রাজনীতির রবীন্দ্রনাথ
সৈয়দ আবুল কালাম
[ পূর্ব প্রকাশিতের পর ]
১৩
'ইংরাজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধ থেকে কিন্তু আমরা একই ধরনের উপসংহারে উপনীত হতে পারি না৷ এখানে রবীন্দ্রনাথ এক বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেছেন৷ তিনি লিখেছেন:
কিন্তু বৃহত্ অনুষ্ঠান মাত্রেই আপস ব্যতীত চলে না৷ পঞ্চবিংশতি কোটি প্রজাকে সুশৃঙ্খলায় শাসন করা সহজ ব্যাপার নহে৷ এতবড়ো বৃহত্ রাজশক্তির সহিত যখন কারবার করিতে হয় তখন সংযম অভিজ্ঞতা এবং বিবেচনা আবশ্যক৷ এইটে জানা চাই, গবর্মেন্ট ইচ্ছা করিলেই একটা-কিছু করিতে পারে না; সে আপনার বৃহত্বে অভিভূত, জটিলতায় আবদ্ধ৷ তাহাকে একটু নড়িতে হইলে অনেক দূর হইতে অনেকগুলা কল চালনা করিতে হয়৷
কুড়ি বছর বয়সে তিনি বলেছিলেন, 'ইংরেজরা আমাদের খাইতেছেন...মাংসাশী প্রাণীর লোভ এড়াইতে হইলে মাংসাশী হওয়া আবশ্যক৷' আজ যখন তাঁর বয়স তেত্রিশ, তখন তিনি বলছেন, 'সংযম..আবশ্যক'৷ ইংরেজের প েসহানুভূতি সৃষ্টির প্রয়াসে তিনি বলছেন, ইংরেজ 'বৃহত্বে...জটিলতায় আবদ্ধ', সে 'ইচ্ছা করিলেই একটা-কিছু করিতে পারে না৷' সুতরাং তিনি জনগণের কাছে দাবি করছেন 'বিবেচনা'বোধ৷ তিনি লিখেছেন, 'বৃহত্ অনুষ্ঠান মাত্রেই আপস ব্যতীত চলে না৷' কথিত এই 'বৃহত্ অনুষ্ঠান' ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ কতর্ৃক ঔপনিবেশিক শোষণ-শাসন চালিয়ে যাওয়ার সুবিশাল তত্পরতা৷ অথচ এ হেন 'বৃহত্ অনুষ্ঠান'কে নির্বিঘ্ন করার অভিপ্রায়ে তিনি জনগণকে শিা দিচ্ছেন, 'আপস ব্যতীত চলে না৷' ইংরেজের ঔপনিবেশিক ফ্যাসিবাদী শাসন তাঁর ভাষায় 'সুশৃঙ্খলায় শাসন৷' যেহেতু তাঁর ভাষায় তা 'সহজ ব্যাপার নহে', তাঁর লেখা থেকেই বেরিয়ে আসে উপসংহার, জনগণের উচিত ইংরেজ বিরোধিতা থেকে নিবৃত্ত হওয়া৷ প্রকৃতপ,ে জনগণের বিােভ-আন্দোলন-প্রতিরোধবিহীন মসৃণ এক ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন ছিল তাঁর কাম্য৷
অতঃপর তিনি লিখেছেন,
রাজ্য জয় করিয়া গৌরব এবং লাভ আছে, রাজ্য সুশাসন করিয়া ধর্ম এবং অর্থ আছে৷ আর রাজাপ্রজার হৃদয়ের মিলন স্থাপন করিয়া কী কোনো মাহাত্ম এবং কোনো সুবিধা নাই৷ বর্তমান কালে ভারত-রাজনীতির সেই কি সর্বাপো চিন্তা এবং আলোচনার বিষয় নহে৷
সাম্রাজ্যবাদের পররাজ্য জয় ও দুঃশাসনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছেন 'গৌরব' ও 'ধর্ম' ৷ সাম্রাজ্যবাদের 'লাভ' ও 'অর্থ' তথা লুন্ঠনকেও তিনি সমর্থন জানাচ্ছেন৷ এরপরই তিনি বলছেন, 'রাজাপ্রজার হৃদয়ের মিলন স্থাপন' তত্কালীন 'ভারত-রাজনীতির' 'সর্বাপো চিন্তা এবং আলোচনার বিষয়৷' সাম্রাজ্যবাদের সাথে মিলনের এই মতবাদকে তিনি এমন এক সময় সামনে এগিয়ে দিয়েছেন যখন ভারতীয় জনগণ ইংরেজ পরাধীনতার বিরুদ্ধে নতুনতর আন্দোলনের জন্য উন্মুখ৷
কিন্তু তত্কালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রবীন্দ্রনাথ বুঝতে সমর্থ ছিলেন যে-ভারতীয় জনগণ ও ইংরেজের মধ্যকার দ্বন্দ্বের আপোস-মীমাংসা অসম্ভব৷ তাই তিনি লিখেছেন, "রাজাপ্রজার মধ্যে দুরূহ স্বাভাবিক বাধাসকল বর্তমান৷ কোনো কোনো সহৃদয় ইংরাজও সেজন্য অনেকসময় চিন্তা ও দুঃখ অনুভব করেন৷ তবু যাহা অসম্ভব, যাহা অসাধ্য তাহা লইয়া বিলাপ করিয়া ফল কী৷" হতাশ রবীন্দ্রনাথ জনগণের মধ্যেও ফিরে যেতে পারতেন৷ কিন্তু তাঁর বিবেচনায়, ভারতীয় জনগণ ছিল ইংরেজের 'বিদেশীয় প্রজা' মাত্র, কোন সংগ্রামী সত্তা নয়৷ সাম্রাজ্যবাদই ছিল তাঁর আশ্রয় ও আস্থার স্থল৷ তাই তিনি, পঁচিশ কোটি "বিদেশীয় প্রজার হৃদয় জয় করিবার জন্য যে দুর্লভ সহৃদয়তাগুণের আবশ্যক", সেজন্য পুনরায় সাম্রাজ্যবাদের কাছেই মিনতি করেছেন:
বৃহত্ কার্য, মহত্ অনুষ্ঠান কবে সহজ সুসাধ্য হইয়াছে৷ এই ভারতজয়-ভারতশাসনকার্যে ইংরাজের যে-সকল গুণের আবশ্যক হইয়াছে সেগুলি কি সুলভ গুণ৷ সে সাহস, সে অদম্য অধ্যবসায়, সে ত্যাগস্বীকার কি স্বল্প সাধনার ধন৷ আর পঞ্চবিংশতিকোটি বিদেশীয় প্রজার হৃদয় জয় করিবার জন্য যে দুর্লভ সহৃদয়তাগুণের আবশ্যক তাহা কি সাধনার যোগ্য নহে৷
ইংরেজের প্রতি প্রশংসা ও স্তাবকতা এখানে অপ্রকাশিত নয়৷ অনেকটা গদগদ স্বরেই তিনি বলেছেন, 'ভারতজয়-ভারতশাসনকার্যে' আবশ্যকীয় গুণাবলী ইংরেজের দুর্লভ গুণ৷ নিজ দেশের পরাধীনতার মধ্যে তিনি সোত্সাহে আবিষ্কার করেছেন ইংরেজের 'সাহস...অদম্য অধ্যবসায়...ত্যাগস্বীকার৷' বিস্মিত ভাবাবেগে তিনি বলছেন, 'সেগুলো কি স্বল্প সাধনার ধন৷'
