চিন্তা
বাংলাদেশে সমাজ চেতনা ও সমাজ-রূপান্তর বহু সমাজ থেকে এক সমাজ
আনিসুর রহমান
১
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি এমন এক সময় এরকম একটি বিষয়ে আমাকে আলোচনা করতে আহ্বান করেছে যখন দেশটা মনে হয় একটা ভয়ানক সংঘাতের পথে চলেছে৷ এই সমাজের রূপান্তর হয়ে 'বহু সমাজ' 'এক সমাজ'-এর দিকে এগিয়ে যাবে এই চিন্তা সহজ চিন্তা নয়৷
আমার এই আলোচনায় প্রথমে এই সময়ের জন্য সমাজ রূপান্তর ও এক সমাজের অর্থ সন্ধান করেছি৷ তারপর আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ও সেই প্রতিশ্রুতি-ভঙ্গের আলোচনা করেছি৷ তারপর দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষে-মানুষে হাত ধরে এক সমাজের দিকে যাবার প্রচেষ্টার কিছু দৃষ্টান্ত দিয়েছি৷ এরকম হাত ধরাধরির একটা বড় সামাজিক আন্দোলনের প্রস্তাব রয়েছে পরবতর্ীতে৷
'সমাজ-রূপান্তর' এই ধরনের কথা মার্কসবাদী শিবিরেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, এবং মার্কসবাদী অর্থে সমাজ রূপান্তর বলতে বোধ হয় একধাপে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই বোঝায়, তাই সমাজ চেতনার অর্থ এরকম বিপ্লবের প্রয়োজনেরই চেতনা৷ কিন্তু গত শতাব্দীতে বিশ্বপ্রাঙ্গণে সমাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর আজ বিশ্বে এরকম সমাজ রূপান্তরের জন্য সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বলে জ্বলজ্বলে তেমন কিছু নেই৷ মার্কসবাদী মহল থেকে সমাজতন্ত্রের পরাজয়ের তেমন গঠনমূলক, নতুন কোনো দিক-নির্দেশনামূলক বিশ্লেষণও আমার চোখে পড়ে নি৷ সমাজ-বিজ্ঞানী হিসাবে আমার কিছু বিশ্লেষণ অন্যত্র দিয়েছি৷ এতে 'বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী'দের জনগণের চাইতে অগ্রসর চিন্তার দাবীর সমালোচনা আছে, প্রোলেতারিয়েতদের একনায়কত্বের নামে 'বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীদের একনায়কত্বের' সমালোচনা আছে৷ এমনকি মাও জে দুং-এর বুদ্ধিজীবীদের জনগণের কাছে গিয়ে তাদের কাছ থেকে শিখে জনগণের জ্ঞান কনসেপচুয়ালাইজ করবার আহ্বানেরও সমালোচনা আছে৷ 'ছোট্ট লাল বই' শেষ পর্যন্ত তো 'মাও জে দুং থট্' বলেই প্রচার করা হলো, 'পিপল্স থট' নয়, যার ফলে মাও-এর মৃতু্যর পরদিনই জনগণ এবার কার 'থট' অনুসরণ করব, এই খোঁজে মগ্ন হয়ে গেল৷ সবমিলিয়ে আমার বিশ্লেষণের সারাংশ হলো এই যে, 'ধ্রুপদী' সমাজ বিপ্লবগুলির পরে বিপ্লবোত্তর দেশগুলিতে মানসিক শ্রম আর দৈহিক শ্রমের মধ্যে দ্বন্দ্বটাই সমাজে প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে জনগণের ওপর নতুন চেহারার একটা প্রভুত্ব ও শোষণের ধারা বইয়ে দেয়৷
অর্থনীতি সমিতি সমাজ চেতনা ও সমাজ-রূপান্তরের অর্থ আজকের বিষয়বস্তুর সাব-টাইটেলেই ব্যাখ্যা করে দিয়েছে_'বহু সমাজ থেকে এক সমাজ'৷ এটি মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গী নয়, জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে উদ্ভূত প্রশ্ন৷ বাংলাদেশে জাতিসত্তার চেতনা বহুধা বিভক্ত, এই সত্য অত্যন্ত স্পষ্ট৷ মার্কসবাদী শিবিরে সমাজতন্ত্রের আগে একটি জাতীয়তাবাদী স্তরের প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি আছে, তবে তাদের মধ্যে এই বিতর্ক এক পর্যায়ে গিয়ে সমাজতান্ত্রিক ধারার হাতেই জাতীয়তাবাদী বিপ্লব হবে এই অবস্থানে এসে দাঁড়ায়৷ এদেশে এমন কোনো মার্কসবাদী ধারা এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না যার নেতৃত্বে দেশে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবও হতে পারে৷ এদেশে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবের আদৌ সম্ভাবনা আছে কী? আমাদের মনে হয় এই প্রশ্নটাই 'বহু সমাজ থেকে এক সমাজ' এই প্রশ্নের মর্মকথা৷
কিন্তু 'বহু সমাজ থেকে এক সমাজ' কথাটিরই মানে কী? কেউ নিশ্চয় চাইছে না যে, সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের নিজ নিজ সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের স্বাতন্ত্র্য ছেড়ে দিয়ে এক সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনকে আলিঙ্গন করুক৷ এই প্রশ্নে জাতীয়তাবাদী দার্শনিক রবীন্দ্রনাথের 'সভ্যতা'র সংজ্ঞা আমাদের সাহায্য করতে পারে৷ বিচিত্রকে মিলিত করিবার শক্তিই সভ্যতার লণ-এর অর্থ প্রত্যেক সমাজ তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে অপর সমাজের সঙ্গে মিলিত হবে পরস্পরের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করে, পরস্পরের কাছ থেকে সমৃদ্ধি ও শিা নেবে, পরস্পরের জ্ঞান থেকে জ্ঞান নেবে, পরস্পরের আচার-অনুষ্ঠানে আনন্দ করে অংশ নেবে, পরস্পরের জীবনপথ সন্ধানে সহযোগিতা করবে, পরস্পরের দুঃখ-বিপদে সহায়তার হাত প্রসারিত হবে, এবং এমনিভাবে মিলিত হয়ে পৃথক হয়েও এক জাতিসত্তার চেতনায় উদ্ভাসিত হবে৷
আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়বস্তুটি এই, বাংলাদেশ কি ওপরের অর্থে একটি সভ্য দেশ হতে পারে? এই চেতনার ধারক কী এদেশে হতে পারে?
২
আমাদের দীর্ঘকালীন স্বাধিকার সংগ্রামে জাতি এক চেতনায় মিলিত হয়েছিল৷ মুক্তিযুদ্ধে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সঙ্গে সাধারণ মানুষের আত্মিক যোগ ঘটে প্রতিদিন একত্রে কঠোর সংগ্রামী জীবন যাপনের বাস্তব অনুভূতির মধ্য দিয়ে, এরকম একটি কষ্টের অথচ সংগ্রামী চেতনায় অনুপ্রাণিত জীবন ভাগ করে নেবার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে৷ এই মহামিলনের অংশীদার যারা ছিল তাদের অনেকেরই চেতনায় একটি রূপান্তর হতে শুরু করে৷ এই রূপান্তর সমাজতন্ত্রকে দৃঢ়ভাবে সমতাবাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও বিত্তহীন জনগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গড়বে এই স্বপ্ন দেখে৷ স্বাধীনতা লাভের পর মুক্তিযুদ্ধের এই ধারাটি দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জাতীর আত্মপ্রকাশের এই পথটি প্রতিষ্ঠিত করবার দাবি জানাতে থাকে৷ সঙ্গে সঙ্গে অনেক ছাত্র-তরুণ-শিক-সরকারী অফিসার বিভিন্ন স্থানে যৌথস্বার্থবর্ধক গণউদ্যোগপ্রণোদিত করে এক নতুন ধরনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বীজ বপন ও লালন করা শুরু করে৷
দুর্ভাগ্যবশত এই স্পন্দন সবার মধ্যে জাগে নাই৷ এমনকি স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দানকারীদের মধ্যে যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে শুধু রাজনৈতিক মঞ্চেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কিন্তু সশরীরে মুক্তিযুদ্ধের দৈনন্দিন গণসংগ্রামে সম্পৃক্ত হবার সুযোগ তাঁদের হয় নাই, তাঁদেরও অনেকের মধ্যেই এই স্পন্দন জাগে নাই৷ তাঁদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকালে ঘটে যাওয়া মানুষের মধ্যে এই রূপান্তরটি হয়তো বুঝতেও পারেন নাই৷ তাই স্বাধীনতা লাভের পর এই রূপান্তরটি অস্বীকার করেই যেন পঁচিশে মার্চের আগের অবস্থায় দেশটিকে ফিরিয়ে আনবার প্রচেষ্টা চলে, যাতে সামগ্রিকভাবে সাংগঠনিক ও আর্থ-সামাজিক কর্মপ্রক্রিয়ার দিক দিয়ে পূর্বেকার কাঠামো ও সংস্কৃতিই বজায় থাকে৷ বলা বাহুল্য সমাজে সেই কাঠামো ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব ছিল না৷ অল্প কিছুকাল টানা-হঁ্যাচড়ার পরে পুরাতনই জয়ী হয় এবং জাতির সৃষ্টিশীল আত্মপ্রকাশের কিছু মিলিত এবং কিছু বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা ক্রমে প্রতিকূল পরিবেশে বিধ্বস্ত হয় অথবা ঝরে পড়ে কিংবা বশীভূত হয়৷
আমরা আজ জাতি হিসাবে অনেক বেশি বিভক্ত হয়ে গিয়েছি৷ একদিকে অসামপ্রদায়িক রাজনৈতিক ধারার হাতেই স্বাধীনতা সংগ্রামের সমতাবাদী প্রতিশ্রুতি এবং গণমানুষের আশা ভঙ্গ হওয়ায় দেশে ধমর্ীয় ধ্বজাবাহী রাজনৈতিক ধারার অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে৷ অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক ও সিভিল এলিটবর্গ ও অন্যান্য সুবিধাবাদী শ্রেণী জনগণকে পিছনে ফেলে বিদেশী ও দেশী সম্পদ আত্মসাত্ করে নিজেদের বিত্ত বাড়াবার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে৷ যে-সমাজে স্বাধীনতার আগে কোটিপতি খুঁজতে হত সেই সমাজে আজ কালো টাকার দৌলতে শত শত কোটিপতির উদ্ভব ঘটেছে৷ অবশ্যম্ভাবী ভাবে এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনীতিকে গড্ফাদার-নিয়ন্ত্রিত রাজনীতিতে পরিণত করেছে৷ সাধারণ জনগণও বাঁচবার আশায় হয় এই ধারা, নয় তো ওই ধারার সঙ্গে পেট্রন-কায়েন্ট সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে৷
