সাহিত্যালোচনা
কিরণ দেশাইয়ের বুকার অর্জন
মাহমুদ হাসান

ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সাহিত্য-সম্মান বুকার পুরস্কার এবছর (২০০৬) অর্জন করলেন আর একজন বিদেশী৷ তিনি ভারতীয় লেখিকা কিরণ দেশাই এবং যে-উপন্যাসটির জন্য এ-পুরস্কারটি পান সেটি হচ্ছে The Inheritance of Loss ৷ কিরণ দেশাইয়ের সাহিত্যকর্মের গুণাগুণ আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়৷ আমরা আজ কথা বলব ইংরেজি ভাষায় রচিত উপন্যাসের শীর্ষস্থানে বিদেশীদের (ইংরেজ নন এমন ব্যক্তিদের) অবাধ যাতায়াত নিয়ে৷
গোড়ার দিকে বিদেশীদের মধ্যে বুকার অর্জন করেন ভারতীয় লেখক সালমান রুশদি৷ তারপর এ-পুরস্কার পান শ্রীলঙ্কান-কানাডীয় লেখক মাইকেল ওনডাট্জি৷ পরে ব্রিটেন ও কমনওয়েলথের যে-লেখকেরা (তাঁরাই পড়েন বুকার পাওয়া-না-পাওয়ার এখতিয়ারে) উপন্যাসে শীর্ষস্থান অধিকার করে পুরস্কারটি অর্জন করেন তাঁরা হচ্ছেন নাইজিরীয় লেখক বেন ওক্রি, ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায় এবং এখন কিরণ দেশাই৷
এ-তালিকা আরো দীর্ঘ হবে যদি আমরা বুকারের ুদ্র-তালিকাভুক্ত লেখকদের নামের দিকে তাকাই৷ এ-তালিকার মধ্যে রয়েছেন ব্রিটেনে-জন্মানো লেখিকা মনিকা আলী ও কিরণ দেশাইয়ের মা অনিতা দেশাই (যিনি তিনবার তালিকাভুক্ত হয়েছেন)৷ বুকার পুরস্কারের বাইরেও কমনওয়েলথের অনেক সাহিত্যিক আছেন যাঁদের মাতৃভাষা ইংরেজি নয়, কিন্তু ইংরেজিতে লিখে সৃষ্টিশীল লেখক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন৷ সত্যি বলতে কি, ইংরেজি ভাষায় ইংরেজদের সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মে বেশ কিছুদিন থেকে দেখা-যায় এক দুঃখজনক অবস্থা৷
প্রায় ৩৫ বছর আগে লন্ডনের ICA -তে (Institute of Contemporary Arts) একটি সেমিনারে আমি উপস্থিত ছিলাম যেখানে এই বিষয়টির উপর বিস্তারিত আলোচনা হয়৷ সেমিনারের আলোচ্য বিষয় ছিল আজকের দিনে ইংরেজদের দ্বারা রচিত ইংরেজি ভাষায় সৃষ্টিশীল সাহিত্যের বাস্তব অবস্থা৷ সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপিকা৷ প্রথমেই তিনি শুরু করেন শ্রোতাদের প্রতি একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে, আমাদের হয়েছে কী? তারপর তিনি আসেন আসল কথায়৷ তিনি বলেন, চলি্লশ বছরের মধ্যে, সম্ভাব্য ব্যতিক্রম ডি.এইচ.লরেন্সকে বাদ দিলে, ইংরেজি ভাষায় সবচেয়ে ভালো যা সৃষ্টি হয়েছে তা ইংল্যান্ডের বাইরে, হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর নয় তো আয়ারল্যান্ডে৷ এরপর আলোচনায় এল যুক্তরাষ্ট্রের লেখকদের নাম৷ উপন্যাসে হেমিংওয়ে, ফকনার, নাটকে আর্থার মিলার, টেনেসি উইলিয়াম্স্৷
কেমব্রিজের অধ্যাপিকা আর একটি নাম করলেন এবং বললেন, 'আজ ইংরেজি গদ্যের সমস্ত তেজোদীপ্তি যেন আটকা পড়ে রয়েছে নর্মান মেলারের লেখায়৷' এরপর ঐ অধ্যাপিকা সবার মধ্যে আরো আনলেন বীট্ কবি এ্যালেন গিনস্বার্গের নাম এবং বললেন, 'এমন ধরনের শক্তিশালী কবি ইংল্যান্ডে নেই৷'
যুক্তরাষ্ট্রের লেখক-কবিদের পর আমরা গেলাম আয়ারল্যান্ডে৷ এবং অতি-সহজেই আমরা নাম পেয়ে গেলাম৷ ইয়েটস্, বার্নাড শ', সিংগ্ ও জেমস জয়েস৷ এঁদের সমক কোনো নাম ইংল্যান্ডের কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেল না৷
শ্রোতাদের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগের বেশী ছিলেন খোদ ইংরেজ৷ ওঁরা সবাই নাম খোঁজার জন্য পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন৷ একজন ীণকণ্ঠে বললেন, 'টি.এস.এলিয়ট৷' সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল এলিয়ট এসেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে৷ এরপর নাম বলা হল অডেনের৷ এর জবাব দিলেন সভার মূল বক্তা৷ তিনি বললেন, 'এ ব্যাপারে অডেনকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলবেন তাঁর লেখার অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে৷' এমনকি বাড়ির আরো কাছে এসে ওয়েলসে আমরা পাই ডিলান টমাসকে, যাঁর সমান মাপের কবি ইংল্যান্ডে নেই এবং স্কটল্যান্ডের লুই ম্যাকনীসের মত কবি ইংল্যান্ডে আছেন কি?
