স্মৃতি
মুক্তিযুদ্ধ আমার মুক্তিযুদ্ধ
মো. শফিকুল ইসলাম

[একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরবময় এক ইতিহাস৷ বাঙালীর সেই গৌরবগাঁথার পাশে ভিন্ন উপকরণের রয়েছে অন্য এক ইতিহাসও৷ সে-ইতিহাস একদিকে যেমন বেদনাদায়ক, তেমনি তা দেয় আত্মবিশ্লেষণের তাগিদ৷ সেই তাগিদ থেকেই এ লেখার অবতারণা]

এক

'আমার শুভাশিস নিও৷ তোমরা ছোট বড় সবাই...৷ জননী জন্মভূমিকে ভুলা যায় না, যায় না ভুলা তার সুসন্তানদের৷ প্রতি মুহূর্তে তোমাদের মনে পড়ে, মনে পড়ে অতীত স্মৃতি৷ দুর্বলতার মুহূর্তে কাপুরুষের মতো প্রাণের মমতায় সব ছেড়ে চলে এলাম৷ জন্মভূমির মমতায় প্রতিনিয়ত টিভিতে গান আর সংবাদ শুনেই কিছুটা পরিতৃপ্তি পাই...৷'
পোস্টকার্ডে লেখা চিঠি৷ কোন লুকোচুরি নেই, দেশের প্রতি আকুতি মেশানো অর্ঘ্য নিবেদনের৷ ছোট্ট চিঠিতে এক স্কুল শিক তাঁর ছাত্রকে লিখেছেন দু-যুগ পরে৷ বর্তমানে ছাত্রের অবস্থান থেকে বহুদূরে যাঁর অবস্থান৷ ফেলে-আসা বিষণ্ন স্মৃতির আপন মনীষায় যে-ছবি চিত্রিত করেছেন তা তাঁর এক-সময়কার ছাত্রকে লিখেছেন নির্দ্বিধায়৷
চিঠিটি আমার শিক বাবু সত্যরঞ্চন দাসের লেখা৷ ওপার বাংলা থেকে লিখেছেন৷ দীর্ঘদিন পর হঠাত্‍ করেই এ চিঠি পাই৷ চিঠিটি হাতে আসার মুহূর্তে বিভিন্ন স্মৃতির মাঝে মনে পড়ে যায় তাঁর দেশত্যাগের ঘটনা৷
একাত্তরের মাঝামাঝি৷ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে চরম পত্রের মতো আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান শোনার জন্যে রেডিওর চারদিকে বেশ ভীড়৷ প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমাদের বাড়িতে লোকসমাগম হয়৷ পাড়ায় রেডিও নেই৷ আমাদের একটি রয়েছে৷ স্বাধীনতাযুদ্ধের বিভিন্ন সংবাদ, দেশবিদেশের সমর্থন, ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়ার মানসে প্রতিদিন আমিও রেডিও শুনতাম৷ এমনি একদিন এক সন্ধ্যায় নতুন সংবাদ পেলাম৷ আমাদের গ্রামের উত্তর পাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ওই রাতে ধর্মন্তারিত হচ্ছেন৷ যাঁরা ধর্মান্তরিত হবেন তাঁদের ভেতর সম্ভাব্য ব্যক্তি ও পরিবারের নামগুলো আমরা পেয়ে যাই৷ এসব ব্যক্তি বা পরিবারের কেউই আমাদেরকে (মুক্তিযুদ্ধের পরে) তাঁদের পরিকল্পনার কথা জানাননি৷ হয়তো বাধা আসতে পারে এ ভয় ছিলো তাঁদের৷ তাছাড়া আমরা ছিলাম অসংগঠিত, দুর্বল, নেতৃত্বশূন্য৷
