গল্প
মৃতু্য কিংবা হিজলফুলকথা
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর

হাসপাতালের সদর দরজা থেকে সোজা দণিমুখে মিনিটদশেক হাঁটা দিলেই সোহনপুরে যাওয়ার সিএন্ড বি রোড৷ সেই রোড ধরে রিঙ্াযোগে আরো মিনিট পনের পুবদিকে এগোলেই রেইন্ট্রি-গাছসমেত সোহনপুর নামে জনপদটির শুরু৷ সেই সোহনপুরের দণি সীমানাজুড়ে পুব-পশ্চিমমুখী এক শীর্ণকায়া গাঙ বহমান, তার নাম জলখেলি৷ সেই জলখেলির বগলে শেষমাথার বাড়িটিই তরীকুলদের৷ জলখেলির যেই গাঙ, যাতে ঘোলাপানির সাথে কচুরিপানা, দলকলস, লতাপাতা বয়ে চলে, এর ফাঁকে যোগ হয় সোহনপুর গ্রামটির গুগোবর, আনাজ-তরকারির ফেলে দেয়া অংশ৷ এমনই এক গাঙের কিনারার বাড়িতে তরীকুল মাত্র পাঁচটা দিন আগেই ঝাড়ুর শলার মতো হাত-পা নিয়ে হাসপাতাল থেকে ঠাঁই নিয়েছে৷
'কিরে মিলু, রফিক্যে ভাই ইতান কী ক? ফিরে বুলে কিয়ের চেডের হাসপাতালাঅ যাঅন লাগবো?' তরীকুলের এই কিসিমের কাচেঘষা আওয়াজ যেন আন্ধারে ঝরে পড়ে৷ একটা নীরবতা চালু হয়৷ তার জিবেঘষা ব্যাকুলতা বেশিদূর গড়াতে পারে না; জান-গতরের সাথে লেপ্টে থাকা কাঁথা-বালিশে জুত্‍ করে সেট হওয়ার আগেই হোঁচট খায়, খানিক জিরানোর মতোই অবস্থা তৈরি হয়৷ এবং তা একসময় নড়বড়ে হতে হতে জলখেলির জলের গন্ধের মতন হারিয়ে যায়৷ মিলু তার বাবার কাছ থেকে আর কত দূর বসা, দুই-তিন হাতই হোক? ওর মাথাটা ডানদিকে কাত্‍ করেও বাপটার এ ধরনের ঘ্যানর-ঘ্যানরের মর্ম উদ্ধার করতে পারে না৷ তাতে মার্শাল ল জারি হওয়ার সময়ের মতোই নীরবতা নামে৷ আবারও তরীকুল বেশুমার বেকায়দায় পড়ে৷ কথাসমূহকে জোরে সাজানোর বাসনাই জোগাড় করতে পারে না৷ গলায় চোতমাসের কাঠফাটা রোদ্দুরের আন্ধাগুন্ধা ঝামেলা নামে৷ এখানেই আবারও তাদের কারো কারো ভাবনায় ডাক্তার আরমান জাগ্রত হয়৷ তাকে আবারও খবর দেয়া দরকার৷ তরীকুল চাচাত চাচা হলেও তার জন্য কি হারামজাদা কিছুই করবে না? তার এ বেহুদা কায়দা-কৌশল ঠাহর করে মিলুর ঝিম-ধরা-মেজাজ নড়েচড়ে ওঠে, 'মাইগ্যেন্তের লাহান চেউচেউ করো কেরে; কী কইবা জুরে কও না! আরমান ভাইজানের কতা আর কতো জিগাইবা?'
নিজের পোলার ধমকে সেলাই করে করে জোড়া লাগাতে-থাকা ভাবচক্কর ফের এলোমেলো হতে শুরু করে৷ শরীরটাতে ঝিমঝিম করতে থাকা ঠাণ্ডা কাঁপুনি ছড়ায়৷ ওর শরীরের তাবত বেকায়দাসমূহ কখন থেকে যেন শুরু হ'ল? উত্তরের ভিটার পাশ দিয়ে চলা গোপাটের লাগোয়া পাট-খেতটায় বীজ বোনার আগে নাকি আরও পরে? আগেই হবে৷ পেটটায় কী যে চুয়া-ঢেকুর ওঠা শুরু হ'ল! নিজ-গতিতে সেরে ওঠার কোনো আলামত নাই৷ কত এন্টাসিড-মেন্টাসিড, কিচ্ছুতেই কিছু হ'ল না! খানা-খাদ্য মুখে নিবে কী, দেখলেই পেট খালি-করা বমি শুরু হয়৷ কত ডাক্তার দেখাল, কত রঙের পরীা৷ রক্তই-তো টানল আধাসেরের কম না৷ নাকে নল ঢুকায়, টেলিভিশনের পর্দা সেট করে ফটো তোলে, পায়খানা-পেশাব, থুথু পরীা করা থেকে আরও কতকিছু করল, বাদ দিল কিছু? হাসপাতালে শেষমেশ আনামত পেটটা কেটে-ছিঁড়ে নাশনুশ করে তবে ছাড়ল৷ কত