'ইংরেজ ও ভারতবাসী' সম্পর্কে অরবিন্দ পোদ্দার লিখছেন, "দেশপ্রেমের উত্তাপ ও আত্মমর্যাদার বোধ উভয় সংহত"৷১২৬ এই কি দেশপ্রেমের উত্তাপ ও আত্মমর্যাদাবোধ? প্রবন্ধটি মূল্যায়নে নেপাল মজুমদার লিখেছেন, "অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথ যখন বেদনারুদ্ধ কন্ঠে সারা জাতির লাঞ্ছনা ও অপমানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তুলিয়া ইংরেজকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়া একটির পর একটি অভিযোগ করিতেছেন তখন কিন্তু কংগ্রেস মঞ্চ হইতে উহার সপ েকোনো কথা বলিতে শোনা গেল না৷ ইংরেজ জাতির ন্যায়পরায়ণতা ও মহানুভবতার উপর কংগ্রেসের তখনও অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা৷"১২৭
কংগ্রেসের রাজনীতিকে নেপাল মজুমদার অনেকটাই উন্মোচিত করেছেন৷ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ কি প্রকৃত অর্থেই ইংরেজকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন? ইংরেজ ও ভারতবাসীর মিলন এবং ভারতবাসীকে ইংরেজবিরোধী সংগ্রাম থেকে নিবৃত্ত করাই কি এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য নয়? তাঁর ােভ-অভিমান-অপমান এ প্রবন্ধে প্রকাশ পেয়েছে সত্য; কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর আশা-ভরসা-অভিযোগ সবই ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের কাছে নয় কি? তিনি কি জনগণের ইংরেজবিরোধী সংগ্রামের প েদাঁড়িয়েছেন? ঔপনিবেশিকতাকে উন্মোচিত করেছেন? সর্বোপরি কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে তাঁর কি কোন মৌলিক তফাত্ ছিল?
রবীন্দ্রনাথ যখন এই নিবন্ধ রচনা করেন, তার আগে-পরে ভারতবর্ষের সর্বত্র জনগণের ইংরেজবিরোধী ােভ বারুদের মত ফেটে পড়ার অবস্থায় ছিল৷
১৮৯০ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের পূর্ব সীমান্তের ুদ্র ও স্বল্প জনসংখ্যা-বিশিষ্ট দেশীয় রাজ্য মণিপুরে টিকেন্দ্রজিত সিং বিদ্রোহ ঘোষণা করেন৷ তিনি ছিলেন রাজ্যের নবনিযুক্ত সেনাপতি, তীব্র ব্রিটিশ-বিরোধী এবং স্বাধীনতাকামী৷ তাঁর বাহিনীর গোলায় ইংরেজ দুর্গ-প্রাসাদ বিধ্বস্ত হয়, প্রাণ হারায় বেশ কিছু সৈন্য ও অফিসার৷ সাধারণ মণিপুরী জনগণও জেগে ওঠে ইংরেজ-বিরোধী এক গণ-অভু্যত্থানে৷ জনতার বর্শার আঘাতে এবং প্রহারে ব্রিটিশ রেসিডেন্ট গ্রিনউডসহ ইংরেজ বাহিনীর কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়৷ কয়েকজনের মুণ্ডুচ্ছেদ করে ক্রুদ্ধ জনতা৷ পরাজিত হয় ইংরেজ বাহিনী৷
শোচনীয় এই পরাজয়ের সংবাদ ভারতের সর্বত্র সালঙ্কারে প্রচারিত হয়৷ কলকাতায় ঔপনিবেশিক দপ্তরে সৃষ্টি হয় ত্রাস৷ ১৮৯১ সালের মাঝামাঝি তারা মণিপুরে পরিচালনা করে এক বিশাল আকারের সামরিক অভিযান৷ এবারও রাজ্যের জনগণ গড়ে তোলেন প্রবল প্রতিরোধ; ধ্বংস করে দেন যোগাযোগের উপায় ও কয়েকটি ব্রিটিশ ঘাঁটি৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের পতন ঘটে; বন্দী হন গুরুতর অসুস্থ টিকেন্দ্রজিত সিং ও তাঁর বৃদ্ধ সেনাপতি থাঙ্গাল৷ ব্রিটিশ বাহিনী ইম্ফল শহরটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় এবং প্রকাশ্য জনসম ে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে স্বাধীনতার দুই মহান নায়ককে৷১২৮ কলকাতার ব্রিটিশ-বিরোধী বঙ্গবাসী পত্রিকায় মণিপুরে ইংরেজের 'অন্যায় অবিচারের তীব্র নিন্দা'১২৯ জ্ঞাপন করা হয় এবং 'উক্ত দণ্ডকে বিচার না বলে শিকারের খেলা'১৩০ হিসেবে অভিহিত করা হয়৷ ব্রিটিশ সরকার বঙ্গবাসীর এই সমালোচনাকে 'রাজদ্রোহাত্মক হিসাবে চিহ্নিত করেন৷'১৩১
সুপ্রকাশ রায় লিখেছেন, "১৩ ই আগস্ট অপরাহ্ন কাল৷ ইম্ফলের পোলো খেলার বিরাট ময়দান৷ ময়দানের কেন্দ্রস্থলে দুইটি ফাঁসির মঞ্চ৷ অগণিত গুর্খা সৈন্য চারিদিক ঘিরে আছে৷ ইম্ফলের সমস্ত মানুষ তাদের বীর নায়ক, মণিপুরের স্বাধীনতার মহান যোদ্ধা টিকেন্দ্রজিতকে শেষবারের মত শ্রদ্ধা জানাবার জন্য উপস্থিত৷ সৈন্যরা চারদিক ঘিরে টিকেন্দ্রজিত সিং ও বৃদ্ধ থাঙ্গাল সেনাপতিকে বধ্যভূমিতে নিয়ে এল ৷ উপস্থিত জনতা পরম শ্রদ্ধাভরে নমস্কার জানাল তাদের দুই মহান নায়ককে৷... টিকেন্দ্রজিত সিং ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করলেন...দ্রুতপদে অগ্রসর হয়ে হাসিমুখে গলা বাড়িয়ে দিলেন ফাঁসির রজ্জুর দিকে৷ মুহূর্তমধ্যে মণিপুরের স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রাণহীন দেহ শূন্যে ঝুলতে লাগল...সমবেত জনতার আর্ত হাহাকারে ইম্ফলের আকাশবাতাস ভরে গেল৷"১৩২
