ভাষান্তর
নারী এবং ক্রমপরিবর্তিত সভ্যতা
মূল উইনিফ্রেড হল্টবি
ভাষান্তর মোবাশ্বেরা খানম
[ পূর্ব-প্রকাশিতের পর ]
সম্পত্তির অধিকার
উপার্জন করার অধিকার সম্পত্তির অধিকারের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়৷ একটি আদর্শ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্পত্তির মালিক বনে যাওয়াটা এমন কোনো ব্যতিক্রমী সুযোগ বা সুবিধার ব্যাপার নয়৷ সুখ বা প্রীতিই পরমার্থ_এমন মতবাদ দিয়ে আয়ের সমতাকরণের ব্যাপারটিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়৷ কিন্তু গত দেড়শতাব্দী ধরে নারী যে পৃথিবীটিতে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, সেই পৃথিবীতে প্লেটোনিক সমাজতন্ত্রের কিছু স্মারক বা নমুনা দেখা গেছে, যা তাদের আয়ের পার্থক্যকে গুরুত্বহীন করে তুলেছে৷
সেই পৃথিবীতে সম্পদের অর্থ হচ্ছে মতা, আর নারী তো দরিদ্রই থেকেছে৷ অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে৷ মিস এ্যানজেলা বারডেট, যাঁর জন্ম ১৮১৪ সালে এবং যিনি উনিশ শতকের মানবিচারে প্রশংসনীয়রূপে পরিবারে বড় হয়ে উঠেছিলেন, তিনি তাঁর সত্-পিতামহীর কাছ থেকে বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন৷ যদিও তখনো 'বিবাহিত মহিলাদের জন্য সম্পত্তি' আইন পাশ হয় নি৷ মিস বারডেট ইউরোপের সবচেয়ে ধনী উত্তরাধিকারীদের অসংখ্য প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব বিশাল দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলেন এবং ১৮৭১ সালে হাইগেট ও ব্রুকফিল্ডের 'ব্যারোনেস্ বারডেট' হয়েছিলেন৷ মিসেস রে স্ট্র্যাচি তাঁর
The Cause বইতে বিষয়টিকে এভাবে পর্যবেণ করেছেন, 'প্রায় বিরল একটি উদাহরণ এই যে, একজন রাজার সঙ্গিনী না-হওয়া সত্ত্বেও ভিন্ন কোনো অবদানের কারণে একজন মহিলাকে রাজকীয় অভিজাতমণ্ডলীর সদস্যপদ প্রদান করা হলো৷'
তাঁর আগেও ধনী বিধবা মহিলা এবং রাজকন্যারা ছিলেন; তাঁর পরেরকালেও ধনী ব্যক্তিদের কন্যারা ছিলেন, ছিলেন গায়িকা ও চলচ্চিত্র তারকাগণ, জনগণের মুগ্ধতা যাদের জন্য বয়ে এনেছিল অবিশ্বাস্য সম্পদ৷ এর সঙ্গে আরও ছিলেন ধীরে ধীরে গড়ে-ওঠা পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নারীগোষ্ঠী, যাদের উপার্জন তাদেরকে দতার পর্যায় থেকে মতায় নিয়ে আসে৷
কিন্তু বেশীর ভাগ েেত্র মেয়েরা ছিল দরিদ্র এবং আছেও, যদিও ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ হয়তো-বা বিশাল সম্পত্তির অধিকারী বা নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে ছিলেন৷ পুরুষরা নিজেদের জন্য যেমনি ব্যয় করে থাকে, এই মহিলারা হয়তো-বা নিজেদের জন্য তার চাইতেও অধিক ব্যয় করতেন৷ ফারের কোট, দামী রত্নখচিত অলংকার, অর্কিড, বিলাসবহুল ফ্যাট, বিলাসী ফ্যাশন ম্যাগাজিনের চকচকে মসৃণ পাতায়-বিজ্ঞাপিত সৌন্দর্যচর্চার বিবরণ_এগুলো মহিলাদের লোভকে বাড়িয়ে তোলার জন্যই পরিকল্পিত হয়েছে৷ দামী চামড়ার দর্শনীয় মানসম্মত জিনিসটির ভোগ তো তাদেরই জন্য৷ তবে সুগন্ধি, বিনোদন, নৌভ্রমণ ও ঘরোয়া পার্টির জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে তা আসতো স্বামী বা পিতার কাছ থেকেই৷ মহিলাদের মাধ্যমে এই পুরুষেরা নিজেদের ব্যয়মতার মর্যাদা এই সহজপ্রবণ
(impressionable) পৃথিবীতে ঘোষণা করতে চান৷ মহিলারা হয়ত ব্যয় করেন, কিন্তু রাজত্ব, মতা ও গৌরব, যা কিছু এর-দ্বারা ক্রীত হয় তাতে তো পুরুষেরই প্রাধিকার৷
যে-মহিলা আপন জীবিকার সন্ধানে বের হন তাঁর বেলায় এমনটি প্রত্যাশা করা হয় যে, তিনি বাত্সরিক ২৫০ পাউন্ডের একটি পরিমিত আয়েই নিজেকে সন্তুষ্ট রাখবেন, তার আয় খুব বেশি হওয়ার দরকার নেই৷ বিজ্ঞাপিত, 'পেশাজীবী মহিলাদের জন্যে ভাড়ায় ফ্যাট,' আবাসিক সঙ্ঘ ও হোস্টেলগুলো কম ব্যয়ের স্থান ছিল, যেখানে রাতের খাবারের ডিম গ্যাসের চুলায় সিদ্ধ করা যেতো এবং রাতে বন্ধুদেরকে কোমল কোকোর কাপ দিয়ে আপ্যায়নও করা চলতো৷ একটি সরল প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, যেহেতু মেয়েদের ওপরে কেউ নির্ভরশীল নয়, সেহেতু তাদের স্বল্পতর বেতনই যথেষ্ট; কেননা তাদেরকে নয়, বরং পুরুষদেরকেই পরিবার-প্রতিপালন করতে হয়৷
