জনগোষ্ঠী আমেরিকার কোন শত্রু দেশে থাকলে আমেরিকা তাদের মুক্তির জন্য কান-ফাটানো চিত্কার করত সন্দেহ নেই, অথচ দেশের মধ্যে এই জনগোষ্ঠী নিতান্তই অপরাধী, এনিয়ে আমেরিকায় আর কোন বিতর্কের অবকাশ নেই৷
এখনো পর্যন্ত দেখলাম যে, আমেরিকার কারাগারতন্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ ও বর্ণময় মানুষদের কারারুদ্ধ করে রাখার একটি প্রয়াস৷ সমাজের অন্যান্য শৃঙ্খলা বজায় রাখার সঙ্গে আইনের দণ্ডব্যবস্থার সাদৃশ্য নিয়ে ফুকোর পরও অনেকে আলোচনা করেছেন৷ নিম্নবর্গের কমর্ী বা শ্রমিকদের শৃঙ্খলিত করার নামে যে অত্যাচার হয় তার ভেতরেই কারাবন্দীদের উপর অত্যাচারের সাধারণ সূত্রের খোঁজ রয়েছে৷ যেমন গুস্তাভ র্যাডব্রুকের মতে দাসেদের কর্মস্থলে শৃঙ্খলিত করার মধ্যেই পরবতর্ীকালে কারাবন্দীদের শাস্তি দেওয়ার বীজ লুকিয়ে ছিল৷ দাস শ্রমিকদের বেত্রাঘাত অথবা মস্তকমুণ্ডন ইত্যাদির মত দৈনন্দিনভাবে প্রচলিত শাস্তিব্যবস্থা ক্রমশঃ জেলে ঠাঁই পায়৷
বর্তমান মানবাধিকারের যুগে অবশ্য জেলের শাস্তিব্যবস্থা 'সভ্য' রূপ ধারণ করেছে৷ শারীরিক অত্যাচার হয়তো সেভাবে করা হয় না, কিন্তু এর পরিবর্তে নির্জন কারাবাসের প্রচলন বেড়েছে৷ তার মানে জেলে উত্পাতকারীদের বশে আনতে তাদেরকে অন্ধকার ুদ্র ক েমাসাধিককাল আটকে রাখা হয়৷ শব্দ প্রবেশ করে না বলে এই কগুলিতে বন্দীদের বোঝার উপায় থাকে না যে সেটা দিনের শব্দময় কোন সময়৷ ভীতিজনক আলো ও শব্দের সমন্বয়ে বন্দীদের সদাই আতঙ্কিত করে রাখা হয়৷ উদাহরণ দিয়ে বলি, যে অন্ধকারে এমন ভয়ার্ত একটি বিভ্রমের সৃষ্টি করা হয় যাতে বন্দীর মনে হয় যেন দুটো হিংস্র কুকুর তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কিংবা মনে হয় কানের কাছে ভয়ংকর সাপের হিস্ হিস্ শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে আসে ঠাণ্ডা-ভিজে বাতাসের অনুভূতি৷
এইসব মানসিক অত্যাচারের ফলে দেখা গেছে যে, নির্জন কারাবাসে থাকার পর বন্দীদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বেড়ে গেছে৷ সময়ে সময়ে এসব তথ্য যে জনসাধারণের কাছে প্রকাশ পায় না তা নয়৷ কিন্তু ওই এক মোম গতানুগতিকতার সৃষ্টি করা হয়েছে নাগরিকদের মনে যে, কারাবন্দী হওয়ার কারণ হল বন্দীদের সহজাত অপরাধপ্রবণতা৷ এই অপবাদটি প্রচার করে জনসাধারণের মধ্যে কারাবন্দীদের ব্যাপারে উপো এবং ঘৃণার মনোভাবের কর্ষণ করা হয়৷ ফলে এ বিষয়ে ঘটে না বিশেষ আলোড়ন, না হয় কোন চর্চা৷ হলে হয় শুধু বোঝাপড়া এবং গড়া-পেটা বিতর্ক, যার দ্বারা বিশ্ব সম েতুলে ধরা হয় আমেরিকান গণতন্ত্রের গরিমা৷ এই বিতর্কগুলির দ্বারা আখেরে কিন্তু কিছুই অর্জিত হয় না৷ আমাদের দেশে বন্দীদের উপর (বিশেষ করে পুলিশি হেফাজতে) অকথ্য শারীরিক অত্যাচার করা হয়ে থাকে৷ কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের দ্বারা যে ধরনের নৃশংস মানসিক অত্যাচার আমেরিকায় হয় তার খবরে আমাদের থানার গণ্যমান্যদের জিভে যে জল এসে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই৷