১৮৯০ সালে পশ্চিম ভারতের ুদ্র দেশীয় রাজ্য কাম্বেতে বিদ্রোহী কৃষকরা সেখানকার নবাবকে বিতাড়িত করে৷ ১৮৯১ সালে পূর্ব ভারতের কেয়োনঝর রাজ্যে ঘটে একটি সামন্তবিরোধী অভু্যত্থান৷ উনিশ শতকের শেষ দশকে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে পাঠান ও পূর্ব সীমান্তে নাগাজাতির প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা৷১৩৩ এর পরে পরেই হয় বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে গৌরবময় মুন্ডা বিদ্রোহ, অব্যাহত ছিল মোপলা কৃষকদের সংগ্রাম, শুরু হয়েছিল মহারাষ্ট্রে মধ্যবিত্তের হিংসাত্মক সংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন৷ শিতি মধ্যবিত্তের ইংরেজ শাসনবিরোধী প্রকাশ্য ােভ-অসন্তোষ রবীন্দ্রনাথের নিবন্ধেই কিছুটা বর্ণিত৷ ১৮৯২ এবং ১৮৯৩ সালে বোম্বাইয়ে ভারতীয় বুর্জোয়া মালিকশ্রেণীর মজুরী-হ্রাসের তত্পরতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বস্ত্রকলের শ্রমিকরা বিচ্ছিন্ন ও ঐক্যবদ্ধভাবে একাধিকবার ধর্মঘট পরিচালনা করে এবং শ্রমিকদের এইসব ধর্মঘটে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার শ্রমিক অংশগ্রহণ করে৷ ১৮৮৫ সালে আহমেদাবাদে শ্রমিকদের ব্যাপক ধর্মঘট সংঘটিত হয়৷ ১৮৯৫ ও ১৮৯৬ সালে কলকাতার বজবজ জুটমিলে দুইবার ওই সময়কার বৃহত্তম ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়৷ এছাড়াও হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে বহুসংখ্যক শ্রমিক আন্দোলন৷১৩৪ ১৮৯৪ সালে বৃটিশ চালু করেছিল 'পিটুনি কর'১৩৫, কোন অঞ্চলে গণবিােভ দেখা দিলে সেই অঞ্চলে পুলিশ বসানোর খরচ বাবদ কর আদায়ের ব্যবস্থা৷ মোটকথা এই ছিল ব্রিটিশ-বিরোধী ােভে-সংগ্রামে উত্তপ্ত ১৮৯০-র দশক৷
১৪
'ইংরেজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে জনগণের কোন বীরত্বগাঁথা আমরা খুঁজে পাই না; বরং পাই ভারতের জনগণ সম্পর্কে এক হতাশাব্যঞ্জক বর্ণনা৷ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন:
ভারতবর্ষীয়রা আপন গরীবখানায় পড়িয়া পড়িয়া তাহার প্রতিশোধ লইতে চেষ্টা করে৷ কিন্তু আমরা কি প্রতিশোধ লইতে পারি৷ আমরা ইংরাজের কতটুকু তি করিতে সম৷ আমরা রাগিতে পারি, ঘরে বসিয়া গাল পাড়িতে পারি, কিন্তু ইংরাজ যদি কেবলমাত্র দুইটি অঙ্গুলি দ্বারা আমাদের কোমল কর্ণমূলে কিঞ্চিত মর্দন প্রয়োগ করে তবে সেটা আমাদিগকে সহ্য করিতে হয়৷ এইরূপ মর্দন করিবার ছোটো বড়ো কতপ্রকার অবসর যে তাহাদের আছে তাহা সদর মফস্বলের লোকের অবিদিত নয়৷
এটা নির্মম সত্য যে গ্রাম-মফস্বল-শহর সর্বত্র ভারতীয়রা ছিল ইংরেজের অসংখ্য অপমান-নির্যাতন-হেনস্তার শিকার৷ সাধারণ মানুষকে অধিকাংশ সময়ে এই অপমানের বোঝা সহ্য করতে হত৷ কিন্তু এ থেকে সৃষ্ট ও ঘনীভূত ঘৃণা-ােভ বারংবার ফেটে পড়তো বিপ্তি কিংবা সম্মিলিত প্রতিরোধে-বিদ্রোহে৷ রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে এই প্রতিরোধ-বিদ্রোহের উপস্থিতি ও অনুমোদন নেই৷
তাঁর বর্ণিত ভারতীয় জনগণ গরীবখানার গরীব, সহায়হীন অনাথ৷ তারা ইংরেজের বিরুদ্ধে কোন প্রতিরোধ গড়তে অম৷ নীরবে ইংরেজের কানমলা হজম করা ছাড়া তাদের কোন গতি নেই৷ তিনি বলছেন: 'আমরা কি প্রতিশোধ লইতে পারি৷ আমরা ইংরাজের কতটুকু তি করিতে সম৷' তাঁর এই আত্মসমর্পণ ও পরাজয়বাদের জবাব হতে পারত, "আমরা অসংখ্যবার তীতুমীর, সিধু, কানু, মঙ্গল পাণ্ডে কিংবা টিকেন্দ্রজিত হতে পারি, 'আমি আবার আসব, আবার সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলব' ফাঁসির মঞ্চে কাণুর সেই অমর উপাখ্যানকে বারংবার বাস্তবে রূপ দিতে পারি, যতদিন না সাম্রাজ্যবাদ নিশ্চিহ্ন হয়৷" কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জনগণের এই শক্তি ও সম্ভাবনাকে স্বীকার করেন না৷ ইংরেজের শোষণ-নিপীড়ন ও অপমানের বিরুদ্ধে জনগণের নিন্দা, ঘৃণা ও অসন্তোষ তাঁর কাছে নিষ্ফল, তাত্পর্যহীন ও নিরূপায়৷ তিনি লিখেছেন,
ইংরাজ আমাদের প্রতি মনে মনে যতই বিমুখ বীতশ্রদ্ধ হইতে থাকিবে ততই আমাদের প্রকৃত স্বভাব বোঝা, আমাদের সুবিচার করা, আমাদের উপকার করা তাহাদের দুঃসাধ্য হইয়া দাঁড়াইবে৷...আমরা ইংরাজের নিন্দা করিয়া কেবল আমাদের নিরুপায় অসন্তোষ লালন করিতেছি মাত্র৷
তাঁর 'সুবিচার' ও 'উপকার' এর উত্স ইংরেজ৷ ইংরেজই অদৃষ্টের নিয়ন্তা৷ এই ইংরেজ যাতে 'বিমুখ বীতশ্রদ্ধ' না হয়, এ-প্রশ্নে তিনি সজাগ৷ এ ছিল ইংরেজ শাসনে লাভবান ভারতীয় সমাজের উপরের অংশের চিন্তার ধরন৷
রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মধ্যবিত্তের সংকট ও দুঃখময় জীবনকে মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করেছেন :
