জাতীয়তাবাদ, সামপ্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
[ পূর্ব-প্রকাশিতের পর ]
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী
মূল্যায়নের প্রশ্ন
গান্ধীর মূল্যায়ন অবশ্যই জরুরী, কিন্তু কাজটা মোটেই সহজসাধ্য নয়৷ গান্ধী হচ্ছেন আধুনিক যুগের ভারতবর্ষের সবচেয়ে পরিচিত ও উজ্জ্বল প্রতিনিধি৷ অন্যরা ছিলেন কেউ প্রদেশের কেউ বা দলের, এমনকি যাঁরা সর্বভারতীয় তাঁরাও প্রায় সবাই তাঁর কনিষ্ঠ_যতটা নয় বয়সে, তারও অধিক ব্যক্তিত্বের মাপে৷ তাঁকে জানলে বিংশ শতাব্দীর যে-ভারতবর্ষ অবিভক্ত ছিল সেই ভারতবর্ষকে জানতে সুবিধা হয়৷ ভারতবর্ষ যখন দ্বিখণ্ডিত ও 'স্বাধীন' হলো তখনো তিনি রইলেন, এবং এখনো আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন বৈকি৷
এর কারণ একদিকে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব, অন্যদিকে ভারতীয় পরিচয়টি ধারণ করবার ব্যাপারে তাঁর অসাধারণ যোগ্যতা৷ 'ভারত-অন্বেষণ' জওহরলাল নেহেরুও করেছেন, সেটা এক ভাবে করা, গান্ধীর অন্বেষণটি ছিল একেবারেই ভিন্ন প্রকারের৷ নেহেরুর ভেতর একটি আন্তর্জাতিকতা ছিল আর গান্ধী হচ্ছেন পুরোপুরি ভারতীয়৷ ভারতের যথার্থ প্রতিনিধি বলেই সারা বিশ্ব তাঁকে চিনতো ও জানতো৷ ভারতের আধ্যাত্মিকতা, তার ধর্মবাদিতা, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, জামাকাপড়, আচার আচরণ, চিকিত্সা, সবকিছুর ব্যাপারেই গান্ধী অনুসন্ধিত্সু ছিলেন, এইসব বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরীানিরীাও অব্যাহত রেখেছেন; এবং তাঁর যে-ভাবমূর্তিটি গড়ে উঠেছিল সেটি হচ্ছে একজন যথার্থ ভারতীয়ের৷
ভারতের রাজনীতির ওপর তাঁর যতটা প্রভাব পড়েছে, অন্যকোনো ব্যক্তির তা পড়ে নি, ভবিষ্যতে যে পড়বে তারও সুযোগ নেই৷ কেননা ইতিহাসের নায়কেরা প্রত্যেকেই একবারই শুধু আসেন, তাছাড়া যে-ভারতবর্ষে তিনি রাজনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সে-ভারতবর্ষ তো এখন আর নেই, সময় বদলেছে, ইতিহাস এগিয়ে গেছে, এমনকি ভূগোলও তো ভিন্ন ও খণ্ডিত হয়ে পড়েছে, তাঁর চেষ্টা ছিল অখণ্ড রাখার, পারেন নি৷ কিন্তু তবু তাঁর প্রভাবটা রয়েছে, থাকবেও৷ গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ছিলেন, ওই দলের কাজ থেকে মাঝে মাঝে সরে গেছেন, কিন্তু কখনোই কোনো অবস্থাতেই রাজনীতি তাঁকে অব্যাহতি দেয় নি, তিনিও রাজনীতি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিযুক্ত করেন নি৷ করাটা সম্ভবপর ছিল না৷ কেননা ভারতবর্ষ ছিল পরাধীন, এবং তাঁর জীবনের ব্রত ছিল নিজের দেশকে স্বাধীন করবেন৷ সেই স্থির ল্য থেকে তিনি বিন্দুমাত্র বিচু্যত হন নি৷ কিন্তু দলের চেয়েও তিনি বড় ছিলেন৷ তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হতো৷ যদিও তিনি অধিকাংশ সময়েই দলের কর্মকর্তা থাকতেন না৷ ১৯৪২-এ 'ভারত ছাড়' আন্দোলন যখন শুরু হয় তখন সিদ্ধান্তটা গান্ধীরই ছিল৷ কংগ্রেসের অনেক নেতার মনেই দ্বিধা ছিল কাজটা সময়োপযোগী হবে কি না এ-বিষয়ে৷ কিন্তু গান্ধী যেহেতু অনড় রইলেন, তাই 'ভারত ছাড়'র ডাকটা না-দিয়ে উপায় থাকলো না৷ কেননা নেতারা জানতেন যে ডাকটা যদি তিনি একাও দেন তাহলেও সারা ভারতবর্ষ জুড়ে তা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হবে, মানুষ জেগে উঠবে, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে৷ নেতারা তাই গান্ধীর সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন৷ না-নিলে তাঁরা নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা হারাবেন এমন শঙ্কা ছিল৷
গান্ধীর এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুভাষ বসুর একটি অপ্রত্য ভূমিকা ছিল৷ সুভাষ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, পরাধীন ভারতবর্ষকে মুক্ত করবার আহ্বান জানিয়েছেন, অথচ কংগ্রেস কিছুই করছে না, কংগ্রেসের নেতারা অনেকেই মতার স্বাদ এবং কারাভোগের যন্ত্রণা এই দুই পরস্পরবিরোধী স্মৃতির দ্বারা পীড়িত ও দ্বিধাগ্রস্ত; গান্ধী দেখেছেন এমন পরিস্থিতিতে নতুন কর্মসূচি না-দিলেই নয়৷ তাই তিনি অহিংস কিন্তু প্রত্য প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছেন৷ নেতারা সবাই তাতে সম্মত হয়েছেন, দ্বিরুক্তি করেন নি৷ করলেও তাঁর সিদ্ধান্তই কার্যকর হতো৷ কিন্তু তাই বলে তিনি যে অন্যদের মত নিতেন না তা নয়৷ মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, গুরুত্ব দিতেন, আলোচনা করতেন, অনেক সময় মেনেও নিতেন৷ ভারতবিভাগের প্রশ্নে তিনি ছিলেন একেবারেই অনমনীয়, ঘোষণা করেছিলেন যে ভারত বিভক্ত হবে তাঁর মৃতদেহের ওপর দিয়ে৷ ভারতকে ভাগ না-করে প্রয়োজনে সবটাই পাকিস্তান হয়ে যাক এই রকম ব্যবস্থাপনাতেও তিনি রাজি আছেন, এমনটাও বলেছিলেন৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন দেখলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তো বটেই, এমনকি জওহরলাল নেহেরুও খণ্ডিতকরণের প েচলে গেছেন তখন তাঁর সমর্থকদের অনেককেই, বিশেষ করে আবদুল গাফফার খান ও মওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো ভারতের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী জাতীয়তাবাদীদেরকে চরমভাবে হতাশ করেই দেশকে দু'টুকরো করার ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছেন৷ আদর্শচু্যত হন নি, বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছেন৷
সর্বস্তরের মানুষকে নিজের কাছে টেনে নেবার অত্যাশ্চর্য মতা রাখতেন তিনি৷ শ্রেণী ধর্ম ও ভাষা নির্বিশেষে মানুষ তাঁর কাছে ছুটে যেত৷ এমন মতা তাঁর সময়ের অন্যকোনো নেতার মধ্যে দেখা যায় নি, পরেও দেখা গেছে বলে জানা যায় না৷ নেহেরু এবং সুভাষ অসাধারণ ছিলেন নেতা ও মানুষ হিসাবে৷ তাঁরা উভয়েই গান্ধীর সঙ্গে অনেক বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন৷ নেহেরু এবং সুভাষ ছিলেন সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, গান্ধী ছিলেন সমাজতন্ত্রবিরোধী, বস্তুত জ্ঞাতেঅজ্ঞাতে তিনি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে প্রতিহতই করেছেন; গান্ধীর হিন্দ স্বরাজের গ্রহণযোগ্য কোনো আবেদনই ওই দুই তরুণ নেতার কাছে ছিল না; কিন্তু তবু তাঁরা কেউই গান্ধীকে ছাড়তে পারেন নি৷ নেহেরু গান্ধীর স্নেহছায়াতেই রয়ে গেছেন৷ সুভাষ যদিও বিদ্রোহ করেছেন, গান্ধীর অহিংসা নীতিকে প্রত্যাখ্যান করে বিদেশে গিয়ে জাতীয় মুক্তি অর্জনের ল্যে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছেন, তবু গান্ধীর অপরিহার্যতা বিষয়ে তাঁর মনে কোনো সন্দেহ ছিল না, যে জন্য গান্ধীকে তিনি 'জাতির জনক' সম্বোধনে ভূষিত করেছিলেন৷ অন্য নেতাদের প েতো তাঁর বিরুদ্ধে যাবার প্রশ্নই ওঠে নি৷ গান্ধীর সঙ্গে চিত্তরঞ্জন দাশের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য ছিল, চিত্তরঞ্জন স্বরাজ পার্টি নামে ভিন্ন রাজনৈতিক দলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; কিন্তু এমনকি তিনিও যে গান্ধী-বলয়ের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গিয়েছিলেন তা নয়৷ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে বলা যায় যে তিনি অতবড় ও প্রভাবশালী হতেন না যদি না গান্ধীকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গণ্য করতেন৷