আমেরিকায় কারাগারতন্ত্রের নির্মাণে, অন্যভাবে বলতে গেলে প্রধানতঃ কৃষ্ণাঙ্গ ও বর্ণময় সংখ্যালঘুদেরকে কারাবন্দী করে রাখতে, অর্থাত্ এদেরকে যতদূর সম্ভব দৃশ্যত লোপাট করতে, যেটি কঠোর ও অনমনীয় পদ্ধতিটি নির্দ্বিধায় চলে আসছে, একটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত সমাজ ব্যবস্থায় সেটা কি করে সম্ভব? বিশেষ করে নাগরিকদের কাছ থেকে এই ব্যবস্থার প্রতি দ্বিধাহীন সম্মতিটি যে কিভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করাটা খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়৷ প্রথমেই মনে করিয়ে দিই যে, আমেরিকায় সব রকমের মতা কুীগত রয়েছে শ্বেতাঙ্গদের হাতে এবং সেই সঙ্গে একমাত্র শ্বেতাঙ্গদের মতামত সর্বাধিক মূল্য দেওয়া হয়৷ কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের মনোভাবের বিষয়টি নিয়ে কতকগুলি বড় বড় সমীা হয়েছে যাতে দেখা গেছে যে, ৮০-৮৫ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অকারণে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে৷
এইসব সমীায় এটিও দেখা গেছে যে, তুলনামূলকভাবে শ্বেতাঙ্গরা অন্য বর্ণের যেমন ল্যাটিনো অথবা এশিয়ানদের প্রতি কম নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে৷ কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদেরকে কোনভাবেই বিশ্বাস করে না৷ সুতরাং শ্বেতাঙ্গদের বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বিদ্বেষের কারণটি সম্পূর্ণরূপেই বর্ণবৈষম্যবাদী মানসিকতা জাত৷ কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি এই বিদ্বেষ সফল করা হয়েছে নৈতিক আতঙ্কের সৃষ্টি করে৷ মানুষের প্রতি মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টিকে দীর্ঘমেয়াদী করার কাজটা, যেমন মুসলমান মাত্রই আতঙ্কবাদী বা সুইসাইড বম্বার, কৃষ্ণাঙ্গ মানেই কামুক এবং অপরাধপ্রবণ, ইত্যাদির গঠন কি ভাবে সম্পন্ন করা হয় তা নিয়ে পরে আলোচনা করবো, আপাতত একটি উদাহরণ দেব৷
১৯৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরে সিক্সটি মিনিটস্ (60 minutes)বলে সি.বি.এস.-এর এক টি.ভি. শো-নির্মাতা একই সঙ্গে গ্লেন ব্রুয়ার (কৃষ্ণাঙ্গ) এবং জন কুনেনকে (শ্বেতাঙ্গ) একই জায়গায় পাঠিয়ে ছবি তুলতে থাকেন৷ দেখা যায় যে, দোকানে কুনেনকে সাহায্য করার জন্য দোকানদাররা খুবই তত্পর, সেখানে ব্রুয়ারের েেত্র শীতল উত্সাহ চোখে পড়ার মত৷ মনোভাবটা এই রকম যে, ব্রুয়ারের জন্য সময় নষ্ট করে লাভ কি, ওর পকেটে তো পয়সা নেই৷ কিন্তু সে-জায়গায় সুপার মার্কেটের কোজ সার্কিট টিভিতে দেখা যাচ্ছে যে, ব্রুয়ারের প্রতি নজরদারিটা অনেক বেশী, কারণ কৃষ্ণাঙ্গ স্বভাবতঃই অপরাধপ্রবণ বলে মার্কিন শ্বেতাঙ্গদের বিশ্বাস৷ অন্যদিকে একই বড় রাস্তায় দু'জন আলাদা আলাদা হাঁটলে পুলিশের গাড়ী কুনেনের প্রতি দৃকপাত না-করে চলে যায়, কিন্তু ব্রুয়ারকে দেখলে গাড়ীর গতিবেগ কমে আসে এবং তাকে এক ঝলক ভালো করে পরখ করে নেওয়া হয়৷ তাছাড়া একই দোকানে গাড়ী কিনতে গেলে কুনেনকে ব্রুয়ারের তুলনায় দামে সস্তা ও অনুকূল ঋণচুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়৷ কোনো দোকানে চাকরীর জন্য দরখাস্ত করলে কুনেনকে বলা হয় পদটি অপূর্ণ, যদিও তার আগেই ব্রুয়ারকে জানানো হয়েছিল যে, পদটি পূরণ হয়ে গেছে৷
আবার বাড়ীভাড়া করতে গেলে দেখা যায় যে বাড়ীওয়ালা কুনেনকে ভাড়া দেওয়ার জন্য তত্ণাত্ রাজী, কিন্তু কুনেন বাড়ীটি মনোমত না-হওয়ার জন্য প্রত্যাখ্যান করে, ঠিক তারপরই ব্রুয়ার গেলে তাকে বলা হয় ভাড়াটে ঠিক হয়ে গেছে৷ অবশ্য বাড়ীওয়ালাদের মুসলমান ভাড়াটেদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব ভারতের অন্যশহর ছেড়ে দিলাম, প্রগতিশীল কলকাতাবাসীদের মধ্যেও ল্য করা গেছে৷ কাগজে ও টিভিতে এনিয়ে অনেক খবরই বেরিয়েছে৷ যা হোক, সিঙ্টি মিনিটসের এই শো'টির দ্বারা শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের এটিই দেখানো হয়েছিল যে, প্রতিদিন কৃষ্ণাঙ্গদের কি পরিমাণ অপমান, অসম্মান ও অবজ্ঞার সম্মুখীন হতে হয়৷
কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি যে চলে আসছে স্ট্যানলি কোহেনের মতে সেই বিষয়টি কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যাপারে একটি নৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টির ফলশ্রুতি৷ নৈতিক আতঙ্কবোধ সেই মানসিক অবস্থা যাতে কোনো একদল নির্দিষ্ট মানুষ প্রতিষ্ঠিত সামাজিক মূল্যবোধ ও স্বার্থকে বিপন্ন করে বলে মনে করা হয়৷ এই অনিষ্ট সাধনের কারণগুলির প্রকৃতিকে আমেরিকায় এক সুনির্দিষ্ট গতানুগতিকতার আকারে রূপদান করে জনমাধ্যমগুলি (বিশেষ করে টিভি)৷ নৈতিকতার একটি প্রাচীর তোলে সংবাদপত্রের সম্পাদকেরা, চার্চের পাদ্রীরা, রাজনৈতিক নেতারা এবং মূলস্রোতের বুদ্ধিজীবীরা৷ সমাজের আধিকারিক ও তাত্তি্বকরা এই 'ব্যাধির' নিরাময়ে তাঁদের রায়দান করেন৷ তাঁরা আইনসংক্রান্ত শাসনপ্রণালী পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে ব্যাপকভাবে তুলে ধরেন৷ আইন প্রণয়নের জন্য যে পরিমাণ প্রতিক্রিয়া সংকটের ভাবনাকে জাগানো হয় সেটা বাস্তব সংকটের থেকে অসমানুপাতিক ভাবে বেশী৷ এই আতঙ্ক থেকেই সৃষ্টি হয় 'লোকগাথার শয়তান'৷
এই শয়তান সৃষ্টির সাফল্যের জন্য প্রচারকার্যে সংখ্যার উপর খুব জোর দেওয়া হয়৷ যেমন এত সংখ্যক নেশাগ্রস্ত, এতগুলো খুন হয়েছে, এইসব অপরাধের ফলে করদাতাদের এত কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে ইত্যাদি৷ তবে বেশীর ভাগ েেত্রই এইসব পরিসংখ্যান রাশিবিজ্ঞানের কারচুপির দ্বারা জনগণের সম্মুখে তুলে ধরা হয়৷ এদের শয়তানির গল্প প্রচারের মধ্যে দিয়ে মানুষের মনে এমনসব ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করা হয় যাতে মনে হবে কৃষ্ণাঙ্গদের দ্বারা অপরাধ সংগঠনের আশঙ্কা, সম্ভাবনা সাধারণভাবে নির্ধারিত সমস্ত যুক্তির বাইরে৷ তাই এদের প্রতিহত করতে কঠোরতম পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়াটাই বাঞ্ছনীয়৷ এদেরকে নিষ্ক্রিয় করতে, নূ্যনতম প েবাগে আনতে এমনসব আইন-প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে যার দ্বারা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া যেতে পারে৷ হয়েছেও তাই৷ মার্কিন শ্বেতাঙ্গরা কোনো কৃষ্ণাঙ্গের প্রতি প্রদত্ত অসমানুপাতিক কঠোর দণ্ডে মোটেই বিচলিত হয় না৷ ক্বচিত্ কোনো মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের সমীায় কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অতিরিক্ত কঠোর শাস্তি প্রদানের তথ্য প্রকাশ পায়, কিন্তু শ্বেতাঙ্গ সমাজ সাধারণত সে-বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেয় না৷
তার কারণ নৈতিক আতঙ্কের সফল প্রচারের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের েেত্র অপরাধটাকেই তাদের সংস্কৃতি বলা হয়৷ এর উপর আবার তাদের সংস্কৃতিকেই অপরাধে পর্যবসতি করা হয়েছে৷ শ্বেতাঙ্গদের মনের অগোচরে কোথাও এই মনোভাব থেকেই যায় যে, কৃষ্ণাঙ্গরা জন্মগতভাবে হিংস্র, অযৌক্তিক এবং সভ্য চিন্তাধারার বশীভূত নয়৷ এরা কোথাও একত্রিত হলে ঝামেলা বাধাবে; সেখান থেকে মারামারি ও ছোরাছুরিও চলবে৷ বন্দুক থাকলে তো কথাই নেই, দু'চারটে লাশও পড়বে৷ তাই তারা যেখানে একত্রিত হয় সেখানে 'সভ্য' শ্বেতাঙ্গরা যায় না৷ যদি কখনো গিয়ে পড়ে তাহলে সত্বর সেখান থেকে প্রস্থান করে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে দেয়৷ পুলিশ এসে কৃষ্ণাঙ্গদের ধরে জেলে পোরে, কেস দেয় বিস্তর (সভ্যদেশের আইন বলে কথা)৷ অপরাধ করাটাই যেন কৃষ্ণাঙ্গদের রীতি৷