আজকে আমাদের জাতীয় আত্মবিকাশের পথে প্রধান বাধা জাতির মধ্যেকার বিরাট আর্থ-সামাজিক বৈষম্য এবং দেশের শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিচ্ছিন্নতা৷ মধ্যবিত্ত শ্রেণীই তার শিা, চিন্তাশীলতা এবং আরটিকুলেশন মতার জন্য জাতীয় চেতনার অগ্রণী নায়ক সেজেছে৷ মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং স্বাধীনতালাভের পর কিছুদিন দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সংহতি, সহশ্রম ও সহউন্নয়ন উদ্যোগের যে ধারাটি জন্ম নিয়েছিল, সেই ধারাটির বিকাশেই জাতির প্রেরণামূলক আত্মবিকাশ ঘটতে পারতো৷ সাধারণ জনগণের সৃষ্টিশীলতা মধ্যবিত্তের সাহচর্যে, সহায়তায় ও সেই সৃষ্টিশীলতাভিত্তিক-উন্নয়ন দর্শনের আরটিকুলেশনে প্রেরণা পেতো, সামাজিক স্বীকৃতি পেতো৷ আজ সেই ধারাটি মৃত৷
আমরা আজকে আর দেশের নিম্নবিত্ত অথচ কঠোর পরিশ্রমী জনগণের সঙ্গে একাসনে বসতে প্রস্তুত নই৷ যদিও একাত্তরে বসেছিলাম, এক পাতে খেয়েছিলাম, এক সঙ্গে মাটির বিছানায় শুয়েছিলাম৷ আজকে আমাদের কৃষক ও গ্রামীণ শ্রমজীবী নিজেদের সৃষ্টিশীলতা বিকাশের সুযোগ না পেয়ে এবং জীবনের ভার বইতে না পেরে তাদের দৈনন্দিন জীবনের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরে ছিন্নমূল বস্তিবাসী হয়ে যাচ্ছে৷ এই প্রক্রিয়াকে রোধ করার জন্য মধ্যবিত্তরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আজকে আর গ্রামবাসীদের কাছে গিয়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে গ্রামীণ উন্নত অর্থনীতি গড়তে মাটিতে হাত দিচ্ছে না৷ আমাদের ছাত্র সমাজের মধ্য থেকেও এরকম স্পৃহা, দৈহিক শ্রমের প্রতি সম্মানবোধ অবলুপ্ত হয়ে গেছে সামগ্রিক মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির অংশ হিসাবেই৷ আজকে আর দৈনিক সংবাদপত্রে 'ওরা মাঠে কাজ করছে' এই শিরোনামে কোনো আত্মগর্বিত ছাত্রদলের প্রেরণামূলক উদ্যোগের খবর ছাপা হয় না৷ মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা আজকে আর আমাদের চেতনা নয়৷
দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গে আমাদের ব্যবধানের এই 'উন্নয়ন' মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালের সবচেয়ে বড় পরাজয়৷ আমাদের জাতিসত্তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন৷ অন্যান্য প্রশ্নে আমাদের মধ্যেই রয়েছে অনেক বিভেদ, কিন্তু জাতিসত্তার চেতনায় এই যে বিরাট বিভেদ গড়ে উঠেছে, এই বিভেদ আমাদের জাতীয়তাবাদের যে-কোন সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করছে_আমরা কী এক জাতি, আমরা কী একই বাঙালী?
এই প্রশ্নের মানবিক বা নৈতিক দিকটা বাদ দিলেও শুধু পরিসংখ্যানগত দিক দিয়ে বিচার করলেও একথা অনস্বীকার্য যে, দেশের বিপুলতম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মবোধ না থাকলে জাতিগত ভিত্তিকেই আমরা অস্বীকার করব৷ জাতীয়তার প্রশ্নের মীমাংসা তর্কে হতে পারে না, বিমূর্তভাবে আমরা আগে বাঙালী না মুসলমান এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর গর্বভরে ঘোষণা করে হয় না৷ এ প্রশ্নের মীমাংসা হতে পারে কেবল জাতির মধ্যেকার আত্মবন্ধন সুদৃঢ় করে, যে-বন্ধন মালা হতে তার সুগন্ধ আপনি ছড়াবে৷ অথচ এই বন্ধন আজ ছিন্ন৷
এ ছিন্ন বন্ধনের ফাঁক দিয়ে আর একটি শঙ্কাজনক হাত সমাজ জীবনের গভীরে ঢুকবার সুযোগ পেয়েছে৷ আমাদের ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতীয় আন্তঃবন্ধন যখন সুদৃঢ় ছিল এবং জাতি যখন একত্রে নিজের আত্মপ্রকাশের অধিকারের সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তখন ধমর্ীয় মৌলবাদ এমনভাবে সমাজে স্থান পায় নাই, যেমনটা আজকে পাচ্ছে৷ মানুষ যখন তার জীবন-সংগ্রামে সমাজের বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন শিতি শ্রেণীর কাছ থেকে সাহচর্য পায় ও অর্থবহ দিকনির্দেশনা পায়, তখন তার অন্য কারো কাছ থেকে মৌলবাদী ফতোয়ার প্রয়োজন হয় না, এরকম ফতোয়া প্রতিরোধ করবার শক্তিও তার মধ্যে জন্ম নেয়৷ কিন্তু মানুষ যখন শুধু শোষণে নিপীড়নে বিধ্বস্তই নয়, সাথীহীনও হয়ে পড়ে, যখন শিতি সমাজের কাছেই সে বারে বারে প্রতারিত হয়, তখন সে দিশাহারা হয়ে পড়ে৷ আমাদের জনগণ বারে বারে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছে দেশের শিতি সমাজের হাতেই৷ তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তারা শোষণমুক্ত সমাজ পাবে, আমরা বুদ্ধিজীবীরাই তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি পাশ্চাত্য ছাঁচের গণতন্ত্রই তাদের কল্যাণ আনবে৷ আমাদেরকে বিশ্বাস করে তারা স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছে, গণতন্ত্রের ভোটের খেলা নিষ্ঠার সঙ্গে খেলে বারে বারে প্রতারিত হয়েছে৷
আজকে তাদের কাছে আমরা তো বাজার-অর্থনীতির ফতোয়াই ঝাড়ছি যার মধ্যেও তারা তাদের আশা-আকাঙ্ার কোনো প্রতিফলন দেখছে না৷ সেই বাজারের দ্বারে হাত পেতে আমাদের কৃষক ও শ্রমিকরা তো বঞ্চনা পেয়েই ফিরে আসছে কিংবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে৷ অগ্রসর পুঁজিবাদী বিশ্বের 'পয়গম্বর'দের কাছে শেখা বাজার অর্থনীতি জপ্ করা এদেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য-অর্থনীতির মূলধারা৷ এটিও তো একটি মৌলবাদী ধারাই, যার পেছনে গণকল্যাণের কোনো যৌক্তিক প্রতিশ্রুতি নেই৷ বাজার যারা ছলেবলে-কৌশলে কুীগত করতে পারবে শুধু তাদেরই জন্য কল্যাণের প্রতিশ্রুতি আছে৷ দেশের শিতি, বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন সমাজের কাছ থেকে এভাবে প্রতারণা পেয়ে পেয়ে সাধারণ মানুষ যদি ধমর্ীয় মৌলবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে তবে এটি অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় মোটেই৷
এর উত্তর শুধু ধমর্ীয় মৌলবাদের সমালোচনা নয়, জনগণকে বাস্তব সাহচর্যের মধ্য দিয়ে আশ্বাস-দেওয়া যে, দেশের শিতি সমাজ জীবন সংগ্রামে তাদের সঙ্গেই রয়েছে এবং আমাদের বিচারবুদ্ধি সত্যি সত্যিই তাদের কল্যাণেই নিয়োজিত৷ এইভাবে জনগণের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব কমিয়ে আনতে না পারলে, এবং নিজেরাও বিশ্বকায়েমী স্বার্থের কাছ থেকে শেখা বুলি মৌলবাদীর মতো আওড়ানো বন্ধ করে নিজস্ব আর্থ-সামাজিক ও গণজীবনের স্বকীয় সংস্কৃতির পরিপ্রেেিত জাতীয় আত্মবিকাশের পথে চলবার জন্য জনগণের হাত ধরতে না-পারলে, সমাজে ধমর্ীয় মৌলবাদের প্রশস্ত অঙ্গন থেকেই যাবে৷
বহুধা বিভক্তির এই সমাজে 'ছুত্'-'অচ্ছুত্' শ্রেণীবিভাগের কথাও যোগ করা প্রয়োজন৷ এদেশে শুধু যে এলিটবর্গ নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে সাধারণতঃ একাসনে বসে না বা একপাতে খায় না তাই নয়, আমাদের এই মুসলিমপ্রধান সমাজেও বেশ কয়েকটি 'অচ্ছুত্' শ্রেণী আছে, এমনই অচ্ছুত্ যে নিম্নবর্গের মুসলমানরাও এদের ছোঁয়া পেয়ালায় চা খায় না৷ এইখানে অন্ততঃ আমরা মুসলমানরাও একটু 'জাত'-বিচার করি৷ এরা এদেশের 'হরিজন' (যাদের মধ্যে অনেকে আজকে মুসলমানও!), 'আদিবাসী', 'দাস', 'মুচি', 'ঋষি', 'দলিত', 'বুনো' এরকম বহু সমপ্রদায় যারা একত্রে সারা দেশে কয়েক ল হবে৷ এরা কোনো হোটেলে এমনকি গ্রামাঞ্চলের রাস্তার পাশে ছোট চা-এর দোকানেও এক কাপ চা খেতে পারে না, অন্য খদ্দের সেই কাপে আর খাবে না বলে৷ অনেক স্কুলে এরা শুধু এদের 'জাতের' জন্যই ভর্তি হতে পারে না৷ এরকম বেশ কয়েকটি 'জাতি'র সঙ্গে সমপ্রতি দারিদ্র্য-বিষয়ক গবেষণা সাপোর্ট সংস্থা 'রিইব'-এর সূত্রে সাাত্ পরিচয় হয়েছে যারা আমাদের দিকে আকুল হয়ে চেয়েছে৷ আমরা কি তাদের 'অস্পৃশ্য' পরিচয় দূর করতে পারবো না?