অপমান সম্পর্কে আমরা উদাসীন নই, কিন্তু আমরা দরিদ্র এবং আমরা কেহই স্বপ্রধান নহি, প্রত্যেক পরিবারই একটি বৃহত্ পরিবারের প্রতিনিধি৷ তাহার উপরে তাহার একলার নহে, তাহার পিতামাতা, ভ্রাতা-স্ত্রীপুত্র-পরিবারের জীবনধারণ নির্ভর করিতেছে৷ তাহাকে অনেক আত্মসংযম আত্মত্যাগ করিয়া চলিতে হয়৷ ইহা তাহার চিরদিনের অভ্যাস৷...কে না জানে দরিদ্র বাঙালি কর্মচারীগণ কতদিন সুগভীর নির্বেদ এবং সুতীব্র ধিক্কারের সহিত আপিস হইতে চলিয়া আসে, তাহাদের অপমানিত জীবন কী অসহ্য দুর্ভর বলিয়া বোধ হয়...কিন্তু তথাপি যথাসময়ে ধুতির উপর চাপকানটি চাপাইয়া আপিসের মধ্যে প্রবেশ করে...এবং সেই পিঙ্গলবর্ণ বড়োসাহেবের রূঢ় লাঞ্ছনা নীরবে সহ্য করিতে থাকে৷ হঠাত্ আত্মবিস্মৃত হইয়া সে কি মুহূর্তে আপনার বৃহত্ সংসারটি ডুবাইয়া দিতে পারে৷ আমরা কি ইংরাজের মত স্বতন্ত্র, সংসারভারবিহীন৷ আমরা প্রাণ দিতে উদ্যত হইলে অনেকগুলি নিরুপায় নারী, অনেকগুলি অসহায় শিশু ব্যাকুল বাহু উত্তোলন করিয়া আমাদের কল্পনাচ েউদিত হয়৷ ইহা আমাদের বহুযুগের অভ্যাস৷
সমকালীন সাধারণ মধ্যবিত্তের সংকট ও দুরবস্থার এক যথার্থ প্রতিচ্ছবি তিনি অংকন করেছেন৷ ইংরেজ রাজত্বে বেকারত্ব তীব্র৷ একজনের সামান্য আয়ের উপর এক দঙ্গল লোক নির্ভরশীল৷ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা মধ্যবিত্তের জীবন৷ ইংরেজের শোষণে-নিষ্পেষণে সে কিষ্ট-নিগৃহীত৷ রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে মূর্ত হয়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের করুণ দুঃখবোধ, হৃদয়-মোচড়ানো অসহায় আর্তনাদ৷ বুকের পাঁজর ভেঙে যেন বেরিয়ে আসছে হতাশা, বেদনা ও পিছুটান৷ মধ্যবিত্তের বাস্তব সংকট থেকে শুরু করে অবশেষে রবীন্দ্রনাথ যে উপসংহার টানছেন তা হল, দরিদ্র-নিরুপায় এই মধ্যবিত্তের প েআত্মসমর্পণই ন্যায়সঙ্গত, ইংরেজের পদতলে মাথা ঠুকে মরা ছাড়া এঁদের গতি নেই৷ তিনি সাধারণ মধ্যবিত্তের মধ্যে বিরাজমান সবচেয়ে পশ্চাত্পদ-স্বার্থপর-আত্মকেন্দ্রিক-কূপমণ্ডূক মতাদর্শকে ন্যায্যতার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন৷
কিন্তু মধ্যবিত্তের এই সংকট-দুরবস্থার জন্য দায়ী সাম্রাজ্যবাদ৷ আরও অনেক বেশী, কোটি কোটি কৃষক ও শ্রমজীবী জনগণের দুরবস্থার জন্যও দায়ী একই সাম্রাজ্যবাদ৷ সুতরাং মধ্যবিত্তের ভবিষ্যত্ এই কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যতের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে বিজড়িত৷ ঐক্য ও সম্ভাবনার এই গ্রন্থিটাকে অধিকাংশ সময়ে দেখতে পায় না মধ্যবিত্ত শ্রেণী৷ জনগণের মধ্যকার ঠিক এই ঐক্য ও অভিন্নতার গ্রন্থিতেই ফাটল ধরাতে চির-তত্পর সাম্রাজ্যবাদসহ জনগণের শত্রুরা ৷ এজন্য তারা অবিরাম মধ্যবিত্ত মতাদর্শের আত্মসর্বস্ব ও সংকীর্ণ অংশটাকে উজ্জীবিত করে তোলার চেষ্টা করে৷ কিন্তু ইতিহাস সা্য দেয়, যেখানেই শোষণ-নিপীড়ন-লাঞ্ছনা, সেখানেই সংগ্রাম-বিদ্রোহ-উত্থান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বৃহত্তর স্বার্থ ও ঐক্যের আওয়াজ৷ এটাই মধ্যবিত্তসহ জনগণের মতাদর্শের আর একটা বাস্তব দিক, যাকে বিরামহীনভাবে জাগিয়ে তুলতে হবে৷ এ কারণেই সমস্ত অন্যায়কে পদপিষ্ট করে সমাজ এগিয়ে যেতে সম হয় নতুনতর অগ্রগতির পথে৷ রবীন্দ্রনাথের শিায় মধ্যবিত্তসহ জনগণের মতাদর্শের এই জ্যোতির্ময় দিক এবং তাদের ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভূমিকা অনুপস্থিত৷ যেমন, তিনি লিখেছেন :
এ-পর্যন্ত ভারত-অধিকার-কার্যে যে অভিজ্ঞতা জন্মিয়াছে তাহাতে ইহা নিশ্চয় জানা গিয়াছে যে ভারতবর্ষীয়ের নিকট হইতে ইংরাজের আশঙ্কার কোনো কারণ নাই৷ দেড় শত বত্সর পূর্বেই যখন কারণ ছিল না বলিলেই হয়, তখন এখনকার তো আর কথাই নাই৷ রাজ্যের মধ্যে যাহারা উপদ্রব করিতে পারিত তাহাদের নখদন্ত গিয়াছে এবং অনভ্যাসে এতই নিজর্ীব হইয়া পড়িয়াছে যে, ভারতরাকার্যের জন্য সৈন্য পাওয়া ক্রমশ দুর্ঘট হইতেছে৷
এই প্রবন্ধের প্রথমদিকে তিনি লিখেছিলেন, 'আমাদের কোন শত্রুর উপদ্রব নাই, বিপদের আশঙ্কা নাই৷' এখানে এসে বলছেন, 'ভারতবর্ষীয়ের নিকট হইতে ইংরাজের আশঙ্কার কোনো কারণ নাই৷' দুটো বক্তব্যই বস্তুগত সত্যের পরিপন্থী৷ প্রথমটা তিনি বলেছিলেন, কারণ, তাঁর বিবেচনায় ইংরেজ উপকারী ও আবশ্যক৷ দ্বিতীয়টা তিনি বলেছেন, কারণ, তিনি জনগণের ইতিহাস-সৃষ্টিকারী অব্যাহত সংগ্রাম ও বীরত্বের উত্তরাধিকারকে ধারণ করেন না৷ ভারতীয় জনগণের নিরন্তর শত্রু ছিল ইংরেজ এবং ইংরেজের জন্য সব সময় আতঙ্কে ছিল ভারতীয় জনগণ৷ ব্রিটিশ-ভারতের ইতিহাস তাই ইংরেজ শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের অবিশ্রান্ত সংগ্রামের ইতিহাস৷ ইতিহাসের এই বস্তুগত সত্য এবং জনগণের গৌরব অস্বীকৃত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথে বক্তব্যে৷ তিনি বরং সাম্রাজ্যবাদী দানবের আপাত-বিশালত্বে অভিভূত ও অবনত: 'আমরা ইংরাজের রেলগাড়ি কলকারখানা রাজ্যশৃঙ্খলা দেখি আর হাঁ করিয়া ভাবি, ইহারা ময়দানবের বংশ৷ ইহারা এক জাতই স্বতন্ত্র, ইহাদের অসাধ্য কিছু নহে৷' তিনি মনে করেন, এই বিস্ময়কর 'ময়দানব' 'ইংরাজ যদি ক্রমশই ভারতদ্রোহী হইয়া উঠিতে থাকে তাহা হইলে রাজকার্যের বাস্তবিক বিঘ্ন ঘটা সম্ভব৷ ... উদাসীন হইয়া কর্তব্য পালন করা যায় কিন্তু আন্তরিক বিদ্বেষ লইয়া কর্তব্য পালন করা মনুষ্যমতার অতীত৷'