বদ-মাংস জমল পেটের গর্তটাতে৷ কিসের পেট! বাপ-দাদা-চৌদ্দগোষ্ঠীর জানের দুশমন৷ সোনার-অঙ্গটাকে চুষতে-চুষতে কেয়ামত বানিয়ে ছাড়ল৷ কী যে এক নেশা ধরে মাথাটার একেবারে ভিতর সাইডে! গন্ধটা আসে কোত্থেকে? জিবের গোড়া, ঠোঁট, নাক, এমনকি গলার পর্দা ধরে টান দেয়৷ মিলুর মাকে সেই কখন বলেছে একটা বিড়ি দেয়ার কথা; সেই দিকে মাগীর খেয়াল আছে? বাড়িভর্তি মানুষের কব্জায় মাগীর বেবাক আদব-লেহাজ৷
হিজলফুলের গন্ধ যেন জলখেলির জলরেখা ধরে-ধরে তাদের বাড়িটাকে আরেক আচরণে ফেলে! চোখের কোনায় কেমন যেন নুন-নুন লাগে৷ সেই ধারায় হাসপাতালের ঘ্রাণও মিশে যায়৷ ডাক্তার-নার্সদের ঘুমঘুম চলাচলতি, ডেটল-সেভলনের গন্ধ, অষুধপত্রের তেজ, কাটা-পেটটার যন্ত্রণা, ব্যাগের পর ব্যাগ রক্ত, কত ঢঙের ওষুধ, কিচ্ছুতে কিচ্ছু হয় না৷ আর তাতেই তার সব এলোমেলো করে দিল৷ এখন কি তবে হাসপাতালের সেই জমানো-পঁ্যাচানো-থকথকে-ভিজাভিজা মেঝে গু-মুতের উপর চালু থাকা বাতাসই তার মুখের গর্ত, এরই পর বাতাস চলাচলের রাস্তা, বুকের জমাট-বাঁধা-ফাঁকফোকর আচ্ছামতো ঠেসে ধরল৷ আর এই সোহনপুরের জলবাতাস-বিরিলিতা মশকরা কম জানে? শৈশব-কৈশোর-যৌবনের পুরাটা কাল কোন বিচার-বিবেচনায় এদ্দিন পর তাকে জাপটে ধরল? বড়ো বেতাল লাগে তার মাথাটায়৷
দিনগুনতি ধরলে ২৫টা দিন কি আর কম? সেই কবে মসজিদের কাঠের মূর্দার স্ট্রেচারে করে ধরতে গেলে মরামানুষটা গেল বহরমপুরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে৷ হায়রে হাসপাতাল! শালারা মড়াকাটার ফ্যাক্টরি বানিয়েছে৷ জেতা শরীরখান নিয়ে কয়টা মানুষ বেরিয়ে আসে? মিলু কতজনকে চোখের সামনে ফটাফট মরতে দেখল৷ সেই মরণের ধাক্কায় পড়েই না, বাপটা শুকনা তেজপাতার মতো জানটা নিয়ে বাড়ি ফিরে৷ এখন এ ভিটেখান ছাড়া তাদের আছেটা কী! সবই হাতছাড়া৷ এখন খাবে কী? মাটি খেয়ে বাঁচবে? আর মাটি খাওয়ার নেশা থাকলে সারাটা সোহনপুরই খেয়ে ফেলত ওরা৷ আরে বাপরে, ৬৫ হাজার ৪শ টাকা কী মুখের কথাগো! মফিজ ফকিরের যুক্তি-পরামর্শ যদি বান্দা একআনা কানে তুলত৷ কোনও বদ-জি্বন-শয়তানের আছর ছাড়া মাস দেড়েকের ভিতর এমন তরতাজা লেবুর মতো জোয়ান মানুষটা ভ্যানিশ হওয়া শুরু করে! ডাক্তাররা এ সবের কী বুঝবে? কী যে ফায়দাটা হ'ল তা এক আল্লাপাক ছাড়া কারো বুঝবার মতা আছে? পাঁচটা দিন আগেই অপারেশন করনেঅলা ডাক্তারটা কী বলল? বলল, 'সরি, আমরা মাস্টা রিমোভ করতে পারলাম না; লিভার, কিডনী ইন্টেস্টাইন আর সারাউন্ডিং স্ট্রাকচারের সঙ্গে এভাবে গেঁথে ছিল যে, এটি সেপারেট করতে গেলে পেশেন্ট ও.টি-তেই এঙ্পায়ার করত৷ এই ধরনের পেশেন্টকে বিষয়টি আপাতত না জানানোই ভালো৷ উই হ্যাভ এন অংকোলজিস্ট, প্লিজ ফলো হিজ এডভাইস৷ কেমোথেরাপিতো মাস্ট৷'
