অপো ছিল সন্ধ্যার৷ রাত হলে আগুনের জিহ্বা সহজেই আকাশ ছুঁতে পারে৷ মানুষ ভয় পায়, আগুন ভয় পাইয়ে দেয়৷ আগুনে ওরা আবার আনন্দও পায়৷ আনন্দ পাওয়ার পই সন্ধ্যার সময়টা নির্ধারণ করে৷ তারা যে ধরনের ঘটনা ঘটানোর ছক তৈরী করে তার জন্যে এই সময়টা উপযোগী৷
ঘটনার ছক তৈরীকারীদের মধ্যে যুবকের সংখ্যাই বেশী৷ এতে কারও জীবন বিপন্ন হতেও পারে৷ কত রাত তাদের স্বপ্নে কেটেছে৷ স্বপ্নেও পাওয়া যায় কাঙ্তি অনাকাঙ্তি নারী৷ সে নারী ছোঁয়া যায়, ধরাও যায় ইচ্ছা মত৷ সেই স্বপ্নের কুহক যখন কাছাকাছি পাওয়া যাবে তখন আর সুযোগ ছাড়া কেন? যুবকদের অনুরোধ থাকে প্রবীণদের দিকে৷ শর্ত শুনিয়ে দেয়, আর যাই হোক, শরমের কাজ করার সময় যেন তারা যুবকদের পাশাপাশি না থাকে৷ থাকলেও যেন নজর না দেয়৷ ইতিপূর্বে কোন ঘটনায় পারদশর্ী যুবক ক'জন হঁ্যা সূচক মাথা নাড়ায়৷ মাথা নাড়িয়ে জানায় সময় তখন খুব কম থাকে, যেখানে শিকার পাওয়া যায় সেখানেই কর্ম সম্পাদন ছাড়া উপায় থাকে না৷
পরের এজেন্ডায় একটু গোলমাল দেখা দেয়৷ গোলমাল ঠিক নয়, মত বিরোধ৷ ঘটনাস্থলের বাড়িঘর সকলের চেনা৷ পাশাপাশি থাকলে চেনা যায়৷ অনেক বছর তো হয়ে গেল পাশাপাশি৷ এখানে এসে দেখা মেয়েগুলো শরীরে শিহরণ জাগাতে পারে৷ ওরা বুকের উপর ওড়না পরে না৷ তৃষ্ণা জাগায়৷ ওরা উন্মুক্ত ঘুরে বেড়ায় বনে-বাদাড়ে৷ সেই বেড়ানো লালসার কষ্ট বাড়ায় মনে৷
এখন কে কোন ছড়ায় নেবে তৃষ্ণার জল মেটাবে সেটাই সমস্যা কিছুটা৷ আগে ভাগে ঘাট ঠিক করে নেয়া ভালো৷ একঘাটে যেন আবার দু'জন নেমে না-পড়ে৷ ঘাটের যখন অভাব নেই তখন আর কাড়াকাড়ি কেন? এসব কাজে কেউ পিপাসু একজন অপোয় থাকলে কাজটা খোলসাভাবে সম্পন্নই হয় না, ব্যাপারটা স্মরণ করিয়ে দেয় ইতিপূর্বের অভিজ্ঞ কেউ কেউ৷ একই সময় একই ঘরে দু'তিন জনের নজর পড়ে গেলে মুরুব্বীরা সমাধান করে ফেলে৷ এসময় লজ্জা পেলে চলে না৷ অনুগামীদের বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফেলা কোন ভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়৷ অভিজ্ঞতা তাই বলে৷
ওরা কে কাকে কতদিন যাবত্ নিশানা করে রেখেছে তা বিস্তারিত জানায়৷ কেউ একজন বলে বসে, সে তো একবার ঘটনা ঘটানোর কাছাকাছিই পেঁৗছেছিল৷ পাওয়া গিয়েছিল নির্জন অরণ্য পথে, একা৷ বন মোরগের মতো ঝাপ্টাঝাপ্টি করেছিল বেশি৷ একাকী দমন করে বাগে আনা সম্ভব হয় নি কিছুতেই৷ তাই একটু হাসি-ঠাট্টা হলেও অভিজ্ঞতার বাহ্বা পায়৷ এবার সে তার তুষের আগুনের ক্রোধ জ্বালাতে চায়৷ না জ্বালাতে পারলে শান্তি নাই৷ অন্তত শান্তির জন্য শান্তি গ্রামের ওই অরণ্যবাড়িতে তার যাওয়া চাই৷ মনোযোগী শ্রোতারা না-বলতে পারে না৷ বিবেচকদের সভায় যুবক তার যুক্তিতে টিকে যায়৷ তবে কেউ কেউ পছন্দের বাড়ি না-পাওয়ায় ুব্ধ হয়৷ বৃহত্তর স্বার্থে তাদের ুদ্র স্বার্থের জলাঞ্জলি দিতে হয়৷ ুদ্র স্বার্থ ছাড়তে না পারলে নারী শিকারে ঐক্য টেকে না৷