আবার এদের গান-বাজনার স্বাভাবিক ঝোঁকটাকে সংস্কৃতি না-বলে অপরাধের পর্যায়ে ফেলা হয়৷ যেমন, র্যাপ মিউজিকের তালে সুর মিলিয়ে কোনো কৃষ্ণাঙ্গের দলবদ্ধ নাচাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয় তো বটেই, শ্বেতাঙ্গরা তখন কৃষ্ণাঙ্গদের স্থান ত্যাগ করে অবিলম্বে৷ র্যাপ মিউজিকের অ্যালবাম বাজেয়াপ্ত ও গায়কদের গ্রেপ্তার করার ঘটনাও ঘটে৷ আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে দলবদ্ধ হয়ে নাচ-গানের প্রচলনটির সূত্র বড়ই মর্মস্পশর্ী ভাষায় লিখেছেন ফ্রেডরিক ডগলাস তাঁর আত্মজীবনীতে৷ দেড়শ' বছর আগেও দাসত্বের যুগে এরা চিনি, তামাক ও তুলোর েেত প্রতিনিয়ত পাশবিক অত্যাচারের বিভীষিকা থেকে ণকালের জন্য মনকে হালকা করতে জমিতে দলবদ্ধ হয়ে নাচ-গান করে চিত্তবিনোদন করত৷ ধরা পড়লে অবশ্য বেত্রাঘাত, লাথি-ঘুঁষি জুটত অবিরাম, কারণ দাসদের জন্য চিত্তবিনোদন নিষিদ্ধ৷ সেই দাস যুগ থেকে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের নাচ-গানটি তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে৷
আমেরিকান সঙ্গীতের জগতে আজ কৃষ্ণাঙ্গদের একচেটিয়া আধিপত্য৷ বিশেষ করে সুরময় ব্লুস এবং জ্যাজের দুনিয়ায় এদের কোন বিকল্প নেই৷ এ সত্ত্বেও কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গীতের এই দিকটির সঙ্গে তাদের ছবিটাকে কল্পনা করা হয় না, করা হয় র্যাপের সঙ্গে৷ সমাজ-সংসার-আইন প্রভৃতি 'সভ্য' প্রতিষ্ঠানের প্রতি 'অশ্লীল' (আসলে কটু ও তিক্ত) উক্তির দ্বারা রচিত গানগুলি শুনলেই শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের নজর প্রখর হয়ে ওঠে এবং কৃষ্ণাঙ্গদের ধরে ধরে জেলে পোরার জন্য তাদের হাত নিস্ পিস্ করতে থাকে৷ এইভাবেই কৃষ্ণাঙ্গদের সংস্কৃতিটাকেও অপরাধের স্তরে ফেলা হয়৷
অপরাধমূলক কার্যকলাপ এবং দমনের প্রক্রিয়াটিকে জনগণের সামনে জনমাধ্যমের (টিভি) দ্বারা তুলে ধরতে আইন-আদালত-পুলিশিব্যবস্থা ও টিভি চ্যানেলগুলি একজোট হয়ে কাজ করে৷ মনস্তাত্তি্বক গবেষণায় দেখা গেছে যে, হিংসাত্মক ঘটনার (যুদ্ধবিগ্রহ, মারামারি) আকর্ষণমতা পর্নোগ্রাফীর পরেই৷ একেবারে চোখের সামনে বিধ্বংসী ঘটনা মানুষের পছন্দ নয়৷ অর্থাত্ সাাত্ অভিজ্ঞতা কেউই উপভোগ করে না, কিন্তু যেখানে সে নিজে জড়িত নয় সেইসব েেত্র হিংসাত্মক কার্যকলাপ দেখতে তার বেশ লাগে৷ টিভিতে সে বসার ঘরের আরামে ইরাকের বা প্যালেস্টাইনের রাস্তায় রক্তস্নাত মানুষের নিউজ কিপ উপভোগ করতে পারে নিরুত্তাপ চিত্তে৷
মানুষের এই মানসিকতার জন্যই টিভি-র স্থানীয় চ্যানেলগুলির খবরের মধ্যে যেটা প্রাধান্য পায় তা হল অপরাধমূলক ঘটনার বিস্তৃত এবং বিশদ বর্ণনা_নিত্য ও প্রতিনিয়ত৷ যে-চ্যানেল যত বেশী এসব দেখায় তার মান বাড়ে তত বেশী, বিশেষ করে জনপ্রিয়তাটা তো দাঁড়ায় সবচেয়ে বেশী৷ এই কারণেই পুলিশ এবং আদালত টিভি চ্যানেলগুলিকে সাড়া-জাগানো অপরাধের কেসগুলি বিস্তৃতভাবে সরবরাহ করে যাতে করে টি.ভি. চ্যানেলগুলো তাদের অনুষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে এইসব ঘটনা দেখাতে পারে৷ প্রচ্ছন্নে, এই সিরিয়েলগুলো দর্শকদের প্রতি আদেশব্যঞ্জক ও উপদেশমূলক৷ চক্রাকারে এই উপদেশগুলি রাজনৈতিক বিষয়সূচীর অন্তভর্ুক্ত হয়ে জনমত দ্বারা পুষ্ট হয়ে আইনে পরিণত হয়৷ এই প্রক্রিয়াটিকেই চম্স্কি সম্মতি আদায় প্রক্রিয়া (manufacturing of consent)বলেছেন, যাতে জনমাধ্যমের ভূমিকা খুবই জঘন্য৷