নিবিড় বিশ্লেষণ ক্রমাগত প্রমাণ করেছে যে এটি একটি ভ্রান্তিমাত্র, তবুও তা জনমনে-ছড়ানো প্রচলিত বিশ্বাসকে সামান্যই টলাতে পেরেছে৷ অবশ্য যুদ্ধের পর থেকে বেশ কিছু জরীপ চালানো হয়েছে৷ লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিঙ্-এর অধ্যাপক বাউলি পাঁচটি নমুনাস্বরূপ শিল্পনগরীতে এক দশমাংশ শ্রমজীবী পরিবারের ওপর সমীা চালিয়েছেন৷ আরো সাতটি পৌরশহরের ব্যারো
(borough) আদমশুমারি তালিকা পরীা করে দেখেছে যে, কুড়ি বছরের বেশি বয়স্ক পুরুষ-শ্রমিকদের শতকরা সাতাশজনই অবিবাহিত কিংবা সন্তানপালনের দায়িত্ববিবর্জিত বিপত্নীক৷ শতকরা চবি্বশ ভাগ বিবাহিত, কিন্তু তাদের চৌদ্দ বছরের নিচে নির্ভরশীল সন্তান নেই৷
অসামরিক প্রশাসনের ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য গঠিত রাজকীয় কমিশনকে দেওয়া সা্যে যা কিনা মিস হেলেনা নরম্যানটনের বই, 'বেতনে লিঙ্গ বৈষম্য'-এর ভুক্তিতেও আছে, দেখা যাচ্ছে যে, সাত বছর চাকুরি হয়েছে এমন মহিলাদের মধ্যে শতকরা সাঁইত্রিশ জনের আয়ের ওপর নির্ভরশীল পারিবারিক সদস্য রয়েছে, দশবছরের ওপর চাকুরি যাদের তাদের েেত্র এ সংখ্যা শতকরা চলি্লশ জনের, পনের বছর ধরে চাকুরি করছে এমন মহিলাদের বেলায় এ হার তেতালি্লশ শতাংশ৷ আর যেসব মহিলা কুড়ি বছরের ওপর চাকুরি করছেন তাদের েেত্র চুরাশি শতাংশ৷
স্বল্পবেতনের কারণ হিসেবে দ্বিতীয় যে-ধারণাটি কাজ করছে তা হলো এমন একটি বিশ্বাস যা কিনা মাঝে মাঝে বেসরকারী নিয়োগকারী এবং স্থানীয় কতর্ৃপও জোর দিয়ে প্রচার করে বাস্তবে রূপ দিতে চায়৷ যেমন বিয়ের পর সব মহিলাই চাকুরি ছেড়ে দিতে বাধ্য৷ স্যার চার্লস চিয়ার্স ওয়েকফিল্ড তাঁর দারুন জনপ্রিয় বই, 'বিদ্যালয়ত্যাগ প্রসঙ্গ'তে লিখেছেন, 'সামান্য বেতন, কিছুটা অবসর ও আরো স্বাধীনতার অর্থ হচ্ছে, একজন তরুণী, বুদ্ধিমতী ও সুন্দরী মহিলা তার চাকুরির বিনিময়ে যা চায় ঠিক তা, বাকীটা সে আশা করে ক'বছর বাদে তার স্বামী তাকে দেবে৷'
অল্পকিছু পেশা আছে, যেমন নাট্যমঞ্চ, সাংবাদিকতা, আইন ও চিকিত্সাশাস্ত্রের বিশেষ কিছু শাখা, যেখানে নারী ও পুরুষ একই কাজের জন্য সমপরিমাণ বেতন পান৷ যদিও প্রথমটি ব্যতীত, বাকীগুলোতে এখনও সুযোগ সমান নয়৷ ১৯৩৩ সালে যখন জনৈক মহিলা চিকিত্সক ৭০,০০০ পাউন্ডের বিশাল সম্পত্তি রেখে মারা গেলেন, তখন তাঁর সম্পদের বিবরণ ক'দিন ধরেই জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ খবরের বিষয় হয়ে উঠেছিল৷ বেশীর ভাগ স্বনির্ভরশীল মহিলার ভেতরে এখনও দেখা যায়, যাকে ভেরা ব্রিটেইন কৌতুক করে বলেছেন, 'পাচ পাউন্ডের চেহারা', নিরীহ একটি প্রাণীর মুখ, যে কিনা তার অবস্থানটি নিয়েই সন্তুষ্ট৷ খুব বেশী হলে সে হয়তো পেছনের দপ্তরে সহকারী হিসাবরকের কাছ থেকে চিঠি লেখার নির্দেশ না-নিয়ে সংস্থা প্রধানের কাছ থেকে সেটা গ্রহণ করে থাকে৷
ব্যক্তির আয়ের ব্যাপারে যা সত্য, জাতীয় ব্যয়ের ব্যাপারেও তা সমানভাবে সত্য বটে৷ এমনটি নয় যে, কেবলমাত্র রাষ্ট্র-দ্বারা নিযুক্তি পেলেই মহিলারা কম বেতন পান৷ বরং দেখা গেছে যেখানে জনপ্রশাসনের কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বিপরীত কিছুর প্রতিশ্রুতি দেন, সেখানেও নিয়মিত সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে৷ এর স্বাভাবিক ফলাফল হিসেবে যা ঘটেছে তা হলো জাতীয় ব্যয়ের বাজেট করতে গিয়ে ঐতিহ্যগতভাবে মেয়েদের স্বার্থরার জন্য বিশেষভাবে যেসমস্ত ব্যয় ধরা হতো, তা গৌণ হয়ে উঠেছে৷ এটি একটি চক্র যা উদ্দেশ্যের দিক থেকে অসত্ না-হলেও ফলশ্রুতিতে অসত্ হয়ে ওঠে৷ উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মহিলারা পুরুষদের চেয়ে কম বেতন পেলে সরকারী তহবিলেও কম দান করবে, যেমন বেকার বীমার েেত্র সপ্তাহে এক শিলিং ছয় পেন্সের জায়গায় এক শিলিং এক পেন্স৷ অতএব অসুস্থতার েেত্র আনুপাতিক সুবিধাও তেমনটাই হবে, পনের থেকে বার শিলিং, আর বিবাহিত মহিলার েেত্র দশ শিলিং তিন পেন্স থেকে তের শিলিং ছয় পেন্স৷ বিস্ময়কর নয় যে, মূল্যের এমন একটি মানের অবস্থায়, ১৯২৯-৩০ সালে মাতৃত্ব ও শিশুমঙ্গল খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় এককভাবে হয়েছে চিনি শিল্পে-দেয়া ভতুর্কির চেয়েও কম, সড়ক তহবিলের চেয়ে ২০০,০০০ পাউন্ড কম এবং 'সামরিক পূর্তভবন ও জমি' খাতে-দেয়া বরাদ্দের তুলনায় অবশ্যই অল্প৷
