ইহুদী-খ্রিস্টান ও ইসলামী ঐতিহ্যে একেশ্বরবাদী বিশ্বাস একটি সাধারণ সম্পর্কসূত্র হিসেবে বিদ্যমান৷ যদিও হিব্রু বাইবেল-এর আধুনিক সাহিত্যিক পর্যালোচনা ও প্রাচীন ইসরায়েলী ধর্মের পুরাতাত্তি্বক অনুসন্ধান ইব্রাহিম, এমনকি মুসা নবীর মতো প্রাচীন ব্যক্তিবর্গের একেশ্বরবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে৷ ইব্রাহিমীয় ঐতিহ্যে একেশ্ববাদের বিকাশের-ধারা উদ্ঘাটন আমাদেরকে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রোপটে একেশ্বরবাদকে স্থাপন করার সুযোগ এনে দেয়, এই প্রোপটটিকে আরও সম্প্রসারিত করলে হিন্দু ধর্মের মতো অন্যান্য ধর্মগুলোও এ প্রোপটে এঁটে যেতে পারে৷
শুরুতে আমাদের দরকার ইসরায়েলী উপাস্যের একেশ্বরবাদী উপাসক হিসেবে ইব্রাহিম ও অন্যান্য ইসরায়েলী ব্যক্তিত্বদের ঐতিহ্যগত বাইবেলীয় (ইসলামীও বটে) চিত্রণটিকে আরও নিখুঁতভাবে খুঁটিয়ে দেখা৷ এটাই রণশীল ইহুদী, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গি যা দাঁড়িয়ে আছে বাইবেলীয় জেনেসিস (সৃষ্টিতত্ত্ব) গ্রন্থ বা কোরআনের নিজ নিজ ব্যাখ্যানের ওপর৷ এটা আদম থেকে ধারাবাহিকভাবে উত্সারিত মানব সমাজের আদি একেশ্বরবাদের ধারণা হাজির করে, নূহ নবী যে মতাবলম্বী ছিলেন এবং ইব্রাহিম ও তাঁর ইসরায়েলী বংশধররা যা জারি রেখেছেন৷
সংেেপ জেনেসিস ইসরায়েলী জাতির একটি ইতিহাস উপস্থাপন করে যা তাদের আদিপুরুষ ইব্রাহিম থেকে সূচিত হয়েছে৷ (যার হিব্রু নাম আব-রাহাম-এর আরিক অর্থ 'জরায়ুর পিতা'; এই প্রবচনটি দিয়ে 'বহু বংশধরের পিতা' বা 'গোত্রের পিতৃপুরুষ' বোঝান হয়৷) ইব্রাহিমকে চিত্রিত করা হয়েছে ব্যাবিলনীয় নগর উর (বর্তমান ইরাকে অবস্থিত) থেকে কেনান দেশে একজন বহিরাগত হিসেবে, যিনি ইসরায়েলে বসতি স্থাপন করেন৷ ইব্রাহিমের সহচর ছিলেন তাঁর দু'পুত্র ইসমাইল ও ইসহাক, আরও ছিলেন পৌত্র ইয়াকুব_যাঁর সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নাম 'ইসরায়েল'৷ পরবতর্ীতে ইয়াকুবকে-প্রদত্ত নামটি তাঁর বংশধরদের গোত্রনামে পরিণত হয়৷ ওপরের সবগুলো চরিত্রকে প্রথাগতভাবে অভিবাসী একেশ্বরবাদী হিসেবেই কল্পনা করা হয়, যেখানে কেনান দেশের আদিবাসীরা ছিলো বহুঈশ্বরবাদী৷ শেষ পর্যন্ত ইব্রাহিমের প্রপৌত্র ইউসুফকে তাঁর ভাইয়েরা মিশরে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়৷ সেখানে তিনি প্রতিপত্তি অর্জন করেন এবং পরে কেনান দেশে খরা দেখা দিলে অন্যান্য ইসরায়েলীদেরকে মিশরে আমন্ত্রণ জানান৷ ইব্রাহিমের বংশধারা তারপর হারিয়ে যায়, কিন্তু ইসরায়েলীদের কাহিনীর ধারাবাহিকতা বহু পরে বাইবেলীয় এঙ্ােডাস (দেশান্তরযাত্রা) গ্রন্থ অুণ্ন রেখেছে৷ এঙ্ােডাস-এ মুসা দাসে-পরিণত তাঁর গোত্রকে মিশরের বাইরে নিয়ে আসেন এবং কেনান দেশের দিকে ফিরে যান৷
মুসাকে কেবল যে একজন একেশ্বরবাদী হিসেবেই দেখান হচ্ছে তাই নয়; বরং বলা হচ্ছে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি ঈশ্বরের ব্যক্তিগত নাম ইয়াহওয়েহ (ইংরেজীতে জিহোভা) জানতে পারেন এবং ঐশী আদেশ বা বিধানপ্রাপ্ত হন (হিব্রুতে তোরাহ ও আরবীতে তাওরাত)৷ মুসার উত্তরাধিকারী যোশুয়া ইসরায়েলীদের কেনান-এর নগরগুলো অধিকারে নেতৃত্ব দেন, পরে দেশটি বিজেতা শাসকগোত্রটির নামে নতুন ইসরায়েল নাম প্রাপ্ত হয়৷ শেষতঃ বাইবেলীয় বুকস অব কিংস-একেশ্বরবাদী রাজা হিসেবে ইসরায়েলে ঐশ্ব্বরিক নিয়োগপ্রাপ্ত দাউদ ও সোলায়মান-এর শাসনের বর্ণনা করা হয়েছে৷
বাইবেলীয় এই ইতিহাসচিত্রণ কোরআনেও প্রায় পুরোপুরিই রতি হয়েছে, অল্পকিছু পরিবর্তন ছাড়া৷ যেমন ইব্রাহিমকে উর নগরের বদলে মক্কাতে দেখান হচ্ছে৷ এভাবে ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানরা সবাই এটা ধরেই নিচ্ছে যে ইব্রাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব, ইউসুফ ও মুসা একেশ্বরবাদী ছিলেন৷ যাহোক, আদি ইসরায়েলীদের একেশ্বরবাদী হওয়াটাকে বহু আধুনিক ধর্মীয় ইতিহাসবেত্তাই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন৷ এই বিতর্ক বিষয়ে খুব সংপ্তি একটি ভূমিকা পাওয়া যাবে ক্যারেন আর্মস্ট্রং-এর বই অ্যা হিস্ট্রি অব গড-এর প্রথম অধ্যায়ে৷
একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, ইসরায়েল জাতি নিজের নামের মাঝে তার প্রাচীন উপাস্যের স্মৃতি অন্তভর্ুক্ত করে, সেই নামটি হলো 'এল'৷ হিব্রুতে এই নামটি স্রেফ ঈশ্বর হিসেবে অনূদিত হয়েছে; এটা আবার বহুঈশ্বরবাদী কেনানীদের একজন প্রধান দেবতার নামও৷ আরও একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, হিব্রু আর কেনানী ভাষা আসলে একই ভাষার ভিন্ন ভিন্ন উপভাষা মাত্র৷ কাজেই এখানে ধমর্ীয় ভাষারও মিশ্রণ ঘটলে আমাদের বিস্মিত হবার কিছু নেই৷ হিব্রু ভাষায় ইসরা-এল মানে হয় 'এল-এর লড়াই' বা 'এল-এর সাথে যিনি লড়াই করেছিলেন'৷ পরের অর্থটি বাইবেলের কাহিনীতে ইয়াকুব কিভাবে আরিক অর্থেই ঈশ্বরের সাথে কুস্তি লড়ে তাঁর নামটি অর্জন করেন তা জানাতে ব্যবহৃত হয়েছে৷
"ইয়াকুবকে নিঃসঙ্গ অবস্থায় রেখে যাওয়া হলো; আর একজন লোক তার সাথে সূর্যোদয় পর্যন্ত কুস্তি করলেন৷ ইয়াকুবের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছেন না দেখে তিনি ইয়াকুবের কোমরের সন্ধিতে আঘাত করলেন, আর কুস্তি লড়তে গিয়ে ইয়াকুবের নিতম্বসন্ধি ভেঙে গেল৷ তারপর তিনি বললেন, আমাকে যেতে দাও, কেননা সূর্যোদয় হচ্ছে৷ কিন্তু ইয়াকুব বললেন, আমি তোমাকে যেতে দেব না যতণ পর্যন্ত না আমাকে আশীর্বাদ করো৷ কাজেই তিনি তাঁকে বললেন, তুমি এখন থেকে ইয়াকুব নয়, ইসরায়েল নামে পরিচিত হবে, কেননা তুমি লড়াই করেছো ঈশ্বরের সাথে ও মানুষের সাথে, এবং জয়ী হয়েছো৷ শেষে ইয়াকুব তাঁকে বললেন, দয়া করে আমাকে আপনার নাম অবহিত করুন৷ কিন্তু তিনি বললেন, কেন তুমি আমার নাম জানতে চাও?
আর সেখানে তিনি তাঁকে আশীর্বাদ করলেন৷ তাই ইয়াকুব স্থানটিকে পেনি-এল (হিব্রুতে ঈশ্বরের মুখ) নামকরণ করলেন এই বলে, কেননা আমি ঈশ্বরকে মুখোমুখি দেখেছি, তারপরও আমার জীবন রা পেয়েছে৷" (জেনেসিস : ৩২ : ২৪-৩০)
উপরের অনুচ্ছেদটি একেশ্বরবাদের আধুনিক ধারণার প্রেেিত অসঙ্গতিপূর্ণ৷ ঈশ্বর সেখানে (যার 'এল' নামটি নিশ্চিত হয়েছে পেনি-এল স্থান নামটি দিয়ে) চিত্রিত হয়েছেন রাতের একজন রহস্যময় আত্মা হিসেবে, সূর্যোদয়ের আগেই যাঁকে অদৃশ্য হতে হয়৷ ইয়াকুব-এর এই কাহিনীটি থেকে বোঝা যায় ইসরায়েলীরা তাদের ইতিহাসের খুব প্রাথমিক পর্যায়েই নিজেদের আদি ঈশ্বর হিসেবে 'এল'কে স্বীকার করে নিয়েছে, তা না হলে এই বিশেষ ঐশ্বরিক নামটিকে তারা তাদের জাতিসূচক নাম হিসেবে ব্যবহার করত না৷ পাশর্্বটীকা হিসেবে বলায় যায়, হিব্রু 'এলোহিম' শব্দটিকে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে উপরে অনুবাদ করা হয়েছে; আসলে এটি একটি বহুবাচক শব্দ৷ এই শব্দটি আমাদের পরবতর্ী আলোচনায় তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে৷
বাইবেলের আরও বহু অনুচ্ছেদ থেকে আদি ইসরায়েলীদের 'এল'-উপাসনা পুনঃসমর্থিত হয়েছে৷ ইব্রাহিম ও তাঁর বংশধররা এল-শাদ্দাই (হিব্রুতে আরিকভাবে 'পর্বতের এল' হলেও প্রথাগতভাবে 'সর্বশক্তিমান ঈশ্বর' হিসেবে অনূদিত) নামে এল-এর উপাসনা করছেন এমন অসংখ্য নজির দেখা যাবে৷
ইব্রাহিম যখন নিরানব্বই বছরের বৃদ্ধ, ঈশ্বর তাঁর সামনে হাজির হলেন, এবং তাঁকে বললেন, 'আমি এল-সাদ্দাই; আমার সম্মুখে হাঁট এবং দোষমুক্ত হও৷' (জেনেসিস ১৭ : ১)
অতঃপর ইসহাক ইয়াকুবকে ডাকলেন, তাঁকে আশীর্বাদ করলেন, উদ্দীপ্ত করলেন, '...এল-সাদ্দাই তোমাকে রহম করুক আর ফলবান ও গণনা করুক৷' (জেনেসিস ২৮ : ১-৩)
ঈশ্বর ইয়াকুবের সামনে আবারো হাজির হলেন... এবং তিনি তাঁকে আশীর্বাদ করলেন৷ ঈশ্বর তাঁকে বললেন, 'তোমার নাম ইয়াকুব; তোমাকে আর কখনো ইয়াকুব নামে ডাকা হবে না, বরং ইসরায়েল হবে তোমার নাম৷' তাই তাঁর নাম হলো ইসরায়েল৷ ঈশ্বর তাঁকে বললেন, 'আমি এল-সাদ্দাই; ফলবান হও এবং অসংখ্য হও; তোমা থেকে উত্সারিত হবে একটি জাতি ও গোষ্ঠীসমূহ, আর তোমার থেকে জন্ম নেবে নৃপতিগণ৷' (জেনেসিস ৩৫ : ৯-১১)