তিনি সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের 'কর্তব্য পালন' ও 'রাজকার্য'কে নির্বিঘ্ন করতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক৷
১৫
১৮৯৩ সালে যখন রবীন্দ্রনাথ 'ইংরাজ ও ভারতবাসী' লেখেন, তখন বিশ্ব-পুঁজিবাদ এক উত্ক্রমনশীল পর্যায়ে রয়েছে৷ ১৮৭৩-৯৬, এই ২২ বছর ছিল বিশ্ব পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক মন্দার কাল; ইতিহাসে তা দীর্ঘ মন্দা (The Long Depression) নামে অভিহিত৷ এই মন্দায় সবচেয়ে বেশী তিগ্রস্ত হয়েছিল ইংলন্ড এবং এর অশুভ প্রভাব পড়েছিল সারা বিশ্বে৷ মন্দার ফলে শিল্পজাত পণ্যের মূল্য পড়ে গিয়েছিল, মুনাফা-হারে ঘটেছিল বড় ধরনের পতন, সংকুচিত হয়ে পড়েছিল প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশের বিশ্ববাজার এবং বাণিজ্যে দেখা দিয়েছিল অত্যন্ত বিপর্যস্ত অবস্থা৷ অধ্যাপক সমর মলি্লক এই মন্দার একটি দিক তুলে ধরেছেন, "১৮৭৩ থেকে ১৮৯৬ পর্যন্ত এক বিরাট মন্দা, যার ফল ইউরোপীয় বাজারের সঙ্কোচন৷ এই অবস্থায় ইংল্যান্ডে যন্ত্রপাতির দাম পড়ে যায়৷ সেই সুযোগ গ্রহণ করে ভারতের মিল মালিকরা৷ তারা সস্তায় এইসব যন্ত্রপাতি কিনে নেয়৷"১৩৬
বিশ্বে ব্রিটেনেই প্রথম আধুনিক শিল্পের বিকাশ শুরু হয়৷ ১৮৭০ সাল পর্যন্ত প্রায় একশ বছর ব্রিটেনের পুঁজিবাদ অপ্রতিহত গতিতে বিকাশ লাভ করে৷ তখন 'পৃথিবীর কারখানা' হিসেবে পরিচিত ছিল বৃটেন৷ বিশ্ব-বাজার ছিল তাদের করায়ত্ত৷ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ-সমর্থক অর্থনীতিবিদ হব্স্ন ১৯০২ সালে লিখেছিলেন: "১৮৭০ সালের পর থেকে ইংলন্ডের শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রাধান্য ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়; অন্যান্য জাতি, বিশেষভাবে জার্মানী, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়াম এগিয়ে আসে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে, .... তাদের প্রতিযোগিতার ফলে আমাদের উদ্বৃত্ত শিল্পপণ্যসমূহ মুনাফার ভিত্তিতে বিক্রি করা ক্রমবর্ধিতভাবে দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে৷ এই জাতিগুলো অনধিকার অনুপ্রবেশ করে আমাদের পুরোনো বাজারগুলোতে, এমনকি অধিকৃত দেশগুলোতে৷ ফলে নতুন নতুন বাজার দখলের প্রয়াস চালানো হয়ে পড়ে জরুরী৷"১৩৭
এর দশ বছর আগেই ১৮৯২ সালে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস চমত্কারভাবে পরিস্থিতিকে তুলে ধরেছিলেন : "যেখানেই জ্বালানী বিশেষত কয়লা আছে সেখানেই আধুনিক শিল্পের সর্তাবলী, বাষ্পশক্তি ও যন্ত্রপাতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব৷ ইংল্যান্ড-ফ্রান্স ছাড়া অপরাপর দেশ, বেলজিয়াম, জার্মানী, আমেরিকা এমনকি রাশিয়ারও কয়লা আছে৷...তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় নিয়োজিত হল শিল্প নির্মাণে, শুধুমাত্র নিজেদের জন্য নয়, বাকী বিশ্বের জন্যও৷ এর ফলে, ইংল্যান্ড প্রায় এক শতাব্দীকাল যাবত্ যে শিল্প-একচেটিয়া ভোগ করে আসছিল তা চিরকালের জন্য ভেঙ্গে পড়ল৷"১৩৮
'অবাধ বাণিজ্য'-র যুগে ইংলন্ডসহ পুঁজিবাদী দেশগুলোর হাতে সঞ্চিত হয়েছিল বিপুল উদ্বৃত্ত পুঁজি৷ একই সময়ে ঘটে বেশ কিছু নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, যেমন লোহা ও ইস্পাতের উন্নততর নিষ্কাশন পদ্ধতি, কারখানায় ব্যবহারযোগ্য বাষ্পীয় এনজিন, রাসায়নিক ও পেট্রোলিয়ম শিল্প, অন্তর্দহ এনজিন, বৈদু্যতিক জেনারেটর ও মোটর ইত্যাদি৷ জ্বালানী হিসেবে পেট্রোলিয়াম ও বিদু্যতের প্রচলন ছিল এক বড় ধরনের অগ্রগতি৷ উদ্বৃত্ত পুঁজি ও নতুন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, উভয়ের সমন্বয়ে ১৮৭০ দশক থেকে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে শিল্পের ব্যাপক ও উন্নততর বিকাশ শুরু হয়৷ একে অনেকে 'দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব' হিসেবে অভিহিত করেছেন৷ মন্দার মধ্যেই উত্পাদন বেড়ে যায় ব্যাপকভাবে৷ ইউরোপ ও আমেরিকা এবং একই সাথে এশিয়া ও আফ্রিকার ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে রেলওয়ের বিস্তার ঘটানো হয় ব্যাপকভাবে৷ ব্রিটিশ পদার্থজ্ঞানী প্রফেসর জে. ডি. বার্নাল পরিস্থিতির এক সংপ্তি বিবরণ দিয়েছেন; "উনিশ শতকের ষাট দশকের শেষ দিক থেকেই পুঁজিতন্ত্রের একমুখী, আশাবাদী প্রথম পর্বের শেষ ঘনিয়ে আসছিল৷ সত্তর দশকে দেখা দিল প্রবল মন্দা৷...