অতএব ব্যক্তি হিসেবে বা লৈঙ্গিক বিবেচনায় নারীরা দরিদ্রই৷ এই দারিদ্র্য তাদের নিজেদের ওপর এবং সার্বিক অবস্থানের ওপর অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া ঘটায়৷ ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর গড়ে-ওঠা একটি সমাজে দরিদ্র হওয়ার অর্থই হচ্ছে নিরাপত্তাহীন হওয়া, আর নিরাপত্তাহীনতা জন্ম দেয় বশ্যতার৷ একজন খাঁটি গভর্নেসের ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্যগুলো, যেমন তার স্পর্শকাতরতা, কতর্ৃপরে প্রতি নমনীয়তা, গৃহভৃত্যদের সাথে দুর্ব্যবহার, তিরি িমেজাজ, প্রাণপ্রাচুর্যের ও সৌন্দর্যের অভাব নিশ্চিতভাবেই তার দারিদ্র্যের লণ প্রকাশ করে৷ তখনকার সময়েও মেধাবী গভর্নেসরা ছিলেন, ছিলেন শার্লট ব্রন্টি৷ বন্ধুত্ববৈরী ডিউকরা ছিলেন, ছিলেন ওয়াটারলুর বিজয়ী বীর৷
ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর চমত্কার প্রবন্ধ
‘A Room of One’s Own’-এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিভাবে সর্বকালেই দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা মানুষের মধ্যে বশ্যতার জন্ম দেয়, জন্ম দেয় গতানুগতিকতার, আর বাধা দেয় অদম্য উদ্যোগ, প্রাণশক্তি ও কল্পনাপ্রবণ উদ্যমকে৷
দারিদ্র্য জন্ম দেয় শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতার৷ ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের পুষ্টি পরিষদ যখন স্পষ্ট করে জানাল যে, সেদেশের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ দেহ ও মনের সঠিক স্বাস্থ্য গঠন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিসীমার নীচে বসবাস করছে, তখন দেখা গেল এই দুর্বলতা যে কেবল নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তা নয়৷ ট্রেডবোর্ড আইন সত্ত্বেও শ্রমিকদের ঘাম-ঝরানো যেসব শিল্প এখনও টিকে আছে সেগুলো দারিদ্র্যসীমার ঠিক সমতলে বা নীচে বসবাসকারী সহস্রাধিক শ্রমজীবী পরিবারের মধ্যে সবধরনের স্তরে বিন্যস্ত, অদ এবং স্বল্পবেতনভুক শ্রমিকদের দ্বারা পূর্ণ৷ সেই সাথে কর্মহীন বেকার মহিলাদের স্বাস্থ্য পুষ্টিহীনতার কারণে দুর্বল৷ তারা রক্তস্বল্পতায় ভোগে, তাদের দাঁত য়ে যায়, পেশী শিথিল হয়ে পড়ে, হৃদযন্ত্র ছন্দ হারিয়ে ফেলে৷ তারা ভোগে বদহজম ও স্নায়বিক পীড়ায়, ভোগে নিদ্রাহীনতা ও মনোবিকারে৷
বেকার ও স্বল্পবেতনভুক পরিবারগুলোতে মায়েরা সাধারণত গ্রহণ করে সবচাইতে নিকৃষ্ট খাবারটি৷ বাচ্চাদের নাস্তা বানানোর সময় বা স্বামীর দুপুরের খাবারের স্যান্ডউইচের রুটি যখন কাটেন তখন চটজলদি মুখে তুলে নেন একটুকরো রুটি, মার্জারিন ও এককাপ চা৷ তারপরও যখন যুদ্ধের সময় মেয়েরা শিল্প কারখানায় কাজে নেমে পড়ল এবং এজন্য ভাল বেতন পেতে থাকল, এবং খাদ্যাভাব সত্ত্বেও এমনভাবে খেতে পেল যেমনটি তারা আগে ক্বচিত্ পেয়েছে৷ তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 'যুদ্ধাস্ত্র কারখানায় নারীদের বিকল্প নিয়োগ' সংক্রান্ত স্মারকের ১৯১৯ সালের প্রতিবেদনে লেখা সম্ভব হয়েছিল যে, 'মহিলারা মনে হয় শ্রমসাধন কাজকে কান্তিকর নয়, বরঞ্চ স্বাস্থ্যকর বলে বিবেচনা করে৷'
প্রতিক্রিয়াটি কেবল ব্যক্তি-নারীর েেত্র বর্তায়নি৷ যখনই নারীরা দলবেঁধে কোনো কিছু করতে চান, যেমন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা, বা পত্রিকা বের করা কিংবা বিমানে পৃথিবী ঘুরে আসার জন্য অর্থ ব্যয় করা, তখনই তারা তিক্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকেন৷ এমনকি আজো তা ঘটে৷ বিশ্বজুড়ে শিার জন্য, রাজনৈতিক ভোটাধিকারের জন্য, পেশাগত সুযোগ সুবিধার জন্য নারীর সংগ্রাম বাধাগ্রস্ত হয়েছে দারিদ্র্যের কারণে; যদিও হয়তো হঠাত্ কখনও কোনো উত্তেজনাপূর্ণ আন্দোলন পাথর খুঁড়ে সোনা বের করে এনেছে৷ ফোরেন্স নাইটিঙ্গেল যখন ক্রিমিয়া থেকে ফিরে এলেন, মিসেস প্যাঙ্কহার্স্ট যখন একটি অনশন ধর্মঘটের শেষে
