ঘুমরাতের বিনিদ্র নত্র
দীলতাজ রহমান

বহুদিন পর৷ জানালায় এসে দাঁড়িয়েছি৷ খণ্ড খণ্ড রঙে আকাশ সমাকীর্ণ৷ কার্নিশছোঁয়া আকাশ কখন উড়ে গেলো এতো দূরে? জানালা গলানো ফালিফালি আলোর যে কণা খুঁটে হৃদয়ে-মননে সঞ্চয় করে রাখতে চেয়েছি, আজ সে ভাণ্ডারও মনে হচ্ছে শূন্য, ফাঁকা৷ উড়াল দিতে ইচ্ছে করে৷ আকাশের দিকে৷
মাথাটা শূন্য ঠেকে৷ সার্সির নজর ছেড়ে ভেতরে ঢুকি৷ জমকালো ভারি পর্দার আড়ালের অভ্যস্ত অন্ধকারই বোধ হয় আমাকে টেনেটুনে ঠিক করলো অবশেষে৷ জানালার বিভ্রম কাটিয়ে টের পাই, ভালো আছি! আনন্দ তো দাওয়ায় এসে বসে আবার উড়ে চলে যাওয়া এক অস্থির পাখির নাম৷ তাকে বাঁধতে বাবুই-এর মতো খাঁচা তো গড়িনি৷
মাটির টান আমার প্রচণ্ড৷ নদী-নালা, মানুষদের বসতি, সেখানেই মন ব্যাপ্ত, এবং সে-ই যেন আমার বিলাসিতা, তবু এই বিলাসিতাই উপহার দিয়েছে দম বন্ধ হয়ে আসা কিছু স্মৃতি আর কষ্ট৷
কিসের কষ্ট? খুঁজে খুঁজে বুকের একেবারে ভেতর থেকে পাথরখণ্ডটি খুবলে ছাড়াতে গিয়ে আবার তাতে আটকে গেছি কতোবার৷ ইদানীং শৈশবের সেই খালটি আবার আমাকে পেয়ে বসে৷ দৌড়াতে দৌড়াতে ক্রমে একদিন ওটা অনেক দূরে ফেলে এসেছিলাম৷ এখন বুঝতে পারছি, ও আসলে আমার হাতই ছাড়ে নি! শৈশব থেকেই আমার তর্জনীতে বাধা ওর পাঁচ আঙুল৷
পাড়াপড়শির ছেলেমেয়েদের কেউ কোনোদিন আমার খেলার সাথী হয় নি৷ সাধারণত ভর দুপুরে এরা মাঠের রাজা-তস্কর৷ আমি অবশ্য এসবও পারতাম না৷ কোনো খেলায়-ই আমি পারঙ্গম ছিলাম না৷
একদিন ওই ছেলেমেয়েগুলো জোট পাকাচ্ছে দেখলাম৷ কোথায় ফুল ফুটেছে, ওরা সেখানে যাবে৷ একদিন তো ওদের দলে ভিড়ে বাড়ির পিছনে কবরস্থানে গিয়েছিলাম৷ বিরাট এলাকাজুড়ে পাঁচিল তোলা৷ এরমধ্যে দু'চারটি কুকুরের বিচরণ চোখে পড়লো৷ শেয়ালের প্রি ছুট দৃষ্টির গতিকে হার মানিয়েছে৷ নতুন কবর ঝোপঝাড় ফুঁড়ে করুণ চোখে তাকাচ্ছিলো! ক'জন লোক আবার ঘুরে ঘুরে জায়গা খুঁজছে, চটা দিয়ে জায়গায় মাপও নিচ্ছে৷ আর তাতেই বুঝেছিলাম_ধারেকাছে কেউ মরেছে৷ মনটা কেমন করে ওঠে৷ ফিরে চলে যেতে ইচ্ছে করে৷ কিন্তু সঙ্গের ওরা স্থিরচিত্ত৷ অপ্রতিরোধ্য একটানে জড়িয়ে আমিও দেখি, আতাগাছ, কামরাঙা, লিচু, জামরুল গাছে পুরনো কবরগুলো ছাওয়া৷ তবে গাছগুলোর কোনোটিই অতো বড় নয়৷ সবে চারা৷ ফল ধরলে যে কেউ হাত দিয়েই পাড়তে পারে৷ পাড়েও৷ ওদের আনাগোনা তাই ওখানে অতো স্বচ্ছন্দ এবং প্রায় নিত্যই যাতায়াত৷ প্রতিটি কবরের ওপরে যত্ন করে কবরের বাসিন্দার স্বজনেরা এই গাছগুলি লাগিয়ে গেছে নিশ্চয়৷
একদিন শিউলি, বেলি, আর গন্ধরাজ তুলতে কার যেন দুটো পা-ই ঢুকে গিয়েছিল ভাঙা কবরের ফোকরে৷ সবাই মিলে তাকে টেনে দাঁড় করিয়েছিল৷ আমি ছাড়া ওদের আর কারো এতে গায়ে কাঁটা দেয় নি৷ আমি কোনো কাজেই ওদের সহযোগী ছিলাম না৷ বরং কৌতূহলেই পিছু পিছু ছুটতাম৷ সেদিনও জানতাম এমন মুষল বৃষ্টি শেষে কবরস্থানে ঢোকা, ওদের ছাড়া আর কারো সাধ্য নেই৷ পাতা থেকে টপটপ জল পড়ছে৷ ফোঁটায় ফোঁটায় জল পতনের সেই দৃশ্য আজো প্রাণের কোঠায় এমন জীবন্ত হয়ে আছে, বাদামের বড় বড় পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে অন্তরকে বিগলিত করে৷
আমাকে কেউ বলে নি, তবু আমি বাসা থেকে একটু দূরের হাঁটুজলের চড়াই-উত্‍রাই-এর একটি বেশ বড় খাল পেরিয়ে চলে গেলাম৷ ওরা ওই থকথকে খালের ভেতর দাঁড়িয়েই পা ঘষে-মেজে ধুলো৷ তাতে কারো পায়ে কাদার লেশমাত্র রইলো না৷ অথচ আমার হাঁটু অব্দি কাদা৷ ওরা সব দাসী-বাঁদী, চাকর-নফরের সন্তান, আমি ভদ্রলোকের৷ আমার বাবার সামনে যে সে লোকের দাঁড়ানোর জো নেই৷ আমার মায়ের কতো গুণ৷ আশপাশের বাড়ির বউ-ঝিদের জরুরি চিঠি লিখে দেয়া থেকে শখের রুমালে ফুল এঁকে তাতে আবার সুতোর রঙ বুঝিয়ে দিতেও তার কোনো জুড়ি-ই ছিল না!