একদৌড়েই তরীকুলের বয়সটা বেড়ে যায়৷ আড়াই-কুড়িওতো পেরোয় নি৷ বড়ো দুইটা ভাই দিব্যি গায়-গিরস্থি করে যাচ্ছে৷ মিলু ভাবতে গিয়ে বড়ো ঝামেলায় পড়ে যায়, বিশটা ব্যাগ রক্ত মানুষটা রাখলো কোথায়! এই নিদানকালে খতমে-সাফাটা তো করাবেই, মফিজ ফকিরকেও বৈলাতলার শ্মশানে পাঠাবে৷ নিবারণ কাকাও তাই বলে, মা কালীকে তুষ্ট করা কি মুখের কথা! আধামণ সন্দেশের টাকা আর যাতায়াতের খর্চাপাতি তো দেয়াই লাগবে৷ মফিজ ফকির যেই তাতে মাথা ঝাঁকায়, তাতে ঘরভর্তি মানুষও নিশ্চিত; আজকে সে বদ-খাসলত জি্বনটার বারোটা বাজাবেই, তাই সে নোটিশ জারির ঢঙে জানায়, 'মাইয়ালুহের লগে ইতান লইয়া কতা কঅন শুভা পায় না, দেহিছরে মিলু, এই রাইতের মইদ্যে কী করি আমি৷'
তরীকুল মাথাটা তুলতে পারে না, দশ-মণি বস্তা কেউ তুলে দিল না তো! তার নাকটা এখন রক্তের গন্ধ চাখতে থাকে৷ মুখভর্তি লালা নিয়ে এখন তার উপায় কী? আবারও বিড়ি খাওয়ার নেশাটা হয় ষোলআনা৷ বালিশে মাথাটা রেখেই মানুষগুলিকে নজরে আনে সে৷ মিলুর মায়ের পাত্তাই নাই৷ মানুষগুলির গা ঘেঁষাঘেঁষি, তবে নিরালা আওয়াজ তার করোটিতে ঠকঠক শব্দ তোলে৷ নোনতা-লেপ্টানো-ভয় তাকে ছাল-ওঠা বালিশের সঙ্গে ঠেসে ধরে৷ প্যাতপ্যাত করে একটু কেঁদে নিলে ময়লা-ঘেঁষা-পাতলা সর্দিতে পাঁজরের জমাট ভাপ একটু পাতলা হয়৷ ভাবনায় ধোঁয়ার গন্ধ লাগে আবারও৷ এবার বিড়ি খাওয়ার খায়েশটা তার বেশ চাঙ্গা হতে থাকে৷ নার্স-ডাক্তারদের কথা না হয় বাদই দিল, হাপাতালের মলমূত্র সাফকরনেঅলা মেথর পর্যন্ত কী পুংডামিটা করল, কইতো, 'চাচায়ো বিড়ি-চিড়ি খাইতে দেকলে নাম কাডাইয়া দেম৷'
হাসপাতাল কি ওর বাবার? একটা বিড়ি খেলেই আল্লার আরশ কেঁপে ওঠবে? অথচ সেই সময় ডাক্তারটার কথার কী নমুনা, 'এই চাচা মিয়াকে বিড়িই শেষ করবে৷'
একটু বলেই কি ান্ত হন! বিছানা-বালিশ, পাঞ্জাবির জেব, ড্রয়ার পর্যন্ত চেক করা শুরু করতেন তিনি৷ বিড়ি খাওয়ার সেই নেশাটা তার গলায় এখন ীণ ভাপ বিলায়, সেই তাপে গলায় তেজ আসে, 'মিলুর মা, আরে কই গেছছ তুই৷ মানুষটা গেল কই! কি-লো এক প্যাহেট বিড়ি আনাছ না, আরে কই তুই?'
মেজাজ তার যতই কড়া হতে থাক, মিলুর মা'র এতো আব্দার শোনার টাইম কই, বরং সে কয়, 'আপনের অতো প্যাড়প্যাড়ানি হুননের সময় নাই৷ উইট্টে বইন, দেহুইন কী তামশা, সোহনপুর গেরামডা ভাইঙ্গা আইছে৷ আল্লারে আল্লা, এরারে আগেঅই খায়-খেজমত কইরা লই৷ জানডা গতরের নিচ দে আশা-যাওয়া করতাছে, তবো বিড়ি খাঅন্ডা ছাড়ে না৷'
এত কথা মিলুর মা কেমনে কয়৷ জিন্দেগিভর চুপচাপ থাকা মানুষটা, কবরের মাঝখানে কথা বলার কারখানা সেট করে নাই তো? মিলুর রাগটা ধরে যত না তার মা-টার উপর, তারচে বেশি বজ্জাত বাপের উপর৷ কারণ তার কথার কী নমুনা, 'মাইয়ামাইনষের জাত অইলো গিয়া য়ের-জাত, তাগোরে নিয়া আরেক পদের ভাব-নমুনা করাই লাগে৷'
মিলু কিছু বুঝে না? নিজের মেয়েটাকে দিল-খোলাসা করে আদর করার আরো কত ঢং বের করবে! কিন্তু তার মা-টার এমন ধারার ছলোবলো-কলকল করার কী মানে থাকবার পারে৷ মেয়েলোক এমন বেতাল লাফালাফি করলে সংসারটা তো আরও পাতালে যাবে৷ এমন একটা অসুখঅলা মানুষকে বিছানায় শুইয়ে রেখে এতো দাপাদাপির কী আছে! নাকি বেখবর কলকব্জার এই স্বামীর তামাম তাগদ নিজের দখলে নিয়ে নিল!