সেই কবে অ্যারিস্টটল বলেছেন আধিক্য থেকেই তৈরী হয় সব থেকে বড় বড় অপরাধ, অভাব থেকে নয়৷ আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গরা অপরাধ করে অভাব-অনটনের জ্বালায়৷ মানুষের এই মনোবৃত্তি পৃথিবীর সর্বত্রই এক৷ আর সব মানুষের মত কৃষ্ণাঙ্গরা অবজ্ঞা ও অপমানের প্রতিশোধ নিতেও অপরাধ করে বসে৷ অন্যভাবে বলতে গেলে আইনের চোখে দণ্ডনীয় কাজই হচ্ছে অপরাধ৷ বিদ্রোহী মনোভাব কখনো কখনো দেখা গেলেও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গরা সংঘবদ্ধ নয়৷ যাতে সংঘবদ্ধ না-হতে পারে সে-চেষ্টায় সদা-নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্র সরকার৷ কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার শ্রমিক এবং নিম্নবর্গের মানুষদের সংঘবদ্ধ হতে দেয় না তা নিয়ে এই রচনায় আলোচনা করার সুযোগ নেই৷
তবে কৃষ্ণাঙ্গদের অভাবজনিত অপরাধের স্থানে বড় বড় বহুজাতিক শিল্প সংস্থানগুলিতে যেসব পুকুর চুরি ঘটে চলেছে তাতে কিন্তু একচেটিয়াভাবেই জড়িত থাকে শ্বেতাঙ্গ এবং ইহুদীরা৷ ওলন্দাজ মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞানী উইলেম বংগ্নার তাঁর ১৯১৬ সালে লেখা ক্রিমিনালিটি এন্ড ইকনোমিক কনডিশনস বইতে রাস্তার এবং রাজমহলের অপরাধ নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেন৷ এই বইটিতে বংগ্নারের প্রতিপাদ্য বিষয়টি ছিল এই যে, পুঁজিবাদ পরার্থবাদের স্থলে বিচ্ছিন্নতাবাদী অহংবাদের সৃষ্টি করে৷ বংগ্নারের বক্তব্য হল এই যে, পুঁজিবাদী শোষণ থেকেই শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে অপরাধমূলক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়, যাকে তিনি রাস্তার অপরাধ বলেছেন৷ অপর প েকায়েমী স্বার্থসম্পন্ন পুঁজিবাদীদের লোভ থেকে সৃষ্টি হয় আর এক প্রকার অপরাধ যাকে তিনি রাজমহলের অপরাধ বলেছেন৷ এই রাজমহলের অপরাধই হল দুনর্ীতিপরায়ণতা, যেটিকে তিনি পুঁজিবাদী অর্থনীতির অবদান বলে চিহ্নিত করেছেন৷ বংগ্নারেরই এক আমেরিকান অনুগামী এডউইন সাদারল্যান্ড পরবতর্ীকালে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে দুনর্ীতির সংস্কৃতিকে White-Collar Crime বা বাবু-কাজজনিত অপরাধ বলেছেন৷
বস্তুতঃ ইংরাজী অভিধানে White-Collar Crime শব্দটি প্রচলনের কৃতিত্বটা সাদারল্যান্ডেরই, তখন থেকে যখন তিনি ১৯৩৯ সালে আমেরিকান সোসিওলজিকাল সোসাইটির বার্ষিক অধিবেশনে এ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন৷ অবশ্য এর আগে ই. এ. রস, স্টেফেন্স, সিনকেয়ার প্রমুখেরা সংবাদতথ্যমূলক বিবৃতি এবং গল্পাকারে শ্রমিক-মজদুরদের কর্মেেত্র নিরাপত্তার অভাব, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যদ্রব্যের প্যাকিং, শিল্পপতিদের দ্বারা বিধায়কদের উপঢৌকন দেওয়া নিয়ে লিখতেন৷ এইসব বিষয়ে লেখার জন্য এঁরা যাদের চটিয়েছিলেন তারা রস, স্টেফেন্স, সিনকেয়ারদের কুত্সা-প্রবণ বলে অপবাদ দিতেন৷ কিন্তু আমেরিকার শিল্পসম্বন্ধীয় আইনপ্রণয়নে মজুর ভোক্তাদের নিরাপত্তা প্রদানের েেত্র এইসব 'কুত্সাপ্রবণ' লেখকদের অবদান স্মরণীয়৷