অতঃপর তাঁদের পিতা ইসরায়েল (পূর্বে যিনি ইয়াকুব নামে পরিচিত ছিলেন) তাঁদের বললেন, '...এল-সাদ্দাই তোমাদের কৃপা করুন৷' (জেনেসিস ৪৩ : ১১-১৪)
ইয়াকুব ইউসুফকে বললেন, 'এল-সাদ্দাই আমাকে দেখা দিয়েছিলেন, আর তিনি আশীর্বাদ দিয়েছেন৷' (জেনেসিস ৪৮ : ৩-৪)
পুনঃ পুনঃ এল সাদ্দাই এর নাম উচ্চারণ ছাড়াও ইব্রাহিম তাঁর উপাস্যকে অন্য আরও বহু নামে আরাধনা করেছে, যার মাঝে আছে এল-ওলাম ( হিব্রুতে চিরন্তন এল), এবং এল এলিয়ন (সর্বউচ্চাসীন এল)৷
'ইব্রাহিম বীরসেবাতে একটি তামারিকস বৃ রোপণে করলেন এবং প্রভু এল-ওলাম এর নাম ধরে ডাকলেন৷' (জেনেসিস ১৬ : ৩৩)
কিন্তু ইব্রাহিম সদোম নগরের বাদশাহকে বললেন, 'আমি প্রভু এল-এলিয়ন এর নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, যিনি স্বর্গ ও মর্ত্যের নির্মাতা৷' (জেনেসিস ১৪ : ২২)
এ থেকে বোঝা যায় যে, আদি ইসরায়েলীদের একজন উপাস্য দেবতা ছিল যার নাম তারা দিয়েছিল এল৷ কিন্তু ঠিক কে ছিলেন এই এল? আধুনিক ধমর্ীয় ইতিহাসবিদেরা এই নামটিকে আদি কেনানবাসীদের একটি দেবতার নাম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; এরা সেই বহুঈশ্বরবাদী যাদের মাঝে বসতিকারী হিসেবে আদি ইসরায়েলী দেশান্তরীদের চিত্রিত করা হয়েছে৷ কেনানীদের ধর্মবিশ্বাসের বিষয়ে বাইবেল সামান্য তথ্য দিলেও আদি কেনানী নগর উগারিত (আধুনিক সিরিয়ার রাস শামরা)-এ পুরাতাত্তি্বক অনুসন্ধানের ফলে কেনানী পুরাণকাহিনী সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অনেকাংশেই বৃদ্ধি পেয়েছে৷ এগুলোতে আছে কেনানী দেবতাকূলের বর্ণনা, যাদের মাঝে আছেন এল (অর্থাত্ উপাস্য) দেবতাগণ ও বাআল (প্রভু)৷
কিন্তু ইসরায়েলী একেশ্বরবাদের বিকাশের পরবতর্ী পর্যায়ে উপাস্য হিসেবে নতুন একটি নাম আসে, শেষ পর্যন্ত যা পুরনো এল-ভিত্তিক নামগুলোকে অপসারণ করে৷ ইব্রাহিমের কয়েক শতাব্দী পরে বাইবেল মুসাকে চিত্রিত করে জ্বলন্ত ঝোপে জিহোভা নামের উপাস্যের সাথে সাাত্রত অবস্থায়৷ জিহোভা তখন তাঁর নতুন ব্যবহৃত নামটি সত্ত্বেও জোর দিয়ে বলেন যে তিনিই সেই দেবতা, যিনি পূর্বে এল-শাদ্দাই নামে পরিচিত ছিলেন৷
ঈশ্বর মুসার সাথেও কথা বললেন এবং তাঁকে বললেন, 'আমিই জিহোভা৷ আমি ইব্রাহিম, ইসহাক আর ইয়াকুবকে দেখা দিয়েছিলাম, কিন্তু জিহোভা নাম আমি তাঁদেরকে পরিচিত করাই নি৷' (এঙ্ােডাস ৬ : ২-৪)
কিন্তু জিহোভার আবির্ভাবের পরও কেনানী ধর্মের চিহ্ন টিকে থাকে৷ এল হচ্ছে কেনানী দেবকূলের মাঝে প্রধান জ্যেষ্ঠতম; তাঁকে চিত্রিত করা হয়েছে দেবতাদের রাজা ও দেবতাদের সভার সভাপতি হিসেবে৷ জিহোভাও নিম্নোদ্বৃত বাইবেলীয় ভাষ্যে একইভাবে চিত্রিত হয়েছেন:
স্বর্গসমূহ তোমার কীর্তিগুলোর প্রশংসা করুক, হে জিহোভা, ঐশী-আত্মাদের সমাবেশে রয়েছে তোমার প্রতি বিশ্বাস৷ নভোমণ্ডলে জিহোভার সমতুল্য আর কে আছে? পবিত্র আত্মাদের পরিষদে যিনি ভীতির উদ্রেক করেন, সেই জিহোভার মত কে আছে স্বগর্ীয় অস্তিত্বগুলোর মাঝে, যারা তাঁকে পরিবৃত করে রাখে তাদের মাঝে কে তাঁর মত মহান ও ভীতিকর? (স্যাম্স্ ৮৯ : ৫-৭)
উপরন্তু কেনানী ঈশ্বর এল'কে তাঁর শক্তিমত্তা ও উর্বরতার জন্য 'ষাঁড় এল' উপাধি দেয়া হয়েছিল৷ এটা কোন কাকতালীয় বিষয় নয় যে, বাইবেল মুসার অনুসারীদেরকে সোনার বাছুর পুজা করার জন্য ধিক্কার দেয়; নিশ্চিতভাবেই তারা তখন কেনানী এল-এর পুজা করছিল৷ কিন্তু খেয়াল করার মত বিষয় হলো বাইবেলীয় জেনেসিস গ্রন্থটি জিহোভাকে উল্লেখ করেছে 'ইয়াকুব-এর ষাঁড়' হিসেবে, এই উপাধিটি এল-এরই উত্তরাধিকার বলে অনুমিত হয়:
ইউসুফ ফলপূর্ণ বৃশাখা... ধনুর্বিদরা তাকে আক্রমণ করলো তীব্রভাবে; কিন্তু ধনুকটা রইল ঋজু... ইয়াকুবের ষাঁড়-এর হাতে...৷ (জেনেসিস ৪৯:২২-২৪)