১৪ হাত বাই ৮ হাত ঘরটার পার হয়ে ৩ হাত প্রস্থের বারান্দাও মানুষে ঠাসা৷ শুধু কি সোহনপুর? জয়রামপুর, কাশিনাথতলার কিছু মানুষও চোখে পড়ে৷ আসবে না? ডিকেয়ার করা মরামানুষ, জিন্দা হয়ে ফিরে আসে কোন গায়েবি আলামতে! সেই আচানক বিষয় আর প্রক্রিয়ার ভিতরটা পরান ভরে বুঝানোর চেষ্টাতদ্বির করছে মিলুর মা৷ তার স্বামীর মাথায় এসব ঢুকানোর কোনো উপায় আছে? সেই মানুষটাতো আছে কেবল বিড়ি খাওয়ার ধান্দায়৷ এমন বেবুঝ মানুষের সঙ্গে জীবনটা পার করে দিল৷ যা বুঝল তো বুঝলই৷ এই পদের জ্ঞান-বুদ্ধি যেন আল্লার আলমে আর কারো নাই৷ তাই এই কাঁইকুঁই রেখে ঘরভর্তি মানুষগুলিকে দু'চোখ মেলে দেখে কিংবা দুই-চারটা কথা বললেও তো পারে; মানুষ দেখা কি কম ফজিলতের কাম৷ দণিপাড়ার কাছুমালীওতো এমনভাবে য় হতে-হতেই মরল; কথা হলো গিয়ে, সেই লোককে দেখতে ২/৪টা মানুষও কি দল বেঁধে গিয়েছিল? তার ঐ ভাঙাচোরা ঘরটাতেই সে কুত্তা-বিলাইর মতন মরে পড়ে থাকল৷ হের বউটাও কী বেআক্কেল, নিজের স্বামীর মরণের ইশারাটা পর্যন্ত পায় না৷ এই মাগী মিয়া-বাড়িতে খ্যাপ না দিলে ওর পেটের ভাতই হজম হয় না৷ সেদিনও বাসনকোসন ধোয়াপাকলা রান্না-বান্না করা শুরু করেছিল ঐ মিয়া-বাড়িতেই৷ জোহরের অক্তেরও পরে এসে টের পায়, কখন জানি মরদটা মরে কাঠ হয়ে আছে৷
এই আচানক ভিড়ভাট্টা বিড়ি খাওয়ার নেশাটা আবারও জাগিয়ে তোলে৷ এখন মগজে পর্যন্ত আপডাউন করে ধোঁয়ার নেশা৷ সেই ধোঁয়ার ধাক্কা মানুষগুলিকে পর্যন্ত আলাদা করতে পারে না৷ একজনের গায়ে পাশেরজন বেহায়ার মতো লেপ্টে থাকে৷ এ কোন কিসিমের ফাজলামি_মানুষ কেন আলাদা হয় না?
মানুষগুলোর পজিশন কী করে বদলে যায়৷ ঠ্যাং উপর দিকে উঠে যায় কী করে! ঠ্যাং-এর ধাক্কায় জং-ধরা-টিন আবার উড়ে যায় কিনা৷ ঘর দোলে কার ইশারায়? তবে কি মফিজ ফকির সহযোগে ঘরটাকে তাবিজ-কবজের কুদরতিতে ছেড়ে দিবে! কপাল তবে শালার ঐ ফকিরেরই খুলবে৷ এতো মানুষের কথাকে আলাদা করে শনাক্ত করতে গিয়ে বেশুমার ঝামেলায় পড়ে সে-ও,
'আল্লা নিজের আতে হায়াত দিছেগো, না অইলে এমুন মরা মানুষনি বাচার কথা!'
'শ শ ব্যাগ রক্তের পাওয়ারে খাড়ইছে৷'
'টেহা-পয়সা কেমুন নামলোগো মিলুর মা?'
'মালপানি ছাড়া কি আর আক্তার বেডাইন্তে কাইক ফালায়?'
'আ-হায়রে কী মানুষ কী অইয়া গেল৷'
'আরে কিয়ের দাওয়াই কিয়ের কী; এই বেডার জিন্দেগি শেষ৷ একদিন দেকবা কুট কইরে দমডা বাইর অইয়া গেছিগে৷'
'তাইনের রুগডা কি ধরলো তে? ক্যানছারই? আল্লাগো৷'
মিলুর মা-টা গেল কই! টক-রসে ওর মুখ ভরে আসে৷ নাহ্, বিড়ি একটা না টানলে যে আর চলছে না৷ আনুর বাপটা এতণ ধরে বসে কী করে? একটা বিড়ি দেয়ারও মুরোদ নাই৷
মিলুর মা ছোট ছেলেটাকেই তাগিদ লাগায়, 'কীরে ঝিলু, তর বড়চাচার ঘরেত্যে লাম্বা টুলটা আর ৩/৪টা চেয়ার আনছ না কেরে? বেক্কলের লাহান খাড়ইয়া থাকলেঅই চলবো?'
পুবের-ভিটার নিয়াশার মা; মিলুর মা-র এসব কাণ্ডকীর্তি দেখে আর সহ্য করতে পারে না, কয়, 'ছিনালনি কী করে, দেকলে তরা! লাং দেইখ্যে ভিত্যে পাগ ওঠছে, হুশ আছে নি? মরাকাঠটা লইয়া তর অতো তেল কেরে?'
'কীরে ঝিলু করিম্যেরে ডাইক্যে লইয়াআ৷'
'কুন করিম্যের কতা কও?'
'দেহো পাডাডা কী ক? আরে বউ পিডাইন্যে করিম্যের কতা কই৷ কিছুতা বুঝেউঝে না৷ একটু পান-বিড়ি আনাই, তর বাপের কইলজাডাদি ফাইট্টে যাইতাছিগে৷'
বসতভিটার পুবপাশেই রান্নাঘর, তারও উত্তর দিকে কাঁচা লেট্রিন৷ মিলুর মা-র বেশিরভাগ ভাবনা-চিন্তা ওটাকে নিয়েই, এত টাটকা গন্ধ লেট্রিনটা জমা রেখেছিল কোন চেম্বারে৷
চাচীর বেবাক কাজে এগিয়ে আসে মিলুর দু'নম্বর চাচার তিন নম্বর মেয়ে হ্যাপি৷ সে-ই বা এ সুযোগ অন্য কাউকে দেয় কোন্ বিবেচনায়? চাচাটাকে হাসপাতালে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া, সিটে নাম লেখানো, ডাক্তার-নার্স ডেকে আনা, ঘড়ি ধরে-ধরে নলে খাবার পাস করানো, ওষুধপাতি টাইমলি খাওয়ানো থেকে শুরু করে প্রসাব-পায়খানা পরিষ্কার; সবইতো ধরতে গেলে সে একলাই করেছে৷ শ্বশুরবাড়িটা হাসপাতালের কাছে-কিনারায় হওয়াতেই রা৷ এখন তাকে ঘিরে যে জটলাটি আছে, তার মাথা চৌদ্দটা চক্কর মারল, ঘড়ি ধরে খাওয়ানো? বাপের জন্মে কেউ শুনেনি!