W.S.P.U.-এর জন্যে আবেদন জানালেন, তখন সেই আবেদনে সাড়া দিতে মহিলারা তাদের অলংকারাদি বেচে দিলেন, ঘড়ি বন্ধক রাখলেন, আর ত্যাগ করলেন ছোখখাট বিলাসী ব্যাপারগুলো, যেমন বই কেনা, কনসার্টে যোগ দেওয়া, বেড়ানো বা নতুন পোশাক ক্রয়৷ স্ত্রীরা তখন ভালবাসাপূর্ণ সহমমর্ী স্বামীদেরকে মনস্তাত্তি্বকভাবে চাপ দিয়ে অর্থ আদায় করলেন, সংখ্যালঘু ধনী মহিলারও এগিয়ে দিলেন তাঁদের সম্পদ৷
কিন্তু বেশীর ভাগ েেত্র মহিলাসংঘ, কলেজ ও বিদ্যালয়গুলো যথেষ্ট দরিদ্রই ছিল৷ তার মানে কেবল এই নয় যে, একজন পেশাজীবী নারী যদি কোনো মক্কেলের
(client)সাাত্কার নিতে চাইতেন তখন কদাচিত্ তাঁকে কার্লটন গ্রিল হোটেলে নিয়ে যেতে পারতেন৷ এর মানে এটাও যে, একটি কলেজপড়ুয়া মেয়ের জন্য উচ্চতর বৃত্তি পাওয়ার সুযোগ ছিল খুবই কম৷ যখন সে কলেজ ছাড়ে তখন গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট পদ পাওয়ার সুযোগ ছিল আরো কঠিন এবং যিনি তার গবেষণার উদ্যোগে অর্থায়ন করবেন এমন একজন উদার ধনী লোক পাওয়াটা ছিল কঠিনতর৷
এমনকি যখন নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে যথেষ্ট সম্পদ লাভ করেন, তখনও সমলিঙ্গের অন্যকারো পেছনে সেই অর্থ ব্যয় করার বিরুদ্ধে ঐতিহ্যের চাপ এত বেশি তৈরী হতো যে, তখন তাঁরা নিজেদের স্বার্থের দিকে তাকানোর ব্যাপারটিও উপো না-করে পারতেন না৷ 'ওইটেকার বর্ষপঞ্জী'তে একটি তালিকা দেয়া হত 'বর্ষের শীর্ষ দাতা বা দানশীলদের দানের৷' ১৯৩৪ সালের সংখ্যায় দেখা গেছে যে হালিংহাম-এর মিসেস বেটি মে গ্রে ৬০,০০০ পাউন্ড দান করেছেন৷ এর মধ্যে ৭,৫০০ পাউন্ড
TOC H.. কে দিয়েছেন৷ প্রাক্তন নাবিকদের, সৈন্যদের, বৈমানিক ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণের জন্য দিয়েছেন ৫,০০০ পাউন্ড, আর ৫,০০০ পাউন্ড দান করেছেন 'একটি বিশাল বৃটিশ সাম্রাজ্যের যোগ্য নাগরিক হয়ে ওঠবার জন্য কিশোরদের প্রশিণের আয়োজন করতে৷'
একইভাবে কার্শালটনের মিসেস এমিলি ফ্রান্স জ্যাকসন ৪০,০০০ পাউন্ড রেখে যান প্রাক্তন সেনা ও নাবিকদের জন্য৷ হোভের মিস ম্যারি এ্যান স্মিথ সেনা ও নাবিকদের জন্য মিস্ ওয়েস্টনের কর্মতহবিলে দান করেন ৩,০০০ পাউন্ড৷ টোরকয়ের মিস এমা মে ওয়েব হ্যারো স্কুলের বৃত্তি ও খেলাধুলার জন্য ২,০০০ পাউন্ড দান করেন৷ উল্লেখযোগ্য এসবের মধ্যে একটি দানও কিন্তু মেয়েদের সরকারী বিদ্যালয়, ক্রীড়া বা উত্তম নাগরিক হবার প্রশিণের জন্য ছিল না৷ লৈঙ্গিক উন্নাসিকতার কি অদ্ভুত প্রকাশ!
এমনও নয় যে, কেবলমাত্র দারিদ্র্যই কর্মজীবনের প্রস্তুতিপর্বকে বাধাগ্রস্ত করে৷ সামান্য বুদ্ধি থাকলে অর্থই অর্থ আনে, পুঁজি সঞ্চিত হয়৷ কর্মসহযোগী নিয়োগ, ভ্রমণ, দাপ্তরিক সরঞ্জামাদি, আপ্যায়ন দ্রুতই একটি পেশাগত আয়কে দ্বিগুণ বা তিনগুণ করে দেয়৷ আর এ ধরনের ব্যয় পেশাগত বা ব্যবসায়ী জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ এনে দেয়৷ যদি কোনো মহিলা ব্যারিস্টার নিজের সচিবকে চিঠির ডিকটেশন না-দিয়ে, লন্ড্রিতে পোশাক না-পাঠিয়ে, শনিবারের সন্ধ্যায় নিজ হাতে কাপড় ধুয়ে, নিজে চিঠির উত্তর লিখে, আর মোটর চালিয়ে সানিংডেল গলফ্ মাঠে ব্রিফ পাওয়ার আশায় যান, তখন সেই ফাঁকে যদি পুরুষ সহকমর্ীটি তাঁর মামলা-মোকদ্দমার কাজগুলো হস্তগত করে নেয় তবে দোষটি কার? হয়ত এটি সঠিক নয় যে, মামলার বিবরণী, কমিশন, দপ্তর, বিনিয়োগ টিপস, সম্মানজনক বৃত্তি, মন্ত্রিসভার নিযুক্তিগুলো মধ্যাহ্নভোজ, সপ্তাহান্তের ঘরোয়া পার্টি বা কাবে বসে নির্ধারিত হবে৷ তবে এখনও ইউরোপ ও আমেরিকায় এভাবেই কাজ চলে, যদিও ভারতের কথা না-বলাই ভাল; এমনকি আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার কথাও, সেখানে আদৌ এসব ব্যবসা হয়ই না৷
পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্যায় পরিহাসের এটিও একটি যে, লোভনীয় লেনদেনগুলো সুন্দর ঝকঝকে একটি অফিসে যথেষ্ট সংযত ও পরিমিতভাবে উপস্থাপন করা যায়৷ আরো সুচারুভাবে সম্পন্ন হয় প্রথম শ্রেণীর রেস্তোরাঁয়, সবচাইতে ভালোভাবে হয় ব্যক্তিগত প্রমোদতরীর ডেকে বসে৷ উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছাড়া, বিলাসবহুল অফিস, রিজ কার্লটনের হিসাবরণ, এবং নিজস্ব প্রমোদতরী ব্যবসায়ী বা পেশাজীবী নারীদের আয়ত্তের বাইরেই থাকে৷