পৃথিবীতে এমন সাজানো বাগান থাকে? তাতে এতো ফুল ফোটে, সেদিন পর্যন্ত এ আমার জানা ছিল না৷ কাঁটাতারে ঘেরা এক নির্জন, বিশাল বন্ধবাড়ির সাজানো বাগান সেটা৷ বাইরে থেকে একঝলক দেখেই বিস্ময়ে ওদেরকে মনে মনে ধন্যবাদ দিই, এমন স্বর্গভুবনের খোঁজ রাখার জন্য৷ ডোরাকাটা বাঘের মতো গেটে ঢাউস তালা৷ ভেতরে বাংলো টাইপ বাড়ি৷ একেবারে নতুন৷ এখনো বসবাস শুরু হয় নি বোঝা যায়৷ তারের ফাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়ে অাঁচড়ে সবার চেয়ে আমিই বেশি বিত হলাম৷ মায়ের মুখখানা মনে পড়ে৷ ভয়ে গা ছমছম৷ আমার আর ফুল ছিঁড়তে না-পারার দুঃখ নেই৷ দুই হাতে দু'টি গোলাপের কথা মনে আছে৷ যার ঘ্রাণ আজো আমার আত্মার গ্রন্থিতে বাঁধা৷ সেই দু'টি গোলাপের সঙ্গে আমি আর কোনো ঘ্রাণ মিলাতে পারি নি আজো৷ নিজেকে টেনে হিঁচড়ে, অচেনা পথে ওদের সঙ্গে পা মিলিয়ে গড়ানো বিকেলে সেই খালটির কাছে এসে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো৷ খাল-উপচানো পানি৷ ভাটা-জোয়ারের খেলা৷ ওরা সবাই ভরা খাল দেখে নির্বিকার মুখে প্রি গতিতে যে যার বাড়িমুখো অন্যপথে ফিরে গেলো৷ বুঝলাম ফেরার পথ ওদের চেনা৷ কিন্তু আমি জানতাম ওদের কারো বাড়ি বা বাসা আমাদের বাসার কাছে নয়৷ তাই কারো পিছু নিলে লাভ হতো না৷ ওদের মায়েরা ঠিকে ঝি'এর কাজ করে সন্ধ্যায় যে যার বাড়িতে ফিরে আসে৷ ওদের আনাগোনাটা শুধু দুপুরে আমাদের আঙিনার কাছে জমাট হতো৷ ভোর থেকে শুরু হয় একজন একজন করে আসা৷ তারপর তাদের পুতুল বিয়ের পাকা কথা, খুনসুটি থেকে তালাকের হেস্তনেস্ত খেলাও হতো ওই প্রতিদিনের একবেলার ভিতরে৷



ওই খাল পেরোলেই আমাদের বাড়ি৷ ওটুকু আমি চিনে যেতে পারবো৷ পাড়ে বসে ঠকঠক কাঁপছি৷ সামনে পিছনে কোনো পথ নেই৷ পিছনে বিরান মাঠ৷ সামনেও৷ তবু কিছুদূর হেঁটে লোকালয়ে ঢুকলেই বাড়ি চিনতে পারবো৷ শুধু কেউ আমাকে একটু পার করে দিক৷ যদিও মনে হচ্ছিলো সাঁতার জানলেও ওই তোড় ঠেলে নদীতে নিয়ে ফেলবে৷ রূপসা নদী৷ সাঁতার জানি না৷ যে কোনোভাবে পারের অনন্ত অপো চলছে আমার৷ প্রিগতিতে ছুটেচলা কচুরি-শ্যাওলার তোড় সৃষ্ট পানির দিকে তাকিয়ে বলি, 'পানি ফিরে যা! আমাকে একটু যেতে দে! আমি আর আসবো না, ভালো হয়ে যাবো, দেখিস ভালো হয়ে যাবো৷'
হঠাত্‍ খসখসে হাতের চড়-থাপ্পড়ের মতো স্পর্শে, ধমক-ধামকের চড়াস্বরে আমি প্রাণ ফিরে পাই৷ ধনুকের মতো বাঁকা, শীর্ণ এক কায়া আমার মুখোমুখি দাঁড়ানো৷ পড়ে-থাকা আমাকে সে মাটি থেকে হেঁচকা টানে তুলে বললো, 'এই ছেমড়ি তোর বাড়ি কোনহানে?'