কেনানী ঈশ্বরকূলের লুপ্তাবশেষ যে কেবল দেবতাদের আদি রাজা এল-এর সাথে জিহোভা-কে সম্পৃক্ত করাতেই দৃশ্যমান হয়, তা নয়৷ এছাড়াও বাইবেলে আছে তারুণ্যদীপ্ত যুদ্ধদেবতা বাআল-এরও চিহ্নাবশেষ৷ বাআল-এর ঐশী উপাধি ছিল 'মেঘের সওয়ার', এটাও বাইবেলে জিহোভার প্রতি প্রয়োগ করা হয়েছে৷
গাও ঈশ্বরের প্রতি, তাঁর নামের প্রশংসা গাও; যিনি মেঘে সওয়ার, তাঁর প্রতি একটা গান গাও, তাঁর নাম জিহোভা, তাঁর সামনে নতজানু হও৷ (স্যাম্স্ ৬৮:৪)
পরে উদ্ধৃত বাইবেলীয় ভাষ্যে যুদ্ধ ও আকাশের দেবতা হিসেবে জিহোভার চিত্রণ খুবই পরিষ্কার, যেখানে মিশরের ফারাওদের কবল থেকে মুক্তিপ্রাপ্তিকে উদযাপন করা হচ্ছে, এটাকে কখনো কখনো 'মুসার সংগীত'ও বলা হয়৷
তারপর মুসা ও ইসরায়েলীরা জিহোভার প্রতি এই গান গাইল; আমি জিহোভার প্রতি গাইব, কেননা তিনি কীর্তিময় বিজয় অর্জন করেছেন; অশ্ব ও অশ্বারোহীদের তিনি নিপে করেছেন পানিতে... জিহোভা একজন যোদ্ধা; জিহোভা তাঁর নাম৷ ফারাও'র রথ এবং তার বাহিনী তিনি নিপে করেছেন পানিতে; ঢেউ তাদের ঢেকে ফেলেছে... তোমার ডান হাত হে জিহোভা, শত্রুদের ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে... তুমি তোমার ক্রোধ জাগরিত করেছিলে, তাদের নিমিষে গ্রাস করেছে, তোমার নাসারন্ধ্রের কম্পনে পানি ুব্ধ হলো, ঢেউ জমলো স্তূপের মতো; তুমি বায়ুকে প্রবাহিত করলে, সমুদ্র তাদের ঢেকে দিল; তারা দস্তার মতোই ডুবে গেল শক্তিমান সমুদ্রে৷ (এঙ্ােডাস ১৫ : ১-১১)
ওপরে ঝড়, বাতাস ও বন্যার মতা দ্ব্যর্থহীনভাবে জিহোভার প্রতি আরোপ করাটা কেনানী বাআল এর লুপ্তাবশেষ বলেই প্রতীয়মান হয়৷ পরের অনুচ্ছেদটি বৃরে আলোকচ্ছটা ও জলের ওপরে বজ্রপাতকে তাঁর কণ্ঠস্বর হিসেবে কীর্তিত করে জিহোভার আকাশদেব ভাবমূর্তিটিকেও স্পষ্টতর করছে৷
কিভাবে আদি ইসরায়েলী ধর্ম উপরোক্ত কেনানী বহুঈশ্বরবাদী দৃশ্যকল্প এ পরিমাণে অঙ্গীভূত করল? একেশ্বরবাদী আদি ইসরায়েলী ধর্মের বিষয়ে আমাদের পূর্বনির্দিষ্ট ধারণার কারণেই এ প্রশ্নটি ওঠে যে, সেই অনুমানে কেনানী উপাস্যদের অন্তভর্ুক্ত করার কোনো সুযোগ নেই৷ বাইবেলের ভাষ্যও কিন্তু এই পূর্বানুমানকে সব সময়ে সমর্থন করে না৷ উদাহরণতঃ আমরা মুসার এই আদেশটি দেখতে পারি :
আমি তোমার ঈশ্বর জিহোভা, যে তোমাদের বের করে নিয়ে এসেছিল মিশর থেকে, দাসত্বের গৃহ থেকে; আমি ছাড়া আর কোন প্রভু তোমাদের থাকবে না৷ তোমরা নিজেদের জন্য কোন মূর্তি নির্মাণ করবে না... তোমরা তাদের সামনে নতজানু হবে না বা তাদের উপাসনা করবে না; কেননা আমি জিহোভা তোমাদের ঈশ্বর ঈর্ষাপরায়ণ, আমাকে যারা প্রত্যাখ্যান করে তাদের তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্ম পর্যন্ত পিতার অন্যায়ের জন্য সন্তানদের শাস্তি দেই৷ (এঙ্ােডাস ২০ : ২-৫)
অনুচ্ছেদটি ঠিক এটা বলছে না যে, জিহোভা বাদে অন্যকোন দেবতার অস্তিত্ব নেই৷ বরঞ্চ বলা হচ্ছে অবশ্যই ইসরায়েলীরা কেবলমাত্র জিহোভারই উপাসনা করবে, অন্য কোনো দেবতার দিকে যেন তারা মন না দেয়৷ অন্য দেবতারা অস্তিত্বশীল কী না তা ভিন্ন এক প্রসঙ্গ, এখানে সে-আলোচনা হচ্ছে না৷ এটা আধুনিক ইসরায়েলী, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের বিশ্বাস অর্থে একেশ্বরবাদ নয়৷ এটা বরং অনেকটা রকদেবতার (henotheism) উপাসনার মত, যে-বিশ্বাসে বহু দেবতার অস্তিত্ব থাকলেও বিশেষ একজনকেই পুজা করতে হয়৷ বাইবেলের প্রেেিত হেনোথিইজমকে অদ্ভুত ধারণা বলে মনে হয়, কিন্তু এটারও কারণ বাইবেল-বিষয়ক আমাদের সেই পূর্বানুমান যে, বাইবেল খাঁটি একেশ্বরবাদী৷ প্রত্যতর বহুঈশ্বরবাদী প্রেেিত এটা খুবই সাধারণ ঘটনা; যেমন হিন্দু ধর্মের ঈশ্বরকাঠামোতে বহু দেব ও দেবীর অস্তিত্ব থাকলেও পূজারীরা ব্যক্তিগতভাবে কখনো কখনো এদের মাঝ থেকে বিশেষ একজনেরই উপাসনা করে থাকেন (শৈবরা শিব কেন্দ্রিক, বৈষ্ণবরা বিষ্ণু)৷ নিচে তুলে ধরা খুবই কৌতূহলজাগানো বাইবেলীয় অনুচ্ছেদটিতে রকদেবের পূজার উপস্থিতি পরিলতি হয়৷