এবার কেউ কেউ ঘটনা ঘটানোর প্রমাণ অপ্রমাণের প্রশ্ন ওঠায়৷ যেখানে রণে যাওয়া হবে তারা বা তাদের পরে কেউ যে ঘটনার কারণের 'ঘটনা' ঘটিয়েছে তার প্রমাণতো দরকার৷ তখন একজনের সাথে আরেকজনের বক্তব্য মেলে না৷ প্রমাণের সামঞ্জস্য রাখতে হলে বিষয়টি আগেই ভেবে নেয়া দরকার৷
এখানেও অভিজ্ঞতার বর্ণনা আসে৷ মরা-ঝিরি টিলা পাড়ায় যে অভিযোগে আগুন দেয়া হয়, পরবতর্ীতে সেই অভিযোগের সত্যতা পায় নি নির্বাহী তদন্ত কমিটি৷ তার কারণ পূর্ব-অপ্রস্তুতি৷ ভাগ্য ভালো যে তদন্তের কাজ স্বজাতি লোকেরা করেছে৷ না হলে বিপদই ছিল৷ ঘটনার প্রমাণ-অপ্রমাণের বিষয় যতোই তুচ্ছ ভাবা হোক না কেন, তারপরও বিষয়টি কেউ বাদ দিতে চায় না, কারণ, তারা যে পরিকল্পক৷ বাস্তবায়নে তো জাগ্রত জনতা দরকার৷ জনতা আছেই৷ তবে জাগ্রত নেই৷ ওদেরে জাগাতে হবে৷ জাগাতে কল্পকাহিনী লাগবে৷ কাহিনীতো আছেই৷ যা ঘটেছে তাই তো কাহিনী৷ কেমন কাহিনী?
আহতরা চিকিত্সায় গেছে৷ একজন এখনো পড়ে আছে ঘটনাস্থলে৷ জঙ্গলে৷ সে মৃত৷ তবিত৷ দেখে-আসা একজন আঘাতের বর্ণনা দিতে পারে৷ যে মারা গেছে তার মাথার ডান পাশে আঘাত গুরুতর কানসহ কাটা৷ পড়ে আছে৷ জখমের গভীরতা খালি চোখে দেখা যায়৷ ঘাড়েও ধারালো কোপের জখম৷ পড়ে আছে উপুড় হয়ে৷ যেখানে পড়ে আছে সেখানে মাটি রক্ত চুষে নিতে পারছে না৷ থকথকে রক্ত৷
আঘাতগুলোর ব্যাখ্যা দিতে চায় কয়েকজন৷ কেউ কেউ জখমগুলো নিজ নিজ এলাকার দাঙ্গার কাটাকাটির মতো বলতে চায়৷ সাথে সাথে প্রতিবাদ, 'চুপ শালা'৷ শুনেই চুপ মেরে যায় ওরা৷ এরা চুপ মেরে গেলে ওরা বলতে চায়, শালারা নিজ দেশের দাঙ্গার মিল খোঁজার জায়গা পাও না আর৷
আরও প্রতিবাদ আসতে থাকে এদিক ওদিক থেকে৷ আসবেই তো, আসাটাই স্বাভাবিক৷ এরপর কথা-বার্তা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে৷ সিদ্ধান্ত হয়, কেউ আর কথা বলতে পারবে না৷ ফিসফিসিয়েও নয়৷
সভা চুপচাপ হলে এলে কোন একজন অভিজ্ঞ লোক বলতে পারে, শুনে মনে হচ্ছে এসব আঘাত স্বজাতির দা' দিয়ে সম্ভব নয়৷ আর নিজেরা নিজেদের কাটবেই বা কেন? কাটতে পারে না৷ কাটার ইতিহাস ওরা ফেলে আসা পুরাতন নিজ নিজ এলাকায় রেখে এসেছে৷ সাথে নিয়ে আসেনি ওসব৷ দূর জেলার থানায়ও ওসব রেকর্ড আসে নি৷ আসলে রক্তেই এসেছে৷ কাগজে আসেনি৷ রক্তের আলামত অদৃশ্য৷ ওসব ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভালো৷
সভা চুপচাপ৷ ওরা শুধু মাথা নাড়ায় সম্মতির৷ সভা ধরে নেয় আঘাত বিজাতীয় দায়ের কোপের৷ ওদের দায়ের সাথে নিহত পরে দায়ের মিল নেই৷ মিলে যাওয়ার সম্ভাবনাও অদূর ভবিষ্যতে নেই৷
আলামত কি পাওয়া গেছে?