গেসু মেম্বারের মেয়েটা হঠাত্‍-ই জিগ্যেস করে বসে, 'দেহি, অহন কয়ডা বাজে?'
'অ, মনে করচছ তুইঅই বেবাকতা জানছ? আমারে ঘড়ি চিনাছ? সব কাম আমি এলহা করছি, রিপুট লইয়া দেক৷ একদিন অইছে কি, আসপাতালের এক ইস্টাপ, আমার অগে কুনাচ্ছে কথা কইতো চাইছিন৷ হেই বেডারে তরার দুলাবাই এমুন চটকানি মারছে; বেডারদি কাপড়-চাপড় নাশ অইয়া গেছিনগে হিহিহি৷'
'কিলো, বেডাডা তরে কী কইছিন?'
'আরে দুরু, খালি চোক তুইল্লা চাইছিন৷'
'কিরে হাসপাতালের নাছ-বেইট্টেন্তে বুলে ডাক্তার-বেড়াইন্তের লগে পুঙ্গা বাজায়?'
'কেডা জানে, মরা টানতে টানতে জান শেষ, অততা দেহনের টাইম আছিল নি?'
'অতদিন হাসপাতালঅ থাকছছ, তর অউর-অরি কিচ্ছু কইলো না?'
'কইবো কী? এরার কি চোক নাই৷ আমি কি টাংকি মারতাম গেছি? ছেড়ার বাপেরে হুনাইয়া দিছি, তুমার মা অতো গুচুরমুচুর করে কেরে? বাপ-চাচারে করতাম না তে বাজারে মাইনষের লাইগ্যে করুম৷'
ফর্সা মিয়ার কানের শোঁ-শোঁ আওয়াজটা কমছেই না৷ মিলুর মা-র আন্দাজ-বরাত এক তোলাও নাই, সে কয়, 'পানে মানুষ ভিজা-জর্দা এত দেয়!'
আনুর বাপ তখন ঘর আর বারান্দার বেবাক মানুষগুলির মনোযোগ নিজের আয়ত্তে আনার কাজে পুরা তত্‍পর, 'আরে দুরু মিয়ারা, ইতান কিয়ের বালের ডাক্তার! ব্রহ্মণবাইড়ের কুসুম বাবুর নাম হুনছোনি?'
পুরা-জটলাটি একদম নীরবতায় পৌঁছলে তার কথার স্পিড ষোলআনা মর্যাদা পায়, 'তাইনের চোরে এমুন জুতি আল্লায় দিছলাইন, ৫০ হাত দুরেত্যে রুগীডারে দেইক্যে কইয়ালতো কী কিসিমের ব্যারাম৷ আমার দুইড্ডে ফুসফুসের মইদ্দে আছিন কিছু? কৈ মাছ ধরবার জালের লাহান ফালাফালা অইয়া গেছিনগে৷ মনারচর-বহরমপুরের ডাক্তার-কবিরাজ-বৈদ্য ফেইল৷ কী করি? তহনই মাইনষে কইল ঐ কুসুম বাবুর কথা৷ ভিজেট মার্তো দুই টেহা৷ মার্তো এক বছরের অষুদ খাইতে বেবাক বিমার মইরা তামা অইয়া গেল৷ কিয়ো ফর্সা বেডা, এর বাদে খাসিডার লাহান ফুলা ধরছিন না শইলডা?'
তরীকুলের হাসির তেজে নাকি বিড়ির তাপে মুখের উপর ফিট করে রাখা বিড়িটা কেঁপে ওঠে৷ ফর্সা মিয়ার তেজ এখন অন্য জায়গায়, 'আরে থোও ফালাইয়া তুমার কুসুম বাবু; জহরপুরের আনন্দ বাবু, ইশারাডা পাইলে দিনের মাইজে ৫০ বার পাল্কিত কইরা বাজানরে দেকতে আইতো, হেইডা বুঝি কিছু না? হেই ব্যাডা ভিজেট নিতো ৫ টেহা! মরামানুষ দুই দিনে গুল্লাছুট খেলত৷'
তরীকুল মরামাছের ঘোলাচোখে চারপাশ দেখতে থাকে৷ ছায়ার ভিতর থেকে মানুষগুলো আলাদা হয় না৷ ঝমঝম আওয়াজের বৃষ্টির দাপট কিংবা টুপটাপ-নির্জনতার ভিতর হিজলফুলের গন্ধটা আসে৷ তবে এখন তা কেন যে জিদ্দাল মেয়েলোকের মতো আসতেই থাকে৷ ২৫টা দিন পার করে দিল, পেটের নিচের দিকের সেলাইখান এখনও কাঁচা৷ পুঁজ, মরা রক্ত, মাংসের টকটক-নোনতা বদগন্ধ কী করে বেরয়? পুরা পেটটা জোড়া লাগবে কবে? কবরের মাটির চাপাচাপিতে জোড়া লাগবে নাকি? শীত-জড়ানো-ভয় আবার তাকে জাপটে ধরে৷ তরীকুল মায়ের মুখটা ঝাপসার ভিতরেও সাজিয়ে নিতে পারে না, তার শারীরিক কাঠামো বারবার ভেঙেচুরে যায়৷ বাপটা কেমন ছ-ফুট লম্বা সাইজ নিয়ে পুরা দরজাটা আটকে দাঁড়ায়৷ তার নিয়তটা কী? আজরাইলকেও ঢুকতে দিবে না? এত তেজ সে পায় কোথায়!