বিদেশেও গন্ধীর অসংখ্য ভক্ত ও অনুরাগী ছিলেন৷ অহিংসা ও সত্যাগ্রহের যে বাণী তিনি প্রচার করেছিলেন অনেকে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন৷ তখন হয়েছেন, পরেও হয়েছেন৷ এখনও হয়ে থাকেন৷ তিনি অনেকটা ভারতবর্ষের মতোই, বিস্তৃত এবং বৈচিত্রময়৷ মহাভারতের সঙ্গেও তুলনা করা চলে৷ তাঁর জীবনে বহু ঘটনা আছে, তিনি একরৈখিক ছিলেন না, তাঁর বাণীতে যে স্ববিরোধিতা রয়েছে তা আমরা দেখেছি, কোনো কোনো বক্তব্য রীতিমত কৌতুককর, কতগুলো অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল, কিন্তু এসব কিছুকে ধারণ করেই তিনি অসামান্য৷ তাঁর বাণী তো বটেই, এমনকি কাজের তুলনাতেও তিনি বড়৷ যে জন্য সঙ্গতভাবেই গান্ধী মনে করতেন যে, তাঁর জীবনই হচ্ছে তাঁর বাণী৷ এই জীবনে নম্রতা ছিল, কিন্তু আত্মসমর্পণ ছিল না; তাঁর কর্মজীবনে কোনো অবস্থাতেই আলস্য দেখা দেয় নি, নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেন নি, সকলকে সঙ্গে নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে পথ চলেছেন; তাঁর ভঙ্গিটি পথিকের, পথযাত্রীর৷
তাঁকে বলা হয়েছে মহাত্মা, মহত্ আত্মা তো তিনি অতিঅবশ্যি৷ কেউ ভাবতো দেবতা, আবার কারো কাছে ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত মানুষ_মহারাজা৷ দেবতা এবং মহারাজায় পার্থক্য না থাকুক তাঁর অপর যে-ভাবমূর্তি সেটা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রান্তের, কেননা সেটি হলো সন্ন্যাসীর৷ তিনি দরিদ্রদের সঙ্গে থাকতে চাইতেন, নিজেও দরিদ্রের মতোই জীবন যাপন করতেন৷ বিলাসব্যসন চিত্তরঞ্জনও ত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু গান্ধীর মতো করে ত্যাগ করতে কেউ পারেন নি, চিত্তরঞ্জনও নয়৷ ব্যারিস্টার গান্ধী ব্যারিস্টার চিত্তরঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন৷ রণশীল চার্চিল গান্ধীকে অর্ধনগ্ন ভিুক বলে বিদ্রূপ করেছেন ঠিকই, কিন্তু গান্ধীর গুরুত্ব তাঁর পওে অস্বীকার করা সম্ভব ছিল না; বিদ্রূপও এক প্রকারের স্বীকৃতি বৈ কি৷
গান্ধীর যেমন ছিল সম্মোহনীয় আকর্ষণশক্তি, তেমনি ছিল মেধা৷ সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পরিশ্রম৷ বুদ্ধিবিবেচনা ছিল অতুলনীয়৷ দরকষাকষিতে ছিলেন অনন্যসাধারণ৷ তবে তিনি স্বপ্নও দেখতেন, এবং অনেক স্বপ্নদ্রষ্টাদের েেত্র যা ঘটেছে তাঁর েেত্রও তেমনটি যে ঘটেনি তা নয়, স্বপ্নকে স্পষ্ট করতে পারেন নি; তাঁর স্বপ্নের স্বরাজ কোন ধরনের রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে তা তিনি বলতে পারেন নি৷ বাধ্য হয়ে আশ্রয় খুঁজেছেন রামরাজ্যের অস্পষ্ট ধারণার কাছে৷ তাঁর আবেদনে ধনী ও নির্ধন উভয়েই সাড়া দিয়েছে, নিজ নিজ স্বার্থে৷ তিনি তাদেরকে একত্র করেছেন, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন নি, সেটা তাঁর ল্যও ছিল না৷ স্বপ্নদ্রষ্টারা কেউ কেউ ধর্মপ্রচারক হন, গান্ধী মোটেই তা ছিলেন না, যদিও ধার্মিকতা বিদ্যমান ও কার্যকর ছিল তাঁর চেতনা ও আচরণের সর্বত্র৷ আর স্বপ্নপ্রতিষ্ঠাকারীদের কারো কারো েেত্র যা অবধারিত থাকে তাঁর জীবনেও তেমনটি ঘটেছে, তিনি শহীদ হয়েছেন, বিরুদ্ধপরে ঘাতকদের হাতে৷ ব্যক্তিগতভাবে গান্ধী ছিলেন অসম্ভব প্রাণবন্ত, যা কখনো অতিনাটকীয় রূপ নেয় নি, কিন্তু সর্বদাই প্রবহমান থেকেছে৷ অত্যন্ত জটিল সমস্যার যিনি সহজ সমাধান বের করতে পারতেন৷ তাঁর ব্যবহারে থাকতো শিশুর সারল্য এবং মাতৃহৃদয়ের ভালোবাসা৷ এক ধরনের দুষ্টুমিও ছিল তার ভেতরে, শিশুদের ভেতর যেমনটা থাকে৷ হাসতে পছন্দ করতেন, মিষ্টি করে৷
নানা বিপদ ও বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে গান্ধীকে অগ্রসর হতে হয়েছে, কিন্তু তিনি কখনোই হতাশ হতে চান নি৷ তিনি সামঞ্জস্যে বিশ্বাস করতেন, আজীবন সামঞ্জস্য স্থাপনের ল্যে কাজ করেছেন, কিন্তু চতুর্দিকে তাঁকে কেবলি দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ দেখতে হয়েছে৷ তবে তাতে তিনি হতাশ হন নি৷ বরঞ্চ অনেকটা হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতাবাদীদের মতোই ভাবতে পছন্দ করেছেন যে, ওইসব দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের ভেতর দিয়ে নতুন ঐক্য বের হয়ে আসবে৷ ১৯২৬-এর ভয়াবহ সামপ্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে তাঁর যে-বক্তব্য আমরা উদ্ধৃত করেছি তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়, বরঞ্চ যেন দাঙ্গার প্রশ্রয়দানকারী৷ কিন্তু উক্তির পেছনে যে একটা আশাবাদ কার্যকর ছিল সেটা মোটেই মিথ্যা নয়৷ ১৯৪২এ, 'ভারত ছাড়' ডাক দেবার আগে কংগ্রেস-লীগ বিরোধ যখন চরম হয়ে উঠছে তখন গান্ধী দু'জন আমেরিকান সাংবাদিককে এক সাাত্কারে বলেছেন,
I have not asked the British to hand over power to the Congress or the Hindus. Let them entrust India to God or in modern parlance to anarchy. Then all the parties will fight one another like dogs, or will, when responsibility faces them, come to a reasonable agreement. I shall expect non-violence to arise out of chaos.২৪৩
Provided that the League cooperated fully with Congress demand for immediate independence without the slightest reservation... the Congress will have no objection to the British government transferring powers today exercises to the Muslim League on behalf of the whole of India... And the Congress will not only not obstruct any Government that the Muslim League may form on behalf of the people, but will join the Government in the running of the machinery of the free state. This is meant in all seriousness and sincerity.২৪৪
গান্ধী তখন কংগ্রেসের কেউ নন, সভাপতি তো ননই, জিন্নাহ যেমনটি ছিলেন মুসলিম লীগের; কিন্তু তাঁর সাহস ও আত্মবিশ্বাস ছিল এমন একটি অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব উত্থাপনের৷ এমন প্রস্তাব কংগ্রেসের প েগ্রহণ করা সম্ভব হতো কি না আমরা জানি না, তবে জিন্নাহ যে এতে কোনো সাড়া দেন নি সেটা তো সত্য৷ জিন্নাহ গান্ধীর