এই মহা বিভক্তির সমাজে আমরা বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেই একটা বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছি৷ শুধু দেশের অর্থনীতি বিশ্লেষণের কথাই এখানে বলি, যে-কাজ সম্বন্ধে আমি একটু বেশি পরিচিত৷ এদেশে অর্থনীতি বিশ্লেষণের মূলধারা তো দেশের উন্নয়নের পরিমাপ করে যাচ্ছে জিডিপি-র বৃদ্ধি দিয়ে, যেখানে এই পরিমাপটি অমর্ত্য সেন সহ বিশ্বের পূরোভাগের অর্থনীতিবিদরা বর্জন করেছেন প্রায় তিন দশক আগে৷ আর জিডিপি বৃদ্ধির মূল্যায়নের নিজের যুক্তিতেই আমাদের দেশে সরকারী সেবা, শিা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ইত্যাদির মান যেভাবে ধসে যাচ্ছে তার ফলে এই সূচকের বৃদ্ধির হার সংশোধন করলে শতকরা পাঁচ থেকে হয়তো শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে৷
পাকিস্তানে তো এরকম সূচক অনুযায়ী দেশে উন্নয়নের 'মিরাকল' হচ্ছে বলে ঘোষণার অনতিবিলম্ব পরেই গণহত্যা শুরু হয়, যেন উন্নয়নের সূচকের কোনো দায়িত্ব নেই উড়োজাহাজটি ক্র্যাশ করতে যাচ্ছে এই আশংকা দেখে সচেতন হবার৷ এদেশেও তো এই উন্নয়নের হিসাব নিয়েই আমরা আজ আসন্ন সামাজিক বিস্ফোরণের আশঙ্কায় আতঙ্কিত৷ তাহলে এই 'উন্নয়নের' অর্থটা কী৭? অন্যদিকে দারিদ্র্য-গণনা ও দারিদ্র্য বিমোচনের পরিমাপও চরম লজ্জাজনকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশ্বের দরিদ্রদের দিকে একটা করে ডলার ছুঁড়ে দেয়া থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে পরিমাপ করা হচ্ছে, যা মানুষকে গবাদি পশু বলে গণ্য করে৷ আজকে আধুনিক বিশ্বে একটি হাতঘড়ি বা মোবাইল সেট না থাকলে যেকোনো মানুষের চেতনায় সে যে দরিদ্র এই ভাবনা থেকে ঘড়ি বা মোবাইলধারী পথচারীর ওপর আক্রোশ হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক৷ একজন্য বঞ্চিতের সন্ত্রাস করবার অধিকার আছে কিনা এই প্রশ্ন কী কেউ অস্বীকার করবেন?
আর এরকম দারিদ্র্য-গণনায় বত্সরে দারিদ্র্য এক পার্সেন্ট করে কমছে বলে আত্মপ্রসাদ করা হচ্ছে এই কথাটি উপো করে যে, যারা মানুষ পরিচয় ছেড়ে এই খোঁয়াড়ের বলদের শেডেও ঢুকতে পারছে না, অর্থাত্ অর্থনীতিবিদদের-দেয়া এই দারিদ্র্য-রেখাও পার হতে পারছে না, তাদের অনেকেই দেশের দারিদ্র্য-বিমোচনে এই উন্নতিতে পরম আনন্দিত না হয়ে খোঁয়াড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে পথচারীকে শিং-এর গুঁতো দিতে চাইতেই তো পারে৷ কিংবা দিশাহারা হয়ে বিপথে দৌড় দিতেই পারে, যে-প্রক্রিয়া সমাজে চলছে৷ আর বাজার অর্থনীতির কাছে আত্মসমর্পণ করে আমরা দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতীদের ধ্বংসের মুখে পড়ে যেতে দেখেও দেশে দারিদ্র্য-বিমোচনে অগ্রগতি হচ্ছে বলে যে-রায় দিয়ে চলেছি, এটা তো শুধু সামষ্টিক হিসাবের খেলাই নয়, দেশের সৃজনশীল সন্তানদের কোনমতে টিকে থাকাটাই বুঝি তাদের সৃজনশীলতার পরিচায়ক৷ দারিদ্র্য-বিমোচনের খোঁয়াড়ে সামষ্টিক অঙ্কের খেলায় মেতে থেকে আমরা কী আমাদের দেশপ্রেমহীনতার এবং গণচেতনা থেকে বিচ্ছিন্নতার পরিচয় দিয়ে চলছি না? এই তো আমাদের সমাজের ওপরতলার মানুষের সমাজ চেতনা৷ তো, এমনি বহুধা বিভক্ত সমাজ কী এক সমাজ হতে পারে?
৩
শুধু নেতিবাচক উদাহরণ দিয়ে সমস্যাটির চিত্র অাঁকা যায়, সমাধানের কোনো পথ পাওয়া যায় না৷ আমার মেঠো দৃষ্টিতে বহু সমাজকে এক সমাজের দিকে নেবার জন্য যদি কিছু করা যায়, প্রথমে মাঠে কোথাও তার বীজ আছে কি না তা খুঁজতে হবে৷ থাকলে তাকে লালন করতে হবে, যেখানে নাই সেখানে বীজটা বোনবার চেষ্টা করতে হবে৷ তাই এবার কিছু বীজের সন্ধান দেই, কিছু মিলনের কাহিনী পরিবেশন করি৷ গত তিন বছর ধরে রিইবের উদ্যোগে সাংবাদিক কুররাতুল আইন তাহমিনার নেতৃত্বে প্রায় ৭০ জন সাংবাদিক সারাদেশে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের নিজস্ব সৃজনশীল উদ্যোগে এগিয়ে যাওয়া দৃষ্টান্ত খুঁজে ৩২৪টি এরকম উদ্যোগের সন্ধান পেশ করেছেন৷ এইসব ইতিবাচক উদ্যোগগুলি কী ধরনের? এদের কোনো কোনোটির কথা হয়তো আপনারা কেউ কেউ আগেও জেনেছেন, তবুও আমাদের বর্তমান আলোচনার পরিপ্রেেিত কয়েকটি নমুনা একসঙ্গে যাচাই করা যাক৷
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি : স্বেচ্ছায় জমির পুনর্বণ্টন
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থানার কাছে মহেশ্বরচান্দা গ্রামের চাষীরা একজন বাম নেতা (মরহুম ওমর আলী)-র নেতৃত্বে, যার স্বপ্ন ছিল সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা, ১৯৯৬ সালে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় জমির পুনর্বণ্টন করে আইল উঠিয়ে দিয়ে সব জমি লেভেল করে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে কৃষির উত্পাদন বহুগুণ বাড়িয়ে এবং অন্যান্য েেত্র যৌথ উদ্যোগ নিয়ে রীতিমতো আর্থ-সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে৷
গণজমায়েতে ইউনিয়ন বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
গাইবান্ধার সাহাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান টুলুর নেতৃত্বে ইউনিয়নের বাসিন্দারা প্রতি বছর পাবলিক মিটিং-এ ইউনিয়নের বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন৷ তারা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে রাস্তা মেরামত ও নির্মাণ, জঙ্গল ও জলাভূমি সাফ ও আবর্জনা পরিষ্কার করেন, সকলের ব্যবহারের জন্য কম্পোস্ট সারও তৈরী করেন৷ অন্যান্য উদ্যোগের মধ্যে শিা ও স্বাস্থ্য প্রকল্প, বেকার তরুণদের জন্য জব ট্রেনিং এবং স্বেচ্ছাশ্রমে বৃরোপণের কাজ এগিয়ে চলছে৷ অনেক মহিলা সমিতি সঞ্চয়-ঋণ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে এবং বিভিন্নরকম কারিগরি শিাদানের প্রকল্প চালাচ্ছে৷ এই ইউনিয়নে কোনো রাজনৈতিক কোন্দল-সন্ত্রাস নেই, এবং সমস্ত নালিস ইত্যাদি বিভিন্ন সালিস কমিটিতে নিষ্পত্তি হয়৷
কৃষি-বিজ্ঞানী ও কৃষকদের মিলন
চাষী-সংগঠক আইয়ূব হোসেনের উদ্যোগে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা এলাকার চাষীরা বেশ কয়েকটি 'কৃষি কাব' গঠন করে কৃষি অফিসারদের সেখানে কৃষকদের সঙ্গে মিলিত হতে আহ্বান করেন, প্রতি জায়গার জমি ইত্যাদির গুণাগুণ পরীা করে বিভিন্ন জমিতে সর্বোচ্চ ফলনের ব্যাপারে পরামর্শ দেবার জন্য৷ কৃষি অফিসাররা আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে আসেন৷ আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষকদের এই মিলনের ফলে চাষীদের ফসল ১৯৮৮ থেকে ২০০২-এর মধ্যে পাঁচ গুণের মতো বেড়ে যায়৷ এই উদ্যোগ ছড়াতে শুরু করে, এবং তাই বাঘারপাড়া উপজেলায় আজকে মোট ২২টি কৃষি কাব জন্ম নিয়ে এলাকার কৃষি উত্পাদনের বৈপ্লবিক অগ্রগতির ধ্বজা ওড়াচ্ছে৷