অবশ্যই এসব অবস্থার উন্নতি ঘটেছে৷ অতীতে সম্পত্তির অধিকারের লড়াইটি অংশত ছিল কিছু আইনের বিরুদ্ধে লড়াই, যেগুলো মহিলাদেরকে সম্পত্তি লাভ বা দখল পেতে বাধা দিচ্ছিল৷ কার্যত সংগ্রামটি ছিল রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের আরো বেশী অংশ পাওয়ার জন্য৷ প্রধানতঃ এটি ছিল সেই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই, যেটি বুঝতেই চাইতো না কেন নারীরা 'স্বল্পমজুরী', সামান্য অবসর ও সীমিত স্বাধীনতার চেয়ে অধিক কিছু চাইবে৷
আইনগত সংস্কার অর্জন করাটা ছিল সবচাইতে সহজ, কেননা সেগুলো ছিল নির্দিষ্ট৷ আইন যখন যথেষ্ট কঠোর থাকে তখন তারা নিজেরাই তাদের প্রতিকার করে৷ বারবারা বডিকন্ ও ল্যাংহাম প্লেসের ুদে সংস্কারবাদী দলটি প্রথম জনমত সৃষ্টি করে, পরে তা গড়ায় 'বিবাহিত মহিলাদের সম্পত্তি আইন' পাশ হওয়া অবধি৷ ১৮৫০ সালের পর থেকে তারা চাপ দিয়ে আসছিল সেইসব মহিলাদের প্রতি কঠোর ব্যবস্থার স্বীকৃতি দেয়ার জন্য, যারা স্বামী ও পরিবার প্রতিপালন করতেন নিজের উপার্জিত সেই অর্থে, যার ওপর হয়ত তাদের প্রকৃত অধিকার থাকত না৷
১৮৭০ সালের বিলে এই অন্যায়টিকেই প্রথমবারের মতো আক্রমণ করা হয় এই যুক্তিতে যে, মহিলারা যা আয় করেন তা নিজের কাছে রাখতে পারবেন, বাকী সবকিছু যদিও তখন তাদের স্বামীদেরই দখলে৷ এরপর সংস্কারের জন্য জনসমর্থন পাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়ে৷ আবেদনপত্রে হয়ত স্বার পাওয়া গেল, উদ্যমী লিডিয়া বেকার হয়ত নারীদেরকে সংগঠিত করলেন, কিন্তু পুরুষেরা কোনো কারণই খুঁজে পেলেন না এটা বুঝবার যে, স্ত্রীরা কেন স্বামীদেরকে অবিশ্বাস করছে৷ সৌভাগ্যক্রমে আইনের মারপ্যাচে ক্রমাগত প্রতারিত হয়ে ব্যবসায়ীরা বিােভকারীদেরকে সমর্থন দেয়৷ মিসেস জ্যাকব ব্রাইটের দ্বারা কৌশলে আপ্যায়িত হয়ে আইনজীবীরা কারিগরি সমস্যাটিকে খুব আকর্ষণীয় বলে মনে করলেন৷ ১৮৮২ সালে বিবাহিত মহিলাদের সম্পত্তি আইনটি পুরোটাই পাশ হয়ে যায়৷
এমনটা বলা হয় যে, এই আইনটি নারীদের জীবনে ভোটাধিকারের বিষয়ে অগ্রগতির পদপেগুলোর চেয়ে অনেক বেশী কিছু দিয়েছে৷ আসলে উভয় ধরনের সংস্কারই পরস্পরের ওপর প্রতিক্রিয়া ঘটায়৷ দুটোর অর্থই মতার বৃদ্ধি৷ দুটোই নারীর আত্মবিশ্বাসকে বাড়িয়ে দিল, পেছনে ফেলে এল অনিয়ম ও পরস্পরবিরোধিতার উত্তরাধিকার৷
আজকাল সম্পত্তি-অধিকার আইনগুলো স্বামীদের তুলনায় স্ত্রীদের প্রতি অধিক পপাতিত্ব দেখায়৷ একজন স্ত্রীর স্বামীকে প্রতিপালনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদিও
Means Test বা সম্পত্তির নিরীা স্ত্রীর উপার্জনে স্বামীকে সুযোগ পাওয়া থেকে বঞ্চিত করতে পারে৷ এখনও আইনের চোখে স্বামীই বাধ্য স্ত্রীকে প্রতিপালন করতে, তার জন্য একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে ও তাদের আয়কর প্রদান করতে৷ এখনও স্ত্রীর অপরাধ ও শাস্তির জন্য স্বামীকেই দায়ী করা হয়৷ যদি স্ত্রী কোনো প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে কুত্সা রটনা করে, যদি বেপরোয়া গাড়ী চালানোর দোষে অভিযুক্ত হয়, অথবা সড়ক অবরোধের মতো কাজ করে তাহলে স্বামীকেই তার জন্য জরিমানা দিতে হয়৷ সাবেকি পদ্ধতির নিয়মনীতির ধ্বংসাবশেষ ঋণব্যবসায়ের পুরোটিকেই এখনও জটিল ও অসুবিধাজনক করে রেখেছে৷ আজকাল একজন স্ত্রী তার স্বামীর ঋণের ব্যাপারে ততণই প্রতিশ্রুতি দিতে পারে যতণ ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট লোকজন তাকে বিশ্বাস করে৷ স্বামীটি হয়ত অনেকবারই কোর্টের তলবনামা পেতে পারেন এমন সব বড় বড় অংকের টাকার জন্য, যা তিনি কখনই খরচ করেন নি৷ শিল্পনগরীর দরিদ্রতম অংশে এমনটি প্রায়ই ঘটে থাকে৷ দেনার দায়ে জেলও হয়৷ মহিলা নয়, বরং পুরুষটিই জেল খাটেন৷