আমাদের গ্রামটি তখন ছিল চার থানা_ভালুকা, গফরগাঁও, ত্রিশাল ও ফুলবাড়িয়ার সংযোগস্থল (বর্তমানে তিন থানার সংযোগস্থল)৷ স্বভাবতঃ থানা সদর থেকে দূরে অবস্থানের দরুন আমাদের গ্রাম পাশর্্ববতর্ী অন্যান্য থানাধীন গ্রামসমূহের ডাকাত সন্ত্রাসীদের ছিল অবাধ বিচরণ৷ এসব সন্ত্রাসী এক গ্রামে অপরাধ করে সহজেই ভিন্ন থানার গ্রামে আশ্রয় নিতে পারতো৷ এরা একাত্তরের এপ্রিল-মে মাসে সংগঠিত হয়ে হিন্দুদের বাড়ীঘর লুটপাট শুরু করে৷ একেকদিন একেকপাড়া এদের দ্বারা আক্রান্ত হতে থাকে৷ রাত গভীর হলেই শুরু হতো লুটপাট৷ আক্রান্তদের আর্ত-চিত্‍কারে বিষণ্ন হতো রাতের পরিবেশ৷ পাকবাহিনীর হিন্দুবিদ্বেষের সুযোগকে এভাবেই নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগায় এসব সন্ত্রাসী৷ এদেরকে প্রতিহত করার জন্যে যে-নেতৃত্ব প্রয়োজন সে-নেতৃত্ব তখন ছিল অনুপস্থিত৷
একদিকে পাক-বাহিনী, অন্যদিকে ডাকাত-সন্ত্রাসী, এ দু'য়ের হাত থেকে নিজেদেরকে রায় ধর্মান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা৷ উত্তর-পাড়ার হিন্দুরা মুসলমান হবে এ সংবাদ বেশীণ গোপন থাকেনি৷ বরং স্বল্প সময়ের মাঝেই তীরবেগে গ্রামের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে৷ এ সংবাদে আমাদের পাড়ার এক শ্রেণীর মানুষ খুশী৷ যাঁরা খুশী, তাঁরা হয়তো মনে করেছিলেন, হিন্দুরা মুসলমান হলে পুরো গ্রাম 'মুসলিম গ্রামে' রূপান্তরিত হবে৷ মুসলমানদের সংখ্যা বাড়বে৷
পরের দিন জানতে পারলাম উত্তর-পাড়ার অধিকাংশ হিন্দু পরিবারের সদস্যরা ধর্মান্তরিত হয়েছেন৷ নিজের জন্য নতুন নামও ধারণ করেছেন৷ কারও নাম 'করিম' কারও নাম 'রহিম'; মেয়েদের ভেতর কারও নাম 'কামরুন্নাহার', কারও নাম 'লতিফা বেগম'৷ বিচিত্র নামে অধু্যষিত নতুন মুসলমান! বাড়ীর নাম কি রাখবেন তা তখনও স্থির হয়নি৷ 'শীলবাড়ী', 'দাসবাড়ী', 'সরকার', 'মোদক' ইত্যাদি বাড়ীর পরিবর্তিত নাম কি হবে তা নিয়ে গুঞ্জরনের সীমা নেই৷ গ্রামে এই এক চিত্র! কর্মহীন, অবসর সময়ে চলতি ঘটনা নিয়ে জল্পনাকল্পনার অন্ত থাকে না৷ মনে হয় উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের ভার যেন তাদের ওপর বর্তেছে৷ হিন্দুরা মুসলমান হলে খাঁ উপাধি নেয়_এটি গ্রামের প্রচলিত ধারণা৷ সুতরাং পুরো এলাকা বা পাড়াটাই খাঁ-পাড়ায় রূপান্তরিত হওয়ার কথা৷
উপায়ান্তর না-দেখে নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে যাঁরা ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, তাঁদের মাঝে সত্যবাবুও ছিলেন৷ ধর্মান্তরিত হওয়ার পর স্যারের সাথে আমার কথাবার্তা হয় নি আর কখনো৷ তবে সংবাদটি শুনে আমি যে গভীর দুঃখ পেয়েছিলাম তা আজও মনে পড়ে৷ কেননা, আমি জানতাম, আমার ওই প্রিয় শিক সানন্দে ধর্মান্তরিত হন নি৷ দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে সততা ও নিষ্ঠাকে পুঁজি করে যাঁর জীবনের তিনটি দশক অতিক্রান্ত হয়েছে, তিনি কতোটুকু অসহায় হয়ে এ-সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা আন্দাজ করা কঠিন ছিল না৷