এলিয়ন যখন জাতিগুলোকে বণ্টিত করলেন, তিনি যখন মানবজাতিকে বিভক্ত করলেন, তিনি জনগোষ্ঠীগুলোর সীমানাকে নির্দিষ্ট করলেন দেবতাদের সংখ্যা অনুযায়ী; জিহোভার জনগোষ্ঠী ছিল তার নিজের অংশ, ইয়াকুব তাঁর জন্য বরাদ্দ ভাগ৷ (ডিউটেরোনমি ৩২ : ৮-৯)
ওপরের এলিয়ন সাধারণত ঈশ্বর হিসেবেই অনূদিত হন, আর ধরে নেয়া হয় তাঁকে দিয়ে জিহোভার মতই সেই একই একেশ্বরবাদী উপাস্যের কথাই বোঝান হয়৷ যাহোক, আমরা দেখেছি ইব্রাহিম দৃশ্যত কেনানী এল দেবতাকে এল-এলিয়ন নামে উপাসনা করেছেন, যেখানে জিহোভা বহু পরে মুসার সামনে আবিভর্ূত হয়েছিলেন৷ সে-েেত্র উপরের অধ্যায়টি কার্যত একটি ঐতিহ্যই রা করেছে যেখানে জিহোভা ও এল দু'জন পৃথক উপাস্য, আর জ্যেষ্ঠতর দেবতা এল নবাগত জিহোভার কাছে ইসরায়েলীদের কতর্ৃত্বভার অর্পণ করছেন৷ আবারও, এই সম্ভাবনা একেশ্ববাদের সাথে নয়, রকদেবের ধারণার সাথেই খাপ খায়৷
ঐতিহাসিকভাবে দেখলে ইসরায়েলী ধর্ম আদিতে একেশ্বরবাদী ছিল এই দাবি ধোপে টেকান খুবই কঠিন৷ বাইবেল নিজেই আমাদের জানাচ্ছে যে, ইব্রাহিম ও তাঁর পুত্ররা, যাঁরা ইসরায়েলি জাতির প্রতিষ্ঠাতা পূর্বপুরুষ, বাস করতেন কেনানের বহুঈশ্বরবাদী পরিবেশে৷ কিন্তু কেবল বাইবেলীয় ঐতিহ্যই আমাদের বলে যে, ইব্রাহিম ব্যাবিলন থেকে আসা একজন অভিবাসী ছিলেন যাতে তাঁকে তাঁর কেনানী প্রতিবেশীদের থেকে পৃথক করা যায়৷ হাজার হাজার বছর আগের এই অভিবাসন কিংবা এমনকি কেনানেই একজন ব্যক্তির অস্তিত্ব প্রমাণ পুরাতাত্তি্বক দিক দিয়ে বিচার করা অসম্ভব৷ এর মানে এটাই যে, আমরা এই জটিল বাইবেলীয় দাবিকে যাচাই করতে পারছি না৷ অন্যদিকে বাইবেল-এ এল ও বাআল-এর চিহ্ন থেকে দেখতে পাই যে, কেনান দেশে আদিতে বসবাসকারী ইসরায়েলীরা কেনানী উপাস্যদের মতই কোন কিছুর উপাসনা করত৷ তাহলে কিভাবে আমরা জানি যে আদি ইসরায়েলীরা কেনানী-ই ছিল না? যদি ইব্রাহিম সত্যি সত্যি উর থেকেই আগত হন, তবে তিনি ও তাঁর গোত্র কেন হিব্রুতেই কথা বলতেন, যেটি একটি কেনানী উপভাষা? কেন তাঁর জাতি নিজেদের নাম কেনানী উপাস্যের নামে 'ইসরা-এল' রাখবে?
ইতিহাসবিদদের কাছে এই ধারণাটিই বেশি গ্রহণযোগ্য যে ইব্রাহিম স্বয়ং কেনানী ছিলেন এবং তাঁর উর থেকে অভিবাসনের কাহিনীগুলো সম্ভবত কাল্পনিক৷ আধুনিক ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবি অনেক বেশি সহজতর, যেহেতু এতে ইব্রাহিমের পরিবার যে উর থেকে এসেছে তা প্রমাণের দায় থাকে না৷ ইব্রাহিমের ব্যাবিলনসম্পৃক্ত হওয়াটা সম্ভবত দুটো উদ্দেশ্য সিদ্ধ করত; প্রথমত এটা তাঁকে সুপ্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার সাথে সম্পর্কিত করতো, যে-সভ্যতাটি রাজনৈতিকভাবে তাত্পর্যহীন কেনান প্রদেশের চেয়ে পুরনো ও অনেক বেশি সুখ্যাত৷ দ্বিতীয়ত, ইব্রাহিমের অ-কেনানী উত্পত্তির ওপর গুরুত্বারোপ পরবতর্ীকালের একেশ্বরবাদী বাইবেলীয় লেখকদের ইব্রাহিম যে বহুঈশ্বরবাদী কেনানী ছিলেন না, তা দাবি করার সুযোগ করে দেয়৷ এখানেই আধুনিক ইতিহাসবিদেরা বাইবেলীয় ভাষ্য থেকে ভিন্ন অবস্থান নেন৷
অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে এসে আমরা খাঁটি বাইবেলীয় ভাষ্য অনুযায়ী কেনানী ও ইসরায়েলী উপাস্যদের মিশ্রণ দেখেছি৷ এটা যদিও জ্ঞানদায়ী এবং একই সাথে সূচনাবিন্দু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কোনভাবেই কাহিনীর পুরোটা নয়৷ ইসরায়েলী সংস্কৃতি ও ধর্মের বিবর্তনের আধুনিক নিদর্শনাদির বৃহদংশ বিচ্ছিন্ন কেতাবী ভাষ্যপাঠের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, বরং পুরাতাত্তি্বক অনুসন্ধান থেকে উত্সারিত৷ এই নিদর্শনগুলো পুরাতাত্তি্বক উইলিয়াম জি. ডেভার তাঁর হু ওয়ার দ্যা আরলি ইসরায়েলিটিস, অ্যান্ড হোয়ার ডিড দে কাম ফ্রম গ্রন্থটিতে বিশদ বিবৃত করেছেন৷