রংপুরের মিঠাপুরের উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের চুহড় ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ হামিদুর রহমান দেখতে পান যে, তাঁর ব্লকের ভূমিহীন শ্রমিকরা সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর দিনের শেষে শুধু মরিচ মেখে ভাত খায়, এবং তাদের তেমন কোনো জমি-জমাও নাই ফসল ফলাবার জন্য৷ তিনি প্রত্যেকের বাড়ী-বাড়ী গেলেন, এবং তাদের শেখালেন কীভাবে নিজের ছোট্ট ভিটেগুলিতেই এবং আশেপাশের পুকুর-ডোবায়, প্রতি ইঞ্চি খালি জায়গায়, সবজী-হাঁস-মুরগী-মাছ উত্পাদন করা সম্ভব, এবং কচুরীপানা-গাছের-ডাল-পচা-পাতা ইত্যাদি ধাপে ধাপে সাজিয়ে তার সঙ্গে বিজ্ঞানসম্মতভাবে রাসায়নিক সার মিশিয়ে উঁচু মানের কম্পোস্ট সার তৈরী করতে পারে৷
১৯৫৫ সালে শুরু এই উদ্যোগে আজকে এই ব্লকে হামিদুর রহমানের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে প্রায় ১২০০ পরিবারের আয় ও জীবনের মান বৈপ্লবিকভাবে বেড়ে গেছে৷ জনাব রহমানকে এদের কারো না কারো বাড়ীতে প্রায় প্রতিদিনই রাত দশটাতেও দেখা যায় খোঁজ খবর নিতে বা পরামর্শ দিতে৷ এদের তৈরী জৈব সার চড়া দামে চুহড়ের এবং অন্য অঞ্চলের চাষীরাও কিনে নিচ্ছে৷ এই ব্লকে মঙ্গার কথা শোনা যায় না৷ আর চুহড় ব্লকের বাইরে অন্যান্য কয়েক এলাকাতেও ভূমিহীনরা নিজেরাই এরকম উদ্যোগ নিয়েছে এবং প্রয়োজন মতো জনাব রহমানকে ডেকে এনে পরামর্শ নিচ্ছে৷
ব্যতিক্রমধমর্ী পাবলিক লাইব্রেরী
যশোরের শারশা উপজেলার ডিহি ইউনিয়নে ইউনিভার্সিটি-কলেজ থেকে পাশ করা কয়েকজন তরুণ একটি লাইব্রেরী সৃষ্টি করে৷ গ্রামের আর একজন যুবক এর জন্য বিনা ভাড়ায় তার কাঁচা ঘরটা দান করে৷ পরে পাকশিয়া গ্রামের নিরর আকবর সরদার লাইব্রেরীর জন্য সতের শতক জমি দান করেন৷ ১৯৭৭ সালে জন্ম নেয়া এই লাইব্রেরী আজকে শুধু দীর্ঘমেয়াদে ছাত্র-ছাত্রীদের গ্রন্থঋণই দিচ্ছে না, চাষীদের চাষাবাদের নতুন প্রযুক্তিতে শিা দিচ্ছে৷ মাছচাষের ট্রেনিং, পরিবেশ সংরণ, বনায়ন, বাত্সরিক চু ক্যাম্পসহ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সচেতনতা-বৃদ্ধি এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে যাদুঘর স্থাপন_এসব কিছুই এই লাইব্রেরীর কার্যক্রমের অংশ৷ লাইব্রেরীটি চলে স্থানীয় শিক ও অন্যান্যদের স্বেচ্ছাশ্রমে৷ স্থানীয় লোকেরা চাঁদা দেয়, গরীবরাও দান করে চার-আনা-আট-আনা করে যে যা পারে৷ তারা সরকার ও কিছু এনজিও-র টাকাও নিয়েছে, তবে স্থানীয় ধনীরা টাকা দিতে চাইলেও নেয় না, তারা চোরাকারবারি বলে৷ বর্তমানে এই লাইব্রেরী সম্পূর্ণ স্বনির্ভর৷ এই ইউনিয়নের প্রত্যেক স্কুলেই একজন শিকের তত্ত্বাবধানে এই লাইব্রেরীর শাখা রয়েছে, এবং স্কুলের শিা বিস্তারে লাইব্রেরীর কমর্ীরা পাশে থাকেন৷
তরুণদের সমাজসেবা
যশোরের উপ-শহরে ১০৮ জন তরুণ 'উপশহর কবর খনন সংস্থা' নামে একটি সংগঠন করে উপ-শহর ও আশেপাশের গ্রামে কারো মৃতু্য হলে তাকে স্বেচ্ছাশ্রমে কবর দেয়৷ এছাড়া তারা এলাকার রাস্তাঘাট পরিষ্কার, 'চলমান ডাস্টবিন' নামে কমর্ীবাহিনী করে প্রতিদিন সকালে বাড়ী-বাড়ী গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করে সেগুলি জায়গামতো ফেলে দেয়া, বৃরোপণ, বিনামূল্যে অভাবী মানুষদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করে দেওয়া, ইত্যাদি কাজও করে৷ তারা একটি পাঠাগারও চালাচ্ছে৷
১৯৯৫ সালে পটুয়াখালির এক গরীব পিতার কিশোর সন্তান সড়ক দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রক্তের অভাবে মারা যায়৷ তা দেখে শহরের ২৯ জন তরুণ, অধিকাংশই ছাত্র, রক্তদান সমতি 'সেভ' গঠন করে৷ জেলা প্রশাসক তাদের অফিস করবার জন্য একটুকরো জমি দেন৷ প্রথমে রক্ত বিনিময় প্রোগ্রাম শুরু হয়_এক ব্যাগ রক্ত নিলে এক ব্যাগ রক্ত দিতে হবে৷ তারপর কলেজ, বৈশাখী মেলা, বইমেলা এরকম বিভিন্ন স্থানে সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়৷ বিভিন্ন জায়গা থেকে অনুদান পেয়ে ২০০৩ সালে সেভের অফিসে ব্লাডব্যাঙ্ক স্থাপিত হয় যা থেকে এলাকার ১০০ শতাংশ রক্তের চাহিদা পূরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে৷
সাংবাদিক ও সৃজনশীল সংগ্রামী মানুষের মিলন
আরো বহু উদ্যোগের রিপোর্ট এসেছে এই প্রজেক্ট থেকে৷ যেমন, অর্থনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ-বান্ধব কাজে দেশের পিছিয়ে-থাকা মানুষদের সৃজনশীল হয়ে এগিয়ে যাবার উদ্যোগ, অভাবী মানুষের প্রতিকূল অবস্থার ভিতর দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে একক প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাবার মতো উদ্যোগ৷ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে কম খেয়ে-পরেও নিজেদের শৈল্পিক বা উদ্ভাবনী তৃষ্ণা মেটাবার অদম্য প্রচেষ্টা, স্বামী-পরিত্যক্ত দুঃস্থ মহিলাদের নিজে সীমাহীন সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করে সন্তানকে মূল্যবোধ ও মর্যাদা নিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবার কঠিন সংগ্রাম তো রয়েছেই৷ বৈরী পুরুষ-শাসিত পরিবেশে নিজেদের ভবিষ্যত্ নিরাপত্তার চিন্তায় সম্পদহীন নারীদের মুষ্টিচাল সঞ্চয় ও ঋণদান সমিতি গঠন, 'প্রতিবন্ধী' কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীদের জীবনের কাছে পরাজয় স্বীকার না-করবার অসাধারণ প্রেরণাময় দৃষ্টান্ত সত্যি বিস্ময়ের৷ পা দিয়ে বা কনুই দিয়ে লিখতে শিখে উচ্চশিার সোপানে উঠে যাওয়ার মতো অসংখ্য সংগ্রামী সৃজনশীল মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন জীবনকাহিনী যা আমাদের এই মানব প্রজাতির সদস্য হয়েছি বলে গর্ববোধ দেবার যোগ্য৷
লণীয় যে, যে-দেশের সংবাদপত্রসমূহ মূলতঃ নেতিবাচক ঘটনাকেই 'সংবাদ' বলে গণ্য করে, সে-দেশে গত তিন বছরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেড়শ'র কাছাকাছি উপরোক্ত গণমানুষের সৃজনশীল মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন জীবন সংগ্রামের কাহিনী ফিচার হিসাবে ছাপা হয়েছে৷ সংবাদপত্রগুলি এরকম সংবাদকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে৷ এই কাজের সঙ্গে জড়িত সাংবাদিকরা বলছেন তাঁরা সাংবাদিক হিসাবে তাঁদের নিজেদের একটা নতুন ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছেন৷ মানুষের সংগ্রামী পরিচয়, প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে মনুষ্যত্বের মহিমা, এগুলো তুলে ধরে দেশবাসীকে জানানো, এবং এরকম এক জায়গার খবর অন্য জায়গার পিছিয়ে-পড়া মানুষদের জানানো তাদের কর্তব্য৷ দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে সমাজের পিছিয়ে-পড়া মানুষদের এই মিলনও একটি নতুন মূল্যবোধের উত্থান বলা যেতে পারে৷
প্রতিবন্ধীদের অ-প্রতিবন্ধী দুঃস্থ মানুষের সঙ্গে একাত্মতা
কুষ্টিয়া অঞ্চলে কয়েকটি গ্রামজুড়ে প্রতিবন্ধী বলে অভিহিত মানুষদের, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের সংগঠন আছে একটি 'প্রতিবন্ধী' উন্নয়ন সংস্থার আওতায়৷ এদের কিছু সংগঠন উক্ত উন্নয়ন সংস্থাটির নীতির বাইরে গিয়েই অ-প্রতিবন্ধী দুঃস্থ মানুষদের সঙ্গেও একাত্মতা ঘোষণা করেছে৷ তাদের ওপর কোনো বড় রকমের অন্যায়-অবিচার হলে, যেমন নারীর ওপর হামলা, অন্যায়ভাবে জমি দখল, তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ আমি এদের (শারীরিক অসুবিধাগ্রস্থ) নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'তুমি যদি সুযোগ পাও তবে কি সমস্ত দেশের শুধু প্রতিবন্ধীদের নেতা হতে চাও, না সমস্ত দুঃস্থ জনগণের?' সে বিনা দ্বিধায় উত্তর দিয়েছিল, 'সমস্ত দুঃস্থ জনগণের'৷ তার মিলন-চিন্তায় কোনো ভুল ছিল না, প্রতিবন্ধী পরিচয়ে শুধু নিজেদের ুদ্র গোষ্ঠীস্বার্থের উন্নতি তার চিন্তায় প্রাধান্য পায় নি৷