'এই তো খালটা পার হলে একটু দূরে,' নিজের অজান্তে হাত জোড় করি৷
'এহানে আসলি কেমনে?' বুড়ির কণ্ঠে চৈত্রের ঠা ঠা দুপুর৷
আমার মনে পড়ে না, অথবা কান্তিতে গলা দিয়ে স্বর ফোটে নি৷ আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে নূ্যব্জবুড়ি থুত্থরে কণ্ঠে বললো, 'তোর নাম কি, এ্যা?'
'আমার নাম নেই৷' এই প্রথম নামের প্রচণ্ড অভাব বোধ করি৷ আমার কণ্ঠ বুঁজে আসে৷ তবু কান্নার ভাবটা সরে যায়৷ বুড়ির পথ উল্টো৷ পুটুলি দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না যে ওটা ভিরে৷
আমাদের গ্রামের বাড়ি দেখতাম প্রায় প্রতিদিন এক বুড়ো ভি েকরতে আসতো৷ তার বাড়ি আমাদের উঠোনের কোনায় দাঁড়ালে দেখা যেতো৷ বুড়োর দু'টি মেয়ে সম্পর্কে বাড়ির মেয়েমহল ফিসফিস করে কি সব বলতো৷ আশপাশের কোনো কোনো ঝি-বউয়ের চোখে আমি পানি দেখেছি ওই মেয়ে দু'টিকে কেন্দ্র করে৷ প্রতিদিন তাদের সম্পর্কে শুনে শুনে আমার কৌতূহল জন্মায় মেয়ে দু'টির প্রতি৷ যেখানে বউ স্বামীকে বিছানায় ধরে রাখতে পারে না, সেখানে মেয়ে দু'টি পাড়ার ছেলে-বুড়োকে একসঙ্গে টানে কি করে? একদিন খুব ভোরে বরই কুড়ানো ফেলে, রঙিন স্যান্ডেল হাতে করে চষা জমির ভেতর দিয়ে ওই বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করেছিলাম৷ কিন্তু ঘরে ঢোকার আগে ডোবার মতো একটা পুকুরে পা ধুয়ে স্যান্ডেল পরে উঠোনের কোনায় দাঁড়ালাম৷ কী জীর্ণ একখানা ঘর! শণ খুলে পাঁজরের মতো চালে বাঁশের চটার ফ্রেম দেখা যাচ্ছে৷ বাঁধনগুলো খুলে যেতে প্রায় উন্মুখ৷ চোখের সামনে প্রকাশ করে দিচ্ছে নিভানো চুলো, হাঁড়িকুড়ি, বালিশের তেলচিটে, কাঁথার ঝুল৷
আমি নিজের বুকের মাংস খুবলে ধরি৷ কী বীভত্‍স! এখান থেকে আমাদের বাড়ি বেশি দূর, নাকি আমাদের বাড়ি থেকে এই বাড়ি? ফেরার ইচ্ছেটা নিয়ে ভুল খেলে তালগোল পাকাতে পাকাতে কানে ভেসে আসছে ফ্যাসফেসে কণ্ঠস্বর, 'মাগিরা, পাড়ার বিটাগে নিয়ে দাপাই বেড়ায়৷ আমার খতিডা শিলাই হরে দেয় না...৷'
চৌদ্দ ও আঠারোর দু'বোন হানুফা, বাসিরার দ্বৈত কণ্ঠ একই মাত্রায় উচ্চস্বরে চড়ে, 'বুড়ো, পারলি তুইও লাইন দিস্... হারামীর বাচ্চা! ভাতার জুটায়ে দিতি পারলি নে, তো পাড়ার মানুষের সাথে লাইন দেবো না তো কি? নিজির বউরি সহালেই পাঠাইছিস বিক্কা অরতি, মুরদ নাই কামাই'র...৷'
আমি ঢুকে পড়ি ওদের ঝাঁপখোলা দরজার কথার ভেতরে৷ আমাকে ওরা তিনজনই চেনে৷ কিন্তু ছোট বলে কোনধরনের খাতির-যত্ন দূরে থাক ওদের কথার প্রসঙ্গও পাল্টালো না৷
বুড়ো গড়গড় করে, 'তোর মা আর এক খানকি, আমার না অয় গায়ে জোর নাই, সে তো পাইরতো পিটাইয়া তোগে ভাল হরতি৷'
মেয়েরা দু'জনেই বুড়োকে ক'ঘা করে মেরে বেরিয়ে গেলো৷ বুড়ো বদ দোয়া দিচ্ছে৷ আমাকে সে খেয়াল করছে না দেখে কিছুটা অবাক হই৷ যে বুড়ো আমার হাতে ভি েপেয়ে কান্নাচোখে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, সে এখন আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না! কিন্তু ওই ঘর, ওইটুকু আঙিনা, পেয়ারাগাছে ফুল, আমাকে কী মায়ায় টানছে! মেয়ে দুটোকেও আমার মন্দ লাগে নি৷ কেমন তুড়ি মেরে সবার পরোয়াকে উড়িয়ে চলে গেলো৷ শহুরে বাসিন্দা আমি, এই বাড়ি পর্যন্ত ছুটে আসা আমাকে পাত্তা দিলো না? এতো জোর ওরা কোথায় পায়?
আরো এগিয়ে যাই৷ বুড়োর সেলাইয়ের জীর্ণ কাপড়খণ্ডে হাত রাখি৷ তার ব্যর্থ চেষ্টা দেখে আপ্লুত হয়ে বলি, 'আমি সেলাই করে দিই?'