সর্বপ্রথম বাইবেলের যে-পর্বটি নিয়ে পুরাতাত্তি্বক অনুসন্ধানের আশা করা যায়, সেটি হলো মুসার নেতৃত্বে মিশরত্যাগ (এঙ্ােডাস); এরই চূড়ান্ত পরিণতি যসুয়া'র নেতৃত্বে তাদের কেনান দেশ দখল৷ ইব্রাহিমের সময় থেকে প্রাধান্যবাদী কেনানী সংস্কৃতি যেখানটাতে মুসার অনুসারী ইসরায়েলীদের দিয়ে প্রতিস্থাপিত হলো, সেই বিন্দুটিতে দেশদখলের এই বিশাল ঘটনাটি পুরাতাত্তি্বকভাবে দৃশ্যমান হবার কথা৷ এটাই সুবিধাজনক, কেননা বাইবেলের আর একটি রহস্য ঘনিষ্ঠভাবে মুসার সাথে জড়িত: এটা হলো সেই স্বগর্ীয় নাম জিহোভা, যেটা তিনিই সর্বপ্রথম শিখেছেন৷ শব্দতত্ত্বের দিক দিয়ে এটা একটা রহস্য, হিব্রু ভাষায় যার কোন ব্যাকরণগত সুনির্দিষ্ট অর্থ নেই৷ এমনকি প্রথম দিকের ইসরায়েলীরাও এই শব্দটিকে রহস্য হিসেবেই গ্রহণ করেছিল, মুসা ও তাঁর সদ্য আবিষ্কৃত দেবতার মাঝে প্রথম সাাতেও যেমনটা দৃশ্যমান৷
কিন্তু মুসা ঈশ্বরকে শুধালেন, 'যদি আমি ইসরায়েলীদের কাছে গিয়ে বলি "তোমার পূর্বপুরুষের ঈশ্বর আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন", আর তারা যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, "তার নাম কি?" আমি তাদের কি বলব?' ঈশ্বর মুসাকে বললেন, 'আমি হলাম তিনি, যিনি আমিই৷' (এঙ্ােডাস ৩:১৩)
বাইবেলের বহু অনুবাদকই যেমন দেখিয়েছেন 'আমি হলাম তিনি, যিনি আমিই' আসলে প্রবচনসুলভ পদ্ধতিতে কেবল এটাই বলা যে, 'আমি কে তা নিয়ে নিজেকে উদ্বিগ্ন করো না'৷ এই পদটি দৃশ্যতঃ ইসরায়েলীদের মাঝে জিহোভা নামে তাদের নতুন উপাস্যের পরিচয় নিয়ে সংশয়েরই প্রতিফলন৷ এটা সত্যিই অর্থবহ হয় যদি ইসরায়েলীরা নিজেরাই কেনানী হয়ে থাকে, যেহেতু জিহোভা কেনানীদের দেবকূলের অন্তর্ভুক্ত নন৷ সেেেত্র আমাদের এ-সিদ্ধান্ত না নিয়ে উপায় থাকে না যে, জিহোভা ছিলেন একজন নতুন উপাস্য, সম্ভবত কোন ভিনদেশী উপাস্য৷ ডেভার উভয় প্রশ্নেরই কৌতূহলোদ্দীপক জবাব দিয়েছেন৷
প্যালেস্টাইনে মুসার সম্ভাব্য সময়কার সমস্ত পুরাতাত্তি্বক নিদর্শন অনুসন্ধান করে ডেভার সবগুলো খনন এলাকা পরিদর্শন করেছেন, তিনি বিজয়ী ইসরায়েলীদের দ্বারা কেনান অধিকৃত হবার কোনো নিদর্শন খুঁজে পান নি৷ তিনি অবশ্য ইতিহাসের একটি বিন্দু চিহ্নিত করেছেন যেখানে অস্তিত্বশীল কেনানী বসতিগুলো হয় হীনবল বা পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে, আর তাদের স্থলে নতুন ইসরায়েলী বসতিগুলো সৃষ্টি হচ্ছে৷ যাই হোক, এটা বের হয়ে আসে যে, এই পরিবর্তন সশস্ত্র একটি ইসরায়েলী আগ্রাসনের কারণে সাধিত হয়েছে এমন কোন প্রমাণই নেই৷ বরং এটাকে মনে হয়েছে স্থানীয় সামাজিক অস্থিরতার ফলাফল, যা শেষ ব্রোঞ্জযুগ থেকে আদি লৌহযুগে উত্তরণের সময়ে ঘটেছিল৷ সম্ভবত স্বৈরতান্ত্রিক ব্রোঞ্জযুগের শাসকদের দ্বারা অতিরিক্ত করারোপে জর্জরিত এবং নির্যাতিত কৃষকরা দলে দলে বড় বড় বসতিগুলো এবং একই সাথে তাদের শাসকদের পরিত্যাগ করেছিল৷ কিন্তু কোনো বড় আকারের আগ্রাসনের ফলে এই পরিবর্তন ঘটেছিল এমন কোনো ইঙ্গিতই নেই৷ ডেভার দেখান যে, পুরাতাত্তি্বক নিদর্শন, বিশেষ করে মৃত্পাত্র নির্মাণশৈলীর ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয় যে এই পরিবর্তনের যুগে নতুন কোনো জাতি কেনান দখল করে নি৷ বরং ইঙ্গিত এটাই পাওয়া যায়, কেনানী সংস্কৃতি এই পর্বে ইসরায়েলী সংস্কৃতিতে বিবর্তিত হয়৷
যদিও মৃত্পাত্র নির্মাণ শৈলী... শেষ দ্বিতীয় ব্রোঞ্জযুগ থেকে প্রথম লৌহযুগে পরিবর্তিত হতে পারে, দৃশ্যত আমাদের পাওয়া সবগুলো পৃথক ধরনই দৃঢ়ভাবে, এবং আমি বলব প্রত্যভাবে একটি ধারাবাহিকতাই প্রদর্শন করে৷ এভাবে আদি ইসরায়েলীরা দেখতে কেনানীদের মতই ছিল৷ (ডেভার, পৃষ্ঠা ১২১)
আমরা ইতিমধ্যেই যে-ধারাবাহিকতা এল ও বাআল-এর কেনানী রূপকল্পের সাথে বাইবেলীয় জিহোভার মাঝে দেখেছি, তার সাথে এটা খুব ভালোভাবে খাপ খায়৷ ডেভার জিহোভার উত্পত্তি বিষয়েও নিদর্শন সংগ্রহ করেছেন৷ মুসার চিত্রণে আমরা পাই তিনি প্রথম জিহোভার সাাত্ পান তাঁর মেডিয়ান বা সিনাই উপত্যকা থেকে শুরু-হওয়া মরু এলাকা ও উত্তর আরব ভ্রমণের সময়ে৷ মিশরতত্ত্ববিদরা এই এলাকাতে জিহোভার সম্ভাব্য উত্পত্তি বিষয়ে ইঙ্গিত দেয় এমন কিছু প্রাচীন লিপি উদ্ধার করেছেন৷ মিশরীয় ভাষ্যগুলোর কালও (১৫০০-১২০০খ্রিস্টপূর্বাব্দ) মোটামুটিভাবে অনুসারীদের কেনানে দেশান্তরী হবার জন্য মুসার ব্রোঞ্জযুগের শেষে যে সময়ে অস্তিত্বশীল থাকার কথা, তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ৷