সাদারল্যান্ডের অবদান হল তিনি এই কুত্সাপ্রবণ সামাজিক বিষয়টিকে সমাজ বিজ্ঞানের রূপ দিয়েছিলেন৷ তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে-কোনরকম অভাব না, থাকা সত্ত্বেও শিল্পপতি ও সমাজের উচ্চবর্গের মানুষদের রয়েছে দুনর্ীতির অসম্ভব রকমের স্পৃহা৷ প্রায় সত্তর শতাংশ বড় বেসরকারী এবং পনের শতাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে সাদারল্যান্ড দেখিয়েছেন কি সাংঘাতিক দুনর্ীতিগ্রস্ত এইসব শিল্পপতিরা৷ ১৯৪৯ সালে এই বইটির প্রকাশক ড্রাইডেন, শিল্পপতিদের আনা মানহানির মামলার ভয়ে প্রতিষ্ঠানগুলির নাম উহ্য রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন৷ ১৯৮৩ সালে বইটির পুনঃ-সংস্করণে উহ্য প্রতিষ্ঠানগুলির নাম প্রকাশিত হয়৷ এই ঘটনা থেকেই বোঝা যায় যে, এইসব প্রতিষ্ঠানগুলির প্রভাব ও মতা কত বেশী৷
এইসব দুনর্ীতির েেত্র ব্যক্তিবিশেষের লোভকেই একমাত্র কারণ বলে মনে করাটা ভুল হবে৷ কেননা বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতে কারো একার প েদুনর্ীতি করা সম্ভব নয়৷ নজরদারি ভীষণ বেশী৷ একটি সুনির্দিষ্ট প্রণালী আছে যার দ্বারা দুনর্ীতি চলে৷ সেই দুনর্ীতিতে অংশগ্রহণ করতে উচ্চ-পদাধিকারীরাই পারে৷ এরা একে অপরের সাথে অর্থভিত্তিক সম্বন্ধ স্থাপন করে জটিল জাল বোনে, যার ফলে অপরাধমূলক কার্যকলাপের প্রমাণ লোপাট করা থেকে শুরু করে আইনব্যবস্থার চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের হাত করে দুনর্ীতিমূলক কাজগুলো হাসিল করা সম্ভব হয়৷ এরই ফলে শিল্পপতিরা হয়ে ওঠে মতাশালী৷ এদের মধ্যে কোনো কৃষ্ণাঙ্গকে পাওয়া দুষ্কর৷ আমেরিকায় White-Collar Crime -এর জগতে আছে শুধু শ্বেতাঙ্গ ও ইহুদী৷ সেখানকার বড় বড় বাণিজ্য সংস্থাগুলিতে দুনর্ীতি ও জালিয়াতি ঘটে চলেছে নিত্য৷ এই ধরনের অপরাধ-নিবৃত্তির তেমন কোন ব্যবস্থা আমেরিকান আইনে পাওয়া যায় না৷
অথচ অপরাধ ঘটা থেকে নিবৃত্তিকরণের জন্য কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য গ্যেটোকরণ ব্যবস্থা, নজরদারি ও বর্ণভিত্তিক চিত্রাঙ্কনের যে অতিকায় আইন প্রণালী ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা আছে সেই ধরনের ব্যবস্থা শিল্পপতিদের েেত্র স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যায় না৷ অর্থ ও প্রতিপত্তির জোরে আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে এরা বেশীর ভাগ েেত্রই বেরিয়ে যায়৷ সম্ভব হয় নি এনরন কিংবা ওয়ার্ল্ডকমের েেত্র, কারণ তহবিল তসরুফের পরিমাণটি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বড়৷ এনরনের েেত্র তো তহবিল তসরুফের ফলে চার হাজার কোটি ডলারের পেনসন তহবিল ফাঁকা হয়ে গেছে, যার ফলে কর্মচারীরা সারা জীবনের সঞ্চয় ও সম্বল হারিয়ে পথে বসেছেন৷ এই হল শ্বেতাঙ্গ অপরাধের জের৷ মানুষের অমন অনিষ্টসাধনের ব্যাপকতা দেখলে শিউরে উঠতে হয়৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও এদের েেত্র অপরাধপ্রবণতার কলঙ্ক শুনতে পাওয়া যায় না৷
হালের যে পুঁজিবাদী অর্থনীতি তাকে জুয়াখেলা অথবা ফাটকাবাজী অর্থনীতি বলা উচিত৷ এ সম্বন্ধে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ মরিস অ্যালিস বলেছেন যে, পূর্বের পুঁজিবাদ ছিল শিল্পকেন্দ্রিক, কিন্তু বর্তমানে এটিকে মুদ্রাকেন্দ্রিক বলা উচিত৷ অর্থাত্ উত্পাদিত পণ্যদ্রব্যের সংবহনের জায়গায় এখন হচ্ছে মুদ্রার সংবহন৷ বিশ্বায়নের কৃপায় প্রতিদিন যেখানে সারাবিশ্বে বারশ' কোটি ডলারের পণ্য বিনিময় হয়, সেখানে মুদ্রা বিনিময়ের পরিমাণ হল চলি্লশ হাজার কোটি ডলার৷ শেয়ার বাজারে হরেক রকম পদ্ধতিতে মুদ্রা বিনিয়োগ করাটাই হল বর্তমান পুঁজিবাদী প্রথার মূলমন্ত্র এবং মোটা টাকা লাভ করাটা আজ আভিজাত্যের লণ৷ সেই সঙ্গে চলে সম মনোভাবাপন্ন মানুষদের মধ্যে গোপন অাঁতাত, অবৈধ চুক্তি এবং জালিয়াতি, যার দ্বারা মোটা অঙ্কের টাকা তসরুফ করা হয়৷