এরপর নাম নিয়ে ফিসফিসানিও সভায় থেমে গেল৷ এখানে সময়ের দিকে আর একটু সামনে এগিয়ে এসে কেউ হয়তো টেড হিউজ-এর নাম আনতে পারেন৷ এর জবাবে বলা যায় সাহিত্যজগতে টেড হিউজ তখনো সুপরিচিত হন নি৷ তবে নাম যখন উঠলো তখন বলা যায় টেড হিউজ আয়ারল্যান্ডের সীমাস হীনিকে মোকাবিলা করার মত কবি নন৷ এখানে টেড হিউজ প্রসঙ্গে আর একটি নাম আমি না-এনে আমি পারছি না৷ সে-নামটি হচ্ছে টেউ হিউজ-এর একসময়কার স্ত্রী মার্কিন মহিলা সিলভিয়া প্ল্যাথ৷ দু'জনেরই কয়েকটি কবিতা আমি বাংলায় অনুবাদ করেছি৷ টেউ হিউজকে আমার সিলভিয়া প্ল্যাথের চেয়ে উন্নততর কবি বলে মনে হয় নি৷ ঘটনা হিসাবে এখানে জানানো যায় সিলভিয়া প্ল্যাথ তিরিশ বছর বয়সে মারা যান, আসলে পারিবারিক অশান্তির কারণে আত্মহত্যা করেন৷ আমার মনে হয় ইংরেজ হবার সুবাদে ইংল্যান্ডে টেড হিউজ-এর নাম এরপর তাঁর একসময়কার স্ত্রীকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে যায়৷
এতণ সভায় আমাদের কথাবার্তা হচ্ছিল ইংল্যান্ডের সৃষ্টিশীল ইংরেজি সাহিত্য এবং মূলতঃ তার করুণ অবস্থা নিয়ে৷ অধ্যাপিকা এবার প্রশ্ন করলেন, এ-অবস্থার কারণ কী? প্রশ্নের জবাব তিনি নিজেই দিলেন৷ বললেন, হতে পারে, যে-কোনো জিনিসের মত সাহিত্যেরও উত্থান-পতন আছে৷ তাই ইংল্যান্ডের সাহিত্য একসময় ছিল উঁচুতে আর ইতিহাসের নিয়ম অনুযায়ী এখন নেমে গেছে নিচে৷ কিন্তু এ-ব্যাখ্যা বক্তার নিজেরই মনঃপূত হল না৷ তিনি বললেন, কিন্তু আসল কারণ বোধহয় এই যে, ইংরেজ জাতি এখন লেখকদের আর অনুপ্রাণিত করতে পারছে না৷ ফলে অবশ্যম্ভাবী পরিণতি!
সাহিত্যের একটি ভিন্ন আঙ্গিনায় প্রবেশ করে আমি আমার এ-লেখাটি শেষ করতে চাই, অবশ্য মনে হয় না বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হবে৷ প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে (অর্থাত্‍ লন্ডনে আসার আগে) ঢাকায় আমি ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে পত্র-পত্রিকা পড়তাম৷ কিছু নাম আমার এখনো মনে আছে_যেমন Quarterly Review, Universities Quarterly, Cornhill, London Magazine, Encounter এগুলোর একটা বিশেষ ভূমিকা ছিল৷ পত্রিকাগুলোতে আমরা সাহিত্য এবং সাহিত্যিকদের সম্পর্কে অনেক খবর পেতাম যা পাঠ্যপুস্তক বা পাঠ্যপুস্তক-সংক্রান্ত গ্রন্থে পাওয়া যেত না৷
দুঃখের কথা, একশো-দেড়শো বছর পর ওসব পত্রিকার বেশীর ভাগ বন্ধ হয়ে গেছে৷ তার কারণ সম্পাদকেরা আর ওসব ম্যাগাজিন প্রকাশে আগ্রহী নন৷ তাঁরা বরঞ্চ ঢুকতে চান প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর Think-tank -এ৷ সঙ্গে সঙ্গে পদক ও খেতাবের প্রতি তাঁদের আগ্রহ বেশী৷ পত্রিকা চালানোর চেয়ে সেটাই তাঁরা বেশী পছন্দ করেন৷ স্বীকার করতেই হবে, ঢাকা থেকে প্রকাশিত নতুন দিগন্তের মত ইংরেজী ভাষায় কোনো পত্রিকা সামপ্রতিক কালে লন্ডনে আমার চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না৷
ইংরেজি সাহিত্য বোধহয় একসময় ছিল বিশ্বে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অবদান৷ আজ তার এ-সঙ্গীন অবস্থা অতিদুঃখজনক৷ আমার সন্দেহ হয় শিল্প-সাহিত্যে অবদান রাখতে পারছে না বলেই হয়তো তারা দুনিয়ার সব রাজনৈতিক অঘটন ঘটিয়ে বেড়াচ্ছে_এ ভয়ংকর পথেই নাম হবে ভেবে!



  © Notun Diganta 2007.
All Rights Reserved
Powered by headoffice