'দেও!' বলে বুড়ো ঝুলির আকৃতির কাপড়খানা আমার দিকে বাড়িয়ে নিজে হাত-পা টেনে তুলে কিছুণের জন্য বেরিয়ে গেলো৷ ছোট্ট বালিশের কভার ভেবে যা সেলাই করলাম, পরে বুঝেছি, ওটা ওই ছুরত আলি ফকিরের ভিরে খতি৷ তবু সেই প্রথম আমি একটা কিছু সৃষ্টির আনন্দে পরম বিভোর হয়েছিলাম৷ তাই বুঝি আজো একটু একটু করে যা কিছু অর্জনের চেষ্টা করি, নিজেকে এক ভিাপাত্র ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না৷ সেদিন দেরিতে ঘরে ফেরার জন্য যদিও মায়ের হাতের দু'চার ঘা কপালে জুটেছিল, তবু বুড়োর প্রসন্ন মুখখানা আজো আমাকে স্বস্তি দেয়৷
বুড়ির হাতের ঠিক সেই রকম থলিতে যা-ই হোক, তা পরিমাণে অল্পই৷ সেটাকেই সে যরে ধনের মতো আগলে বললো, 'তয় যাবি ক্যামবাই?'
আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলি, 'জানি না! তুমি আমাকে দিয়ে আসো৷'
সেই খতি সেলাইয়ের পুণ্য যেন আমার ভেতর এসে ভর করে৷ এবার আমি আর একটুও ভয় পাই না৷ আমি জানি বুড়ি আমাকে ফেলে যেতে পারে না৷ প্রয়োজনে এখানেই সারারাত আগলে বসে থাকবে৷ কিন্তু বুড়ি বলে, 'এহন তো যাওয়া যাবি না৷ ওদিকি তাও মেলা দূরি, এট্টা বাঁশের সাঁকু আছে, কিন্তুক আমি তো চোহি দেহি না, দিনিরব্যালাই দেহি না৷ আমারেও কোনো মরণে পাইছোলো, এদিকদি আইছিলাম৷'
শেষে 'আ-প-দ,' বলে বুড়ি আমার হাত ধরে টান দেয়, বলে, 'চল্ আইজ রাইত আমার কাছে থাকপি৷'
এপাশে বুড়ির হাত, ওপাশে বাড়ির টান, সেই যে আমি খণ্ড হয়েছিলাম, আর নিজেকে একত্র করতে পারি না৷ বাড়ির শাসন-বারণ ছিল অমানবিক৷ শিশুর বসবাসের অযোগ্য৷ তার ওপর আবার শিশু হলেও তো মেয়ে! মেয়ের একরাত বাইরে কাটানো৷ হানুফা, বাসিরার নিষিদ্ধ জীবনের কারসাজির অনেকখানি ভেদ আমি বুঝে গেছি তখন৷ কী বেপরোয়া টান দু'জনের চালচলনে৷ নতুন বউ একা বিছানায় তড়পায়৷ তাকে ফেলে নওল স্বামীরা পর্যন্ত বেরিয়ে আসে সেই টানে৷ তারপর একসময় ঘরে ফিরে যায়৷ আর ওসব বুঝে ওঠায় আমার যে কোনো দোষ ছিল না, তা বুঝেছিলাম, বড়রাই ছোটদের চোখের পর্দা খুলে দেয় সবকিছু বুঝে উঠতে৷
অনেকখানি পথ হাঁটতে হলো৷ নৌকোর ছইয়ের আকৃতি অসংখ্য খুপরি৷ ক'খানা গুণতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি৷ রাতে বুড়ি তার খুপরিতে ফিরে গিয়ে, একাই চুলো জ্বালিয়ে ভাত রাঁধলো৷ পাশের খুপরিতে ওর ছেলে, ছেলের বউ, নাতিপুতি৷ কেউ খোঁজও নিলো না৷ অথচ তারা সবাই হামলে পড়ে গোগ্রাসে ভাত খাচ্ছে৷ বুড়ি এমনিতে কুঁজো, তার ওপর কুয়ো থেকে পানি তোলা, খড়কুটো গোছগাছ করে রান্না করা, এতোকিছুতে কোথাও ওর কান্তি নেই৷ খাওয়াদাওয়া সেরে সবাই এসে দরজা ঘিরে ধরলো৷ যেন আমি বুড়ির ভিরে দান৷ আমাকে নিয়ে দরজায় তাদের একটার পর একটা প্রশ্ন৷ বুড়ি কাঁপা কাঁপা হাতে আগুনে কাঠ ঠেলতে ঠেলতে সবার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে, 'জ্বেন-বুত খালের কাছে ফেইলে চইলে গেছে৷ আমি যেইয়ে পড়াতে রই.ে.. না অলি চুবোয়ে মারতো৷'
জি্বন-ভূতের প্রসঙ্গটি আমি লুফে নিলাম৷ সারারাত ঘুম এলো না, জি্বন-ভূত পাকিয়ে গল্প ফাঁদতে গিয়ে৷ আগে থেকে প্রেমে জড়িয়ে-থাকা মেয়েকে জোর করে অন্যখানে বিয়ে দেয়৷ তারপর অবাধ্য টান ছিঁড়তে না-পেরে একদিন কাঁচা বাসর ছেড়ে মেয়ে পালায়৷ মা-বাবা, জ্ঞাতিগোষ্ঠী কোন একদিন সে-মেয়েটিকে খুঁজে পেলে স্বামীর ঘরে পুনরায় ঢোকানোর উপায় ওই জি্বন-ভূতের মোম আছর৷ মেয়েকে জি্বনে নিয়েছিল, শুনলেই কেমন একটা সমীহভাব জেগে ওঠে সাধারণের চোখে৷ বাড়ি ফিরে হারিয়ে-যাওয়ার বিপদ সামলানো যায়, কিন্তু কেউ কেউ যে আবার বলতো, 'জ্বেন-বুত না কচু, নাঙের সাতে ডলাই বেড়াইছে, এহন জ্বেনের উছিলা৷'
কিন্তু ছেলে-বউ, নাতি-পুতি তাদের কারো প্রতি বুড়ির কোনো অভিযোগ ছিল না কোনো, ভেবে আমি আশ্চর্য হয়ে যাই৷ এর মধ্যে পুঁচকে একটা এসে রান্নারত বুড়ির গলা পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বললো, 'দাদি, পয়সা বিক্কা পাইস নাই?'