দুই

আমার শিক সত্যবাবু থাকতেন শান্তিগঞ্জ বাজারে৷ ওই বাজার আমাদের গ্রামের উত্তর পাশে নদী তীরে অবস্থিত৷ সত্যবাবুর বাবা ছিলেন কবিরাজ৷ কবিরাজি পেশা থেকে যে সামান্য আয় হতো ওই আয় দিয়েই সংসার চালাতেন, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ যোগাতেন৷ সত্যরঞ্জন দাস ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান৷ বাবার টাকায় লেখাপড়ার খরচ মিটত না বিধায় তিনি টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালাতেন৷ ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময়ই তিনি আমাদের স্কুলে শিক হিসেবে যোগদান করেন৷
নতুন স্কুল৷ তাঁরই শিক বাবু উমেশ চন্দ্র বিএবিএল পাশ করে কলকাতার বাড়ীঘর ছেড়ে অজপাড়াগাঁয়ে স্কুল গড়ে তুলেছেন৷ পশ্চাত্‍পদ এ গ্রামটির ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে শিতি হয়ে উঠবে এই স্বপ্ন ছিল উমেশবাবুর৷ ওই শিকের আদেশে সত্যবাবু স্বল্প বেতনে শিকতার দায়িত্ব পালনে ব্রতী হন৷ তাঁর এক ছোট ভাই আমার সহপাঠী ছিল৷ স্কুল সময়ের পর গ্রামের বিভিন্ন হাটে ছোট্ট দোকান সাজিয়ে বসতো৷ আয়ও সংসারে যোগ হতো৷ এভাবেই সত্যবাবুর পরিবার লেখাপড়ার জগতে ভিন্ন উদাহরণ তৈরী করে৷ দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে শিার জগতে ব্রতী হওয়ার দরুন গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেন সত্যরঞ্জন দাস৷
সত্যবাবু ধর্মান্তরিত হয়েছেন এ ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে ভালো লাগে নি৷ এক ধরনের আপন অসহায়ত্বে সমব্যথী হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা৷ পাড়ার হিন্দুরা মুসলমান হওয়ার পর তাঁদের ওপর মসজিদ তৈরীর হুকুম জারি হয়৷ শুধু নামে মুসলমান হলে তো চলবে না, কাজেও মুসলমান হতে হবে! তাই ওই শান্তিগঞ্জ বাজারের এক পাশে মসজিদ তৈরীর কাজে নামতে হয় নবদীতি 'মুসলমানদের৷' সত্যবাবুকেই মূল দায়িত্ব নিতে হয়৷ একদিন এক বিকেলে হাটবারে তাঁকে মসজিদের কাছাকাছি দেখি৷ কোন কথা হয় নি৷ আমাকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলেন৷ মনে হলো নিজেকে লুকাচ্ছেন যেন৷
অথচ এই মানুষটি নতুন স্কুলঘর গড়ার কাজে আমাদেরকে নিয়ে কি আনন্দেই না ছুটে যেতেন পাড়ায় পাড়ায়! আমরা নতুন স্কুলের জন্যে এলাকাবাসীর কাছ থেকে বাঁশ চেয়ে আনতাম, ফসল আনতাম, চাঁদা উঠাতাম৷ আমরা স্বেচ্ছাশ্রমে স্কুল ঘর তৈরীতে সত্যবাবুর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেছি অথচ এই মানুষটি ওই দিন আমাকে দেখেও কোন কথা বলেন নি৷
তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে আরো অনেক স্মৃতি ভেসে ওঠে৷ শান্তিগঞ্জে প্রতি বত্‍সর ঘটা করে দুর্গাপূজা হতো৷ পূজা কমিটির মূল দায়িত্বে থাকতেন তিনি৷ ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন৷ পূজার বিভিন্ন আয়োজন থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন পর্যন্ত সবকিছুতেই তাঁর পদচারণা৷ নাটকে অভিনয়ও করতেন৷ আমাদেরকে পূজা মণ্ডপের কাছে পেয়ে কী রকম যে আনন্দিত হতেন তা আজও স্মৃতিতে অম্লান৷ সেই মানুষটি ধর্মান্তরিত হয়ে মসজিদ তৈরী করছেন! আমাকে দেখেও কোন কথা বললেন না? মনে হলো যন্ত্রচালিত এক মানুষ৷ ভীত বিহ্বল ওই চেহারার ভেতর যে কী প্রচণ্ড কষ্ট লুকিয়ে রেখেছেন তা আমি আমার কিশোর মন দিয়ে সামান্যই অনুভব করতে পেরেছিলাম৷ আমি তাঁর কাছে গিয়ে কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করার সাহস পাই নি৷ তাঁর সাথে ওই দেখাই সম্ভবতঃ আমার শেষ দেখা৷