আন্তরিকতায় আস্থা রাখতেন না; ব্রিটিশ শাসকেরা গান্ধীকে যতটা না অবিশ্বাস করতেন, জিন্নাহ অবিশ্বাস করতেন তার চেয়েও অধিক; এবং সে-কথা রূঢ় ভাষায় বলতেও তিনি কসুর করেন নি৷ বস্তুত রূঢ়তা জিন্নাহর জন্য সেই পরিমাণেই একটা বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল যে-পরিমাণে বিনয় ছিল গান্ধীর বৈশিষ্ট্য৷ গান্ধীর বিনয়ের সঙ্গে অবশ্য তাঁর অন্তর্গত শক্ত মেরুদণ্ডের কোনো বিরোধ ছিল না৷
দেশবিভাগ যখন অপ্রিতিরোধ্য বলে মনে হচ্ছিল তখনো গান্ধী তাঁর অসংশোধনীয় আশাবাদ পরিত্যাগ করেন নি৷ ১৯৪৫এর ২২ জুন তিনি বলেছেন, “Let it be a partition between two brothers, if a division there must be”.দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাস না-করেও দেশভাগ কেমন করে মেনে নিচ্ছেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
I agreed on the basis of members of a family desiring severance of the family tie in matters of conflict, but not in all matters so as to become enemies of one another as if there was nothing common between the two except enmity.২৪৫
দুই ভাই যদি ঠিক করে যে তারা আর এক সাথে থাকবে না, তাহলে পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নিয়ে পৃথক হয়ে যাওয়াটা অসম্ভব ঘটনা নয়, তা নিয়ে মারামারি কাটাকাটির কোনো আবশ্যকতা নেই, চিরস্থায়ী শত্রুতাও অনভিপ্রেত৷ এটা আশাবাদীর কথা বটে৷ কিন্তু এমনটা ঘটে নি৷ ভাগাভাগি হয়েছে দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্যে, এমন দাঙ্গা যার তুলনা ভারতের ইতিহাসে আর নেই৷ স্বাধীন হতে গিয়ে পরাধীন ভারত নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল বৈকি৷ গান্ধী যেটাকে ভয় করতেন সেটা হলো ভ্রাতৃকলহের তৃতীয় পরে হস্তপে৷ এবং ঠিক সেটাই ঘটেছে৷ এই তৃতীয় প হচ্ছে ব্রিটিশ শাসক৷ তাদের নীতিই ছিল ভাগ করো এবং শাসন করো৷ ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গের পেছনে উদ্দেশ্যগুলোর একটা ছিল ওই ভাগ করা; বাংলাকে দুই ভাগ করলে কংগ্রেস দুর্বল হবে, এই বোধটা তো ছিলই, হিন্দু-মুসলমান বিরোধ যদি তৈরি করা যায় তাহলে ভাগটা কেবল ভৌগোলিক থাকবে না, আরো গভীরে চলে যাবে, এমন একটা হিসাব যে অনুপস্থিত ছিল তাও বলা যাবে না৷ ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগকে সংগঠিত হতে ব্রিটিশের উত্সাহ দান ঘটেছে ওই বিভাজন তৈরীর ল্যেই৷ কিন্তু মুসলিম লীগের চাইতেও শক্তিশালী অস্ত্র ছিল স্বতন্ত্র নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন৷ তথাকথিত 'দায়িত্বশীল প্রতনিধিত্বমূলক' সরকার গঠনের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দানের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু ও মুসলমানরা আলাদা আলাদা ভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে, এমন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল৷
১৯০৯ সালের শাসন সংস্কারে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ব্যবস্থা করাটা তাই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার তুলনায় অনেক বড় ঘটনা৷ পরে, ১৯৩২-এ, সামপ্রদায়িক রোয়েদাদের মাধ্যমে বিভাজনের ব্যাপারটাকে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-রেখে অন্য সমপ্রদায়ের েেত্রও প্রসারিত করা হয়েছিল, যার ফলে শিখ ও ভারতীয় খ্রিস্টানরা নিজের স্বতন্ত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার তো পেলোই, হিন্দু সমপ্রদায়ের মধ্যে তফসিলীভুক্তদেরকে আলাদা জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করা হলো৷ হিন্দু সমপ্রদায়কে বিভক্ত করার এই চেষ্টার বিরুদ্ধে গান্ধী স্বভাবতঃই অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন৷
ব্রিটিশ শাসকদেরকে গান্ধী যখন বলছিলেন ভারত ছাড়, জিন্নাহর বক্তব্য তখন ছিল আগে ভাগ করো তারপরে ভারত ছাড়৷ অর্থাত্ গান্ধী যখন বলছেন, তোমরা চলে যাও, তোমরা চলে গেলে ভাগাভাগির কাজটা স্বাধীন ভারতে আমরা, হিন্দু-মুসলমানেরা নিজেরাই সম্পন্ন করতে পারবো; জিন্নাহ তখন বলছেন, সেটা হবার নয়, তোমরা চলে গেলে আমরা হিন্দুদের হাতে পড়ে যাবো, এবং তারা আমাদের ন্যায্য হিস্যা দেবে না৷ গান্ধী যেখানে তৃতীয় পরে হস্তপেকে তিকর বলে মনে করছিলেন, জিন্নাহ সেখানে ভাবছিলেন তৃতীয় পরে সাহায্য না-পেলে আত্মরার উপায় থাকবে না, মুসলমানদের সর্বনাশ হয়ে যাবে৷ আর এই বিরোধটাকে উত্তেজিত করার ব্যাপারে বিদেশী শাসকদের ভেতরে উত্সাহের যে কোনো ঘাটতি ছিল না সেটা তো বলাই বাহুল্য৷ তৃতীয় পরে নাক গলানো সম্পর্কে গান্ধী মন্তব্য করেছিলেন, “the third power, even without deliberately wishing it, will not allow real unity to take place”২৪৬ এটা তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ী বক্তব্য, কেননা বিভেদ সৃষ্টি করার ব্যাপারে তৃতীয়প েআগ্রহের যে বিন্দুমাত্র অভাব ছিল তা নয়৷ কোনো ঔপনিবেশিক শক্তিরই সেটা থাকে না, আর ইংরেজরা তো হলো ওইসব শক্তির ভেতর সবচেয়ে ধূর্ত, তারা কেন বিভক্ত করতে চাইবে না৷ এক সময়ের খেলাফত্ আন্দোলনের নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী লন্ডনে অনুষ্ঠিত ১৯৩১এর গোলটেবিল বৈঠকে তাঁর বাকবৈদগ্ধ ব্যবহার করে ব্রিটিশদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,
The Hindu-Muslim problem is of your creation. But not altogelter. It is the old maxim of ‘divide and rule’. But there is a division of labour. We divide and you rule.২৪৭
কথা তো ঠিকই, ভারতীয়রা নিজেদেরকে ভাগ করেছে এবং তাতে সুবিধা হয়েছে ব্রিটিশের, কিন্তু তৃতীয় প হিসাবে ব্রিটিশের ভূমিকা যে কেবল দর্শক ও সুবিধাভোগীর ছিল তা নয়, ছিল প্রত্য খেলোয়াড়ের, এবং উস্কানিদাতার৷ তারা তো অত্যন্ত প্রীত হয়েছে যখন দেখতে পেয়েছে ব্রিটিশবিতাড়ন স্থগিত রেখে ভারতবষর্ীয়রা পরস্পরকে নিধনে নিমগ্ন রয়েছে৷
গান্ধীকে প্রচলিত অর্থে রাজনীতিক বলা যাবে না৷ তিনি আইন সভার সদস্য হবার জন্য প্রাথর্ী হন নি, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী হবার আকাঙ্া তাঁর ছিল না৷ তিনি সমাজ সংস্কারে আগ্রহ রাখতেন, কেননা রাষ্ট্রের চাইতেও সমাজকে প্রাথমিক বলে মনে করতেন, যেমন করতেন রবীন্দ্রনাথ৷ গান্ধীর কাছে স্বরাজ কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা ছিল না, একই সঙ্গে ছিল ব্যক্তির নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণও৷ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এখানেও তিনি পৃথক৷ তিনি আস্থা রাখতেন নৈতিক শক্তিতে৷ নৈতিক শক্তির সাহায্যে তিনি ব্রিটিশকে ভারতছাড়া করতে পারবেন বলে ভরসা করতেন, ওই একই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ মিটিয়ে ফেলাও সম্ভব বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল৷ অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের জন্য তিনি চরকার দ্বারস্থ হয়েছিলেন৷ হিন্দু সমাজে বিদ্যমান অচ্ছু্যত্ সমস্যা দূর করার অভিপ্রায়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক কাজকে স্থগিত করে দিতে পিছপা হন নি৷ কিন্তু তাঁর চূড়ান্ত পরিচয়টা রাজনৈতিকই, কেননা তাঁর দেশ তখন ছিল পরাধীন, এবং স্বাধীনতা না এলে স্বরাজ কিংবা সমাজসংস্কার কোনোটিই সম্ভবপর ছিল না৷