অবাধ বাণিজ্যের যুগে বৃটেন ছিল সারা পৃথিবীর কর্মশালা৷ কিন্তু লগ্নী-পুঁজির ভিত্তি ছিল অনেক বিস্তৃত৷ সংরতি বাজারের সুযোগ নিয়ে ফ্রান্স, জার্মানী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন প্রাধান্য বিস্তার শুরু করেছিল৷ শিল্পবিপ্লবের মধ্যে দিয়ে উত্পাদিকা শক্তির যে প্রকাণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে, ততদিনে মালিকদের সামনে তা একটা সমস্যা হাজির করেছিল_হস্তান্তরযোগ্য উদ্বৃত্ত ক্রমাগত জমে ওঠার সমস্যা৷ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই উদ্বৃত্ত যে উত্পাদকদের_অর্থাত্ শ্রমিকদের হাতে ফিরে যাবে সেটা সম্ভব নয়৷ কাজেই ঐ উদ্বৃত্ত বিনিয়োজিত হল উত্পাদনেই, ফলে উত্পাদন আরো বেড়ে গেল৷ এবার বর্ধিত উত্পাদনের জন্য হন্যে হয়ে সারা পৃথিবীতে চলল বাজারের সন্ধান৷...শুরু হল ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণ৷''১৩৯ 'ইংলন্ডের বেলায় উপনিবেশ দখলের বিপুল প্রসারের যুগ হল ১৮৬০-১৮৮০ সাল, উনিশ শতকের শেষ দুই শতকেও তা খুব প্রভূত৷'১৪০ হবসনের হিসেবে, '১৮৮৪-১৯০০ এই কয় বছরে ইংলন্ড অধিকার করেছিল ৫ কোটি ৭০ ল জনসংখ্যা সমেত ৩৭ ল বর্গমাইল'১৪১ এলাকা৷
এই সময়টাতে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাড়াকাড়ির প্রধান ত্রে ছিল আফ্রিকা৷ পুরো আফ্রিকাই তাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়৷ ১৯০১ সালে ভারতের তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বলেছিলেন, "আমরা ততদিনই বিশ্বের সর্ববৃহত্ শক্তি, যতদিন আমরা ভারতের শাসনমতার অধিকারী৷ আমরা যদি ভারতকে হারাই তাহলে আমরা তৃতীয়-স্তরের শক্তিতে অধঃপতিত হব৷"১৪২ ১৮৯৪ সালে কার্জন এই এশীয় উপনিবেশ থেকে অর্জিত সম্পদকে 'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর'১৪৩ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন৷ ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কর্তৃস্থানীয় প্রতিনিধি ঐ একই ব্যক্তির অভিমত ছিল, 'ভারতবর্ষ হচ্ছে আমাদের সাম্রাজ্যের নির্ভরস্থল.... আমরা যদি ভারতবর্ষকে হারাই তাহলে আমাদের সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হবে৷'১৪৪ কার্জন সবকিছুই বলছেন দীর্ঘ মন্দা, সংকট এবং বিপুল ঔপনিবেশিক বিস্তারের শেষ পর্যায়ে৷ ব্রিটিশ কতর্ৃক উনিশ শতকের শেষভাগে ভারত-লুন্ঠনের দানবীয়তা তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট৷ অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশের সাথে ব্রিটেনের পার্থক্য ছিল একটাই, ব্রিটেনের কব্জায় ছিল সংরতি লুন্ঠনত্রে ভারতবর্ষ, অন্যান্যদের তা ছিল না৷ দীর্ঘ মন্দা, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা-উদ্ভূত সংকট ও সাম্রাজ্যবিস্তারের সীমাহীন ব্যয়ভারের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় ভারতের ওপর, উদ্ধার পায় ইংলন্ড৷ তিনবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রিত্ব পদধারী লর্ড 'সলস্বেরি একদা ভারতকে 'প্রাচ্য সমুদ্রে ইংরেজ সৈন্য ঘাঁটি' আখ্যা দিয়েছিলেন৷ চীন থেকে মাল্টা_সাম্রাজ্যের যে কোনও প্রয়োজনে ভারতীয় সৈন্যবাহিনীকে পাঠানো হত ভারতের ব্যয়ে৷'১৪৫
১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালু হয় ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যৌথ কতৃত্বে৷ ১৮৮২ সালে ফ্রান্সকে হটিয়ে ব্রিটেন সুয়েজ খাল ও মিসর দখল করে নেয়৷ সুয়েজ খাল চালু হওয়ায় ভারত থেকে ব্রিটেনের যাতায়াত পথ সংপ্তি হয়ে যায়৷ 'ইংরাজ ও ভারতবাসী'-তে রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কেই লিখেছেন, "আজকাল সাহেব তিনটি মাসের ছুটি পাইলেই তত্ণাত্ ইংলন্ডে পলাইয়া গিয়া ভারতবর্ষের সমস্ত ধূলা ধৌত করিয়া আসেন৷...যে দেশ তাঁহারা জয় করিয়াছেন সে দেশে থাকিয়াও যথাসম্ভব না থাকিয়া এবং যে জাতিকে শাসন করিতেছেন সে জাতিকে ভালো না বাসিয়াও কাজ করা সুসাধ্য হইয়া পড়িয়াছে৷"
রবীন্দ্রনাথ যদিও ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের ভালাবাসার আবর্ত থেকে বের হতে পারেন নি, কেননা বাস্তবে সুয়েজ খাল চালু হওয়ার ফল দাঁড়ায়, অনেক সহজে বিপুল ভারতীয় সম্পদ পাচার৷ মধ্যযুগীয় চুরি-লুট-দসু্যতা-পাচার থেকে শুরু করে বৃটেনের শিল্প-পুঁজি ও আধুনিক লগ্নী-পুঁজির শোষণসহ সব ধরনের শোষণ-লুন্ঠন একই সাথে চালু হয়৷ এর ফলেই "উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (১৮৫১-১৯০০) মোট যে ২৪টি দুর্ভি হয়েছিল ... তার মধ্যে ১৮টি হয়েছিল ১৮৭৫-১৯০০, এই শেষ পঁচিশ বছরে৷"১৪৬ এই দুর্ভিগুলোতে মৃতু্যবরণ করেছিল প্রায় তিন কোটি মানুষ৷ "তার অধিকাংশই ছিল গরীব মানুষ, বিশেষত ভূমিহীন কৃষক৷"১৪৭