একবার কী যে নেশায় ধরল তরীকুলকে, সেই নেশার নিয়ত হ'ল, ফকির-আমির সব এক করে ছাড়বে৷ গোপন এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কয়দিন ঘুরঘুর করল৷ বাপের প্যাদানি খেয়ে, তবে ঠাণ্ডা৷ তবু রাত ১০টা বাজতে না বাজতেই তিন ব্যান্ডের রেডিওটা নিয়ে সেই যে বিবিসি, ভয়েস-অব-এ্যমেরিকা, হিল্লী-দিল্লী, পিকিং, আকাশবাণী কলকাতা-র সংবাদ শোনা শুরু করত_একটা দিনও গ্যাপ দিত? এ নিয়েও বাপটা কম খিটিমিটি করেছে? করবে না? সে তো আর মক্কা-মদিনা থাকত না, পাশের ঘরটাতে থেকেই আল্লার বারোটা মাস আইয়ুব খানের মার্শাল-ল জারী করে রাখত৷ পেশাব-পায়খানা, নড়া-চড়া, ওঠ-বস করা সবই তো তার এক্তিয়ারে৷ এমন শীতল হাওয়া জীবনে পেয়েছে বলে মনে করতে পারে না তরীকুল, কী ঠাণ্ডা! এই শীতে কী পোয়াতি মাগীর মতন ফুলে ওঠা পেটটা ফুস করে ফুটে যাবে? কিন্তু এখানটায় গোরের মতো নীরব কেন? গোরটা কবে থেকে তার পিছু নিলো! ছুরি-কাঁচিঅলা ডাক্তারটাকে, জ্ঞান-টানার একেবারে শেষ মুহূর্তে ঘুমের ভেতর একেবারে ডুবতে ডুবতে বলে, 'ছার, আপনের মতন আমার এক ভাইস্তা আছে, বড় ডাক্তার, হেয়ো_আপ-নে-র...৷'
ডাক্তারের হাসির রেখাটি তার দেখা হয় না৷ উনার কি জানা নাই, এমন তো কম রোগীই আছে, যারা কোনো-না-কোনো ডাক্তারের রেফারেন্স দেয় না, ও.টি.তে ঢুকলে তো কথাই নাই৷
মিলুর মা'টা ফের কখন থেকে নার্সদের মতো খানাতল্লাশ করা শুরু করল! চেটের এক বিড়ি নিয়ে তার কটমটানিও সহ্য করতে হবে! আনুর বাপের সামনে কে তাকে বিড়ি টানতে দেখেছে৷ একবার না হয় মিলুর মা চুপ করে বিড়ি একটা দিলই, কিন্তু এ কোনকিসিমের আব্দার! মিলুর মা'র বেদিশা ভাবচক্কর দূর করে কী করে?
বিকেলের রং বদলে যেতে থাকে৷ মালেহার কান্নার ভেজা-ভেজা গন্ধে সেই রঙে ছাই-রং-ধূসরতা ছড়ায়৷ পোয়া মাইল দূর থেকেই কান্নার সুরটি অসুখঅলা বাড়িটাকে বর্ষার কাদা-জলের মতো থিকথিকে করে ফেলে৷ জলখেলির কিনারায় গড়ে ওঠা পাড়াটি তখনও নীরব৷ টুপটাপ করে পড়তে থাকে হিজলফুল৷ বাঁশের সাঁকোটা পেরোতেই সাবানের মতো পিচ্ছিল কাদায় পা পিছলে যায়৷ হিজলফুল দুলে ওঠে৷ সন্ধ্যা নড়ে যায়৷ হিজল-সন্ধ্যার জল-রং কান্নায় ভাসতে-ভাসতে, ডুবতে-ডুবতে, একসময় সে বাড়ির কিনারায় পৌঁছতে পারে, 'বাজানগো, তুমারে আল্লায় বাঁচাইয়া আনছেগো বাজান?'
কথার ভিতরে নুন-নুন ভেজা-ভেজা গন্ধ মিশে গেলে একটা হিহি প্যাতপ্যাতানির ভিতর বাদ-বাকি আকুতিকাকুতি নড়বড়ে হয়ে যেতে থাকে৷ এমনকি তা আশপাশের ৫/৭ জনকে সেই থকথকে নরম জমিনে ঠেসে ধরে৷ কান্না-সংক্রামক ঘরটিতে নীরবতা ছাড়া আর কোনো শব্দ নাই৷ পাটকাঠির মতো হাত-পা, ঝাড়ুর শলার মতো চুল, বুকের হাড্ডিগুড্ডির ভিতর একফোঁটা ধুকধুকানি, তার-ই ওম নেয় মালেহা৷
মিলুর মা বলে, 'জামাই আইলো না? কার লগে আইছছতে? বেয়াই-বেয়াইনের শইলডা কেমুন?'