নৈতিক শক্তি গান্ধীর জন্য ছিল অনুপ্রেরণা এবং সাহস উভয়ের অফুরন্ত উত্স৷ নিপীড়নকে তিনি ভয় পান নি, কারাবাস তো সামান্য ব্যাপার, মৃতু্যর দ্বারপ্রন্ত থেকেও ফিরে এসেছেন, একাধিকবার৷ গান্ধী ভুল করতে ভয় পেতেন না, ভুল হয়েছে বুঝতে পেলে অকপটে তা স্বীকার করতেন, এবং ভ্রমের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতেন৷ অত্যন্ত উচ্চমানের মেধাবান ব্যক্তি থেকে শুরু করে অতিদরিদ্র মানুষটি পর্যন্ত তাঁর প্রতি অনুরাগ অনুভব করতেন৷ দণি আফ্রিকায় এক ুব্ধ পাঠান হত্যা করতে চেয়ে একদা তাঁকে আক্রমণ করেছিল, সেই পাঠানদেরকেও তিনি এমনভাবে নিজের কাছে টেনে নিতে পেরেছিলেন যে, ১৯৩৭-এর নির্বাচনে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে, যেখানকার পাঠান অধিবাসীদের শতকরা ৯৩ জনই মুসলমান, সেখানে নির্বাচিত হওয়া তো পরের কথা মুসলিম লীগের প েকোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্রই দাখিল করেন নি৷ পাঠানদের নেতা আবদুল গাফফার খানের উপাধি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল 'সীমান্ত গান্ধী'র৷
রাজনীতির অনেক েেত্রই আমরা গান্ধীর নৈতিক বিজয়ের প্রমাণ পাবো৷ রাজনীতিতে তিনি গুণগত পরিবর্তন এনেছিলেন৷ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই বোধের সঞ্চার ঘটিয়েছেন যে, ইংরেজ যতই পরাক্রমশালী হোক না কেন বাঘ ভাল্লুক নয়, তার বিরুদ্ধেও দাঁড়ানো যায়, এবং যায় তাকে নত করাও৷ এই কাজটা সশস্ত্র বিপ্লবীরা, ইংরেজরা যাদেরকে বলতো সন্ত্রাসী, তাঁরাও করেছেন, ভিন্নভাবে৷ রাজনীতিকে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ায় তাঁর ভূমিকা অনন্যসাধারণ, যদিও শ্রমজীবী জনগণ রাষ্ট্রমতা দখল করে নিক এটা তিনি কখনো চান নি, তাঁর চাইবার কথাও নয়৷ মানুষকে তিনি আশা দিয়েছেন, শিখিয়েছেন স্বপ্নদেখতেও৷
আরো দু'টি বড় অর্জন রয়েছে গান্ধীর৷ এ দু'টি আবার পরস্পর সংলগ্নও বটে৷ তিনি মানুষকে দেশপ্রেমিক হতে অনুপ্রাণিত করেছেন, যে-দেশপ্রেম পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য সত্ত্বেও বর্তমান ভারতে এখনো অুণ্ন রয়েছে দেখতে পাই৷ সেই সঙ্গে পরাধীন ভারতের মানুষের জীবনে এমন কারণ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন যাতে ভারতীয় বলে পরিচয় দান করাটাকে তারা নিজেদের জন্য গৌরবজনক বলে মনে করে৷ পরিচয়দানের ওই গৌরব এখনো যে মলিন হয়েছে তা নয়, বরঞ্চ উজ্জ্বলতর হয়েছে বলেই ধারণা করা যায়৷ দেশপ্রেমিক হওয়ার এবং দেশপ্রেমিক হওয়ার জন্য কারণ সৃষ্টি করার এই দ্বৈত অর্জন সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতার জন্য অব্যাহত আন্দোলনের ভেতর দিয়েই৷ ওই আন্দোলনের সামনে গান্ধী যেভাবে ছিলেন অন্যকেউ তেমনভাবে থাকতে পারেন নি৷
কিন্তু গান্ধীর জীবনে পরাজয়ও তো রয়েছে৷ বড় মাপের পরাজয়৷ তাঁর যে স্বপ্ন ছিল সেটা তো অর্জিত হয় নি৷ স্বপ্ন ছিল ভারতবর্ষকে স্বাধীন করবেন এবং তাকে ঐক্যবদ্ধ রাখবেন৷ এ দু'টিও পরস্পর সংলগ্ন বটে, এবং এরা যে অর্জিত হয় নি সেটা তো সত্য৷ হঁ্যা, মতা হস্তান্তরিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত স্বরাজ আসে নি৷ ১৯৪৭এ আসে নি, তার পরেও এসেছে বলা যাবে না, কেননা অস্পষ্টভাবে হলেও স্বরাজ বলতে যে-মুক্তির কথা তিনি ভাবতেন তেমন মুক্তি ভারতের সর্বস্তরের মানুষ এখনো পায় নি৷ আর ভারতবর্ষকে এক রাখার যে চেষ্টা তিনি করেছিলেন সে-চেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে৷ কর্মমুখর জীবনের শেষ প্রান্তে পেঁৗছে ব্যর্থতার বোধ দ্বারা গান্ধী আক্রান্ত না-হয়ে পারেন নি৷ অবশ্যই তিনি আত্মসমর্পণ করেন নি, আশা হারান নি, সংখ্যালঘুদের রা করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু বিষণ্নতা তাঁর সঙ্গী হয়েছিল৷ আগে বলতেন একশ' পঁচিশ বছর বাঁচতে চান, শেষে মনে হতো তিনি বড়ই কান্ত ও সহকমর্ীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন৷ দেশভাগের পূর্বমুহূর্তে তাঁর তিনটি উক্তি স্মরণীয়, ১. “Let not the coming generations curse Gandhi for being a party to Indian vivisection”. ২. “They must first cut me to pieces before they vivisect the country... if there is a true Pakistan it would have to be the entire Hindustan.” এবং এরই মধ্যে তাঁর সেই পুরাতন কণ্ঠস্বরও ধ্বনিত হয়ে উঠেছে, ৩. “if I felt strong enough. I would alone take up the flag of revolt. But I do not see the condition to do so.”২৪৮
একা হলেও বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন৷ কার বিরুদ্ধে? না, ব্রিটিশের বিরুদ্ধ নয়, সারা জীবন যেমনটা করেছেন তেমন নয়, বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরা দরকার হয়ে পড়েছিল সেইসব ভারতীয়দের বিরুদ্ধেই যারা ভারতবর্ষকে দ্বিখণ্ডিত করতে চাইছিল_এদের মধ্যে কেবল যে মুসলিম লীগ ছিল তা নয়, কংগ্রেসের নেতারাও ছিলেন, যেমন ছিলেন হিন্দু মহাসভার৷
মহত্ মানুষের এ এক মস্ত বড় ব্যর্থতা৷ যে জন্য মনে হয় তিনি একটি ট্র্যাজেডির মহানায়ক৷ ট্র্যাজেডির নয়, আসলে মহাকাব্যেরই৷ মহাকাব্যে অনেক ঘটনা ঘটে, তার ভেতরে ট্র্যাজেডিও থাকে৷ বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাকাব্যে ওই ট্র্যাজেডিটা আছে৷ কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক কেন ট্র্যাজেডির নায়কে পরিণত হলেন? কারণ কি? প্রধান কারণ হলো রাজনীতিতে ধর্মকে প্রবেশ করতে দেওয়া৷ ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার না-থেকে যখন রাজনীতির ব্যাপারে পরিণত হয় এবং তার ফল যে কেমন ভয়াবহ হতে পারে তার কাহিনী রক্তের অরে লেখা আছে মহানায়কের ওই পরাজয়ে৷ গান্ধী নিজে ধার্মিক ও ধর্মবাদী ছিলেন, তবে কোনো দিক দিয়েই সামপ্রদায়িক ছিলেন না৷