সুশীল ও বখাটে তরুণদের মধ্যে মিলন
সৃজনশীল বাংলাদেশ প্রজেক্টের সাংবাদিকদের বরিশাল আঞ্চলিক সম্মেলনে এই কাজে যোগদানকারী হাঙ্গার প্রজেক্টের কয়েকজন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে আমার সাাত্ হয় এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করি তারা কী করছে৷ তাদের নেত্রী হাই স্কুল-পড়া মেয়ে জানায় যে, তারা শহরের নাগরিক জীবনে কোনো সমস্যা হলে সেখানে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়৷ যেমন কোথাও বিপজ্জনক রাস্তা নির্মাণ, আবর্জনা পরিষ্কার করা, রাস্তার বিদু্যত্-তার বিপজ্জনকভাবে ছিঁড়ে গেলে তা মেরামত, কোনো ঘরের অসুস্থকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, ইত্যাদি৷ পরিশেষে জানায় তার সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতাটি: এক পাড়ায় বখাটে ছেলের দল নানানরকম উত্পাত করতো৷ এই তরুণের দলটি কয়েকদিন ধরে বখাটে ছেলেদের প্রত্যেকের সম্বন্ধে খোঁজ খবর নেয় তাদের চরিত্রের ভালো দিকগুলি সম্বন্ধে৷ তারপর এই দলটির সবাইকে চা-এর নেমন্তন্নে ডাকে৷
ওরা অবাক হয়েই গেল, তাদের তো কেউ নেমন্তন্ন করে না! নেমন্তন্নে নেমন্ত্রণকারীরা নিমন্ত্রিতদের প্রত্যেকের কাছে গিয়ে জানায় তারা তার সঙ্গে দেখা করবার জন্য অনেকদিন ধরে আগ্রহী এবং তারা জেনেছে শুনেছে অমুকের অমুক ভালো গুণের কথা৷ ছেলেগুলি তো একেবারে কাত৷ তাদের তো কেউ প্রশংসা করে না! তারপর নিমন্ত্রণকারীরা অতিথি ছেলেদের প্রত্যেকের লেখাপড়ার কথা জিজ্ঞেস করে, এবং জানতে পারে যে লেখাপড়া ওদের ভালো লাগে না৷ কেন ভালো লাগে না? কেমিস্ট্রি একেবারে বুঝি না, অঙ্ক ভীষণ কঠিন, ইত্যাদি উত্তর এলো৷ নিমনন্ত্রণকারীরা জানায় আমাদের মধ্যে অমুক খুব ভালো কেমিস্ট্রি বা অঙ্ক বোঝে, সে তোমাকে সাহায্য করতে পারলে খুব আনন্দিত হবে, ইত্যাদি৷ এভাবে দুই তরুণের দলের মধ্যে মিলন আস্তে আস্তে সুদৃঢ় হলো৷ ওরা আর কী করে বখাটেপানা করে?
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি : গ্রামে ট্রুথ কমিশন
মাগুরার একটি গ্রামে রাজনৈতিক সংঘাত সন্ত্রাস ও হত্যা নিয়ে গোটা এলাকা চরমে উঠেছিল৷ গ্রামবাসীরা শেষ পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে শহরে, কার্যরত গ্রামের একজন শ্রদ্ধেয় নাগরিককে ডেকে পাঠায় একটা মীমাংসা করে দেবার জন্য৷ নাম দিতে অনিচ্ছুক এই নাগরিককে জনাব 'ক' বলব৷ জনাব 'ক' দণি আফ্রিকার 'ট্রুথ কমিশন' স্টাডি করেছিলেন৷ তিনি গ্রামের দুই সংঘাতী পরে নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সম্মতি নিয়ে 'ট্রুথ কমিশন' পদ্ধতিতে এই গ্রামের সমস্ত সন্ত্রাস মোকাবিলার প্রস্তাব করেন৷ সবার সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় যে, সাধারণ সভা করে গ্রামের ধনী-দরিদ্র, শক্তিধর ও শক্তিহীন সবাইকে আহ্বান করা হবে সংঘাত কী করে বন্ধ করা যায় এই বিষয়ে খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত দেবার জন্য৷ যারা সন্ত্রাসী_অন্যায় করছে বলে তারা জানে বা মনে করে তাদের নাম উল্লেখ করতে, নিজ নিজ অভিযোগ বলতে এবং তার প্রতিকার চাইতে৷ আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হবে তারাও সুযোগ পাবে নিজ নিজ আচরণ ব্যাখ্যা করবার, অন্যায় করে থাকলে তা সংশোধন করবার অথবা তার জন্য মাফ চাইবার৷
২০০২ সালের প্রথম দিকে এক সকালে গ্রামের ট্রুথ কমিশনের বিরাট জমায়েত হয়৷ শুধু গ্রামের আচার অনুযায়ী মহিলারা তেমন আসেন নি, আর সংখ্যালঘু হিন্দু সমপ্রদায়ের সবাই না এসে তাদের প্রতিনিধিরা শুধু আসে৷ সবার পূর্ণ সম্মতিক্রমে জনাব 'ক', তার বড় ভাই যিনি গ্রামেই থাকতেন এবং যাকে সবাই শ্রদ্ধা করে, এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টার এই তিনজনকে আলোচনার মডারেটর নির্বাচিত করা হয়৷ আলোচনায় সকলেই পূর্বেস্বীকৃত আলোচনার নিয়মাবলীর সঙ্গে সহযোগিতা করে, এবং উপস্থিত প্রায় সকলেই আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়৷
কারো না-কারো সম্বন্ধে খুন-খারাপি বা তার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ যাদের ছিল তারা খোলাখুলি অভিযোগ করে, এবং অভিযুক্তরাও আত্মপ সমর্থনের সুযোগ পায়৷ একজন বিশেষ মতাশালী ব্যক্তি যার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি খুনের সঙ্গে জড়িত থাকবার অভিযোগ আসে তিনি কিছুণ আত্মপ সমর্থনের চেষ্টা করেন৷ কিন্তু পরে, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে যখন খুনগুলির বেদনাদায়ক বর্ণনা পেশ করা হয় তখন তিনি মা চান এই বলে যে, তিনি এই অপরাধগুলির জন্য ইতিমধ্যেই শাস্তি পেয়েছেন৷ তাঁর এই স্বীকারোক্তি এবং মা প্রার্থনায় উপস্থিত সবার ওপর বিদু্যত্-সঞ্চালনের মতো প্রতিক্রিয়া হয়, কারণ কেউই আশা করে নি যে এরকম একজন শক্তিশালী দুর্ধর্ষ লোক তাঁর সব অপরাধ প্রকাশ্যে স্বীকার করবে এবং মা প্রার্থনা করবে৷ উপস্থিত সবাই এই ট্রুথ কমিশন-প্রক্রিয়ার ফলাফলে বিরাট স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এবং গ্রামে ভবিষ্যতে শান্তির আশায় আশান্বিত হয়৷ গ্রামবাসীরা পরে জানায় যে তাদের বুক থেকে একটা মস্ত বড় বোঝা সরে গেছে৷
আলোচনার শেষে গ্রামবাসীরা দু'টি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতিটি থেকে দু'জন করে সদস্য নিয়ে এবং সেই অবসরপ্রাপ্ত হেডমাস্টারকে সমন্বয়কারী করে একটি স্থায়ী সংহতি কমিটি গঠন করে মারাত্মক অপরাধ ছাড়া সব কোন্দলের মীটমাট করবার জন্য৷ এও ঠিক হয় যে, এই কমিটির একটি প্রথম কাজ হবে অতীতে কেউ কারো কাছ থেকে বলপূর্বক সম্পত্তি বা অন্য যা কিছু নিয়েছে তাদের একটা লিস্ট করে সেগুলি ফেরত দেওয়া বা তিপূরণের ব্যবস্থা করা৷ দুই মাসের মধ্যে এই কাজটি সম্পন্ন হয়, যার ফলে এই কমিটির ওপর গ্রামবাসীদের আরো আস্থা বাড়ে৷
তখন থেকে এই কমিটি নিয়মিতভাবে বসে গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং ছোটখাটো দ্বন্দ্ব মীমাংসা করে আসছে; কোনটা সহজে কোনটা একটু খড়-কুটো পুড়িয়ে, যেগুলি আগের অবস্থা থাকলে বৃহত্তর দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত হতে পারতো৷ গ্রামে আইন-শৃঙ্খলার অনেক উন্নতি হয়েছে, এবং স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িও এই ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট৷ গ্রামাবাসীরা এখন তাদের কীর্তি আশেপাশের গ্রামে গর্বের সঙ্গে বলে বেড়াচ্ছে৷ কোন কোন প্রতিবেশী গ্রামের বাসিন্দারা তাদের গ্রামেও এরকম প্রক্রিয়া নেয়া যায় কি না তা আলোচনা করছে বলে শোনা যায়৷ কিন্তু সামপ্রতিক কালে জাতীয় নির্বাচনের পরিপ্রেেিত ওপর থেকে আবার এই গ্রামে সন্ত্রাস উস্কে দেবার প্রচেষ্টা চলছে বলে শোনা যাচ্ছে, যার ফলাফল অনিশ্চিত৷