উত্তর দেয় না মেয়ে, পাত্থরের নীরবতা নিয়ে কোনদিকে যেন তাকিয়ে থাকে৷ তাই মিলুর মাও নীরবতার অংশ হয়, সেও আর কথা বাড়ায় না৷ মেয়ে তো আর চলে যাচ্ছে না; বকুলি আর তহুরীর মোকাবেলা এত জেরা করার কী দরকার৷ এইগুলির জিবে আল্লায় হাড্ডি দেন নি, এক নম্বরের খবিস৷ কিন্তু তার এই বোকা মেয়েটাকে নিয়ে কী করে সে, আবার প্যাতপ্যাতানি শুরু করল৷ চোখ দুইটার মধ্যে কী ঘোড়াউত্রা নদীটা সাথে করে নিয়ে এলো? বাপটার কাছে আসলেই মেয়েটার দিশামিশার কিচ্ছু ঠিকঠিকানা থাকে না৷ আরে বাপরে, আর যেন কারও মেয়ে নাই৷ রান্নাঘরটার ভিতরে মালেহাকে নিজেই টেনে নেয়, 'এ্যাই নডি, মাইনষের সামনে অতো চরে পানি ফেলছ কেরে? জামাই ফির তরে মারছে নি!'
'তোমরার মেন্দামুইখ্যে জামাইর কথা আর কইয়ো না, পারে ত খালি আমরার লগে বেডাগিরি দেহাইতে৷ হের মা একটা কথা কইলে এক্কেরে মেনি-বিলাই অয়া যায়, আস্তা একটা গাই৷'
আবারও গলা ভিজেভিজে এমনই আঠালো হতে থাকে যে তার ভিতর থেকে শাশুড়ির বারো রঙের খোটা, একশ' মণ ধান তোলার মেহনত, বাপটার বিড়ি খাওয়ার ছোটলোকি নেশা নিয়েও সাত-কথা, নানান বিত্তান্ত, এসবের কিছুই উদ্ধার করতে পারে না মা-টা৷ মিলু ভাইটা এসময় সামনে এসে পড়তে মালেহার গলার ফ্যাসফ্যাসানির জোর আরো বাড়তে থাকে৷
রান্নাঘরটার ভাঙাচুরা বেড়া আর শইল মাছের ভর্তার বাস পেয়ে তার সর-পড়া জিবের গোড়া শিরশির করে, 'কিগো মায়া, মাইনষে ইতান কি ক, বাজানের বুলে ক্যানছার অইছে? আর বলে বাচত না!'
নাকের ডগা তিরতির কাঁপুনিসমেত দুইটা ৫০ টাকা আর সাতটা ১০ টাকার নোট মা'র হাতে গুঁজে দেয়৷
'চুরি কইরে আইনছছ? জামাই জানে নি?'
'আরে দুরু, কিয়ের চুরি? চাইয়া আনলে চামারের পুতাইন্তে চাইর আনা পইসানি দিলোঅইলে?'
'আরে চিল্লাছ কেরে, মাইনষে হুনলেদি মুহে ছেপ দিবো৷'
'চিল্লাই কি শখ কইরা, তুমার বেয়াইএ কি কয় উনবা? আমারে কয়, তুমার বাপ কি আর বাঁচবো, তুমরার ভাগে দেহো গিয়া লিল্লা-সদগা কিছু পড়ে নি৷'
এইসব কথার ঝালটা পুরা-মাত্রায় বিনাশ হওয়ার আগেই মিলুর গলার ঘেউ ঘেউ ধারটা মালেহার প্যানপ্যানানিকে ছিঁড়েফেঁড়ে ত্যানাত্যানা করে দিতে থাকে, 'অতণে আসল কথাডা পাইলাম৷ আইচ্ছা! তে অইলে বাপের সম্পত্তির বন্ডক বুইজ্জা লওনের লাইগ্যা পাডাইছে তরে?'
'নারে মিলু, এরারে কি আল্লায় কম দিছে? এই বেক্কলডা কী কইতে কী উনছে, ন্তে দে৷'
'তুমি চুপ কর, ওই মালেহা, তরা কি ভাগ চাছ? সম্পত্তির ভাগ? কুনু চুত্‍মারানির পুতেরে একটা পুইসা দিতাম না৷ দা-ও দে, মাথাডা দুই ভাগ কইরে লাইয়াম৷ তর গমচোর শ্বশুর সম্বন্দির পুতেরে কইছ, তাইনের বেয়াই-এর চিগিস্যায় লাখ টেহার উপরে খরচা পড়ছে৷ আগে দেনা শুধ করুক, শালার পুতে রাখছে কিছু? বান্দির পুতে আর কয়দিন হাসপাতালঅ থাকলে মায়ারেও বন্ধক দিত!'
'কীরে তরা এ্যাইডা কী শরু করছছ! বাপটার রুহু না-যাইতেই সম্পত্তি লইয়া কামড়াকামড়ি শুরু কইরা দিলি!' মিলুর মা-র চোখ, নাক, বুকের গভীরে নোনতা ঝাঁজ নামে! সেই ঝাঁজের ভিতর নিজেকে লুকিয়ে-চুবিয়ে রেখেই জজ-ব্যারিস্টারের রায় জারি করতে থাকে, 'আগে আমার হাড্ডি-মাংস বন্ডক কইরা ল, তার বাদে সম্পত্তির মইদ্যে হাত দিছ! তে না অইলে দুই-চাইর আনার বিষ অইন্যে দে, মইরা আক্ কইরা থাহি৷'
'কিগো মাইয়া, মিলু ভায়ের লাহান তুমার মাতাতঅ পচা ধরছে নি? এক কাম কইরো, ভায়ের মাতাত কচু পাতার-ভরন দিয়ো, ধরতে গেলে হে-অইত্তো অহন তামাম জিন্দেগির কাণ্ডারি৷ অহন-অ অত ফ্যাত্‍-ফ্যাত্‍ করলে মাইনষেদি সিধা খাডাস ডাকব৷'
স্যালাইন, সিরিঞ্জ আর লাল-হলুদ-সাদা ওষুধের শিশিগুলি উদাম বিছানায় জমা হতে থাকে৷ তিন আইটেমের গোটাবিশেক ইঞ্জেকশন, স্যালাইনের হাজার-পাওয়ারি-ব্যাগ, লম্বা মোটা সিরিঞ্জ, তরীকুলের কুয়াশা-জমা-চোখে হলদে রোদের রেখা জমতে থাকে৷ নাড়ির চলাচলতি কি দড়ির মতো পঁ্যাচানো চামড়ার সঙ্গে মিলমিশ খেয়ে গেল! ডাক্তার আরমানের ঘামের রেখা দু'পাশের জুলফি বেয়ে থুতনির দিকে ভিজে আসতে থাকে৷ চাচাজী কতণ টিকবে? কেমোথেরাপি স্টার্ট করার সঙ্গে সঙ্গে আবার কোনো ইমার্জেন্সি এরাইজ করে কিনা? এমনিতেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এত পেটেন্ট ওষুধ ম্যানেজ করা কি যা-তা ব্যাপার ছিল! আতাউর রহমান স্যারের ম্যালা কোয়ারি চালাল, স্যার বলতে থাকেন, 'বুঝলাম, তোমার চাচা, বাড়িতে এ পেশেন্টকে ম্যানেজ করবে কী করে?'