রেডফোর্ড-এর মতে, আদি ইসরায়েলীরা স্রেফ দণি কেনানের শাসু বেদুঈনদের একটি দল ছিল৷ ১৮ ও ১৯ তম মিশরীয় রাজবংশের আমলের নথিপত্রের কল্যাণে আমরা তাদের সম্পর্কে ভালোই অবগত৷ শাসুদের একাধিক বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, মিশরসীমান্তে, মরুপ্রায় সীমান্তে তাদের বাস... কয়েকটি চমকপ্রদ লিপিতে শাসু অঞ্চলের ইয়াও দেবতার উল্লেখ রয়েছে, এটা বাইবেলীয় ঐতিহ্যানুযায়ী মুসার মিডিয়ান এলাকা থেকেই জিহোভা বিষয়ে অবগত হবার বিষয়টাই স্মরণ করিয়ে দেয়৷ বাস্তবত, এই ভাষ্য ইসরায়েলী জিহোভা বিষয়ে আমাদের জানা আদিভাষ্য, এবং বাইবেলের বাইরে খুবই অল্প কয়েকটির একটি৷ (ডেভার, পৃষ্ঠা ১৫০)
জিহোভা শব্দটির হিব্রুতে একটি রহস্যময় শব্দ হওয়াটা অর্থবহ হয় যদি এটা হিব্রুতে আমদানিকৃত অহিব্রু শব্দ হয়ে থাকে৷ মনে হয় ছোট ছোট দলের দেশান্তর ইসরায়েল, মিশর ও আশেপাশের দেশগুলিতে সর্বদাই চালু ছিলো; মানুষ ভালো শস্য ও বেশি খাদ্যের খোঁজে যে কোনো স্থানেই যাতায়াত করতো৷ ডেভারের মতে, হতে পারে যে, এই দলগুলোর কোন কোনটি কেনানী বিপর্যয়ের সময়ে মিশর ও মেডিয়ান হয়ে ইসরায়েলে প্রবেশ করে, এবং মুসা ও জিহোভার ধমর্ীয় প্রথাও সঙ্গে নিয়ে আসে৷
ব্রোঞ্জযুগের শেষে কেনানে রাজনৈতিক শূন্যতার কারণে একইভাবে ধমর্ীয় শূন্যতাও সৃষ্টি হবার কথা৷ এই শূন্যতার মধ্যেই মিশর থেকে মুসার (যেটি আসলে একটি মিশরীয় নাম, এর অর্থ 'কোন কিছু হতে জাত', যেমন 'তুত মোজেস' মানে পর্বতজাত) নেতৃত্বে বহির্গমনের ঐতিহ্য, জিহোভা নামের মরু দেবতার উপাসনা, এবং শেষ পর্যন্ত কেনানী দেবতা এল ও বাআল-এর প্রতিরূপের সমন্বয় ঘটেছিল৷ ফলাফল ছিল নতুন একটি ইসরায়েলী ধর্ম, যেটি লৌহ যুগের নতুন বসতিগুলোর সাথে বিকশিত হয়েছিল; আর এল ও বাআল-এর মতো পুরনো দেবতারা জিহোভার নতুন ভাবকল্পের অন্তভর্ুক্ত হয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে এটি একেশ্বরবাদী ধর্মে পরিণত হয়৷
এইভাবে ইসরায়েলী একেশ্বরবাদের বিবর্তনের কাহিনীটি আমরা যা ভাবতাম তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল৷ মজার বিষয় হলো কাহিনী সেখানেই সমাপ্ত হয়নি, বরং কয়েক শতাব্দী পরে আরবে ইসলামের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এর ধারাবাহিকতা চলতে থাকে৷ কোরআনে ব্যবহৃত আরবী শব্দ আল্লাহুমা দৃশ্যত বাইবেলে ব্যবহৃত ঈশ্বরের সাধারণ হিব্রু প্রতিশব্দ 'এলোহিম' থেকে এসেছে৷ অন্যদিকে ধারণা করা হয় আরবী আল্লাহ শব্দটি আল ইলাহ (আরবীতে দেবতা বা উপাস্য) শব্দটির সংকোচন৷ মনে হয় আল্লাহ ইসলাম-পূর্ব আরবের একজন আঞ্চলিক দেবতা; মুহাম্মদের (ছাঃ) পিতার নাম আবদুল্লাহ (ঈশ্বরের উপাসক) থেকেও এর নিদর্শন পাওয়া যায়৷
এভাবে আমরা পাচ্ছি ইহুদী-খ্রিস্টান-ইসলামী ঐতিহ্যের একটি কৌতূহলোদ্দীপক চিত্র; যা আজকের দিনে অন্যান্য ধর্মমতগুলোর সাথে মিথষ্ক্রিয়ায় দারুণভাবে পরিবর্তিত হতে পারে৷ যদি ইসরায়েলে মুসার পর জিহোভার একেশ্বরবাদী পূজা শুরু হয়, সে-েেত্র দৃশ্যত বাইবেল ও কোরআনীয় ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইউসুফ এর মতো চরিত্রগুলো সকলেই ছিলেন বহুঈশ্বরবাদী৷ যেহেতু এদেরকেই কোরআনে আদি মুসলমান হিসেবে সন্মানিত করা হয়েছে, তাই বিস্ময়কর এই সিদ্ধান্তেই আমরা পেঁৗছাই যে 'মুসলিম'-এর সংজ্ঞাটি সহস্র বছরে বদলে গিয়েছে, সেই সাথে স্রষ্টা বা ঈশ্বরের ধারণাটিও৷ আজকের দিনে অনেকে হয়তো স্বীকারই করবে না দৃশ্যতঃ এমন একটি বহুঈশ্বরবাদী ধর্মে বিশ্বাসী হবার পরও ইব্রাহিমের উচ্চ আসন-বিষয়ে কোরআনে কোন সংকীর্ণতা নেই৷