সভা চুপচাপ৷
না-পাওয়া গেলে ভালো৷ পাওয়া গেলে সেটা যেন কিছুতেই স্বগোত্রীয় না হয়৷ সভায় কম বুদ্ধিমানেরা বিস্মিত হয়৷ এতো জ্ঞান না থাকলে কি নেতা হওয়া যায়? অভিজ্ঞতা বাহ্বা পায় এবারও৷ অভিজ্ঞ আরেকজনের মতামত পাওয়া যায়, মৃতের সংখ্যা বাড়ানো দরকার৷ হাসপাতালে যারা গেছে তাদেরকেও মৃত ধরলে সংখ্যা মাত্র তিন হয়৷
সভায় মত পাওয়া যায়, সংখ্যা গুণে নির্ধারিত করার দরকার নেই৷ কেউ তিন, কেউ সাত, কেউ দশ৷ এভাবে বললেই তো হয়৷ গভীর অরণ্যে কিংবা পাহাড়ী অরণ্যের গভীরে ঘটনা ঘটে গেলে সব মৃতদেহ কি পাওয়া যায়? এদের সংখ্যা যেমন মেলেনি, ওদেরও৷ এখানে পুরানো পঁথি পড়ুয়া কেউ যেন আছে, তাই শোনা যায়, লাখে লাখে সৈন্য মরে/ কাতারে কাতার,/ শুমার করিয়া দেখি/ পঞ্চাশ হাজার৷
ঘটনা সকালের৷ এখন দুপুর পেরিয়ে যায়৷ হাতে সময় কম, কাজের বেলা সময় একটু দ্রুত বয়ে যায়৷ মিটিং-এ আর সময় কাটানো ঠিক হবে না৷ তাই শেষ হয়ে যায়৷ ওরা সংবাদ বাহক হয়ে নিজ নিজ পাড়ায় চলে যেতে থাকে৷ ছড়িয়ে পড়ে৷
শুধু ওরা ছড়িয়ে পড়েছে তা নয়৷ ওদের সাথে ছড়িয়ে পড়ছে ছকে তৈরি কথা৷ হত্যার কথা, মৃতু্যর কথা৷ কথাগুলো পাড়ায় পাড়ায় কথা হয়ে পড়ে থাকে না৷ কোন কালে পড়েও থাকে নি৷ এসব যারা শুনছে তারা আর কিছু ভাববার যেন সময় পাচ্ছে না৷ ভাববার আগেই উত্তেজিত হয়ে পড়েছে৷ উত্তেজেনা তাদের রক্তে প্রবহমান৷
যাদের অবস্থা বেহাল হয় তাদের ঘরে ঘরে দা আছে, অরণ্যে দা' ছাড়া চলে না৷ ঘরে ঘরে থাকা দা'গুলো ওদের হাতে হাতে উঠে আসে৷ ডান হাতে ধরে রাখা দা' ওরা মাথার ঊধের্্ব তুলে ধরে৷ উত্তেজনার শব্দগুলো বাতাসে শ্লোগান হয়ে৷
অরণ্যে কান পাতলে অনেক দূরের শব্দও শোনা যায়৷ হাজার কণ্ঠের শব্দ অরণ্য নিয়ে যায় দূরের অন্য পাড়ায়৷ ওরা শোনে৷ কি বোঝে তা' ওরাই জানে৷ ও পাড়ায়ও অভিজ্ঞ লোকজন আছে৷ তারা দূরের বিজাতীয় শব্দের অর্থ বোঝে, টের পেয়ে যায়৷ ওদেরওতো জানা, বিজাতীয় পাড়ার উত্তেজনা এবং মাথার ঊধের্্ব তুলে ধরা দায়ের পরিণতি কী৷ ভাববার সময় পায় নি৷ অঘটন স্থানের নিকটে যাদের বাড়ী, দায়-দায়িত্ব ওদের উপরই বর্তায়৷ তারপর দূরের যারা তাদেরকে ছুঁয়ে যায়৷
আজও তাই হবে৷ ব্যতিক্রমের দিন আরও দূর, বহুদূর৷