বুড়ি অকপটে বললো, 'একআনা পাইছি, কিরাসিন ফুরোই গ্যাছে, ও পয়সা আমার নাগফে৷ আরেকদিন পাই যুদি, তোরে দেবো নি৷'
নুন আর মরিচ দিয়ে বুড়ি আমাকে ভাত খেতে দেয়৷ কেউ সারাদিনের কর্মকান্ত বুড়ির দিকে একটু তরকারি এগিয়ে দিলো না৷ তবু টিমটিমে দেউটির পাশে ফুটো থালায় আধফোটা ভাতগুলো সব সাবাড় করে দিলাম৷ আজো সে-ভাতের স্বাদ মুখে লেগে আছে৷ বৃষ্টিভেজা কবরের ফুলের ঘ্রাণের মতো৷
সকালে অনেকগুলো চোখের সামনে পান্তা খেতে আমার কোনো জড়তা লাগছিলো না৷ বুড়িকে আমার জনম জনমের পরমাত্মীয়ের মতো মনে হচ্ছিল৷ চলে আসার সময়ে আমি বারবার ফিরে তাকাচ্ছিলাম, যেন সে আমার অর্ধেক দুনিয়া৷ আমাকে ওই খুপরিঘরের একরাতের স্মৃতি আমার বহুরাতের আশ্রয়ের ঘরখানার চেয়ে কম কাতর করে নি৷ বুড়ি আমাকে না নিয়ে এলে আমি কি মরে পড়ে থাকতাম না? বুড়ি দরজার ঝাঁপ বাঁধার সময়ে আমি তার শূন্য খতিটি তার মতো ভঙ্গিতে ধরে রেখেছিলাম৷ বুড়ি আমাকে খালের কাছে আনার আগে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়িগুলো এঁকেবেঁকে ঘুরে এলো ভি েমাগতে মাগতে৷ ততোণে শূন্য থলেটি আমার কাছেই ছিল৷ প্রথম বাড়ির ঢালে উঠতেই বুড়ি সতর্ক হলো, আমার হাত থেকে থলেটি একটানে খসিয়ে নিল৷ বুড়ির সঙ্গে এতোটা সময় হেঁটে মনে হচ্ছিলো ওর লজ্জাঘেন্না কিচ্ছু নেই৷ ভি েদেবো না বল্লে আর সে দাঁড়িয়ে ঘ্যাংগায় না অন্য ভিখিরিদের মতো৷ আমাদের বাড়ির কাছের সেই ছুরত আলী ফকিরকে তো দেখেছি, ভি েনা-দিয়ে উপায় থাকতো না, না-পাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়েই থাকতো৷ অল্প দিলে দাঁত খিঁচিয়ে বিড়বিড় করে গেরস্ত'র চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়তো৷ আবার চারটে বেশি দিলে সাত আসমান নামিয়ে এনে দিতো চাইতো উঠোনেই৷ বুড়ি সেরকম না হওয়ায় আমার র৷ে আমার সম্পর্কে, কেউ কিছু জানতে চাইলে বুড়ি উত্তর দিয়েছিল, 'জ্বেনে ওয়ারে মানষির বেশে নিয়া রওনা দিলি আমি ফিরাইয়া রাকছি৷'
বউ-ঝি'য়েরা আশ্চর্য হয়ে বলেছে, 'এই মাইয়ে, তোর নাম কি, এঁ্যা?'
আমি নাম নেই বলাতে বুড়ির ভাষ্য সবখানে উত্‍রে গেছে৷
ছুটে আসতে পথে ঢলঢল করে দুলছিল কুঁজো বুড়ির স্তন দু'টি৷ অবিরাম এই দুলুনিতে আমার বুকে অস্বস্তি হচ্ছিলো৷ পুরো এলাকাটা আমার অচেনা৷ কোথাও কোথাও পাটের তে বাতাসে দুলছিল ঢেউ তুলে৷ হাত বাড়িয়ে ছুঁতে যাবো, অমনি বুড়ির হেঁচকা টান৷ সেই এলাকায় আমরা কোনখান থেকে এসেছিলাম মনে নেই৷ শুধু মনে পড়ে বিভ্রমমতি আমাদের বাবার জন্য আমাদের বাসা পাল্টাপাল্টিটা খুব দ্রুত হতো৷ ঘুরতে ঘুরতে বুড়ি খালের কাছে একজায়গায় এনে দাঁড় করালো, বললো, 'ক, তোগে বাসা কোনদিকি?'