কিন্তু ওই যে তিনি ধর্ম ও রাজনীতিকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন রাখতে অসম্মত হলেন তাতেই সামপ্রদায়িকতা বৃদ্ধি পাবার সুযোগ পেয়ে গেলো, এবং স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় এবং ঘটে গেলো আধুনিক ভারতের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ঘটনা; রক্তাক্ত, অতিবীভত্স দেশভাগ, যার দুষ্ট ফলাফলের হাত থেকে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানুষ এখনো মুক্ত হতে পারে নি৷ ১৯৪২ গান্ধী যে 'ভারত ছাড়' ডাক দিয়েছিলেন তার ফলে যে-অভু্যত্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতে কম্পন দেখা দিয়েছিল, ১৮৫৭এর পরে অমন ঘটনা আর ঘটে নি, মনে হয়েছিল পরিণতিটা দাঁড়াবে ব্রিটিশের প্রস্থান; কিন্তু তেমনটা যে ঘটলো না তার কারণ সাম্রাজ্যবাদী নিষ্পেষণ তো অবশ্যই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ হলো সামপ্রদায়িক বিভাজন৷ সমপ্রদায়গত ভাবে মুসলমানরা ওই আন্দোলনে যোগ দেয় নি; পরে ব্রিটিশের সঙ্গে দরকষাকষিতে লিপ্ত হয়ে এবং সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হয়ে কংগ্রেস ও লীগ প্রায় গৃহযুদ্ধ বাধিয়ে তুলেছে৷
গান্ধী সামপ্রদায়িক ছিলেন না, কিন্তু মুসলিম লীগ তাঁকে হিন্দু সমপ্রদায়ের নেতা হিসাবে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছে, এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা ছিল জিন্নাহর৷ ভারতবর্ষে দণি আফ্রিকা থেকে প্রত্যাবর্তন করার পর প্রথম যে বড় রাজনৈতিক উদ্যোগটি গান্ধী গ্রহণ করেন সেটি অসহযোগ আন্দোলন, তাতে তিনি খিলাফত্-উচ্ছেদের বিরুদ্ধে মুসলিম সমপ্রদায়ের আবেগকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, যার ফলে যুগপত্ অসহযোগ-খিলাফত্ আন্দোলন শুরু হয়েছিল৷ রাজনীতিতে ধর্মের এই ব্যবহার মোটেই সুবিধাবাদী ছিল না, ছিল পরিপূর্ণরূপে আন্তরিক; গান্ধী আশা করেছিলেন যে এর ফলে হিন্দু মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে, দু'টি স্রোত মিলে মিশে এক ও অভিন্ন হয়ে যাবে৷ কিন্তু তাঁর সে-আশা সফপ্রসূ হয় নি, হিতে বরঞ্চ বিপরীত ঘটেছে৷ আন্দোলন সফল হয় নি, গান্ধী নিজেই তা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন৷ ওদিকে তুরস্কে কামাল পাশা খিলাফত্ বিলুপ্ত করে দিয়েছেন৷ খিলাফত্ আন্দোলনের নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলী ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন৷ লন্ডনে ১৯৩১এ মওলানা মোহাম্মদ আলীর মৃতু্যর পর তাঁর বিধবা স্ত্রী মুসলিম লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসাবে মনোনীত হয়েছেন, যদিও তিনি বোরখা ছাড়েন নি৷ দুই সমপ্রদায়ের ভেতর ঐক্য প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে দূরত্বই বৃদ্ধি পেয়েছে৷ যার একটি লণ ছিল সামপ্রদায়িক দাঙ্গার সংখ্যা ও মাত্রা বৃদ্ধি৷ যুগপত্ ওই আন্দোলন যে সফল হবে না তার একাধিক কারণ অবশ্য আন্দোলনের চরিত্রের ভেতরই নিহিত ছিল৷ অসহযোগ আন্দোলন ছিল ইহজাগতিক, খিলাফত্ আন্দোলন ধমর্ীয় পুনরুজ্জীবনবাদী; প্রথমটি চেয়েছে জাতীয় স্বাধীনতা, দ্বিতীয়টির আদর্শ ছিল প্যানইসলামিক; এদের এক হবার কথা নয়, এবং পরস্পরবিরোধী শক্তিকে এক করতে গেলে যে পার্থক্যটাই বরঞ্চ প্রকট হবার আশঙ্কা থাকে, ঘটনাক্রমে তারই নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে৷
গান্ধীর যে-ভাবমূর্তিটি গঠিত হয়েছিল সেটিকে তিনি মনে করতেন ভারতীয়; কিন্তু যেহেতু তিনি নিজেকে সনাতনী হিন্দু বলতেন, গো-রায় আগ্রহ প্রকাশ করতেন এবং তাঁর পরিধেয়কে হিন্দু বলে চিহ্নিত করা সহজ ছিল মুসলিমদের একাংশের দৃষ্টিতে, তাই তিনি কেবল ভারতীয় রইলেন না, হিন্দু হয়ে উঠলেন৷ ওদিকে মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা সমস্বরে দ্বিজাতি তত্ত্বের কথা বলতে বলতে সামপ্রদায়িকতাকে বৃদ্ধি করতে থাকলো, ব্রিটিশ শাসকের প্ররোচনা দানও অব্যাহত রইলো৷ গান্ধী নিজে সকল ধর্মকে সমান মর্যাদা দিতেন; রাজনৈতিক সভাকে অনেক সময় তিনি সর্বধর্মের মিলিত প্রার্থনা সভায় পরিণত করতেন, ১৯৩১এ গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের যখন যাচ্ছেন তখন জাহাজের ডেকে প্রার্থনা সভার আয়োজন করলে তাতে কয়েকজন ইউরোপীয়ও যোগ দেন; কিন্তু সকল ধর্মকে এই সমান মর্যাদা দান ধর্মনিরপেতার জন্য মোটেই সুখকর হয় নি, বরঞ্চ ধর্মের মূল্য বেড়েছে, এবং ওই বৃদ্ধি সামপ্রদায়িকতার প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা দান করেছে৷
ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিলে গান্ধী ভারতবর্ষের জন্য মস্ত বড় উপকার করতে পারতেন, এবং তাতে দেশভাগকে প্রতিহতকরণে তাঁর প্রাণপণ প্রচেষ্টা শক্তিশালী হতো৷ সেটা না-করে ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে সংযুক্তকরণের পথে এগিয়ে সেই বিষের বিস্তারকেই তিনি উত্সাহিত করে গেছেন, যে-বিষের প্রভাব থেকে এই উপমহাদেশ এখনো মুক্ত হয় নি, কবে যে মুক্ত হবে আমরা বলতে পারি না৷
ভারতবর্ষে ধর্মের বিভাজনের তুলনায় অনেক বেশি সত্য ছিল শ্রেণীর বিভাজন৷ প্রয়োজন ছিল সেই বিভক্তির অবসান ঘটানো৷ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একটি দুর্বলতা যেমন ছিল ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, তেমনি অপরটি ছিল শ্রেণীভেদকে অুণ্ন রাখবার প্রচ্ছন্ন চেষ্টা৷ এই দু'টি আবার পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসাবে কাজ করেছে৷ ধর্মের আচ্ছাদন শ্রেণীর দূরত্বকে অস্পষ্ট করে দিতে চেয়েছে, শ্রেণীনির্বিশেষে সকল হিন্দু এক দিকে, সকল মুসলমান বিপরীত দিকে, এই রকমের অবস্থান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন দেশী ধনিক শ্রেণী (উভয় সমপ্রদায়ের) এবং বিদেশী শাসক দুই পরে কাছ থেকেই প্রত্য-অপ্রত্য উত্সাহ লাভ করেছে৷ ধর্মের ভাগাভাগিটা খাড়াখাড়ি, শ্রেণীর ভাগাভাগি আড়াআড়ি; খাড়াখাড়ি বিভাজন আড়াআড়ি বিভাজনকে কেটে দু'টুকরো করে ফেলেছে; ফলে লাভ হয়েছে সামপ্রদায়িকতার, ভীষণ তি হয়েছে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের৷ ওই যে অতবড় সম্ভাবনার ১৯৪২এর আগস্ট অভু্যত্থান, সে যে ব্রিটিশ শাসককে ভারত ছাড়া করতে পারল না, বরঞ্চ মুখ ঘুরিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধের অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করে ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে পরিণত হলো তার একটি কারণ কংগ্রেস তার আন্দোলনে শ্রমিক ও কৃষককে নিজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে নি; করতে চায়ও নি; পাছে সামাজিক বিপ্লব ঘটে যায়, এবং নেতৃত্বদানকারী বিত্তবানদের বিপদ ঘটে৷ ধর্মকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অসম্মত হয়ে গান্ধী প্রতিক্রিয়াশীলদেরকেই সাহায্য করে গেছেন৷ তাঁর কাজটা বিপ্লবকে সহায়তা দানের ছিল না, ছিল বিপ্লবকে ঠেকানোর৷