ছয়দফা গ্রুপের মতো নারীবাদী সংগঠনগুলো ১৯৩৪ সালে এই বৈষম্যের প্রতিকার সাধনের চেষ্টা করে৷ পুরুষের বিরুদ্ধে এ ধরনের বৈষম্য গড়ে উঠেছে এমন একটি ব্যবস্থা থেকে, দুই হাজার বছর ধরে যা নারীর প্রতি অন্যায় করে চলেছে বলে প্রমাণিত হয়েছে৷ যদি অন্যায়ের সেই ঘড়ির দোলকটি একটু অন্যদিকে দুলে থাকে তবে তা মাত্র মুহূর্তের জন্য৷ তাও আবার বিশেষ বিশেষ েেত্র৷ ১৯২৬ সালের আইন উইল না-করে যাওয়া মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ব্যাপারটি নারীপুরুষ উভয়কেই সমান করে দেয়৷ তারপরও এখনো পর্যন্ত ভূসম্পত্তি ও পদবী প্রথমে যায় জ্যেষ্ঠ পুত্রসন্তানের কাছে, যদি সেই পুত্রের আগে কন্যাসন্তান থাকে তবুও৷ কেবল নিজের অধিকারেই ব্রিটিশ উচ্চকরে আজীবন সদস্য হয়েছেন এমন মহিলার সংখ্যা খুবই কম, যেমন কাউন্টেস্ রবার্টস্ অথবা ভাইকাউন্টেস্ রনডা৷ তাঁরা দু'জনেই এই উপাধি লাভ করেছিলেন অদ্ভুত একটি পরিস্থিতিতে তাঁদের পিতাদের কাজের দরুন৷
জাতীয় আয়ের পুরো অংশটি পাওয়ার সর্বশেষ লড়াইটা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং এখনও চলছে৷ ১৯১১ সালের জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা আইন অবশ্যই সহস্রাধিক নারীকে রাষ্ট্রীয় ইন্সু্যরেন্সের আওতায় এনেছে, কিন্তু তারা সমান অর্থ জমা দিতে পারে নি, তাই সমপরিমাণ সুবিধাও পায় নি৷ ঠিক একই কারণে বেকার-বীমার েেত্রও এমন বৈষম্য রয়ে গেছে৷ হয়তো তা অনিবার্যই ছিল৷ যতোদিন মহিলারা পুরুষদের চেয়ে একই কাজের বিনিময়ে কম রোজগার করবে এবং বীমার জন্য জমা দেবে কম, ততোদিন তাদের জন্য তহবিলে অর্থকর্তন অবশ্যই পরিমাণে স্বল্পতর হবে; ট্রেডইউনিয়ন ফান্ড বা জাতীয়বীমা অথবা রাজনৈতিক দলের চাঁদার তহবিল, ত্রেটি যাই হোক না কেন৷ কিন্তু ভিন্ন আরেকটি নীতি অন্য দুটো আন্দোলনের গভীরে প্রবহমান ছিল, সেটি হচ্ছে বিধবাদের অবসরভাতার জন্য একটি ব্যবস্থা দাবীর প েপ্রচারণা চালানো৷
উপরোক্ত দুটো আন্দোলনই একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক পদ্ধতিকে স্থির নিশ্চিত বলে মেনে নেয়, যেখানে পরিবার থাকে স্বামী ও পিতার ওপর নির্ভরশীল৷ যে-মহিলাটি বিয়ের পর বেতনসহ নিজের চাকুরীটি ছেড়ে দেয়, তার সন্তানেরা বয়োসন্ধিতে না-পৌঁছানো পর্যন্ত স্বনির্ভর হয় না৷ আসলে এটি তুলনামূলকভাবে একটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা৷ যেমন এলিনর রোথবন তাঁর 'উত্তরাধিকার-বঞ্চিত পরিবার' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মধ্যযুগের নারীরা ঘরে ও মাঠে উত্পাদনকারী হিসেবে কাজ করত৷ উনবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত শিশুশ্রমকে নিশ্চিত বলে গণ্য করা হতো৷ ১৩৮৯ সালের নির্মিত একটি প্রাচীন মূর্তি দেখে বোঝা যায় 'শিশুটি বার বছর পর্যন্ত কৃষিকার্যে নিয়োজিত ছিল৷' কিন্তু যখন মানবিক আইনগুলো ও উনবিংশ শতাব্দীর গার্হস্থ্য বিধিমালা শ্রমবাজার থেকে প্রথমে শিশুদের ও পরে বিবাহিত নারীদের একটি বিশাল অংশকে বিতাড়িত করল, তখন সবাই পরিবারের উপার্জনম পুরুষটির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে৷ এর একটি পরিণতি হলো এই যে, গৃহকর্তার কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো পরিবারটিই বিপন্ন হয়ে পড়তো৷
দ্বিতীয়টি হলো, সমান বেতনের জন্য মেয়েদের দাবীটি বরাবরই_মেয়েরা পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল, এই যুক্তিতে বাধাগ্রস্ত হতে থাকে৷ তৃতীয় ফলাফলটি হলো, যখন মেয়েরা শ্রমবাজারে ঢুকল তখন তারা একটি বিরূপ পরিবেশে অকারণ অবজ্ঞার অবস্থাতেই ঢুকল৷ আর চতুর্থ ফলাফলটি হলো, স্বাস্থ্যপরিচর্যার মান, আরাম, গৃহের স্বাচ্ছন্দ্য ও আয়েশ সবই নির্ভর করত গৃহকর্তার খামখেয়ালী ইচ্ছার ওপর৷
এ ধরনের নির্ভরশীলতাকে নানারকম উপায়ে ইদানিং পরিবর্তন করা হয়েছে৷ দরিদ্র-সহায়ক আইনের ব্যবস্থাপনা অসন্তোষের সঙ্গে হলেও সকল ব্যক্তির প্রয়োজনকে বিবেচনায় এনেছে, কেবল যে 'মা-বাবা ও তিন সন্তানে'র কল্পিত পরিবারকে তা নয়৷ যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে রুটিরুজির উপার্জনকারীদের স্রোতের মতো যোগদান সহজতর করা হয়েছিল, তাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে ভরণপোষণ ভাতা দিয়ে৷ তার ফলে স্বাস্থ্যের মানে যে উন্নতি ঘটেছিল এ-বিষয়টি সেই সংক্রান্ত দাপ্তরিক নথি সংগ্রহকারকদের বিস্মিত করেছে৷ সেসময় প্রকৃত নির্ভরশীলদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধকালীন অবসর ভাতা বরাদ্দ দেবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল৷ আর তাই যুদ্ধশেষে সমাজ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী আয়-বরাদ্দের ধারণাকে বিবেচনায় নিতে৷