সেটা কালকের জায়গা ছিল কিনা বুঝবো কি করে? এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে হঠাত্‍ চোখে পড়ে আমার হারানো কালকের গোলাপ দু'টি শুকিয়ে কালসিটে হয়ে পড়ে আছে৷ খালে তখন গতকাল দুপুরের মতো তিরতিরে হাঁটুপানি৷ আমি ফুল দুটো কুড়িয়ে নিয়ে ছুটে পানিতে নেমে পড়ি৷ বুড়ি আমাকে ভয় দেখায়, তাও ভূতের, বলে, 'ও মাইয়া, কাইলকা তো পারিনেই আমার জন্যি, আইজক্যা চুবইয়া বুডবডি ছুটোয়ে দেবেনে!'
বুড়ির সব মহিমা এরি মধ্যে আমার কাছে নষ্ট হয়ে গেছে বাড়িয়ে ভূতের গল্প বলায়৷ কিন্তু পথ চলার শক্তিতে এখনো কম যায় না সেও৷ ঝুলন্ত এক স্তনে আরেক স্তন বাড়ি খাচ্ছে, দৌড়ের মতো তবু হেঁটে আমার সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে এলো৷
এই তো আমাদের বাড়ি! তিন রুমের বারান্দাসহ লম্বা একখানা ঘর৷ লাগোয়া রান্নাঘর৷ আরেক পাশে বাথরুম৷ টিউবওয়েল বেড়ার বাইরে৷ লাইনধরে পানি আনতে হতো৷ এবং সে-কাজটি আমাকেই করতে হতো৷ বাড়িটির খোলা তিনপাশে বাঁশের তৈরি বেড়া দিয়ে তিনদিক ঘেরা৷ দেশের বাড়িতেও আমাদের ঘরখানা স্কুলের মতো লম্বা ছিল৷ কিন্তু বারান্দা ছিল না৷ তবে উঠোন ছিল বিরাট৷ ঢালের জমি, দূরের পুকুর যেনো কৈ মাছের মতো কানকোয় হেঁটে হেঁটে চলে যেতো অন্যের দখলে৷ চাচা জালিয়াতি করে নিজের নামে লিখে নিতো মাঠের অংশও৷ আমাদের দাদার আমলের দণিমুখী সে ঘরকে উত্তরের ঝড় এসে দেিণ নত করে রাখতো৷ আবার দেিণর ঝড়ে উত্তরে অবনত হতো৷
যখন শহরে থাকতাম তখনো ছেড়ে-আসা সুবিশাল ঘরের ওই ভার আমার মনজুড়ে চাপখেয়ে থাকতো৷ আবার অন্যকোনো ঋতুতে পুরনো সে-চালের ফুটো দিয়ে যে ঝলক এসে পড়তো কাঁথা-বালিশে, লুটেপুটে তাই দিয়ে যেন অলিন্দ সাজিয়েছে হৃদয়ের ঝালর৷ ঝড়ের গতি বাড়লে আমরা ছোটরা খাটের নিচে ঢুকে পড়তাম৷ ইট দিয়ে উঁচুকরে-রাখা খাটখানা ঝাঁকি দিলে বুকের ভেতর হিম হয়ে আসতো, যদি ঘরের চাপে খাট ধসে যায়?
বজ্রপাত ঝড়ের গতি থিতিয়ে আনে৷ দু'চারটি বজ্রপতনের শব্দও কাউকে যে নতুন জীবনের স্বাদ দিতে পারে, এরকম নতুনতর স্বাদে হামলে পড়ে ভিজে কতোবার ছুটে বেরিয়ে গিয়ে আগে দেখতাম ঘরখানা সোজা হয়ে উঠতে পেরেছে কি না৷ জমিদারী উত্‍পীড়ক মেজাজের আমার বাবা তবু ভাঙা বুকের পৈত্রিক ওই ঘর সংস্কারের প্রয়োজন কোনোদিন মনে করলেন না৷
সেদিন আহত ফড়িং-এর মতো বাড়ি ঢুকে পড়ে দেখি, আমাদের ভাড়াকরা সেমিপাকা বাড়িটি পাড়া-পড়শিতে ভরে গেছে৷ মা বিলাপ করে কাঁদছেন৷ আমি ছিলাম মৃত সন্তান জন্ম-দেয়া মায়ের প্রথম জীবিত মেয়ে৷ তারপর তো পরপর আরো চার মেয়ের মা হয়েছেন আমার মা৷ তবু শুধু আমার নাম রাখেন নি অকাল মৃতু্য ভয়ে৷ মামার বাড়ি গেলে আমি রাবুর মেয়ে নামে পরিচিত৷ বাবার বাড়ি জাফরের মেয়ে৷ শহরে ভাড়া বাসায় এই, ওই, হেই বলে সমবয়সীরা সম্বোধন করে৷ তো, মা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরতে গেলেন আরো রেগে কাঁদবেন বলে, বাবা তখন ছোঁ মেরে আমাকে সরিয়ে নিয়ে বললেন, 'বল কোথায় ছিলি? রাতে কোথায় ছিলি?'