ওই ১৯৪২ সালেই, জাপান যখন ভারতের দিকে বিজয়ীর মতো এগুচ্ছে তখন জুন মাসের ৬ তারিখে গান্ধী লিখেছেন, “I see no difference between the Fascist or Nazi powers and the Allies. All are exploiters, all resort to ruthlessness to the extent required to compass their end”. ওই লেখাতে তিনি এটাও বলেছেন যে, মানুষের মুক্তির কথা বলার আগে আমেরিকা ও ব্রিটেনের প েউচিত্ কাজ হবে নিজেদের দূষিত হাতকে পরিচ্ছন্ন করা৷২৪৯ তবে তিনি এটা বলেন নি যে, ফ্যাসিবাদী, নাত্সী ও মিত্র বাহিনীর ভেতর শোষণের যে ঐক্য সেটা হচ্ছে পুঁজিবাদী শোষণের৷ সমাজতন্ত্রকে বুঝতে যতই অসম্মত হোন, পুঁজিবাদকে চিনতে তাঁর অসুবিধা হয় নি৷ গান্ধী যদি বলতেন যে আসল লড়াইটা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধেই, কেননা যে-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতবাসী লড়ছে সেটা হলো পুঁজিবাদের রাজনৈতিক প্রকাশ, তাহলে তাঁর অবস্থান এবং ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলন উভয়েরই চেহারা যেত বদলে, ভারত থেকে সামপ্রদায়িকতা লেজগুটিয়ে পলায়ন করতে বাধ্য হতো এবং ভারত হয়তো-বা ভাগই হতো না, অমনভাবে মানুষের রক্তপাত ও অশ্রুপাত ঘটতো না৷ কিন্তু কংগ্রেস, লীগ, হিন্দু মহাসভা সবাই তো ছিল পুঁজিবাদে দীতি, ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে এেেত্র তাদের গোপন ঐক্য ছিল বৈকি৷ ওইসব রাজনীতিকদের জন্য লড়াইটা ছিল মতা হস্তান্তরের প্রশ্নে; বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা রার ব্যাপারে তারা ছিল পরস্পরের আত্মীয়৷
গান্ধী পুঁজিবাদকে শত্রু হিসাবে চিনেও চিনলেন না৷ আর তিনি যে, শ্রেণীভেদ দূর করতে চান নি তার অতিউত্কৃষ্ট প্রমাণ হচ্ছে এই যে, অচ্ছু্যত্প্রথা অবসানের ল্যে তিনি আন্দোলন করলেন ঠিকই, কিন্তু একবারও বললেন না যে, তিনি ওই প্রথার ভিত্তিমূলে রয়েছে যে-বর্ণভেদ ব্যবস্থা তার অবসান চান৷ বর্ণভেদ তো আসলে শ্রেণীভেদই, শ্রেণীভেদের চেয়েও খারাপ, কেননা অর্থনীতির বাস্তবতাকে সে আচ্ছাদিত করে রাখে ধর্মের মোড়কে, যে জন্য মনে হয় ব্যাপারটা কেবল যে ঈশ্বরনির্দেশিত তা নয়, পবিত্রও বটে, ঈশ্বরনির্দেশিত বলেই পবিত্র৷
জিন্নাহ এক সময়ে গান্ধীর সঙ্গেই ছিলেন, অর্থাত্ ছিলেন কংগ্রেসে; কিন্তু পরে তিনি একেবারেই বদলে গেছেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পাট চুকিয়ে দিয়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদের রণধ্বনি তুলেছেন৷ সে-দৃশ্য দেখে ১৯৩৮-এ গান্ধীর মন্তব্য ছিল,
In your speeches I miss the old nationalist. When in 1915 I returned... from South Africa, everybody spoke of you as one of the staunchest nationalists and the hope of both Hindus and Mussalmans. Are you the same Mr Jinnah? If you say you are, inspite of your speeches, I shall accept your word.
জিন্নাহর প েতো অস্বীকার করবার কোনো উপায় ছিল না যে, তিনি বদলে গেছেন৷ কিন্তু তাঁর ভেতরে যে দ আইনজ্ঞটি ছিল সেটি অনেক সময়েই অস্পষ্টতা সৃষ্টি এবং পারলে প্রতিপকে আক্রমণ করতে পছন্দ করতো৷ এেেত্রও তেমনটি ঘটেছে৷ গান্ধীর উক্তির জবাবে জিন্নাহ বলেছেন, “Nationalism is not the monopoly of any single individual. In these days it is very difficult to define it, but I do not want to pursue this line of controversy any further.”২৫০ এখানে তিনি জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিচ্ছেন না, ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যাচ্ছেন, কেননা যে নতুন মুসলিম জাতীয়তাবাদে তিনি দীতি হয়েছেন তাতে যে তাঁর খুব গভীর আস্থা আছে তা নয়, যদিও বাইরে ওই জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করছেন, এবং ব্যবহারের মাত্রাটা ক্রমাগত বৃদ্ধিই পেয়েছে৷ আস্থা যে ছিল না তার প্রমাণ তো জিন্নাহ নিজেই দিয়েছেন, পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম ও ঐতিহাসিক অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে, যাতে তিনি দ্বিজাতি তত্ত্বকে নাকচ করে দিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর নতুন রাষ্ট্রে হিন্দু মুসলমানে কোনো বিভেদ থাকবে না, কালক্রমে সকলে মিলে একটি নতুন জাতি গড়ে তুলবে৷
১৯১৫ সালে জিন্নাহর সঙ্গে গান্ধীর সাাতের যে উল্লেখ গান্ধীর উক্তিতে দেখলাম, তখন ছোট কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটেছিল৷ গান্ধী ও জিন্নাহ উভয়েই গুজরাটী, গান্ধীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপল েবোম্বাই শহরে গুজরাট সমিতি একটি সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করে, জিন্নাহ তখন ওই সমিতির সভাপতি, সেটাই অবশ্য স্বাভাবিক ছিল, কেননা ওই শহরে জিন্নাহই তখন সবচেয়ে পরিচিত ব্যক্তিত্ব৷ সভায় জিন্নাহর মার্জিত সম্বর্ধনা বক্তব্যের পরে গান্ধী বলেন যে, এটা দেখে তিনি আনন্দিত যে একজন মুসলমান গান্ধীর নিজের এলাকার সমিতির কেবল সদস্যই নন, সমিতির সভাপতির পদেও আসীন রয়েছেন৷২৫১
একটি সরল উক্তি সন্দেহ নেই, কিন্তু পেছনে ফিরে তাকিয়ে এখন মনে হয় মন্তব্যটি তিনি না-করলেই হয়তো পারতেন৷ জিন্নাহর মুসলমান পরিচয় তখন উল্লেখযোগ্য ছিল না, এবং উল্লেখ করাটাও ছিল অপ্রয়োজনীয়৷ এর নয় বছর পরে ১৯২৪ সালে, অসহযোগ-খিলাফতের অবসানের গ্লানির দ্বারা পুষ্ট হয়ে দুই সমপ্রদায়ের ভেতর যখন দাঙ্গাহাঙ্গামার ঘটনা ঘটছে গান্ধী তখন আরেকটি অসতর্ক মন্তব্য করেন৷ তিনি বলেন যে, দাঙ্গার অধিকাংশ েেত্রই দেখা গেছে হিন্দুরাই দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে থাকে, যার ফলে তাঁর ধারণা হয়েছে যে, “the Mussalman as a rule is a bully, and the Hindu a coward. Where there are cowards, there will always be bullies” মুসলমানদের স্বভাব ষণ্ডের, হিন্দুর স্বভাব কাপুরুষের, যেখানে কাপুরুষ আছে সেখানে ষণ্ডরা তো থাকবেই_এই ধরনের সাধারণীকরণ আর যার পইে শোভা পাক মহাত্মা গান্ধীর প েকরাটা যে সঙ্গত নয়, এমন কথা গান্ধীর পৌত্র রাজমোহন গান্ধীই বলেছেন, তাঁর Understanding the Muslim Mind বইতে৷২৫২
গান্ধীর তৃতীয় উক্তিটি ১৯৪৪ সালের, এটি তিনি করেছেন জিন্নাহকে লেখা একটি চিঠিতে৷ ব্যক্তিগত চিঠি নয়, রাজনৈতিক পত্র, তাই জনসম েপ্রচারিত৷ প্রসঙ্গটি লাহোর প্রস্তাব৷ গান্ধী লিখেছেন,
The Resolution itself makes no reference to the two-nation theory, which was, in any event, wholly unreal. I find no parallel in history for a body of converts and their descendants claiming to be a nation apart from their parent stock. If India was one nation before the advent of Islam, it must remain one in spite of the change of faith of a very large body of her children.