গণগবেষণা ও মানুষে-মানুষে মিলন
গত তিন বছর ধরে রিইব-এর উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের নিজস্ব যৌথ গবেষণা (পার্টিসিপেটরি একশন রিসার্চ) চলছে, যার মধ্যে শুধু একত্রে গবেষণা নয়, একটা মিলনেরও প্রক্রিয়া বটে৷ আমরা বুদ্ধিজীবীরা যখন একত্রে গবেষণা করি, সেমিনার-ওয়ার্কশপে মিলিত হই তার মধ্যে মিলনের কোনো ব্যাপার থাকে না, নিজ-নিজ স্বার্থে জ্ঞান সন্ধান বা জ্ঞান বিনিময়ের জন্য একত্র হই, তারপর যে যার ক্যারিয়ারের সন্ধানে চলে যাই৷ মাটির কাছাকাছি মানুষরা যখন একত্রে তাদের সমস্যাবলী বিশ্লেষণ ও তা উত্তোরণের পথ সন্ধানে একত্রিত হয় তখন তারা তো শুধু 'গবেষণা' করতে নয়, পরস্পরের দৈনন্দিন সমস্যাবলীর বাস্তব সমাধান খুঁজতে চায়৷ তারা পরস্পরকে জীবন-সংগ্রামে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে, একত্রে সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মপন্থা গ্রহণ করে৷
এর ফলে তাদের মধ্যে একাত্মতাবোধ জন্মে৷ গণগবেষণা থেকে এরকম একাত্মতা সৃষ্টির, পিছিয়ে-পড়া মানুষদের নিজেদের মধ্যেই 'বহু সমাজ থেকে এক সমাজ' সৃষ্টির অসংখ্য উদাহরণ এই গবেষণাগুলির বিভিন্ন রিপোর্ট ও আলোচনায় রয়েছে৷ আজকে এখানে শুধু একটি গল্প বলবো, গণগবেষণা কীভাবে একজন বৃদ্ধের মধ্যে তার বহুদিন পূর্বেকার কৃতকর্মের জন্য সবার সামনে স্বীকারোক্তি দানে প্ররোচিত করে৷
নীলফামারি অঞ্চলের এক গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ঘরসমূহের মহিলারা প্রতি সপ্তাহে গণগবেষণায় মিলিত হয়৷ শাশুড়ী-বউ যারা পূর্বে ঘরে ঝগড়া করে বলে পরিচিত ছিল তারাও এখানে একসঙ্গে আসে, বিবাদ ছেড়ে একসঙ্গে সবার সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে তারা মিলেমিশে এগিয়ে যেতে পারে৷ এর প্রভাবে ঘরেও শাশুড়ি-বউতে বিবাদ কমে যাচ্ছে৷ এক বৃদ্ধ পুরুষ তাদের এই সাপ্তাহিক 'গবেষণা' মিটিং-এর পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পর্যবেণ করতো৷ তারপর একদিন মহিলাদের গবেষণা চলাকালে হঠাত্ সে বলে, 'আমি কিছু করতে চাই৷ তোমাগো এই গবেষণা দেইখ্যা আমিও একদিন নিজের ওপরেই একটা গবেষণা করলাম৷ গবেষণা করলাম আমার পোলার বউডা আমারে এক্কেরে দেখবার পারে না ক্যান৷ দেখলাম যে আমি পোলার বিয়াতে যৌতুক নিয়া তার বাবারে এক্কেরে শেষ কইরা দিছি৷ তাই সে আমারে দেখবার পারে না৷'
সবার সামনে বৃদ্ধের এই স্বীকারোক্তির গভীরতাটা তুচ্ছ বিষয় নয়৷ আমি মনস্তত্ত্ববিদ নই, তবে মনে হয়েছে এই স্বীকারোক্তির পেছনে ছিল বৃদ্ধের একাকীত্ববোধ৷ বৃদ্ধের মনে হয়েছিল, হায় সবাই গণ-গবেষণার মধ্যে যেন মিলনের মন্ত্র খুঁজে পেয়েছে৷ সে তো লোভী, সবাই ভয় করে এমন এক গৃহকর্তা, তার সঙ্গে কে মিলিত হবে? তার ছেলের বউ কি তার হাত ধরে কোনোদিন বলবে না 'বাপজান, আমি তোমারে নিজের জন্মদাতার মতো ভালোবাসি?'
ভূমিহীনদের সন্তানদের জন্য খয়রাতবিহীন প্রি-স্কুল
মাগুরার কাজলী গ্রামের 'কাজলী মডেল' সম্বন্ধে আপনারা সবাই জানেন না৷ ভীষণ পিছিয়ে-পড়া ঘরগুলির শিশুরা ছাবি্বশ জন করে এক কাশে পড়ছে৷ এখন দেশের প্রায় এমনি দেড়শ প্রি-স্কুলে ব্ল্যাকবোর্ডে নিজের জন্য নির্দিষ্ট ঘরে অাঁক-জোক লেখা-লেখা খেলা করছে৷ এক-একদিন এক-একজনের মা বাসা থেকে চাল-ডাল নিয়ে এসে স্কুলে রেঁধে কাসের সবাইকে খাওয়াচ্ছে৷ তাদের সন্তানকে সারা মাস খাওয়াতে যে চাল-ডালটুকু লাগতো তার চেয়ে বেশি তো লাগছে না এই ব্যবস্থায়, মাসে ছাবি্বশ দিনের কাশে৷
এইভাবে হতদরিদ্র হয়েও সন্তানের শিার ব্যবস্থা হওয়া ছাড়া মাসে একদিন এতজন শিশুকে খাওয়াবার আনন্দ এই মা-বাবাদের জীবনের স্বাদ বদলে দিয়েছে৷ যার মা নির্দিষ্ট দিন সবাইকে খাওয়াবে সেই শিশুটিরও এ নিয়ে কত গর্ব৷ কে বলে তারা গরীব, মহা ডাঁটে এই দিনের জন্য সে কাশের ক্যাপ্টেন ও মাঠে পি টি-র সর্দার৷ তীরের বেগে তারা শিার সোপান দিয়ে উঠে যাচ্ছে সবাইকে অবাক করে দিয়ে৷ আর তাদের মা-বাবারা যারা আগে বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতেন তাঁরা একত্রে মিলিত হয়ে এই স্কুলের ব্যবস্থাপনা করছেন৷ এই প্রি-স্কুল আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা তো একজন বিত্তবানই, যিনি অর্থ ঢেলে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের অপমান না-করে পথ দেখিয়েছেন, তাদের যা আছে তাই দিয়েই তাদের সন্তানদের শিার দৌড়ে সবার চেয়ে এগিয়ে দিতে৷
গণগবেষণা ও অচ্ছুতদের সঙ্গে মিলনের প্রক্রিয়া শুরু
মিলনের এই উদাহরণমালা শেষ করছি সাতীরার অস্পৃশ্য 'ঋষি' শ্রেণীর গণগবেষণার মধ্য দিয়ে জাগরণের ও তাদের অস্পৃশ্যতা দূর হবার পথে অগ্রগতির কাহিনী পেশ করে৷
গত এক বছর ধরে গণগবেষণা করে এই শ্রেণীর মধ্যে আত্মশক্তি জাগ্রত হয়েছে৷ তাদের প্রত্যয় হয়েছে এই অশুচিতা নিজেদের কোনো অপরাধ বা ভাগ্য নয়, মানুষের মনের সঙ্কীর্ণতা৷ তারা এখন এই ভাগ্য মেনে নেয় না, তর্ক করে৷ চা-এর দোকানে চা দিতে অস্বীকার করলে দল বেঁধে সেখানে গিয়ে দাবী করে তাদের চা দিতে হবে, হোটেলে ভাত দিতে হবে৷ হোটেল শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়, তবে তাদের চা-এর কাপে ও ভাতের থালার পেছনে দাগ দিয়ে রাখে যাতে এগুলিতে অন্য কাউকে খাদ্য পরিবেশন না করা হয়, হলে অন্য খদ্দের আসবে না৷ এদিকে এই পর্যন্ত অগ্রগতি!
অন্যদিকে 'কাজলী' মডেলের অনুকরণে গণগবেষণায় অংশগ্রহণকারী সাতীরার 'অচ্ছুত' ঋষি সমপ্রদায় তাদের সন্তানদের জন্যও প্রি-স্কুল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়৷ এই মডেলের ফমর্ুলা অনুযায়ী তো ছাবি্বশ ঘরের সন্তান দরকার যাতে এই একদিন এক একটি ঘর থেকে সব ছাত্রছাত্রীদের জন্য খাবার আসবে৷ ঋষিদের নিজেদের মধ্যে তেরোটি ঘরের ছেলে-মেয়ে পাওয়া গেল৷ স্কুলে জায়গা আছে দেখে আশেপাশের ক'টি অতিদরিদ্র মুসলমান পরিবার তাদের সন্তানদের এই স্কুলে পাঠাবার প্রস্তাব দেয়৷ কাজলী মডেলের স্কুলে তো কোন খরচ নাই৷ কিন্তু তাদের সন্তানরা ঋষিদের সন্তানদের ঘরে তৈরী রান্না কী করে খাবে? তাই তারা জানালো বাসা থেকে তাদের সন্তানদের জন্য আলাদা চিড়া-মুড়ি জাতীয় খাবার নিয়ে আসবে৷ শুধু একটি মুসলমান পরিবার নাকি রাজী হয়েছিল স্কুলে তাদের সন্তানের ঋষির ঘরের খাবার খাওয়ার প্রস্তাবে৷
এই বন্দোবস্তেই স্কুলটি শুরু হবার কথা জানতে পেরে ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে গণগবেষণা সমন্বয়কারী গবেষকদের একটি কর্মশালায় সাতীরা গিয়েছিলাম৷ মনে হয়েছিল অন্ততঃ এক স্কুলে তো দুই সমাজের শিশুরা মিলিত হয়েছে, এটাই তো একটা বড় অগ্রগতি৷
গত ৩১শে আগস্ট খবর পাই যে এই শিশুদের খাবার থালাও এক হয়ে গিয়েছে৷ এখন আর কোনো ঘরের সন্তানদের জন্য আলাদা করে চিড়া-মুড়ি নয়, সব থালাতেই এক চুলায় রান্না খিঁচুড়ি চলে, কোনোদিন ঋষিসন্তানের মা'র হাতে রান্না, কোনোদিন মুসলমান সন্তানের মা'র হাতের৷ এই অঘটনটা নিশ্চয় ঘটালো কাজলী মডেলের অবাধ্য শিশুরা৷ তাদের পরস্পরের সঙ্গে মিলনের দুরন্ত তৃষ্ণা কী থালা-গ্লাস আলাদা করে ঠেকান গেল?