সংসারের মধ্যে নিজের গুরুত্ব অনুধাবনের এমন একটা ণ বাবার শেষের প্রশ্নটি গুড়িয়ে ভেঙে দিলো৷ নিখোঁজ হয়ে-যাওয়া একটা শিশুর আবার রাত আর দিনেরও পার্থক্য? বুড়ি মওকা বুঝে শুরু করলো, 'ও বাবা, মাইরো না৷ ও আমারে কইছে, হঠাত্‍ বোলে গরম বাতাস আইসে ওরে দূরি খালের মাথায় বড় নদীডার দারে উড়োয়ে ফেলায় যায়...৷'
অথচ এই বুড়িকে খালের ওপারে ফেলে আসতে চেয়েছিলাম, ভাগ্যিস ও লাফিয়ে আমার হাত জাপটে ধরেছিল৷ আসতে আসতে বলেছিল, 'পত চিইনে গ্যাছো, না? তুমার মা'র কাছতে কিছু আদাই না হরে তুমারে ছাড়তিছি না...!' একটু থেমে বুড়ি আবার শুরু করে, 'শ্যাষে আমি পাইয়ে মন্তর দি ওরে ঠিক হরিছি৷ আর এট্টু অলি নদীতি বাইসে যাতো৷ জিন্দা ফিরে আইছে সিডাই বাগ্যি!'
জি্বনের যে নিকুচি করেন আমার বাবা, সেটা আমি ভালোই জানি৷ বাবা আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, ফ্রক খুলে এই কচি শরীরে কোন্ চিহ্ন খুঁজছেন, আমি তা বুঝতে পারি৷ অতো মানুষের ভিতরে লজ্জায় আমার তখন মনে হচ্ছিলো এ কোথায় আমি ফিরে এসেছি! হানুফা, বাসিরার বাবা তার মেয়েদের সম্পর্কে যে-ধারণায় নিশ্চিত, আমার বাবা সেই শঙ্কায় ধুঁকছেন?
এক নাগাড়ে ক'দিন আড়ালে আবডালে ডেকে বাবা-মায়ের নানা প্রশ্নে আমার কাছে নতুন আরেক দিগন্ত ধরা পড়ে৷ ভাবলাম মা-বাবা হয়ে এরা যদি এমন প্রশ্ন করতে পারে তা হলে হনুফা, বাসিরার নির্লজ্জতায় অতো দোষ কোথায়?
বুড়িকে সেদিন মা পঞ্চাশ টাকা দেবেন ভেবেছিলেন, আমার জানের ছদগা হিসেবে৷ কিন্তু বুড়ি তার দরদাম আগেই কষে ফেললো৷ বললো, 'শোনো বাফুরা, আমি কাইল দুফরতে এতোুণ বিক্কে হরলি তিনপো চাইল পাতাম৷ মাইয়েডা দুইবেলা আবার দুই পো চাইল খাইচে, আমার চাইলগুনো ফিরাইয়া দেও৷ আর জ্বেন ছাড়ানোর জন্যি পাঁচশিহে৷ আমি খালি এইর জন্যি আইছি, দ্যাহো এহন তোমাগে মাইয়ে নামডা ফেরত পাইছে কি না৷ ও ওর নামই ভুইলে গেইছে৷ ওর নাম কি?'
প্রশ্ন করে বুড়ি একবার আমার মা'র আর একবার বাবার দিকে তাকায়৷ তারপর মুখে মুখে চোখ বুলিয়ে নিরুত্‍সাহিত হয়ে পাওনা বুঝে নিয়ে কেটে পড়ে৷
পরদিন সেই খেলার সাথীদের ভিড় থেকে ডাকিয়ে এনে বাবা আমার দিকে তর্জনি তুলে সবাইকে দেখিয়ে বললেন, 'আজ থেকে ওর নাম পারমিতা'৷
যেন ঢলঢল লম্বা জামার ভেতর ঢুকে পড়া এক প্রতিবন্ধী শিশু আমি৷ ক'দিন আগেমাত্র একটি দুধ দাঁত ভেঙে গেছে ভেবে রক্ত গড়ানো মুখে মায়ের কাছে এসে শুনি, আমার সাত বছর হয়ে গেছে৷ এখন অনেকগুলো দাঁত এভাবে নড়েচড়ে জানান দিয়ে পড়বে; আবার নতুন দাঁত গজাবে৷ এসব বুঝিয়ে আমার সেই বন্ধুরাই তন্নতন্ন করে ইঁদুরের গর্ত খুঁজে দিলো, ইঁদুরের মতো সরু দাঁত উঠবে এই আশায়৷ কিন্তু লাউয়ের বিচির মতো দাঁত গজাতে দেখে বুঝেছিলাম, এটাও জি্বন-ভূতের অস্তিত্বের মতো ফাও কথা৷
মা প্রচণ্ড কাব্যপ্রেমিক হওয়ায়, আমাকে পারমিতার মতো শব্দের অর্থ লিখিয়ে পড়িয়ে আদায় করে নিয়েছিলেন৷ অনেক বড় হয়েও স্কুলে না-পাঠানোর জন্য বাড়িতে পড়ে পড়ে শিতি হওয়ার চেষ্টা আমাকে পীড়িত করে৷ ঝাঁকখসা একটি পাখির মতো প্রায়ই দুপুরগুলোয় মার বালিশের তলা থেকে নরনারী পত্রিকা নিয়ে যা পড়তাম তাতে দু'চারজন স্কুল পড়ুয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে বুঝতাম, আমি পিছিয়ে নেই৷ তবু ক'বছর গড়াতে, না গড়াতে মানুষের ফিসফাস, একটি তরুণ ওই বাড়ির মেয়েটির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে, মেয়েটি একটু বের হলেই যেখান