এই দুনর্ীতি বন্ধ করতে আমেরিকান আইনে কোন প্রতিষেধক ব্যবস্থা নেই সেটা আগেই বলেছি৷ কিন্তু নাগরিকরা এ নিয়ে ধীরে ধীরে সরব হচ্ছেন৷ যদিও এই ধরনের অপরাধ নিয়ে টি.ভি.তে ধারাবাহিক দেখানো হয় না, তা সত্ত্বেও আমেরিকান জনমত ক্রমশঃ সোচ্চার হওয়ার ফলে জুরিভিত্তিক আইন ব্যবস্থায় White-Collar অপরাধীদের দণ্ড কঠোর হচ্ছে৷ কিন্তু অপরাধপ্রবণতার যে কলঙ্ক কৃষ্ণাঙ্গদের েেত্র প্রযোজ্য হয় সেটা শ্বেতাঙ্গদের েেত্র থাকে না৷ সাধারণ মানুষের মনে কিন্তু শ্বেতাঙ্গ মাত্রেই দুনর্ীতি পরায়ণ, জালিয়াত্ লোকঠকানোর কারবারী_এই গতানুগতিক ভাবনা আসে না৷ অবশ্য সরকার বেশ ভালই টের পাচ্ছে যে, এইসব অপরাধীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ তাই বিশ্বায়নের নামে এদের আমেরিকা থেকে অন্যদেশে চালান করা হচ্ছে৷ সাম্রাজ্যবাদের কালে যেমন ইংলন্ডের অপরাধীদের অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে নির্বাসিত করা হত, বর্তমানে বিশ্বায়নিক সাম্রাজ্যবাদের যুগে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ অপরাধীদেরকে বহির্বিশ্বে ব্যবসার জন্য ঠেলে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে৷
লক ওয়াকোয়ান্ট ১৯৯৯ সালের এক রচনায় আমেরিকার কারাগারতন্ত্র প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সরকার প েজনহিতকর কর্মসূচী না-থাকার জন্য আমেরিকার কারাগারগুলি গৃহহীন দরিদ্র মানুষের বাসস্থানে পরিণত হচ্ছে৷ কারাগারগুলি সমাজে অর্থনৈতিকভাবে নিম্নস্তরের মানুষদের অধীনস্থ করে রাখার জন্য খুবই প্রয়োজনীয়৷ কারাগারে এদের দিয়ে উত্পাদনমূলক কাজ করানো হচ্ছে দরিদ্র কর্মশালার ধাঁচে, যার ফলে রাজস্ব উত্পাদনও বেড়ে যাচ্ছে৷ অতএব দেখা যাচ্ছে যে, গত শতাব্দীর ষাটের দশকের কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিক অধিকার দিতে বাধ্য হওয়ার পর থেকে আমেরিকান সরকার ক্রমশঃ কৃষ্ণাঙ্গদের গতিবিধি সীমাবদ্ধ করার কাজে কারাগার ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ করে চলেছে৷ সেই সঙ্গে অপরাধীদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদেরকে রাজনৈতিকভাবেও নিষ্ক্রিয় করা হচ্ছে৷ কলিন পাওয়েল, কন্ডলিত্সা রাইস কিংবা বারাক ওবামারা বাইরে কালো, কিন্তু ভিতরে সাদা৷
আমেরিকান সমাজের বর্ণান্ধতার সঠিক অর্থ হল এই যে, কোন বর্ণের মানুষ যদি ভিতরে সাদা হয় তাহলে সে গ্রহণযোগ্য হবে৷ বেশীর ভাগ কৃষ্ণাঙ্গ ভিতরে সাদা হতে পারছে না বলেই তাদের এই দুর্দশা৷ অপরাধী হওয়ার দোষে আট শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ২০০৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারে নি৷ ২০০০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে যেখানে ফোরিডাতে জর্জ বুশ অ্যাল গোরকে মাত্র ৫৬৭ ভোটে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সেই সময় যদি জেল থেকে মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না করা হত, তাহলে অ্যাল গোর ৩০,০০০ ভোটে জিততেন (কারণ কৃষ্ণাঙ্গরা প্রথাগতভাবে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেয়)৷ প্রাক্তন অপরাধী ও বিচারাধীনদের মিলিয়ে পঞ্চাশ ল আমেরিকান দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত৷ সুতরাং বিদ্যমান দু'টি মাত্র রাজনৈতিক দলের প েআমেরিকার ল ল কৃষ্ণাঙ্গের সমস্যা নিয়েও মাথা ঘামানোর দরকার হয় না৷ একবার গ্রেপ্তার করে জেলে ঢুকিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে গেল৷ ধন্য আমেরিকার কারাগারতন্ত্র৷
John D. Strentny. ‘Law and the American State,’ Annual Review of Sociology, Volume 32, pp 213-244, 2006
Steven D. Levitt, Thomas J. Miles, ‘Economic Contributions to the understanding of Crime,’ Annual Review of Law and Social Science, Volume 2, pp 147-164, 2006
Michel Foucault, Discipline and Punish : the Pirth of Prison.
C. Marks, ‘The urban underclass,’ Annual Review of Sociology. Volume 17, pp 445-466, 1991
A. V. Horwitz, ‘The economy and social pathology,’ Annual Review of Sociology, Volume 10, pp 95-119, 1984
Lorna A. Rhodes, ‘Towards an anthropology of prisons,’ Annual Review of Anthropology, Volume 30, pp 65-83, 2001
Simon A. Cole, Michael Lynch, ‘The social and legal construction of suspects’, Annual Review of Law and Social Science. Volume 2, pp 39-60, 2006
Daniel Bergner, God of the Rodeo : The quest for redemption in Lousiana’s Angola prison
S. Zukin, Gentrification, I ‘Culture and Capital in the urban core,’ Annual Review of Sociology. Volume 13, pp 129-147, 1987
Stewart E. Tolnay. ‘The African American ‘Great migration’ and beyond,’ Annual Review of Sociology, Volume 29, pp 209-232, 2003
Christy A. Visher, Jeremy Travis. ‘Transition from prison to community : understanding individual path ways,’ Annual Review of Sociology. Volume 29, pp 89-113, 2003
Alfred Blumstein, Joel Wallman. ‘The crime drop and beyond,’ Annual Review of Law and Social Science. Volume 2, pp 125-146, 2006
James Q. Whitman, ‘The comparative study of criminal punishment,’ Annual Review of Law and Social Science, Volume 1, pp 17-34, 2005
Paul R. Brass. ‘Foucault steals political Science,’ Annual Review of Political Science. Volume 3, pp 305-330, 2000
Anthony Spirito, Christianne Esposito - Smythers. ‘Attempted and completed suicide in adolescence,’ Annual Review of Clinical Psychology. Volume 2, p 237-266, 2006
W. R. Allen, R. Farley, ‘The shifting social and economic tides of black America, 1950-1980,’ Annual Review of Sociology. Volume 12, pp 277-306, 1986
Darrell Steffensmeiers, Emilie Allan, ‘Gender and crime : Towards a gendered theory of female offending.’ Annual Review of Sociology. Volume 22, pp 459-487, 1996
J. Braithwaite. ‘White-collar crime,’ Annual Review of Sociology. Volume 11, pp 1-25, 1985
Christopher Ugger, Angela Behrens, Jeff Manza. ‘Criminal disenfranchisement,’. Annual Review of Law and Social Science. Volume 1, pp 307-322, 2005