উদ্যোগ-মেলা ও উদ্যোগ-সফর
সৃজনশীল উদ্যোগ সন্ধানী প্রকল্প থেকে বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে পারস্পরিক সাাত্, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতার কিছু উদ্যোগও নেয়া হয়৷ ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে উত্তর বাংলার ডিমলা থানাধীন তিস্তা নদীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের চরখড়িবাড়ি গ্রামে একটি 'উদ্যোগ-মেলা' করা হয়৷ উদ্দেশ্য ছিল আমরা যেসব উদ্যোগ দেখেছি সেগুলো আরেকটি অঞ্চলের মানুষ যাঁরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কটে আছেন তাঁদেরকে দেখাতে, যাতে করে তাঁরা তাঁদেরই মতো মানুষের সফলতা দেখে নিজেরাও অনুপ্রাণিত হন এবং উঠে দাঁড়াতে সচেষ্ট হন৷ এই উদ্যোগমেলায় চরখড়িবাড়ীতে দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ১৪টি সংগঠনের এক বা একাধিক প্রতিনিধি নিয়ে আসা হয়৷ এরা চরখড়িবাড়ির বাসিন্দাদের নিজেরা কী করছেন তাই শুধু বলেন নি, এরকম বেশ কয়েকটি আয়বর্ধক ও সাংগঠনিক উদ্যোগের কৌশলাবলী হাতে-কলমে দেখিয়েও দিয়েছেন৷ রংপুরের চুহড় ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হামিদুর রহমান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গাছের ডাল, পচা পাতা, কচুরীপানা ইত্যাদি স্তরে স্তরে সাজিয়ে তার সঙ্গে রাসায়নিক সার মিশানো ফমর্ুলা অনুযায়ী কম্পোস্ট সার তৈরীর পদ্ধতি এবং অন্যান্য উদ্যোক্তারা ধানেেত মাছের পোনা উত্পাদন, মহিলাদের সঞ্চয়-ঋণ সমিতি গঠন ও তার ব্যবস্থাপনা পাড়ায় পাড়ায় তিনদিনব্যাপী কাশ করে করে হাতে নাতে শিখিয়ে দেন৷ এই গ্রামের পিছিয়ে-থাকা মানুষদের মধ্যে অনেকে আগ্রহভরে অতিথি-উদ্যোগীদের কাছ থেকে তাদের মূল্যবান পদ্ধতিগুলো শিখে নেয়৷
এছাড়া এক অঞ্চলের পিছিয়ে-পড়া মানুষদের প্রতিনিধিদের অন্য অঞ্চলের সৃজনশীল উদ্যোগ দেখাবার জন্য 'উদ্যোগ সফর' (স্টাডি টু্যর)-ও চলছে৷ এটি শুধু নতুন পদ্ধতি শেখা নয়, প্রেরণামূলক, পিছিয়ে-পড়া মানুষদের জন্য দিগন্ত-উন্মোচক, তাদের মধ্যে মিলনসঞ্চারক৷
৪
ওপরে উলি্লখিত সমাজের পিছিয়ে-পড়া মানুষের সৃজনশীল উদ্যোগগুলির মতো আরো বহু বহু উদ্যোগ নিশ্চয়ই রয়েছে যেগুলির সন্ধান আমরা মধ্যবিত্তরা শহরে বসে পাই নি৷ এগুলির অনেকের মধ্যেই স্থানীয় পর্যায়ে মানুষে মানুষে মিলনের চিত্র আছে, অর্থাত্ 'বহু' 'এক' হয়ে গেছে৷ উদ্যোগ-মেলা ও উদ্যোগ সফরও তো এদিকেই অবদান রাখে৷ বহু সমাজ থেকে এক সমাজের দিকে যাবার দিক নির্দেশ তো এর মধ্যেই রয়েছে৷ কিন্তু এই সমস্ত উদ্যোগ বহু হয়েও বিচ্ছিন্নভাবে ছড়ানো৷ সাগরের বহু স্থানে বিন্দু বিন্দু জলকণা বা বুদ্বুদ্, যেগুলি আকাশ ছুঁতে পারছে না৷ এগুলি থেকে যদি একটা বড় ঢেউ সৃষ্টি করা যায় তবেই তো বলা যায় যে বহু সমাজ থেকে এক সমাজ সৃষ্টির দিকে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে৷ ছোটখাটো মিলন-সফরে বা উদ্যোগ মেলায় তেমন কিছু তো হয় না৷
এরকম ঢেউ এসেছিল ভারতের কেরালার 'সায়েন্স ফর সোসাল রেভলু্যশন'-এর উদ্যোগে৷ এখনো-চলা সেই আন্দোলনে ওই প্রদেশের বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রসমাজ প্রতি বত্সর দীর্ঘ ছুটিতে সারা দেশে গণমানুষের কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে বসে বিজ্ঞানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনের মিলন ঘটায়৷ ইউএনডিপির 'মানব-উন্নয়নের' সূচক অনুযায়ী কেরালা হচ্ছে ভারতে অগ্রণী প্রদেশ৷ যদিও এই কৃতিত্বে এই প্রদেশের 'সায়েন্স ফল সোসাল রেভলু্যশন'-এর অবদান ইউএনডিপি বা অন্য কেউই বুঝতে পারে নি৷ জার্মানীতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা গণমানুষের সঙ্গে পার্টিসিপেটরি রিসার্চ আন্দোলনে নেমে যায় ১৯৬০ দশকের শেষের দিকে, যখন উইলি ব্রান্টের নেতৃত্বে সে-দেশের রাজনীতি জনকল্যাণের দিকে মোড় নেয়৷ চীনের প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ১৯১৯ সালের ফোর্থ আন্দোলনেও (১৯১৭-১৯২৩ সময়কালীন 'নয়া সাংস্কৃতিক আন্দোলনের' অন্তর্গত) সেদেশের বুদ্ধিজীবী ও ছাত্ররা গণমানুষের সঙ্গে মিলিত হয় এবং পরিণতিতে সেই প্রক্রিয়ার মধ্য থেকে চীনের বিপ্লবী ধারার জন্ম হয়৷
মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানীরা গণমানুষের সঙ্গে হাত না-মিলালে, পরস্পরকে সমৃদ্ধ করবার জ্ঞান চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করলে দু'টি পৃথক সমাজ থেকে যাবে৷ যেখানে দ্বিভাজনে বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানীরা আকাশ ছোঁবার চেষ্টা করে মাটিকে অবহেলা করে, সেখানে গণমানুষও বিজ্ঞানের জ্ঞান ও বিশ্লেষণ থেকে সমৃদ্ধি নেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং এগিয়ে যাবার গতিও হয় মন্থর৷ এরকম বুদ্ধিজীবী ধারা থেকে 'অগ্রসর চিন্তার' অহংবোধ নিয়ে যদি কোনো বিপ্লবী ধারাও জন্ম নেয় তবে সেরকম ধারা বিপ্লব করেও গণমানুষের মুক্তি আনতে পারে না৷
এই ঢেউ সৃষ্টি তো পিছিয়ে-পড়া মানুষরা নিজেরা করতে পারবে না, তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের সেই সম্পদ ও মতা নেই৷ বিজ্ঞানকেও নিজে থেকে তাদের ঘরে আনবার সামর্থ নেই তাদের৷ দেশের স্বাধীনতার পরে এরকম একটা ঢেউ উঠি-উঠি করেছিল 'যে আগুন জ্বলেছিল'-র ধারায়, যাতে অবদান রেখেছিল দেশের বহু ছাত্র-শিক তরুণ এবং দেশপ্রেমিক সরকারী অফিসার ও বিজ্ঞানী৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের কয়েকজন শিক এবং একদল ছাত্রও এই ঢেউ-এ সাঁতার কেটেছিলেন৷ আজকে এই বহুধা-বিভক্ত দেশের মহা-সংকটকালে এরকম একটি ঢেউ সৃষ্টির বড়ই প্রয়োজন৷
দেশের 'সুশীল সমাজ' বর্তমানে চলতি 'গডফাদার গণতন্ত্রের' জায়গায় 'পার্টিসিপেটরি গণতন্ত্র' আনবার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন নিজ নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়েই, তাঁদের এই নিষ্ঠা প্রশংসনীয়৷ কিন্তু এই ঈপ্সিত রূপান্তরের আর্থসামাজিক ভিত্তি বর্তমানে অনুপস্থিত, আর গডফাদাররা তো তাঁদের এই মহান উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করেই চলেছেন৷ আরো ফলপ্রসূ কাজ কী তাঁরা করতে পারেন না দেশের পিছিয়ে-থাকা মানুষদের সৃজনশীল, পারস্পরিক মিলনশীল জলবিন্দুসম উদ্যোগীদের পরস্পরের সঙ্গে মিলে? সারা দেশে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের অনেকের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে, দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী-প্রাযুক্তিক-সরকারী অফিসার-রাজনৈতিক নেতাদের তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁদের জ্ঞান-বুদ্ধি এগিয়ে যাবার কাজে ঢেলে দিয়ে দেশের সার্বিক গতির মোড় ঘুরিয়ে দেবার প্রচেষ্টায় শরীক হতে পারা যায় না কি? পারেন না কি নিজেরাও এই আন্দোলনে মাঠে নামতে? এর সঙ্গে 'বাজার অর্থনীতি'র মৌলবাদকে চ্যালেঞ্জ করে একটা স্বদেশী আন্দোলনের মতো ডাক দিয়ে এদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতীদেরও বাঁচবার সংগামে একটা হাত এগিয়ে দেয়া কী যায় না? মাগুরার সেই গ্রামের বড় খুনীর মতো, বরিশালের সেই বখাটে ছেলেদের মতো, দু-চারজন খুনী-বখাটেও এই হাওয়ায় মেতে গেলে সেটা তো একটা উপরিপাওনাও হতে পারে৷ তার জন্য গ্রামে গ্রামে যেখানে সম্ভব 'ট্রুথ কমিশন' বসুক না, মাগুরার সেই বদলে-যাওয়া খুনীকেই অন্যত্র এরকম 'ট্রুথ কমিশন'-এর প্রথম সভায় প্রধান বক্তার সম্মান দেয়া হোক্ না৷