ব্লাড টেস্ট, ব্লাড ট্রান্সফিউশন আর কেমোথেরাপি ম্যানেজমেন্ট করবে কে? তাকেই তো এইসব হাঙ্গামা ফেইস করতে হয়েছে৷ দুনিয়ার কথাবার্তা বুঝিয়ে, স্যারকে চিকিত্‍সার বিষয়ে এনসিয়োর করে তবে তাকে পেটেন্ট মেডিসিন ম্যানেজ করতে হয়েছে৷
'একটা লেকচার যে একদম ফরজ হয়ে গেছে, বুঝলেন চাচাজি, সব ম্যাডিসিন কি আর মেডিকেলের স্টোরে থাকে? এই যে দেখেন, এই যে লাল পাউডারের মতন তিনটা ভায়াল_একটাও মাগনা নয়৷ পাক্কা দুইটি হাজার টাকা পকেট থেকে চলে গেল৷' কথাগুলির ভিতর যেটুকু গ্যাপ পড়ে তাতেই তরীকুল তার হাড্ডি, মাংস, রগ চুপসে-যাওয়া-মগজের পড়ে-থাকা তাপ দিয়ে ভাতিজার হাত চেপে ধরে, 'বাবারে, তরা ছাড়া আমার আর কেডা আছে৷ আমি ত অহন রাস্তার ফহির৷ বাপ নাই, উপযুক্ত পুত নাই৷ তরার পাওডাত্‍ ধইরে কই, আমার এতিম পোলাপানডির...৷'
'ছি ছি, কী যে বলেন চাচাজী, আল্লার রহমতে আপনার হেলথ আবার ইমপ্রুভ করবে৷'
'বাবারে, মাফ কইরে দিছ? আমি আর বাচতাম না৷'
'উহু, কোনো চিন্তা করবেন না৷ চান্স পেলেই, আপনাকে দেখতে চলে আসবো না হয়৷'
উশের ফোঁটার মতো তখনও টুপটুপ করে স্যালাইন তার রক্তে মিশতে থাকে৷ ডাক্তার আরমান দুইটা বাড়ি উত্তরে, তার নিজের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলেও, তরীকুলের ঝাপসা চোখ কিছুই ঠাহর করতে পারে না৷ এরা ক্রমাগত হাসপাতালের গন্ধে ঢোকে, বারও হয়৷ গন্ধের গল্প দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগেই নাকের গভীরে একটা চিরচিরে ভাব ওঠে৷ কিন্তু তরীকুলের শরীরে জেগে থাকা মৃতু্যর গন্ধ সেই গল্পকে একেবারেই বাড়তে দেয় না৷ মৃতু্যর গল্প নানান কায়দায় কেবলই বদল হতে থাকে৷
তারও অনেক পর সোহনপুরে এক কান্না পয়দা হয়৷ তা সোহনপুরের মেলা জায়গা থেকেই হতে পারে, তবে আপাতত তরীকুলের বাড়ির অভ্যন্তরের কান্নাটাই ল করা যাক৷ বাড়িটাতে মৃতু্যর আয়োজন ছাড়া কিছুই নাই৷ চারদিন আগেই শেষ হওয়া পূর্ণিমার কোনোই রেশ নেই আকাশে৷ ছাই-রং আলোতেই রাতের বয়স বাড়ে৷ শরীর তার ঢেকে রাখে একটা ময়লা চাদর৷ তছবিখান ভিজে পিছলে যায়, মালেহা তবু টিপতে থাকে এটাকে৷ কান্নার তাপ যেন এতে ঝরে পড়ে৷ হ্যাপির তেল-পিঁয়াজ ঘসাহাতের ভিতর বেঁচে থাকার পরশ টের না-পেলে নিজের হাতটাতে মৃতু্যর গন্ধ বুঝে বুঝি-বা চমকে ওঠে! মিলুর মা'র কোরান-তেলাওয়াত মিহিসুরের ভিতরও নড়তে থাকে৷ হিজলফুলের গন্ধ ঘরটাতে যেন ভর করে! ছাই-রং আকাশে তখন জোছনা৷ এর মাঝেই মৃতু্যর ধুকধুকানি পাঁজরের মাঝখানটাতে কেঁপে-কেঁপে ওঠে!


  © Notun Diganta 2007.
All Rights Reserved
Powered by headoffice