বলো: না, বরং অনুসরণ করো ন্যায়পরায়ন ইব্রাহিমের ধর্ম (কোরআন ২:১৩৫)
বর্তমান কালের মুসলমানদের জন্য ইব্রাহিমের প্রতি কোরআনের অকুণ্ঠ সমর্থন খুবই তাত্পর্যপূর্ণ৷ ইব্রাহিম বহুঈশ্বরবাদী ছিলেন এই ঐতিহাসিক সত্যটি আমরা যদি গ্রহণ করি, তাহলে আমরা ইব্রাহিমের প্রশংসাপূর্ণ বহু আয়াত থেকে ইসলামের একটি উদার ব্যাখ্যার ত্রে খুঁজে পাই৷ এটা দণি এশিয়ার প্রেেিত খুবই প্রাসঙ্গিক, যেখানে মৌলবাদী মুসলিম নেতারা বহুঈশ্বরবাদী হবার কারণে নিয়মিতভাবেই হিন্দু ধর্মের সমালোচনা করেন৷
আরও সাধারণভাবে, ইহুদী-খ্রিস্টান ও ইসলামী একেশ্বরবাদ একেবারে পৃথক ধমর্ীয় ভাবধারা থেকে বিকশিত হয়েছে, এই ঐতিহাসিক সত্যটি মেনে নিলে অন্যকোন ধর্মকে একেশ্বরবাদী না-হবার জন্য সমালোচনা করা যায় না৷ এটা আমাদের সহায়তা করে কোরআনীয় একটি ধর্মতত্ত্ব গড়ে তুলতে, যা অন্যসব ধর্মের প্রতি ঐশী-প্রেরণাযুক্ত ধর্মমতের উপযুক্ত অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও উপলব্ধিপূর্ণ, সেগুলোকে যতই ভিন্ন মনে হোক না কেন৷ নীচের আয়াতগুলো এেেত্র প্রাসঙ্গিক:
সব জাতির জন্যই রয়েছে প্রেরিত পুরুষ৷ (কোরআন ১০:৪৭)
প্রতিটি জাতির প্রতি আমরা পবিত্র আচার-কৃত্যাদি নির্ধারণ করেছি যা তাদের পালন করতে হবে৷ (কোরআন ২২:৬৭)
আর তোমাদের প্রতি আমরা সত্যপূর্ণ ঐশী বাণী প্রকাশ করেছি, যা এর আগে প্রেরিত পূর্বের ঐশী বাণীগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করেছে... সকলের জন্যই আমরা পবিত্র আইন ও সঠিক পথ নির্ধারণ করেছি৷ আল্লাহ চাইলে তোমাদের একটিমাত্র জাতি বানাতে পারতেন৷ কিন্তু তা তোমাদের তিনি দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীা করতে পারেন (তুমি যা, তিনি তোমাকে তা বানিয়েছেন)৷ কাজেই শুভ কাজে নিজেদের মাঝে প্রতিযোগিতা কর৷ আল্লাহর কাছেই তোমাদের সকলকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে, আর তিনি জানাবেন তোমাদের মাঝে পার্থক্যটা কি ছিল৷ (কোরআন ৫:৫১)
উপরোক্ত অংশটি দৃশ্যত এটাই প্রতিপাদন করে যে, পৃথিবীতে আমরা ভিন্ন ভিন্ন যে ধর্মবিশ্বাসগুলো দেখি, হতে পারে সেগুলো জগত্ নিয়ে বৃহত্তর একটি ঐশী পরিকল্পনারই অংশ৷ কিভাবে আমরা জানব যে এর সবগুলোই ভিন্ন ভিন্ন জাতির প্রতি উদ্দিষ্ট 'পবিত্র আচারবিধি' নয়, প্রতিটি ঈশ্বর-আদিষ্ট 'নির্ধারিত পথ' (আরবীতে সিরাত, শরিয়া শব্দটিও একই উত্স থেকে এসেছে)-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়? আমাদের কাছে এদেরকে ভিন্ন রকম মনে হতে পারে, মনে হতে পারে অদ্ভুত, কিন্তু ইব্রাহিমের বহুঈশ্বরবাদিতাও আমাদের তাই মনে হতো৷ কিন্তু কোরআন ইব্রাহিম-এর বিষয়ে স্পষ্ট ইতিবাচক; কাজেই তার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত কোনো ধর্মের সমালোচনা করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে৷ উপরোক্ত বিষয়গুলো পরিষ্কার হলে যে-কোন ধর্মের সমালোচনার একটি উপায়ই বাকি থাকে, সেটির ভিত্তি হলো তার অনুসারীদের 'সত্কর্ম'৷ এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলাম অন্য ধর্মের প্রতি কেবল সহনশীলই হয়েই ওঠে না, বরং তাদেরকে সঠিক উপলব্ধিও করতে পারে৷
এই আলোচনার আর একটি কৌতূহলোদ্দীপক ফলাফল হলো, সম্পূর্ণ ভিন্ন ইতিহাস সত্ত্বেও ইহুদী-খ্রিস্টান-ইসলাম ধর্মকে বহু দিক দিয়ে হিন্দু ধর্মের মত মনে হওয়া৷ উভয়েই হাজার হাজার বছর আগে বহুঈশ্বেরবাদী ধর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করে এবং একেশ্বরবাদের দিকে অগ্রসর হয়৷ ইসরায়েলে এটা দশ হাজার বছর আগে ঘটে জিহোভার মাঝে এল ও বাআল দেবতার অন্তভর্ুক্তির মধ্য দিয়ে৷ ভারতে এটা ঘটে এক শতাব্দী আগে ব্রাহ্ম সমাজের মাধ্যমে৷ যার একটি ফল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত কবিতা ও গানগুলো এমনি মাত্রায় একেশ্বরবাদী যে, বাংলাদেশের গির্জাগুলোতে সেগুলো প্রার্থনা সংগীত হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে৷