মিলনের দিকে এগোবার পথে আলোকিত ধমর্ীয় নেতাদের অবদানও তুচ্ছ নয়৷ আমার এরকম মুসলিম ধমর্ীয় নেতার সঙ্গে সাাতের সুযোগ হয়েছে যাঁরা রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ভাষণ শুরু করেছেন, রবীন্দ্রনাথের গান ফটোকপি করে মসজিদে বিতরণ করেছেন, কবি নজরুল ইসলামের মতো মসজিদ ও মন্দির উভয় স্থানেই গিয়ে প্রার্থনা করেছেন৷ সব ধর্মেই এরকম আলোকিত ধমর্ীয় নেতা আছেন, তাঁদের একত্রে একটা সম্মেলনে এনে সব ধর্মের মিলনের বাণী দেশের মানুষকে শোনানো বোধ হয় একটা ইতিবাচক পদপেই হতে পারে৷ এরকম সব পদেেপর ফলে দেশ একেবারে বদলে যাবে এমন মনে করা হচ্ছে না, কিন্তু প্রবল হানাহানিময় এই হতভাগ্য দেশের মাটির ওপর মিলনের হাওয়া তো বয়ে আসবে? সুন্দরের শক্তিটা বাড়াতে পারলে তবেই না অসুন্দরকে পরাস্ত করবার সম্ভাবনা বাড়ে৷
বলা বাহুল্য সমাজে এরকম একটা ঢেউ সৃষ্টিতে সরকারের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো প্রয়োজন৷ এ ধরনের উদ্যোগের প্রচার, উদ্যাগ-মেলার আয়োজন করা, এবং বিভিন্ন খাতে উপযুক্ত প্রযুক্তির কথা জনগণকে জানাবার ব্যাপারে সরকার বিশেষ অবদান রাখতে পারে৷ আর সরকারের মধ্যেও নিঃসন্দেহে দেশপ্রেমিক মানুষরা আছেন৷ এর দৃষ্টান্ত তো কৃষি দফতরের অফিসাররা দেখাচ্ছেনই, যাঁরা এরকম একটা আহ্বানে সাড়া দেবেন এবং এধরনের উদ্যোগের প্রসারে সহায়তা করে নিজেদের কর্মের সার্থকতা খুঁজে পাবেন৷
প্রশ্ন উঠতে পারে এই পদেেপ দেশের আকাশ-ছোঁওয়া বৈষম্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রচেষ্টা কী হবে না? আমি এই বৈষম্য কমাবার কোনো সামাজিক শক্তি দেশে এই মুহূর্তে দেখছি না৷ এটি অনেক বড়ো ধরনের সমাজ-রূপান্তরের প্রশ্ন যার জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় রকমের সমাজ বিপ্লবেরই প্রয়োজন৷ অদূর ভবিষ্যতে এদেশে এরকম কোনো বিপ্লবের সম্ভাবনাও আমি দেখছি না৷ তবু এই প্রশ্নে দেশবাসীর সচেতনতা বৃদ্ধি করবার চেষ্টা করে যাওয়া আমাদের সকলেরই সামাজিক দায়িত্ব৷ আমাদের সংবিধানের মূল নীতিতে এখনো সমতাবাদী সমাজের প্রতি অঙ্গীকার রয়েছে৷ আমি জানি না এই ইসু্যটা সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে গেলে, এবং অমর্ত্য সেন-এর মতো বিশারদকে দিয়ে এই বলে সা্য দেওয়াতে পারলে যে, এদেশের সম্পদ ও আয় বণ্টন কোনোমতেই সমতাবাদী সমাজের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায় না, তখন দেশের সুপ্রীম কোর্ট কী রায় দেবেন? তবে সংবিধানের মূলনীতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে আদালতের উপদেশই শুধু বোধ হয় হতে পারে, নির্দেশ বোধ হয় হয় না৷
তবুও আইনের উপদেশ বৈষম্যের বিরুদ্ধে পেলে এই অন্যায়টার বিরুদ্ধে সবার বক্তব্য, এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের সম্ভাবনা আরো জোরদার হতে পারে৷ আর সুন্দরে-সুন্দরে মিলনের ঢেউটা যদি উত্তাল করা যায় তাহলে তার সুন্দর সমাজ গড়বার প েদেশের গণমানুষ আবার কামানের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্য প্রস্তুত হতেও পারে৷ তখন জাতীয়তাবাদী ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারা এক হয়েও যেতে পারে৷ কিন্তু এগুলো বর্তমান পর্যায়ে ইউটোপীয় চিন্তা৷ তাছাড়া, দেশবাসী কামানের মুখে তো অনেকেবারই ঝাঁপিয়ে পড়ে পরিণামে নতুন শাসকদের হাতে শুধু বঞ্চনা পেয়েছে৷ কেবল আমাদের দেশে নয়, অন্যদেশেও, বিভিন্ন রকম 'সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব'-এর পরেও৷ তাই এই প্রশ্নটার সঙ্গে এরকম সমাজ বিপ্লবের পরে কারা দেশের প্রভুত্ব করবে, এবং বিপ্লব টিকে থাকবার প্রশ্নটাও যোগ করা প্রয়োজন৷
আসুন এই কঠিন প্রশ্নদুটির উত্তর আমরা সন্ধান করি৷ সেই সঙ্গে পিছিয়ে-পড়া মানুষদের হাত ধরতে কী পারি না? তাদের দারিদ্র্য দেখে শুধুই কী তা বিমোচনের কথা বলে যাব? ওপর থেকে এই কথা বলে যাওয়ার মধ্যে যে নীচের তলার মানুষদের গভীরতম বেদনা আছে সে-কথা রয়েছে রবীন্দ্রনাথের এই গানে :
মম দুঃখের সাধন যবে করিনু নিবেদন তব চরণতলে
শুভ লগন গেল চলে,
প্রেমের অভিষেক কেন হল না তব নয়নজলে৷...
মনে হয়েছিল দেখেছিনু করুণা তব অাঁখিনিমেষে,
গেল সে ভেসে৷...
দুঃখীর সঙ্গে মিলনের মহালগ্নটা এসেছে৷ যদি আমরা করুণা না-দেখিয়ে হাত ধরি, যেমন ধরেছেন বিচ্ছিন্নভাবে দেশপ্রেমিক কিছু কৃষিবিদ, কাজলী গ্রামে বিদেশে কাজ থেকে অবসর-নিয়ে-আসা ওপর তলারই মানুষ, এবং আরো অনেকে৷ এই মহালগ্নটা পার হয়ে যাচ্ছে, এখনো সময় আছে তাদের হাত ধরবার৷ দেশের এলিটবর্গের সমাজ চেতনার এইখানেই পরীা৷
৫
দেশের 'সুশীল সমাজ' যদি এরকম একটা দায়িত্ব নিতে আগ্রহ না-দেখায় তাহলে এ দায়িত্ব কে নেবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক-ছাত্ররা? সরকারের কোন দফতর? সাংবাদিকদের কোন নেটওয়ার্ক? কোন সমাজ-উন্নয়ন পাঠচক্র? কোন বামধারা? না কী শেষ পর্যন্ত সবাই মাঠটা ছেড়ে দেবে ইরানের মতো কোন ধমর্ীয় ধারাকেই, এই জাতীয়তাবাদী রূপান্তরটা সমাপন করতে?
পুনশ্চ
এই নিবন্ধটি লেখবার পর দেশের রাজনৈতিক সঙ্কট তীব্রতম আকার ধারণ করেছে৷ একথা স্পষ্ট যে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্নটি হচ্ছে এবার কোন্ প্রধান 'গড্ফাদার' গোষ্ঠী দেশকে লুণ্ঠন ও ধর্ষণ করবে, এই প্রতিযোগিতায় উভয় পরে কাছে গ্রহণযোগ্য রেফারি ও নীতিমালার প্রশ্ন৷ অতীতে এই দুই পই দেশকে শাসন করবার সুযোগ পেয়েছে, এবং তাদের কুশাসন এবং প্রতিশ্রুতিভঙ্গ দেখে জনগণ বারে বারে এক গোষ্ঠীকে ছেড়ে অন্য গোষ্ঠীর দিকে অনেক আশায় হাত বাড়িয়ে আবার প্রতারিত হয়েছে৷ সেরকম বিকল্প কোন ধারা না-থাকায় জনগণের অনেকে এবার নির্বাচন সম্বন্ধেই বীতশ্রদ্ধ, যে কথা নাজিম কামরান চৌধুরীর মাঠ-অনুসন্ধান ভিত্তিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট ওঠে এসেছে (ইলেকশন ২০০৭, ডেইলি স্টার ৬ অক্টোবর ২০০৬)৷ অনেকে পেট্রন-কায়েন্ট সম্পর্কে এক বা অন্য রাজনৈতিক ধারার কাছে আবদ্ধ৷ আর অনেকে যেন আপাততঃ তাত্ণিক ধর্ষণকারী 'নেকড়ে'র হাত থেকে রা পেতে দূরে অপেক 'চিতাবাঘে'র দিকেই হাত বাড়াচ্ছে৷
এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় যতদিন গণজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো রাজনৈতিক ধারা জন্ম না-নেয়৷ দেশের 'সুশীল সমাজ' চিতাবাঘ আর নেকড়ের মধ্যে জাতিকে ধর্ষণের প্রতিযোগিতায় নিরপে রেফারীর সন্ধান না-করলে, এবং বাম শক্তিবর্গও গণজীবনের সঙ্গে মিলনের আন্দোলনে ব্রতী হলে, এই মিথষ্ক্রিয়া থেকে নতুন আশাপ্রদ রাজনৈতিক ধারার জন্ম নেবার সম্ভাবনা রয়েছে৷
এই নিবন্ধটি ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির একই শিরোনাম-শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসাবে পেশ করবার জন্য লেখা হয়৷ রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় নি৷ এম.এম.আকাশ, প্রিসিলা রাজ ও কুর্রাতুল আইন তাহমিনা রচনাটির একটি খসড়া পড়ে মূল্যবান মন্তব্য দিয়ে সাহায্য করেছেন বলে তাঁদেরকে ধন্যবাদ৷ বক্তব্যের জন্য শুধুমাত্র লেখকই দায়ী৷