তিন

হিন্দুদের ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনায় স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তি বাদে অধিকাংশ গ্রামবাসীই উদ্বিগ্ন৷ তাদের অভিমত : ইসলামে জোর জবরদস্তি চলে না৷ ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম৷ সুতরাং সারা দেশ জুড়ে যেখানে হানাদার বাহিনীর হিংস্র, পৈশাচিকতার থাবা বিস্তৃত, সেখানে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ধর্মান্তরিত করার প্ররোচনা প্রদান ঠিক নয়৷
ধর্মান্তরিত হয়েও হানাদারদের নিষ্ঠুরতা থেকে বা তাদের এ দেশীয় দোসরদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে মুক্ত থাকা যে সম্ভব নয়, এ আশংকা থেকেই যায়৷ ওই পাড়াটি এমন এক অবস্থানে যেখানে ঘাতক বাহিনীকে থামতেই হতো৷ কেননা ওই জায়গাটি ছিলো ভালুকা-গফরগাঁও সড়কের মধ্যখানে ফেরীঘাট সংলগ্ন৷ ওই পাড়ার অধিবাসীদের আশংকা যে সঠিক ছিলো তার প্রমাণ অচিরেই পাওয়া গেছে৷
উল্লেখ্য যে, ওই পাড়ার অধিকাংশ বাসিন্দাদের আয়ের উত্‍স ছিলো ছোট ব্যবসা৷ কারও ছিলো মুদির দোকান, কারও কাপড়ের ব্যবসা, কারও বা ধান-চালের৷ ব্যবসার আয় থেকেই সংসারের যাবতীয় খরচ নির্বাহ করতে হতো৷ সুতরাং, ওই একমাত্র অবলম্বনের ওপর আঘাত আসা মানে সর্বস্বান্ত হওয়া৷ সে-কারণে সীমাহীন শংকার ভেতর দিয়ে ওই পাড়ার অধিবাসীদের দিন কাটতো৷ সাময়িক ধর্মান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো সে শংকারই বহিঃপ্রকাশ৷
হিন্দুদের ধর্মান্তরিত হওয়ার মনস্তাত্তি্বক দিকটির প্রতি যাঁরা সচেতন ছিলেন, তাঁদের সংখ্যা বেশী হলেও তাঁরা ছিলেন চলমান পরিস্থিতির কারণে দুর্বল৷ হানাদারদের দোসর দালালরা সাময়িকভাবে হলেও ওই সময় ছিলো উচ্চকণ্ঠ৷ নব্যধর্মান্তরিত 'মুসলমানদের' শংকিত চিত্তেই ওই দালালদের সিদ্ধান্তসমূহ মেনে চলতে হতো৷ ওই সময় লালমোহন মোদক নামে এক মুদী দোকানী মারা যান৷ ওই মৃত ব্যক্তির সত্‍কার চিতায় হয় নি, তাকে তাঁর চিরপরিচিত নদীতীরেই সমাহিত করা হয়৷
লালমোহন মোদকের মৃতু্য ও তাঁর সত্‍কারের বিষয়টি অনেকের মনকে নাড়া দিয়েছিলো, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ওই ঘটনা ছিলো অনাকাঙ্তি ও উদ্বেগজনক৷ সমাজের যে-অংশটি হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করার উদ্যোগ নিয়েছিলো তারাই লালমোহন মোদকের সত্‍কারে ছিলো অতিমাত্রায় উত্‍সাহী৷ অথচ, এরাই বলেছিলো, পাড়ার স্বার্থে সাময়িক ধর্মান্তরিত হওয়া প্রয়োজন৷ 'জীবন বাঁচলে ধর্ম থাকবে'_এ বাক্য দিয়েই উদ্বুদ্ধ করেছিলো তারা৷ অথচ পরবতর্ী সময়ে এরাই দীর্ঘদিনের লালিত বিশ্বাস, প্রচলিত আচার অনুষ্ঠানাদির ওপর আঘাত হানতে শুরু করে৷ আমার ধারণা সত্যবাবুসহ অনেকেই এ আঘাত মেনে নিতে পারেন নি৷ অথচ প্রতিবাদও করতে পারছিলেন না৷ এক ধরনের বোবা বিবেকের দংশনের শিকার হয়েছিলেন তাঁরা৷ সম্ভবতঃ দেশত্যাগ তারই পরিণতি৷

