১৩২০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত কবি গোবিন্দচন্দ্র দাসের (১৮৫৫-১৯১৮) 'কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার প্রতি বিবাহযোগ্যা বালিকার উক্তি'র শুরুর স্তবকটি এমন :
বাবা! থাকুক আমার বিয়ে,
চাইনে আমি এম, এম, বি, এ, কিনতে হয় যা টাকা দিয়ে,
ছাগল গরুর মত যাদের, ছেলের হাটে গিয়ে,
সোনার চেইন সোনার ঘড়ি, গবর্্ব যাদের গলায় পরি,
অমন পশু কিনোনাক কানাকড়ি দিয়ে!
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুতেই এমন একটি উচ্চারণ থেকে স্পষ্ট হয় বাঙালী সে-সময়ে পণ-প্রথা নামের অভিশাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল৷ ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের 'দেনাপাওনা' গল্পের কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা রামসুন্দর বনেদী ঘরের রায়বাহাদুরের পুত্রের জন্য যখন 'বাঁধা দিয়া, বিক্রয় করিয়া' প্রতিশ্রুতির দশ হাজার টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হন, তখন নিরুপমার চেলি-চন্দন-গহনা পরিহিত রূপটি রা পেয়েছিল পাত্রের অবাধ্যতার কারণেই৷ 'কেনাবেচা-দরদামের কথা আমি বুঝি না, বিবাহ করিতে আসিয়াছি বিবাহ করিয়া যাইব'_এই ছিল পাত্রের বক্তব্য৷ কিন্তু বিবাহযাত্রায় নিরুপমাকে রা করলেও স্ত্রীর বাকি জীবনকে সে বন্দী করে রেখেছিল৷
মাদারীপুরের মেয়ে স্নেহলতার কি নিরুপমার কাহিনীটি পড়া ছিল? বাংলায় রামায়ণ, মহাভারত, গীতা পড়া ছিল; তবে 'দেনাপাওনা' পড়া না থাকলেও নিরুপমার যে ভবিতব্য অনুমান করার মত বুদ্ধি ও ভবিষ্যত্ সিদ্ধান্ত নেবার শক্তি ছিল এমনটি সহজেই মনে করা যায়৷
পাঁচ ছেলের পর নিরুপমা৷ আর স্নেহলতা ছিল বাবা হরেন্দ্রচন্দ্রের প্রথম সন্তান৷ নগদ ৮০০ টাকা এবং ১২০০ টাকার অলঙ্কার শর্তে বাবা বিয়ে ঠিক করলেও সেই অর্থ-অলঙ্কার জোগাড়ের কষ্ট থেকে বাবাকে মুক্তি দিতেই কি স্নেহলতার আত্মত্যাগ? ১৯১৪ সালের ৩০ জানুয়ারী (মতান্তরে ৩১ জানুয়ারী) শাড়িতে আগুন লাগিয়ে স্নেহলতা আত্মহত্যা করেন৷ সেই স্নেহলতার জীবনী, সে-সংক্রান্ত পত্র-পত্রিকার সংবাদ, সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি নিয়েই মালেকা বেগম সম্পাদিত গ্রন্থ স্নেহলতা৷
স্নেহলতা-র সম্পাদক মালেকা বেগম ভূমিকাতে ('স্নেহলতার অনুসন্ধানে') জানিয়েছেন কীভাবে স্নেহলতা নামের নারীটি ক্রমে ক্রমে সম্পাদককে ব্রতী করে তুলেছে
স্নেহলতা, সম্পাদনা মালেকা বেগম, সূচীপত্র, ফেব্রুয়ারী ২০০৬, ঢাকা, ১৫০ টাকা
বর্তমান গ্রন্থটি প্রণয়নে৷ ১৯৬০ সালে তাঁর পাঠ ঘটে রবীন্দ্রনাথের 'স্ত্রীর পত্র' গল্পটি, যেটিতে স্নেহলতার আত্মাহুতির ছায়াপাত ঘটেছে বলে তাঁকে জানান অধ্যাপক (শহীদ) মুনীর চৌধুরী৷ ১৯৮৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত চিত্রদেবের অন্তঃপুরের আত্মকথা বইয়ে তিনি উল্লেখ পান ঐ স্নেহলতার৷ ১৯৯৬-এ দেশ পত্রিকায় ড. স্বপন বসুর প্রবন্ধ 'পুড়বে মেয়ে উড়বে ছাই' সম্পাদককে অনেকখানি আলোর সন্ধান দেয়৷