গান্ধীর কাছে two-nation theory অত্যন্ত ভয়াবহ মনে হয়েছে, কেননা দেখতে পেয়েছেন যে এটিকে মেনে নিলে ভারতবর্ষ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, “there will be no limit to claims for cutting India into numerous divisions, which would spell India’s ruin.২৫৩
সন্দেহ নেই যে এখানে উদ্ধৃত গান্ধীর সবক'টি পর্যবেণই সঠিক৷ লাহোর প্রস্তাবে দ্বিজাতি তত্ত্বের উল্লেখ ছিল না, 'পাকিস্তান' নামে একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামগন্ধও সেখানে নেই, এসবই পরে যুক্ত হয়েছে৷ এটাও সত্য যে ভারতের মুসলমানদের প্রায় সবাই ধর্মান্তরিত, জিন্নাহ এবং কবি ইকবাল উভয়ের পূর্বপুরুষও এক সময়ে স্থানীয় ও হিন্দুই ছিল৷ ধর্মান্তরিতরা নিজেদেরকে স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে দাবী করছে এমন নজীরও হয়তো ইতিহাসে পাওয়া যাবে না, এবং দ্বিজাতি তত্ত্ব একবার মেনে নিলে বহুজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে কেটে টুকরো টুকরো করবার দাবী উঠবে_এসবই সত্য৷ কিন্তু ওই যে ভারতীয় মুসলমানদেরকে 'ধর্মান্তরিত' বলা এটা মুসলমানদেরকে যে আহত করবে তাতে সন্দেহ ছিল না, বিশেষ করে ঘটনাটা যেহেতু সত্য এবং নতুন ধর্মগ্রহণকারীরা যখন স্বভাবতঃই থাকেন স্পর্শকাতর৷ আহত করেছেও বটে৷
গান্ধী একদিকে রামরাজ্যের কথা বলছেন, অন্যদিকে মুসলমানদেরকে অভিহিত করছেন ধর্মান্তরিত হিন্দু বলে, এতে সামপ্রদায়িক বিরোধ সৃষ্টিকারীদেরকেই সহায়তা করা হয়েছে৷ আমরা সকলেই এক মায়ের সন্তান, ভারতবর্ষকে এক রাখার প েএমন যুক্তি মুসলমানদের কাছে ততদিনে অগ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে, কেননা ইতিমধ্যেই তারা 'বন্দে মাতরমে'র রণধ্বনি শুনে বিচলিত হয়েছে, এবং নিজেদেরকে তারা যেহেতু ধমর্ীয় ভাবে হিন্দুদের থেকে স্বতন্ত্র হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত, তাই ওই স্বাতন্ত্র্য নিয়ে গর্বিতও বোধ করেছে৷ তাছাড়া ধর্মান্তরিতই হোক আর যাই হোক মুসলমানরা যে গত বছর ধরে ভারত শাসন করেছে এই অভিমানও তো তাদের নিজেদের মধ্যে ছিল৷
বস্তুত গান্ধী একটি মোহের ভেতর ছিলেন৷ তিনি ভারতবর্ষের ঐক্যে বিশ্বাস করতেন এবং তাঁর দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন৷ তাঁর ধারণা ছিল ভারতবর্ষ এক জাতির দেশ৷ প্রথম দিকে জিন্নাহও তেমনটিই মনে করতেন৷ ভারতবর্ষে দু'টি প্রধান সমপ্রদায় রয়েছে, কিন্তু তারা সমপ্রদায়ই, স্বতন্ত্র জাতি নয়, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এই ধারণাতে জিন্নাহরও সম্মতি ছিল, এবং তিনি সে-অর্থেই জাতীয়তাবাদী ছিলেন যে-ভাবে গান্ধী তাঁকে দেখতে পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন৷ কিন্তু ত্রিশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে জিন্নাহ মুসলমান সমপ্রদায়কে একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসাবে দেখতে শুরু করলেন, এবং এই নতুন জাতীয়তাবাদের প্রধান মুখপাত্রে পরিণত হলেন৷
গান্ধীর প েবলা সম্ভব ছিল না যে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিটা আসলে কি, নতুন কালের জিন্নাহর প েসেই অসুবিধাটা কিন্তু ছিল না, তিনি সরাসরিই বলতে পারলেন তাঁর জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হচ্ছে ধর্ম৷ কিন্তু ধর্ম তো জাতীয়তাবাদের নিয়ামক হতে পারে না, একটি উপাদান হতে পারে যদিও৷ জাতীয়তাবাদের আরো উপাদান আছে_যেমন স্থান ও বর্ণ, যে-বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ভাষা, যে-হিসাবে বাঙালী, পাঞ্জাবী, মাদ্রাজী, তামিল_এরা ভিন্ন ভিন্ন জাতি৷ একটি জাতির ভেতর ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ থাকতে পারে৷ থাকেও৷ জিন্নাহ নিজেই এক সময়ে স্বীকার করেছেন যে, ভারতবর্ষে বিশটির মতো জাতি বসবাস করতো; যে-স্বীকৃতিতে বোঝা যাচ্ছিল তখন তিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথাই ভাবছিলেন৷ জিন্নাহর এই বক্তব্য সম্পূর্ণ সঠিক যে ভারতবর্ষ কখনোই এক জাতির দেশ ছিল না, ব্রিটিশ শাসকেরা এসে প্রশাসনিক ভাবে তাদেরকে এক করেছিল মাত্র৷ আসলে ভারতবর্ষ হচ্ছে একটি মহাদেশের মতো, রাশিয়াকে বাইরে রাখলে ইউরোপের যে-আয়তন, ভারতবর্ষের আয়তনও তার সমানই, এবং ইউরোপে যেমন জার্মান, ফরাসী, ইটালীয়ান, স্প্যানিশ আলাদা আলাদা জাতির বসবাস, ভারতবর্ষেও তেমনি অনেক ক'টি জাতি বাস করতো৷
গান্ধী মনে করতেন তারা সবাই এক জাতি, কেননা তারা সকলেই একই মাতৃভূমির সন্তান৷ 'বন্দে মাতরম' যদিও তাঁর নিজের রণধ্বনি ছিল না, এবং হিন্দুমহাসভার সাভারকারের মতো যদিও তিনি পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমির ধারণায় বিশ্বাস করতেন না, তবু মাতৃভূমির সন্তানেরা যে একটি অভিন্ন জাতি এটা তিনি মনে করতেন৷ কিন্তু এক জায়গায় থাকলেই যে এক জাতি হবে এমন তো কথা নেই, একই রাষ্ট্রের ভেতর বিভিন্ন জাতি থাকতে পারে, এবং থাকেও৷ ভূমি তাই ঐক্যের প্রধান ভিত্তি হতে পারে না৷ ভিত্তিটা তাহলে কি? সেটি গান্ধীর প েস্পষ্ট করে বলা সম্ভব ছিল না৷ রবীন্দ্রনাথও ভারতীয়দের ঐক্যে বিশ্বাস করতেন, ভারতীয়দের তিনি একটি মহাজাতি হিসাবে দেখতে পেতেন, কিন্তু তাঁর সে-দেখাতেও অস্পষ্টতা ছিল, কেননা ঐক্যের সূত্রটা কি সেটা তাঁর কাছেও যে পরিষ্কার ছিল তা নয়৷ তাঁকে আমরা বলতে শুনেছি ঐক্যটা হচ্ছে মনুষ্যত্বের, যে-কথা কবির প েবলা সম্ভব, কিন্তু রাজনীতিকের প েনয়৷ গান্ধী সহজ হিন্দী ভাষাকে (যে-ভাষা উদর্ুর কাছাকাছি এবং যার জন্য দেবনাগরী ও উদর্ু উভয় লিপিই ব্যবহার করা যেতে পারে) ঐক্যের একটি ভিত হিসাবে গ্রহণ করতে চেয়েছেন, যেমন ঠিক উল্টো অবস্থানে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ চেয়েছিলেন উদর্ুকে মুসলিম জাতীয়তাবাদের জন্য ঐক্যের অন্যতম সূত্র হিসাবে ব্যবহার করবেন৷ বঙ্কিমচন্দ্রের কথা মনে পড়ে; ভারতকে কিভাবে এক রাখা যায় সে-নিয়ে তিনিও ভেবেছেন, এবং ইংরেজী ভাষা যে বন্ধনের গ্রন্থি হতে পারে এরকমও বলেছেন৷