১৯১৯ সাল থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত বেশীরভাগ সমতাবাদী দলসহ কয়েকটি নারী সংগঠন এমন সব দাবী করল যেগুলো ঠিক সমতাবাদী পদপে নয়, বরং সেনাবাহিনীতে যে প্রচলিত বিধবাভাতা রয়েছে তা বেসামরিক েেত্র সমপ্রসারিত করার দাবী৷ তাদের যুক্তিটা ছিল এই যে, যেহেতু সামাজিক প্রথার কারণে বাধ্যতামূলকভাবে মেয়েদেরকে বিয়ের পর শ্রমবাজার থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়, তাই পরিবারের উপার্জনম পুরুষটির মৃতু্য হলে তারা নিজেরা তো বটেই এমনকি তাদের সন্তানেরাও দুঃসহ অবস্থায় পতিত হয়৷ কখনো কখনো দ শ্রমিকের চাকুরীতে পুনরায় ফিরে যাওয়া তাদের প েঅসম্ভব হয়ে ওঠে৷ ততদিনে অদ শ্রমিকের পদগুলোও, যেমন ঠিকা ঝি, বোতাম সেলাইকারী, অফিস পরিষ্কারকারী এগুলো প্রতিযোগিতামূলক হয়ে গিয়েছিল৷ এর দুঃসহ ফল ভোগ করতো সন্তানেরা৷ ১৯২৫ সালে মেয়েরা ইংল্যান্ডে জাতীয়ভাবে কর্তনভিত্তিক একটি অবসরভাতার ব্যবস্থা অর্জনে সম হলো বীমাগ্রহীতাদের বিধবা স্ত্রীদের জন্য৷
আরো কিছু প্রকল্প ছিল যেগুলো এই নীতিকে এগিয়ে নেয়৷ ১৯১৬ সালে গ্রেনোবেলের এম রোমানেট নামে একজন ভদ্রলোক তাঁর কারখানায় শ্রমিকদের পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বেতন দেয়ার একটি বিধান চালু করেন৷ ১৯২১ সালে এই প্রথাটি অন্যান্য কারখানায় সম্প্রসারিত হয়৷ তখন সারা ফ্রান্সজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়
caisses de compensation ৷ সেখানে নিয়োগকর্তা ও নিয়োগপ্রাপ্ত উভয়েরই প্রদান সাপে েপ্রতিটি শ্রমিকের পরিবারের নির্ভরশীলদেরকে সংখ্যা অনুযায়ী সাপ্তাহিক ভাতা দেয়া হয়৷ এই ব্যবস্থা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, জার্মানী, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও চেকোশ্লাভাকিয়ায়৷ জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম আদালতও এটি গ্রহণ করেছে৷ ইংল্যান্ডে লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিঙ্ এবং অন্যকিছু প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থাটি নিয়ে গবেষণা করছে৷
এই পদ্ধতিটির ব্যাপারে মতামতগুলো নিয়ে জোরালো তর্ক চলেছে৷ ইংল্যান্ডের
Combined English বিশ্ববিদ্যালয় সংগঠনের সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মিস এলিনর রাথবোন এম.পি. এই ধারণার সবচাইতে পরিশ্রমী ও কার্যকর উদ্যোক্তা৷ কিন্তু বিরুদ্ধবাদীরা বিভিন্ন দিক থেকে তাঁর অবস্থানকে আক্রমণ করেছে৷ একটি দল ঘোষণা করে যে, কেবল মাত্র মা ও স্ত্রী হবার কারণে মহিলাদেরকে অর্থ দেয়ার মানে হলো গার্হস্থ্য অভিভাবকত্বের পদমর্যাদাটিকেই চিরস্থায়ী করে দেয়া এবং শিশুদের সাথে তাদেরকেও নির্ভরশীলদের পর্যায়ভুক্ত করা৷ তারা বরং অগ্রাধিকার দিতে চাইলো সমান বেতন, স্বাধীন প্রতিযোগিতা ও পিতৃত্বের ধারণার ওপর আরো কঠোর সামাজিক দায়িত্ব চাপানোকে৷ মায়েদের মতো করে পিতারাও যদি 'অভিভাবক শিল্পের' চর্চাটি শুরু করে, যেমন বাচ্চাদের নাওয়ানো, খাওয়ানো, বেড়ানো, তাহলে এসব কাজে মায়েদের ওপর কঠিন চাপ সৃষ্টি হয় না৷ তারা রাশিয়ার দাতব্য চিকিত্সালয় ও 'ক্রেশ' (শিশুদের রাখার জায়গা), কমিউনে খাওয়া ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি উপার্জনশীল মায়েদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এগুলোকে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে৷ প্রকল্পটি যখন তাদের দেশে প্রয়োগের জন্য প্রচারিত হয় তখন ডাচ বা ওলন্দাজ সমাজতন্ত্রীরা যুক্তি দেখাল যে, এই ব্যবস্থাটির প্রচলন হলে মহিলাদের বেতন কমে যাবে৷ নব্য-ম্যালথাসবাদীরা দুঃখ প্রকাশ করল জনসংখ্যার ওপর এর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে৷ যদিও বাস্তব েেত্র এই ভাতা পরিবারকে বৃহত্ করার কাজে উত্সাহিত করেছে বলে মনে হয় না৷
