'বিশ্বায়ন' কথাটাকে আজ বুঝে বা না-বুঝে, নানাজনে নানাভাবে ব্যবহার করছেন৷ যেমন বলা হচ্ছে, বিশ্বায়নের এ-যুগে সবাইকে ইংরেজী শিখতে হবে৷ ভালো কথা; কিন্তু সবাইকে, তা-ও আবার আপন মাতৃ বা জাতীয় ভাষাকে ভুলে বা উপো করে? পৃথিবীর অন্যান্য জাতি বা ভাষাভাষী মানুষ কি তাই করছে? নিশ্চয় নয়৷ অথচ আজ এদেশে বাংলা ও ইংরেজীকে পরস্পরের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করাবার চেষ্টা চলছে৷ বলা হচ্ছে যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষা নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির ফলেই ইংরেজী শিার েেত্র আমরা পিছিয়ে পড়েছি৷ আর ইংরেজী না-জানার ফলেই নাকি আমাদের উন্নতি বিঘি্নত হচ্ছে, আমরা সবেেত্র পিছিয়ে পড়ছি, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না৷
কিন্তু প্রশ্ন হল, বাংলা ভাষাটাই বা আমরা কতটা শিখেছি বা শিখতে পেরেছি৷ আজ রাষ্ট্র এবং সমাজ জীবনে বাংলার যতটা ব্যবহার দেখতে পাই, তা প্রকৃত অর্থে কী প্রমাণ করে? প্রাথমিক পর্যায় থেকে উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত প্রায় বার বছর বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা শেখার এবং তারপর আরও চার-পাঁচ বছর, এমনকি বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করার পরও বিশ্ববিদ্যালয়-শিতি ব্যক্তিদেরও গড়পড়তা বাংলা ভাষার জ্ঞান-মান কি আমাদেরকে লজ্জা দেয় না? সুতরাং প্রশ্নটা এখানে বাংলা নিয়ে 'বাড়াবাড়ি'র নয়, ইংরেজী ভাষার প্রতি উপো করারও নয়৷ আসল সমস্যাটা আটকে আছে আমাদের ভাষাশিার পদ্ধতির, কিংবা আরও বড় করে দেখলে, সামগ্রিক শিা পরিকল্পনার মধ্যে৷
বাইরের দুনিয়া বা বিদেশ বলতেও তো শুধু আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন বা অস্ট্রেলিয়াকেই বোঝায় না৷ আমাদের দেশের শিার্থীরাই অ-ইংরেজীভাষী দেশ যেমন জার্মানী, ফ্রান্স, জাপান, রাশিয়া, স্পেন কি ইতালীতে গিয়ে মাত্র এক বা দু-বছরের ভাষা শিার কোর্স করেই কি ওইসব দেশের ভাষা মোটামুটি আয়ত্ত করতে পারছে না? তারপর সে-ভাষার মাধ্যমে উচ্চশিা গ্রহণ বা উচ্চতর গবেষণায় সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছে না? এমনকি আমাদের দেশের যে হাজার হাজার শ্রমিক ও পেশাজীবী আজ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গিয়ে কাজ করছে তারাও কি সব মাদ্রাসায় পড়ে বা আরবী শিখে সেখানে যাচ্ছে?
বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে যাঁরা আজ দেশবাসীকে (আসলে দেশের সমস্ত মানুষকে) ইংরেজী শেখানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, তাঁরা যে এ-যুক্তিগুলোর সঙ্গে অপরিচিত তা নয়৷ আসলে তাঁরা যা করছেন বা বলছেন তা নিজেদের শ্রেণী বা গোষ্ঠীস্বার্থেই করছেন বা বলছেন৷ বলা বাহুল্য, বিদেশী অনুদাননির্ভর আমাদের অর্থনীতি ও বিকৃত উন্নয়ন-ভাবনার সঙ্গে বিষয়টির একটি ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে৷ জাতীয় স্বার্থ বা ব্যাপক জনগণের কল্যাণ নয়, 'আমার ও মামার' দিকটি দেখা, মুষ্টিমেয় তেলেমাথায় আরও তেল সিঞ্চনের বন্দোবস্ত ঠিক রাখাই যার উদ্দেশ্য৷ আর বিশ্বায়নের শ্লোগানটি এেেত্র তাদের নতুন প্রণোদনা যোগাচ্ছে৷
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, এমন কি জিয়া বা এরশাদের শাসন আমলেও, প্রশাসনিক েেত্র বাংলা প্রচলনের যতটা উদ্যোগ-আয়োজন ছিল, সাম্প্রতিককালে তাতে যেন উল্টোমুখী চোরাস্রোতের টান পড়েছে৷ এেেত্রও সেই 'বিশ্বায়ন' বা 'তথ্যপ্রযুক্তি'র অজুহাত দেওয়া হচ্ছে৷ সভা-সেমিনার ও কর্মশালায় দাতা সংস্থার প্রতিনিধি বা বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতির যুক্তি আমাদের আমলাদের এেেত্র কি কর্মপত্র তৈরী, কি ভাষণ-আলোচনায় বাংলা বর্জনে প্ররোচিত করছে না? শুধু তাই নয়, ইদানীং মনে হয় উচ্চ মহলের অলিখিত নির্দেশেই মন্ত্রণালয়সহ সরকারী দপ্তরগুলোতে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বাংলায় বাতচিত না-করাটা এক রকম রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷
শিকদের প্রশিণ দেওয়ার ল্যে স্থাপিত সরকারী প্রতিষ্ঠানেও অতু্যত্সাহী কর্তাবিশেষের উদ্যোগে বাংলা ভাষার ব্যবহার শোনা যায় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে৷ সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিতে গিয়ে মন্ত্রী-আমলারা বলছেন, ইংরেজী শুধু ভাষা নয়, এটি একটি টেকনোলজি; সুতরাং দেশের উন্নতি করতে হলে এই 'টেকনোলজি' গ্রহণের বিকল্প নেই৷ উপদেশ দিচ্ছেন, বাংলার বদলে বরং ভুলভাবে হলেও ইংরেজী বলতে, লিখতে৷
তাঁদের মতে এভাবেই নাকি আমরা একদিন ইংরেজীতে অভ্যস্ত, চোস্ত হয়ে উঠব৷ তবু বাংলা নিয়ে বাড়াবাড়ি আর নয়, অনেক হয়েছে, আর পিছিয়ে থাকা চলবে না ! জাতীয় ভাষার চর্চা মানেই তাঁদের কাছে পিছিয়ে পড়ার পথ প্রশস্ত করা৷ তাঁদের কাছে উন্নতির আদর্শ হল সিঙ্গাপুর৷ তাঁরা ভুলে যান, অথবা হয়তো ইচ্ছা করেই এই সত্যটির প্রতি চোখ ফিরিয়ে থাকেন যে, মূলত অভিবাসী-অধু্যষিত একটি বহুভাষিক ও বহুজাতিসত্তা বিশিষ্ট রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের জন্য ইংরেজীর মতো একটি 'কমন' ভাষার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই৷
এমনকি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও এ-ব্যাপারে বাংলাদেশের তুলনা চলে না৷ হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার পর ইতিমধ্যে অর্ধশতাব্দীকাল কেটে গেলেও, আজও ভারতের এক বিরাট অংশের মানুষের, বিশেষ করে দণিাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর কাছে হিন্দি গ্রহণীয় হয় নি৷ তাদের কাছে এটি আধিপত্যবাদের প্রতীক৷ সর্বভারতীয় যোগাযোগের ভাষা হিসেবে তারা প্রথম থেকেই বরং ইংরেজীরই পপাতী৷ যে-কারণে পূর্ব ও উত্তর ভারতের 'আকাশবাণী' দণি ভারতের রাজ্যগুলোতে বরাবর শুধু 'অল ইন্ডিয়া রেডিও'ই হয়ে রয়েছে৷ আজ ভারতের বিশেষ করে বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলোতে ইংরেজী-মিশ্রিত অদ্ভুত হিন্দির প্রচলন মনে হয় এক সাধারণ ভারতীয় ভাষা সৃষ্টির প্রয়াস মাত্র৷
আপন মাতৃভাষা নিয়ে এমনি হীনমন্যতা, এর শিকার যে কেবল আমরা অর্থাত্ বাংলাদেশের মানুষ তা-ই নয়; ওপার বাংলার লোকদের বেলায়ও কথাটা কমবেশি প্রযোজ্য৷ পশ্চিম বাংলায়ও এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের মধ্যেও ইংরেজী-মাধ্যমে পড়ার প্রবণতা সাম্প্রতিককালে বেশ বেড়ে গেছে৷ আর এরই প্রতিক্রিয়ায় কলকাতার বেশকিছু বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয় ইতিমধ্যে উঠে গেছে বলে জানা যায়৷ আপন দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যাপারে এই ইংরেজী-পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের চূড়ান্ত অবজ্ঞা বা উদাসীনতার পরিচয় আমরা পাই বিশেষ বিশেষ দিবসে সেখানকার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত তাদের টুকরো-টুকরো সাাত্কার থেকে৷
এর পেছনে যে বাঙালীর ঐতিহ্যগত হীনমন্যতার ভূমিকাই মুখ্য তার প্রমাণ হিসেবে আমরা এখানে একটি চমত্কার দৃষ্টান্তের উল্ল্লেখ করতে পারি৷ দৃষ্টান্তটি দিয়েছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সমপ্রতি দূরদর্শনে প্রচারিত একটি আলোচনা সভায়৷ তিনি দেখিয়েছেন, উত্তর প্রদেশের নাম হিন্দি বা ইংরেজি উভয় ভাষাতেই উত্তর প্রদেশ, 'নর্থ প্রভিন্স' বা 'নর্থ স্টেট' নয়; যেমন মধ্য প্রদেশেরও ইংরেজি অনুবাদ 'মিড্ল প্রভিন্স' বা 'স্টেট' করা হয় নি, করা হয়নি রাজস্থানের ইংরেজী অনুবাদ 'ল্যান্ড অব দি কিং'৷ অথচ পশ্চিমবঙ্গের ইংরেজী নাম 'ওয়েস্ট বেঙ্গল'৷