চার

এসব ঘটনাবলীর ভেতর দিয়েই সময়ের চাকা সামনের দিকে ছিলো অগ্রসরমান৷ এক সময় মুক্তিযুদ্ধের সাথে প্রত্যভাবে জড়িয়ে পড়ায় নিজের গ্রাম থেকে আমিও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি৷ যুদ্ধ শেষে গ্রামে ফিরে অনেকের সাথে দেখা হলেও আমার প্রিয় শিক সত্যবাবুর সাাত্‍ পাই নি৷ জানতে পারি তিনি আর এ বাংলায় নেই, ওপার বাংলায় চলে গেছেন৷
স্বাধীন দেশে, সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারের যারা স্বপ্ন দেখতাম, তারা ভাবতাম দেশের দুর্গম পল্লীতে বিভিন্ন ধর্মের মেলবন্ধনের ভেতর দিয়ে সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে উঠবে৷ আমাদের প্রিয় স্কুলটিতে দ্বিগুণ উত্‍সাহ নিয়ে কাজ করবেন স্কুলের জন্মলগ্ন থেকে জড়িত বাবু সত্যরঞ্জন দাস৷ শুধু আমাদের গ্রামে নয়, বাংলাদেশের আরও অসংখ্য গ্রামেই ঘটবে ওই সুখকর ঘটনা৷ আমরা যারা এসব আদর্শ শিকের ছাত্র, যুদ্ধের সাথে জড়িয়েছিলাম প্রত্য বা পরোভাবে, তারা গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে দাঁড়াবো তাঁদের সামনে৷ তাঁরা আমাদেরকে অন্তরের গভীর থেকে আশীর্বাদ করবেন৷ তাঁদের সে-আশীর্বাদ হয়ে ওঠবে আমাদের পথ চলার প্রেরণা৷
কিন্তু, বাস্তব এমনই রূঢ় যে, আমরা আমাদের প্রিয় শিকদের ধরে রাখতে পারি নি৷ ওই অপারগতার দুঃখবোধ আজও বুকে বয়ে চলেছি৷ যে-কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আবেগ মেশানো ছোট্ট ওই চিঠিটির জবাব দিতে পারি নি৷



  © Notun Diganta 2007.
All Rights Reserved
Powered by headoffice