তবে যতদিন আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভেতরে পরিবার প্রথা বর্তমানের মতো দৃঢ়ভাবে প্রোথিত থাকবে, ততোদিন আয়ের কিছু কিছু পুনর্বণ্টন ঘটলে সেটা বেশ সুবিধাজনকই হবে৷ কারণ বর্তমান ব্যবস্থা নারী বা পুরুষ কারো জন্যই উত্তম নয়৷ অর্থনৈতিক সেই কল্পকাহিনী, যেখানে প্রতিটি পুরুষকেই দুই বা ততোধিক সন্তান প্রতিপালন করতে হয়, কিন্তু কোনো মহিলাকে তা করতে হয় না, তার ফলশ্রুতি কিন্তু দু'জনেরই বেতন কমিয়েছিল৷ যৌক্তিক ভাবে দেখতে গেলে পারিশ্রমিক হওয়া চাই পুরোপুরি মেধাভিত্তিক, অথবা প্রয়োজন বা চাহিদা ভিত্তিক৷ এখন এমন একটি আপোসের চেষ্টা চলছে যা দু'টোর কোনটির প্রতিই ন্যায়বিচার করে না৷
কাজেই মহিলারা ধনী নন, তবে তাঁরা ধনী হচ্ছেন৷ তাঁরা নিরাপদ নন, তবে নিরাপত্তাবোধের মূল্যকে তাঁরা স্বীকৃতি দিচ্ছেন৷ ভোটাধিকার লাভ করার পর থেকে জাতীয় আয়ের সামান্য একটু বেশী অংশ তাঁরা পাচ্ছেন, আর কেউ কেউ অন্ততঃ এমন কিছু পদ্ধতি বের করতে চেষ্টা করছেন যাতে জাতীয় আয়ের বণ্টন আরো সুষ্ঠুভাবে করা যায়৷
এসবই সাধারণীকরণ৷ আমি অন্যকোনো জায়গার নয়, ইংল্যান্ডের গত দেড় শতাব্দীর ইতিহাস আলোচনা করেছি৷ কারণ মুক্তির আন্দোলন এখানেই শুরু হয়েছিল এবং বেশীর ভাগ ইউরোপীয় দেশেই এই ধারার অনুসরণ ঘটেছে৷ এমন কি ব্রিটিশশাসিত রাজ্যসমূহ এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও৷ এখানে স্থানিক ও ব্যক্তিক পার্থক্য আছে, যার দরুন দেখা যায় যে, ভিক্টোরীয়-পূর্ববতর্ী এবং যুদ্ধ-পরবতর্ী পারিবারিক জীবনকে পেছনে ফেলে এসেছে অনেকে, একই সাথে তারা একই বোর্ডিং হাউজে থাকছে৷ আরও যা বলা যায়, তাহলো পৃথিবীর পুরো ইতিহাসে কোনো সামাজিক আন্দোলনই ব্যতিক্রমবিহীনভাবে ঘটে নি৷
আমরা এখন একটি ক্রান্তিকালে বাস করছি৷ মেয়েদের মেধা, অবস্থান, উচ্চাশা, দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো নিয়ে যেকোনো আলোচনাই যে-উত্তেজনা ছড়ায় তা আংশিকভাবে সেই স্নায়বিক উত্তেজনা, যা উঠে আসে এমন একটি আবেগের বন্ধন থেকে, যা নারী-পুরুষকে একের সঙ্গে অপরকে বেঁধে রাখে৷ অংশত এটি একটি ঐতিহাসিক আবেগ যার শেকড় অতীতের গভীরে প্রোথিত৷
যেদিন এই পরিচ্ছেদটি লিখছিলাম ঠিক সেদিনই আমি উদ্যমী তরুণী মিস্ ক্রিস্টিন ফয়েলের দেয়া একটি মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করেছিলাম৷ এটি আয়োজিত হয়েছিল ডেম ইথেল স্মিথ-এর জয়ন্তী উপল৷ে স্যার টমাস বিচ্যাম ছিলেন সভাপতি৷ তিনি ডেম ইথেল সম্পর্কে প্রশংসাসূচক একটি ভাষণ দেন, যাতে তাঁকে জীবিতদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা ও সর্বকালের সর্বোত্তম মহিলা সুরস্রষ্টা বলে উল্লেখ করেন৷ তিনি বলেন, আর কোনো মহিলা সুরকারই তাঁর শত মাইলের মধ্যে আসতে পারেন নি৷ আর কখনও আসতে পারবে না বলেই তাঁর ধারণা৷ তাঁকে যেন এতে খুব খুশি বলেই মনে হলো; যেন সেই সুরকারের মেধার প্রতি এটি একটি বিশেষ শ্রদ্ধা নিবেদন যার প্রশংসা তিনি করছিলেন৷
কিন্তু তিনি এতোটা নিশ্চিত হলেন কি করে? কেনই বা তিনি এত আনন্দিত? কেনই বা প্রধানত পুরুষ-অধিকৃত এলাকায় কোনো মহিলার সাফল্যকে দৈব ঘটনা বা বাজে ঠাট্টা বলে মনে করা হয়? মহিলারা গত দেড় শতাব্দীর যে-আন্দোলনের ফলে তাদের নিজেদের জন্য অন্ততঃ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিাগত ও নৈতিক সমতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তাকে কেনই বা তাদের কেউ কেউ নিজেরাই ১৯৩৪ সালে আবার ত্যাগও করেছিল? এইসব অস্থিরতা কি জন্য?
এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদেরকে সময় ও দেশের কিছু বিষয়কে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করতে হবে৷ এগুলোকে বিবেচনা করতে হবে একটি সামাজিক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে উত্তরণের যে-সমস্যা, তারই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন হিসেবে৷