গান্ধীর মূল্যায়নের প্রশ্নে জিন্নাহর কথা আসে, এবং আসবেই৷ জিন্নাহ না থাকলেও গান্ধী থাকতেন, কিন্তু গান্ধী না-থাকলে জিন্নাহ হয়তো ভিন্ন ধরনের ও মাপের মানুষ হতেন৷ গান্ধীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হওয়ার দরুন জিন্নাহর উচ্চতা ও মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে_মুসলিমদের কাছে তো বটেই, ব্রিটিশের কাছে, এমনকি হিন্দু সমপ্রদায়ের মানুষদের কাছেও৷ জিন্নাহর 'কায়েদে আজম' উপাধি গান্ধীর কারণেই গ্রাহ্য হয়৷ নিজের ধৈর্যশক্তি দেখে নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করে দেশভাগের অল্প আগে ১৯৪৪ সালের এক মাসে (সেপ্টেম্বর ১৯৪৪) গান্ধী জিন্নাহর বোম্বাই শহরের বাসভবনে চৌদ্দ বার দেখা করেন, তাতে কংগ্রেসের নেতারা বিরক্ত হয়েছেন, কিন্তু গান্ধী নিবৃত্ত হন নি৷২৫৪ তাঁদের ভাষাও ছিল ভিন্ন ভিন্ন৷ ইংরেজীতেই কথোপকথন হতো, কিন্তু গান্ধী চিঠিপত্র গুজরাটী ভাষাতেও লিখতেন, জিন্নাহকেও লিখেছেন, যদিও সঙ্গে ইংরেজী অনুবাদ দিতে ভোলেন নি৷ ১৯৪৬ সামপ্রদায়িক দাঙ্গা থামানোর আবেদন জানিয়ে যে যৌথ আবেদনপত্রটি প্রচার করা হয় তাতে জিন্নাহ স্বার করেছেন ইংরেজীতে, গান্ধী করেছেন উদর্ু, হিন্দী ও ইংরেজীতে৷২৫৫ জনসভায় জিন্নাহ উদর্ুতে বক্তৃতা করছেন এমনটি কখনো ঘটেনি, যদিও গান্ধী প্রায় সবসময়েই বক্তৃতা করতেন হিন্দুস্থানীতে৷
কিন্তু তাঁদের ইংরেজী ব্যবহার যে এক রকমের ছিল তা নয়৷ গান্ধীর ইংরেজী তাঁর কণ্ঠস্বরের মতোই_নম্র ও বিনয়ী; জিন্নাহর ইংরেজী সে-তুলনায় বলিষ্ঠ, প্রয়োজনে রুষ্ট, কখনো কখনো নাটকীয়৷ ত্রিশের দশকে লেখা এক সুপরিচিত চিঠিতে জিন্নাহ গান্ধীকে বলছেন, “It is quite clear that you represent noboly else but Hindus, and as long as you do not realize your true position and realities, it is very difficult for me to argue with you.”২৫৬ এমন কঠিন ভাষা আর যাঁর পইে ব্যবহার করা সম্ভব হোক না কেন, গান্ধীর প েব্যবহার করা সম্ভবপর ছিল না৷ জিন্নাহ মওলানা আজাদকে এক টেলিগ্রামে show boy President of Congress বলে যে-ভাবে সম্বোধন করেছেন তেমন উক্তিও গান্ধীর জন্য অকল্পনীয় হবারই কথা৷
গান্ধী ও জিন্নাহর ভেতর ভাষাব্যবহারে পার্থক্যের দৃষ্টান্ত অত্যন্ত সহজলভ্য৷ আরো একটি দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক৷ প্যালেস্টাইনে ইহুদীবসতি স্থাপনের কথা যখন শোনা যাচ্ছিল তখন, ১৯৩৮ সালে গান্ধী বলছেন,
The cry for the national home for the Jews does not make much appeal to me... Why should the Jews not, like other peoples of earth, make that country their home where they are born and where they earn their livelihood.
এ হচ্ছে হুবহু সেই যুক্তি যাতে ভারত হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানদের মাতৃভূমি, যেখানে তাদের বসবাস করা উচিত৷ খিলাফত্ আন্দোলনের সময়ে মুসলমানদের মধ্যে হিজরত্ করার যে আওয়াজ উঠেছিল, এখানে গান্ধী প্রকারান্তে সে-মনোভাবের নিন্দাই করছেন, অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ভাষায়৷ তিনি বলেছেন,
Palestine belongs the Arabs in the same sense that England belongs to the English, or France belongs to the French. It is wrong and inhuman to impose the Jews on the Arabs.২৫৭
প্রশ্নটা ধর্মের নয়, প্রশ্নটা জাতীয়তাবাদের৷ বলা যায় ধর্মনিরপে আরব জাতীয়তাবাদের৷
কয়েক বছর পরে প্যালেস্টাইনে যখন সত্যি সত্যি ইহুদী বসতি স্থাপন শুরু হয়ে গেছে তখন ১৯৪৫ সালে প্রধানমন্ত্রী এটলীর কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে জিন্নাহ ওই ঘটনার প্রতিবাদ করছেন এই ভাষায়,
It is my duty to inform you that any surrender to appease Jewry at the sacrifice of the Arabs would be deeply resented and vehemently resisted by the Muslim world and Muslim India and its consequences would be disastrous.২৫৮
সুরটা একেবারেই ভিন্ন৷ যেন একজন রাষ্ট্রপ্রধান অপর একজন রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠাচ্ছেন৷ মুসলিম জগত্ এবং মুসলিম ভারতের প্রসঙ্গ এসে গেছে, গান্ধী যা নিয়ে ভাবেন নি, ভাববেনও না৷
গান্ধী ও জিন্নাহ পরস্পরের কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে গেছেন৷ একই বছরে, ১৯৪৮ সালে তাঁদের মৃতু্য হয়, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে, কিন্তু তখন তাঁরা দুই রাষ্ট্রের বাসিন্দা৷ জিন্নাহ তাঁর নতুন রাষ্ট্র সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, আর গান্ধী অনশন করছেন সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের মানুষদেরকে বাঁচানোর জন্য এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানের পাওনা ৫৫ কোটি টাকা শোধ করে দেওয়ার জন্য ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে৷ তাঁদের দু'জনের মৃতু্যর ঘটনা এই দুই নেতার ভেতরকার পার্থক্যটাকে যতটা পরিষ্কার ভাবে তুলে ধরেছে, অন্যকোনো কিছুই তেমনটা পারে নি৷ পোশাকে পরিচ্ছদে, জীবনযাত্রায়, ভাষাব্যবহার, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁরা আলাদা ছিলেন, মৃতু্যতেও তাঁরা পৃথক৷ গান্ধী নিহত হলেন প্রকাশ্য জনসমাবেশে, শহীদ হলেন বলা যায়; জিন্নাহ শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন গোপনে, প্রায় অবহেলায়, এবং য়রোগে, যে-রোগকে তিনি গোপন রেখেছিলেন, তাঁর চিকিত্সকরাও কখনো প্রকাশ করেন নি, তাঁরই অনুরোধে৷ গান্ধী সবকিছুই প্রকাশ করতে চাইতেন, জিন্নাহর প্রবণতা ছিল গোপন রাখার; গান্ধীর ভাবমূর্তি সর্বদাই হাস্যোজ্জ্বল, জিন্নাহ সর্বণ গম্ভীর৷ জিন্নাহর স্মিত হাস্য একান্ত নিকটজনেরা দেখেছেন, কিন্তু গান্ধীর মতো তিনি হাসতে ভালোবাসতেন বলে জানা যায় না৷ জিন্নাহর কান্নার ঘটনাও বিরল৷ তবে মৃতু্যর একেবারে দ্বারপ্রান্তে যখন পেঁৗছেছেন, জিন্নাহ চোখে তখন অশ্রু দেখা গেছে৷ সে-অশ্রুপাত যে কেবল রোগের যন্ত্রণায় ঘটেছে তা নয়, ভারতীয় মুসলমানদেরকে মুক্ত করতে গিয়ে তাঁদেরকে দুই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে সরাসরি বিভক্ত এবং বিরাট এক অংশকে বাস্তুচু্যত এবং তথাকথিত হিন্দুস্থানের নাগরিক হিসাবে ফেলে রেখে আসার বেদনাবোধ থেকেও ঘটে থাকবে৷ গান্ধীর পরাজয়ের মধ্যে জয় ছিল, জিন্নাহর জয়ের মধ্যে
অন্তর্নিহিত ছিল পরাজয়৷
[ চলবে ]
তথ্যসূত্র
২৪৩. Stanley Wolpert, প্রাগুক্ত, p 206
২৪৪. ঐ, p 208
২৪৫. অমলেশ ত্রিপাঠী, স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, প্রাগুক্ত, পৃ ৩৭৯
২৪৬. Stanley Wolpert, প্রাগুক্ত, p 207২৪৭. Rajmohan Gandhi, Understanding The Muslim Mind, New Delhi, p 120২৪৮. অমলেশ ত্রিপাঠী, স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, প্রাগুক্ত, পৃ ৪৯৩, ৪৮৯ ও ৪৯৭
২৪৯. Stanley Wolpert, প্রাগুক্ত, p 206২৫০. D. G. Tendulkar, প্রাগুক্ত, volume iv, p 302
২৫১. Stanley Wolpert,, প্রাগুক্ত, p 38
২৫২. Rajmohan Gandhi, প্রাগুক্ত, p 111২৫৩. Stanley Wolpert, প্রাগুক্ত, pp 232-33
২৫৪. Rajmohan Gandhi, প্রাগুক্ত, p 161২৫৫. ঐ, p 173২৫৬. D. G. Tendulkar, প্রাগুক্ত, p 220
২৫৭. ঐ, p 379
২৫৮. Stanley Wolpert, প্রাগুক্ত, pp 250-51