স্নেহলতার বিবাহের তারিখটি ছিল ফাল্গুনের ১৪তম দিন৷ আর তিনি আত্মহত্যা করেন ১৬ মাঘ৷ পরিষ্কার শাড়ি পরে, পায়ে আলতা লাগিয়ে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগান নিজের শরীরে৷ তাঁর এ আত্মাহুতির ঘটনা শুধু বঙ্গবাসীকে আলোড়িত করে নি, পণপ্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পথনির্দেশও করে দিয়েছিল৷ প্রায় শত বছর পরও শ্বশুর বাড়ির পণের টাকা পরিশোধ করতে না-পারায় নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা আমরা পড়ে থাকি পত্রপত্রিকায়৷
'সম্পাদকের কথা'র বাইরে বইটিতে দু'টি অংশ রয়েছে, ১৩২০ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত রেবতীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহলতা গ্রন্থটির পুনমর্ুদ্রণ, এবং স্নেহলতার আত্মাহুতি সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া৷ প্রতিক্রিয়াগুলোকে চারটি আলাদা অংশে উপস্থাপন করা হয়েছে; পত্রপত্রিকায় প্রতিক্রিয়া, প্রবন্ধে প্রতিক্রিয়া, কবিতায় প্রতিক্রিয়া এবং ইংরেজি ভাষায় প্রতিক্রিয়া৷
স্নেহলতা'র জীবনী বিষয়ে কয়েকটি গরমিল অবশ্য বর্তমান গ্রন্থে ল্য করা যায়৷ যেমন স্নেহলতার বাড়ির গ্রামটির নাম৷ ভূমিকাতে বলা আছে বালিচাড়া (পৃ ১০), রেবতীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় একই বানানের গ্রামটির নাম উল্লেখ করলেও 'পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত' অংশে সঞ্জীবনী থেকে গৃহীত স্নেহলতায় গ্রামের নামটি 'কাগদি' বলে উলি্লখিত৷ সম্পাদক জানিয়েছেন স্নেহলতা তাঁর বাবা-মা'র প্রথম সন্তান (পৃ ১০); রেবতীকান্ত'র লেখায় বোঝা যায় তিনি জ্যেষ্ঠা কন্যা হলেও প্রথম সন্তান ছিলেন না; সম্পাদক লিখেছেন পাত্রপরে দাবি ছিল ৮০০ টাকা নগদ আর ১২০০ টাকার অলঙ্কার (পৃ ১০); অন্যত্র তথ্যটি এমন, নগদ ৯০০ ও অলঙ্কারের ১২০০ টাকা (পৃ ৩৯)৷ এসকল তথ্যবিভ্রান্তি দূর হলে তা পাঠককে স্বস্তি দিত অনেক বেশি৷ যেমন প্রয়োজন ছিল মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত স্নেহলতা বইটির প্রকাশকাল উল্লেখ করা৷ যদি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত ঐ গ্রন্থটি ১৯১৪ সালের রেবতীকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশিত গ্রন্থের কাছাকাছি সময়ে বা কিছু পরেও প্রকাশিত হয়ে থাকে তবে অধিকতর স্পষ্ট হতো সেটি জানানো যে, স্নেহলতার ঘটনাটি বাংলা অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও কতদূর ব্যাপৃত হয়েছিল৷
রেবতীকান্ত যে জীবনীগ্রন্থটি লিখেছিলেন তা ছিল একটি সামাজিক আহ্বান৷ গ্রন্থটির ভাগগুলো ছিল নিম্নরূপ, প্রথম অধ্যায় : জন্মভূমি, বংশপরিচয়, বাল্যজীবন ও চরিত্রের বাহ্যবিকাশ; দ্বিতীয় অধ্যায় : বিবাহের সম্বন্ধ ও আত্মোত্সর্গে সংকল্প; তৃতীয় অধ্যায় : স্নেহলতার আত্মবলির ফল ও দেশবাসীর কর্তব্য; চতুর্থ অধ্যায় : স্নেহলতার মৃতু্যতে ভগবানের ইঙ্গিত, এবং শেষটি হলো কাজের কথা৷ শেষ অংশটিতে লেখক বিনাপণে বিবাহ-বিষয়ে যুবকদেরকে উত্সাহিত করার জন্য আগ্রহীদের সংপ্তি বংশপরিচয়সহ একটি নামের তালিকা তৈরী করে তা প্রচারের জন্য আহ্বান জানান৷ লেখকের ভাষায়:
আমরা দেশের সর্বসাধারণকে অনুরোধ করিতেছি, তাহারা প্রতি নগরে নগরে, জেলায় জেলায় এইরূপ নামের লিস্ট সংগ্রহ করিয়া সবর্্বত্র বিতরণের বন্দোবস্ত করুন৷ তাহাতে এ বিষয়ের প্রকৃত কাজ যথেষ্ট হইবে৷ (পৃ ৩৫)
রেবতীকান্তের জীবনীর সাথে যেসকল পত্রপত্রিকায় স্নেহলতার ঘটনার কথা নিয়ে সংবাদ-প্রবন্ধ নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল সেগুলো হলো : ভারতী, ভারতবর্ষ, বসুমতী, হিতবাদী, মাহিষ্য মহিলা, ব্রাহ্মসমাজ, বামাবোধিনী, অমৃতবাজার, প্রবাসী, প্রজাপতি, বেঙ্গলী, মহিলা,
The Modern Review এ তালিকা থেকে সুস্পষ্ট হয় স্নেহলতার আত্মদানের ঘটনাটি কত গভীরভাবে মানুষের মনে সাড়া জাগিয়েছিল৷ সে-সময়ে কোনো কোনো সমাজসংরক হয়তো পণপ্রখা প্রতিরোধের ব্যাপারে যেসকল যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন তা আধুনিক দৃষ্টিতে অনাধুনিক, কিন্তু তারপরও স্বীকার করতেই হবে এ ঘটনাটি বাঙালীর চিন্তা জগতে তুলেছিল এক ব্যাপক আলোড়ন৷ স্নেহলতার ঘটনাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কলমে সৃষ্টি করেছিল 'স্ত্রীর পত্র'-র মত (১৯১৪) এক গল্পের৷ বাঙালী বুদ্ধিজীবী সমাজের এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল তার কিছু উদ্ধৃতি আমাদের সে প্রতিক্রিয়ার চিত্রটি বুঝতে সাহায্য করবে :
১. আমি যে আমার কন্যাকে নির্দ্দিষ্ট বয়সের উপরে আমার ঘরে রাখিতে পারি না, রাখিলে আমার মাথা যায়, সুতরাং শত আদরের ধনকেও যেমন করিয়া হউক ঘরের বাহির করিতে হইবে; যে তাহার আদর জানে না, যে তাহাকে চায় না, তাহারই হাতে দিতে হইবে; সবর্্বস্বপণ করিয়াও আমি ইহা করিতে বাধ্য; (পৃ ৭৮)
২. মনু বলিয়াছেন, কন্যা চিরকুমারী থাকে তাহাও স্বীকার, তবুও অপাত্রে কন্যা দান করিবে না৷ যে আমার কন্যাকে চায় না, টাকা চায়...সেই অর্থপিশাচ কি আমার কন্যার সুপাত্র? (পৃ ৭৬)
আমাদের মনে রাখা দরকার স্নেহলতার ঘটনাটির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কলকাতায় অন্তত ১০/১২টি সভা হয়েছিল৷ সে-ঘটনার পর শতবর্ষ অতিক্রান্ত প্রায়৷ আজ এমন একটি ঘটনার কাছাকাছি কোন ঘটনাও যদি ঘটে তবে তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ অন্তত ১০/১২ হাজার সভা যদি না-হয় তাহলে অনুমান করা যায় বাঙালী চিন্তাচেতনায় কোন পর্যায়ে আছে৷
যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম বাঙালী প্রতিবাদী স্নেহলতাকে নিয়ে মালেকা বেগম যে পরিশ্রমটি করেছেন তার জন্য তিনি ধন্যবাদার্হ৷ মাদারীপুরের পালং নদীর তীরে বালিচাড়া নামের যে-গ্রামে স্নেহলতা ১১ বছর কাটিয়েছেন সেখানে প্রতিষ্ঠা হোক যৌতুকবিরোধী স্মৃতিস্তম্ভ৷