থেকে দেখা যায়, সেখানেই আটকে থাকে৷ বিষয়টি যখন সত্যি প্রমাণিত হলো, আমার মনে হতো_কল্পিত ডানাওয়ালা ঘোড়ায় সওয়ার ওই তরুণ আমাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটছে আকাশের নীল ছুঁয়ে৷ যেন স্বাদহীন, স্বার্থপর এই পৃথিবী অতিক্রম করে আমি দূর-দূরান্ত চলে যাচ্ছি৷ এই অসহ্য পরিবেশ, পরিমণ্ডল ছেড়ে আমি চলে যাচ্ছি, যেতে পারছি, শুধু এতেই যেন আমার আনন্দ৷ অধরা, অদৃশ্য, ছায়াছায়া সেই মুখ, অবয়ব আমাকে অনেক ক'টা বছর বিভোর করে রেখেছিলো! যেন ওখানেই আমার আনন্দ৷ মুঠোবন্দী বিষবিবর্জিত মৌমাছি৷
আর ওই মধুভাবে ডুবন্ত দেখে বাবা নবমশ্রেণীর ঢাউস ঢাউস একসেট বই কিনে দিয়ে হঠাত্‍ যেন চড়াই-উত্‍রাইয়ের ঢালে ধাক্কা মেরে আমাকে ফেলে দিলেন৷ হেডমাস্টারের সমীপে অনুনয় করে স্কুলেও ভর্তি করে ছাড়লেন৷ ১৯৭৬ সাল, কী অসহনীয় দশা৷ জীবনঘাতী, নড়বড়ে সেই ঘরখানার চেয়ে আমি আরো চাপে পড়ে গেলাম৷ বাংলা ছাড়া আমি আর একটি বইও বুঝি না৷ প্রতিদিন সবার পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসি৷ তবু পুরনো সেই নাম না-জানা তরুণ টানের ভীতিকর গহ্বর থেকে রেহাই পেতে এক সন্ধ্যারাতে আমাকে ঘুম থেকে টেনে একজনের হাতে সমর্পণ করা হলো৷ ক'দিনের মুখর উত্‍সবই আমাকে জানান দিলো, জীবনের এই পরিণতির নামই বিয়ে৷ জীবন্মুক্ত, খরস্নায়ু মানুষটি সংবেদিত হয়ে সহসা অনিশ্চয়তা জয় করে আমার মেরুদণ্ডে এনে দিলেন অবিচলিত ভাব৷ চলাফেরার স্বাচ্ছন্দ্য৷ গতিতে সংকল্প৷ শঙ্কামুক্তি৷ এই স্বাধীনতার জন্যই তো মাত্র ক'দিন আগেও কল্পিত ঘোড়ায় ছুটতে চাইতাম আকাশের পথে৷ একটু একটু করে উদিত বোধে তখনি উপলব্ধি করেছি_কারো জলধনু মুখের মায়া তো ছিল না সে-ছোটার নেশায়! মন আসলে পথ-ই খুঁজেছিল স্বপ্নকে ফুঁড়ে জীবনকে ব্যাপ্ত করার৷
অনায়ত্ত রশ্মির সুতোয় জ্ঞানচু তিনিই বেঁধে দিয়েছিলেন৷ নিজেকে অতিক্রম করে এগোতে আলোর সোপান এগিয়ে দিতেন তিনি৷ পৃথিবীর বুক কেটে ছুটোছুটির এতোপথ, যে পথে যাই, আজ চিনে ফিরে আসতে পারার আলোয় গড়ানো এই প্রাসাদের চৌকাঠের সেই সে স্থাপয়িতা বজ্রমণি দৃষ্টিতে সারাণ ঠিকরালেও, কখনো পারদের আয়নার মতো চিনিয়েছেন আমার দূরতম আমিকে৷ কারণ জলে উত্‍পন্নের স্পৃহায় নয়, তড়পাতে দেখেই বলেছেন কতোবার, 'তোমার তুমিকে আমার চেয়ে আজো বেশি তুমি চেনোনি!'
আজ যাবতীয় ঐশ্বর্যের মধ্যে যা নেই, তা যেন কেবল চাইনি বলেই নেই! নাহলে শ্রমে-ঘামে প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তি'র সবই তো মুঠোয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলেন৷ ঝড়দোলায়িত বাড়ির সেই জগদ্দল অনুভূতির বিশ্রুতি শুনে, প্রথমেই তিনি বহুল ব্যয়ে ভেঙে আবার সম্পূর্ণ গড়ে দিয়েছিলেন শূন্যভিটের ভয়ঙ্কর একা ঘরখানাকে৷
সাতাশটি বছর যেন জড়ানো পট, যার কাহিনী একটি ঘুমরাতের বিনিদ্র নত্রের মতো মুছে গেলো৷ শুরুটা আগে ছিলো বলেই কী এমন ব্যতিরেকী পরিসমাপ্তি! এই স্থিতিশীলতা ছাপিয়ে স্থাপয়িতাকে খুঁজে আমি আজ সেই ঝড়ের খালটির নিবিষ্টতা অনুভব করি, যা আরো কূল বিস্মৃত হয়ে দোদুল্যমান করে তুলছে সময়ের পরিসরকে ধনুকের ছিলার মতো দীর্ঘ টানে৷ শুধুই কি সাতাশ বছরের সুখস্বপ্ন? এই শব্দগুচ্ছও একলার ধসপ্রাণে পতিত বিঘ্ন, মূহ্যমান বয়ে যাওয়া সময়ের টঙ্কারধ্বনি? সাতাশ বছর, একটা নদীর ছবির ওপর বয়ে যায় বরফঝড়, বয়েই যায়৷



  © Notun Diganta 2007.
All Rights Reserved
Powered by headoffice