একই আলোচনা সভায় কলকাতা দূরদর্শনের মুখ্য অধিকর্তা পঙ্কজ সাহা জানালেন, সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যটির নাম কেবল 'ওয়েস্ট বেঙ্গল'-ই, 'পশ্চিমবঙ্গ' নয়৷ ওখানকার বাঙালীরা এতদিন এটাই মেনে এসেছেন৷ ওখানকার টিভি চ্যানেলগুলোতেও 'গীতাঞ্জলী', 'শ্রদ্ধাঞ্জলী'র মতো শব্দের ভুল বানান এখন প্রায় সুলভদৃষ্ট ব্যাপার৷ অথচ ইংরেজীর বেলায় এমনটি কমই হয়ে থাকে৷
বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এই নয়া চক্রান্ত কিংবা তার প্রতি প্রভাবশালী মহলের সচেতন ও অচেতন অবহেলার প্রভাব আমাদের প্রকাশনাশিল্প, সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমগুলোর ওপরও পড়ছে৷ আমাদের খবরের কাগজে বানান, শব্দ প্রয়োগ ও বাক্যগঠনগত ভুল এখন প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার; পাকিস্তান আমলে তো বটেই, আজ থেকে বিশ কি পঁচিশ বছর আগেও যা কল্পনা করা যেত না৷ ইদানীং আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে নিয়মিত বলা ও পড়া হচ্ছে, 'তিন মার্চ', 'চৌদ্দ চৈত্র' ইত্যাদি৷ ইংরেজীর অনুকরণে ৩ মার্চ, ১৪ চৈত্র এরকম লেখা যেতেই পারে, এবং লেখাই ভালো৷ কিন্তু ইংরেজিতে March 25লেখার পরও আমরা কিন্তু বলি Twenty Fifth March ; Twenty Five March নয়৷ আর 'চৌদ্দ চৈত্র' হলে, পহেলা বৈশাখের বদলেও তো 'এক বৈশাখ' বলাই উচিত৷
বছরের পর বছর আমাদের রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষক-আলোচকদের মুখে শুনে আসছি 'পঁচিশে মার্চের কালো রাত্রি'৷ যেন বা রাত কালো ছাড়াও নীল, হলুদ কিংবা লালও হয়ে থাকে৷ কালরাত্রি (মৃতু্য, ভয়ঙ্কর বা অভিশপ্ত অর্থে) কথাটা এভাবে আমাদের অজ্ঞান বাচনিকে 'কালো রাত্রি' হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ পৌর কর্পোরেশনের সাফাই কর্মীদের এ্যাপ্রোনে লেখা হচ্ছে 'পরিচ্ছন্ন কর্মী'৷ যদিও কথাটা হওয়া উচিত 'পরিচ্ছন্নতা কর্মী'৷ আমাদের বিদ্বজ্জন বা সারস্বত সমাজের দৃষ্টি এদিকে পড়ে না কি? না কি তাঁরাও বাংলা ভাষার ভুলকে কোনো ভুলই মনে করেন না? আমাদের ভিআইপি-রা টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজী-বাংলার অদ্ভুত মিশেল দিয়ে যখন কথা বলেন তখন কি বিশ্বাস হয় তাঁরা বাংলা বা ইংরেজী কোনো ভাষাই বিশুদ্ধভাবে শিখেছেন?
সিআইএ-র হয়ে কাজ করার অভিযোগে আমেরিকান পীস কোরের সদস্যদের এক সময় বিভিন্ন দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়৷ এমনকি সত্তর দশকের শেষদিকে বাংলাদেশে পীস কোরের সদস্যদের কাজ করার ব্যাপারে একটি চুক্তি স্বারিত হলেও, দেশব্যাপী প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত তা রদ করা হয়৷ অথচ আজ সেই পীস কোরের মাধ্যমেই সারা দেশের শিা প্রতিষ্ঠানসমূহে কমিউনিকেটিভ ইংরেজী শিা দানের কাজটি মহোদ্যমে চলছে৷ যদিও এর ফলে আমাদের সাধারণ শিার্থীদের ইংরেজী শিার ব্যাপারটি সত্যিসত্যি কতটা এগোচ্ছে তা অনুসন্ধানের বিষয়৷
সমগ্র মানবজাতি নিয়ে এক-বিশ্বরাষ্ট্র গঠনের যে-স্বপ্ন পৃথিবীর দার্শনিক-লেখক-শিল্পীরা দেখে এসেছেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে যে এস্পারেন্তো ভাষার পরিকল্পনা ভাষাবিজ্ঞানীরা করেছেন, তার বাস্তবায়ন আজও স্বপ্ন-কল্পনার
স্তরেই রয়ে গেছে৷ তার পরিবর্তে আমরা আজ বিশ্বায়নের নামে নতুন করে যেমন অর্থনৈতিক, তেমনি এক-ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ছি না তো?