অর্থাত্ উনিশ শতকের শেষার্ধের এই লাগামহীন শোষণ-লুন্ঠনের বোঝা প্রায় এককভাবে বহন করেছিল ভারতের কৃষক৷ একই সাথে এর অশুভ প্রতিক্রিয়া ভারতীয় সমস্ত শ্রেণীর উপরেই কমবেশী পড়েছিল৷ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের অনুগত নতুন সৃষ্ট মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশও হয়ে পড়েছিল যথেষ্ট বাধাগ্রস্ত৷ ভারতবর্ষের পঁচিশ কোটি মানুষের পুরো বাজারকে সংকটগ্রস্ত ইংলন্ডের শিল্পপুঁজিপতিদের জন্য গ্রাস করার প্রয়োজনে, '১৮৭৯ সালে মোটা কাপড়ের উপর আমদানী শুল্ক রহিত করা হয়েছিল... ১৮৮২ সালে বিলুপ্ত করা হয়েছিল লবণ ও মদ ছাড়া, সব আমদানী শুল্ক৷'১৪৮
উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ইংরেজের বেপরোয়া শোষণ-লুন্ঠন ভারতবর্ষে জনগণের সর্বাত্মক উত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল৷ ফলে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ শুধু আন্তর্জাতিক পরিসরে নয়, ভারতবর্ষেও সংকটে নিপতিত হয়েছিল৷ ভারতীয় জনগণের জন্য এ ছিল আপেকি অনুকূল অবস্থা৷ ইংরেজের সামরিক অজেয়তাও ছিল চ্যালেঞ্জের মুখে৷ কিন্তু ভারতে কংগ্রেসের চরম আনুগত্য এবং আপোসকামিতার রাজনীতি, বিত্তবান শ্রেণীগুলোর ইংরেজের প্রতি অপরিসীম আনুগত্য ও সহযোগিতা, ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদ, সাম্প্রদায়িকতাসহ বিভিন্ন ধরনের ভাগকর-শাসনকর নীতির প্রয়োগ, প্রাচীন ঐতিহ্যপন্থা, বিভিন্ন কুসংস্কার ও পশ্চাত্পদতাকে উস্কে দেওয়া, ইত্যাকার বহু বিষয় সেদিন জনগণের উত্থানের সম্ভাবনাকে প্রশমিত করতে কিংবা ভিন্ন পথে চালিত করতে সম হয়৷ এর ফলে মূলত ইংরেজ শাসন-শোষণ রা পায়৷ নতুবা শুধু ভারতবর্ষের নয়, পৃথিবীর ইতিহাস হয়ত অন্যভাবে রচিত হতো৷
রবীন্দ্রসাহিত্য এেেত্র ব্যতিক্রম ছিল না৷ পরবতর্ী দুটো অধ্যায়ে আমরা এ সম্পর্কে আরো স্পষ্টতর ধারণা অর্জন করতে পারবো৷
১৬
একজন ভারতবর্ষীয় হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মৃদুকন্ঠও ইংরেজের বিপুল বর্ধিত শোষণের বিরুদ্ধে উত্কন্ঠায় কিছুটা সরব হয়ে উঠেছিল৷ 'ইংরাজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন,
ভারতবর্ষের সহিত স্বার্থসম্পর্কীয় সম্বন্ধ লইয়া প্রবন্ধ আজকাল প্রায় দেখা যায়৷ ইংলন্ডের জনসংখ্যা প্রতিবত্সর বৃদ্ধি পাইয়া কী পরিমাণে খাদ্যাভাব হইতেছে এবং ভারতবর্ষ তাহা কী পরিমাণে পূরণ করিতেছে, এবং বিলাতি মালের আমদানী করিয়া বিলাতি বহুসংখ্যক শ্রমজীবীর হাতে কাজ দিয়া তাহাদের কিরূপে জীবনোপায় করিয়া দিতেছে তাহার তালিকা বাহির হইতেছে৷
ইংরাজ উত্তরোত্তর ভারতবর্ষকে তাঁহাদেরই রাজগোষ্ঠের চিরপালিত গোরুটির মত দেখিতেছেন৷ ... স্বার্থের সম্পর্কটা উত্তরোত্তর জাজ্বল্যমান করিয়া তোলা হইতেছে৷ ... ইংলন্ডের প্র্যাকটিক্যাল লোকের কাছে ভারতবর্ষের কেবল মন-দরে, সের-দরে, টাকার-দরে, সিকার-দরে গৌরব৷ ... ভারতবর্ষের সহিত যদি তাহার স্বার্থের সম্পর্কই দৃঢ় হয় তবে যে শ্যামাঙ্গিনী গাভীটি আজ দুধ দিতেছে ...তাহার লেজটুকু এবং ুরটুকু পর্যন্ত তিরোহিত হইবার সম্ভাবনা৷ এই স্বার্থের চ েদেখা হয় বলিয়াই তো ল্যাঙ্কাশিয়র নিরুপায় ভারতবর্ষের তাঁতের উপর মাশুল বসাইয়াছে আর নিজের মাল বিনা মাশুলে চালান করিতেছে৷
ইংলন্ডের জনগোষ্ঠীর খাদ্যের যোগান দিত ভারত, পঁচিশ কোটি মানুষের বিশাল ভারতীয় বাজার ছিল ইংরেজ শিল্পপতিদের অস্তিত্ব ও সমৃদ্ধি এবং ইংলন্ডের শ্রমজীবীদের জীবিকার নিশ্চয়তা৷ এ নিয়ে তখন ভারতবর্ষে যথেষ্ট ােভ ছিল৷ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মতেও, ইংরেজ শোষণের তীব্রতায় ভারতবর্ষনামী 'শ্যামাঙ্গিনী গাভীটি'র 'লেজটুকু এবং ুরটুকু পর্যন্ত তিরোহিত হইবার সম্ভাবনা৷' ইংরেজ ঔপনিবেশিকতার প্রধানতম বলি কৃষকদের উপর শোষণ-নিপীড়ন প্রশ্নে কিন্তু একটা কথাও বলেন নি রবীন্দ্রনাথ৷ ভারতীয় বা ইংরেজ মালিকানাধীন শিল্পে নবসৃষ্ট শ্রমিক শ্রেণীর উপর চরম শোষণ-নিপীড়ন প্রশ্নেও তিনি নীরব৷ শিতি মধ্যবিত্তকেও তিনি তিরস্কার করেছেন তাঁদের ইংরেজ বিরোধী ােভের জন্য৷ কিন্তু তিনি ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের বিরুদ্ধে আরোপিত শুল্ক-বৈষম্যের প্রশ্নে ইংরেজকে সুনির্দিষ্টভাবে বিরোধিতা করেছেন৷ এই বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র বাংলা ছিল না, ছিল বোম্বাই ও আহমেদাবাদে৷ সুতরাং তিনি এক সর্বভারতীয় অবস্থান থেকে বোম্বাই ও আহমেদাবাদে বিকশিত বৃহত্ ভারতীয় শিল্প পুঁজিবাদের প েদাঁড়িয়েছেন৷
'ইংরাজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাঁর এই সর্বভারতীয় স্বতন্ত্র সত্তাকে ঊধের্্ব তুলে ধরেছেন৷ ইংরেজের সাথে তিনি যে ঐক্য-সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, তা এই স্বতন্ত্র ভারতবর্ষীয় সত্তার ভিত্তিতে, একে বিসর্জন দিয়ে নয়৷ একই কারণে তিনি বিত্তবান ও শিতি সম্প্রদায়ের যে অংশ অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে 'ইংরাজী ছদ্মবেশ ধারণ' করে, ইংরেজের সাথে অনৈক্য ঘুচাতে চায় তাঁদেরকে তিনি তাঁর সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন৷ তিনি লিখেছেন:
আমাদের মধ্যে সাধারণের সম্মানজনক এক সম্প্রদায়ের লোক আছেন...তাহাদের ভাবখানা এই: ইংরাজের সহিত আমাদের অনেকগুলি বাহ্য অমিল আছে৷ সেই বাহ্য অমিলই সর্বপ্রথম চ েআঘাত করে এবং তাহা হইতে বিজাতীয় বিদ্বেষের সূত্রপাত হইয়া থাকে৷ অতএব বাহ্য অনৈক্যটা যথাসম্ভব দূর হওয়া আবশ্যক৷ ...বসনভূষণ ভাবভঙ্গি এমনকি, ভাষাটা পর্যন্ত ইংরাজী হইয়া গেলে দুই জাতির মিলনসাধনের একটি প্রধান অন্তরায় চলিয়া যায়...৷ এটিকেট-শাস্ত্রে একটু ত্রুটি হওয়া, ইংরাজী ভাষায় স্বল্প স্খলন হওয়া তাঁহারা মহা পাতকরূপে গণ্য করেন এবং স্বসম্প্রদায়ের পরস্পরের মধ্যে সাহেবি আদর্শের নূ্যনতা দেখিলে লজ্জা ও অবজ্ঞা অনুভব করেন৷...কতকটা পরিমাণে ইংরাজী ছদ্মবেশ ধারণ করিলে বৈসাদৃশ্যটা আরো স্পষ্ট হইয়া উঠে৷...আমরা কি য়ুরোপের সহিত অন্য সমস্ত বিষয়ে এতটা একাত্ম হইয়া গিয়াছি যে বাহ্য অনৈক্য বিলোপ করিয়া দিলে অসংগতি-নামক গুরুতর রুচিদোষ ঘটিবে না৷...এই উপায়ে...ইংরাজের সহিত অনৈক্য তো আছেই, আবার স্বদেশীয়ের সহিত অনৈক্যের সূচনা হয়৷...
ইহার অর্থ এই_জাতীয় সম্মান বিক্রয় করিয়া আত্মসম্মান ক্রয় করা৷...যতণে না আমার সমস্ত স্বজাতীয়কে আমি সম্মানযোগ্য করিতে পারিব ততণ আমি রঙ মাখিয়া একসেপ্শন সাজিয়া তোমাদের দ্বারে পদার্পণ করিব না৷...
আমাদেরও এখন জাতিনির্মাণ-আত্মনির্মাণের অবস্থা, এখন অজ্ঞাতবাসের সময়৷
কিন্তু এমনি আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা বড়োই বেশি প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছি৷ ...
ইংরাজ ভারতবর্ষীয়কে ঠিক ভারতবর্ষীয়ভাবে বুঝিতে এবং শ্রদ্ধা করিতে অম৷ এজন্য আমরা অগত্যা ইংরাজকে ইংরাজী-ভাবেই মুগ্ধ করিতে চেষ্টা করিতেছি৷
রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, 'আমরা কি য়ুরোপের সহিত অন্য সমস্ত বিষয়ে এতটা একাত্ম হইয়া গিয়াছি৷' অর্থাত্ তিনি মনে করেন, ইংরেজ তথা ইউরোপীয়দের সাথে ভারতীয়দের মৌলিক সারবস্তুগত পার্থক্য আছে৷ একারণেই তিনি বলছেন, 'বাহ্য অনৈক্য বিলোপ করিয়া দিলে' অসংগতির সমাধান হবে না৷ 'সাধারণের সম্মানজনক' তথা বিত্তবান সম্প্রদায়ের যে অংশটি মনে করে 'বসনভূষণ ভাবভঙ্গি এমনকি, ভাষাটা পর্যন্ত ইংরাজী' হয়ে গেলে ইংরেজের সাথে অনৈক্যের সমস্যার সমাধান হয়, তাঁদেরকে তিনি 'জাতীয় সম্মান বিক্রয় করিয়া আত্মসম্মান ক্রয় করা'র দোষে দোষী সাব্যস্ত করছেন৷ তাঁর এই 'জাতীয়' সম্মানের ব্যাপ্তি ভারতবর্ষীয় তথা সর্বভারতীয়৷ তিনি বলছেন, 'ইংরাজ ভারতবর্ষীয়কে ঠিক ভারতবর্ষীয়ভাবে বুঝিতে এবং শ্রদ্ধা করিতে অম৷' অর্থাত্ এখানে, তাঁর বর্ণনামতে, ভারতের একজন মানুষের সত্তা নিছক বাঙালী, মারাঠী, সাঁওতাল, মুণ্ডা ইত্যাদি নয়, বরং ভারতবর্ষীয়৷ আমরা এক 'সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের' আভাস এখানে পাচ্ছি৷ কিন্তু তিনি বলছেন 'আমাদেরও এখন জাতিনির্মাণ-আত্মনির্মাণের অবস্থা৷' অর্থাত্ 'সর্বভারতীয় জাতি' এখনও গড়ে ওঠে নি৷ তিনি আপে করছেন, 'এখন অজ্ঞাতবাসের সময়৷ ...আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা বড়োই বেশি প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছি৷' অর্থাত্ মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের যতটুকু ইংরেজবিরোধী বিােভ তখন পর্যন্ত প্রকাশ পেয়েছে, তা তিনি সমর্থন করতে পারছেন না৷ তিনি পশ্চাদপসরণ ও নিষ্ক্রিয়তা চাইছেন৷
এখানে তিনি যে 'জাতিনির্মাণ'-এর তত্ত্ব এনেছেন, তা ছিল তখনকার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দেরই তত্ত্ব৷ "তিলক, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি আরো অনেকে বলতে ভালবাসতেন, ভারত একটি জাতি হয়ে উঠছে৷...কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি ডবি্ল্লউ সি ব্যানার্জি কংগ্রেসের যে তিনটি মূল ল্য স্থির করে দিয়েছিলেন তার অন্যতমটি ছিল 'জাতীয় ঐক্যের মনোভাবের পূর্ণ বিকাশ ও তার সংহতিসাধন৷...রুশ পরিব্রাজক আই পি মিনায়েভ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'কংগ্রেসের কাছে কংগ্রেস নেতারা কি ফল আশা করেন?' ব্যানার্জি উত্তর দিয়েছিলেন, 'ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও ঐক্য গড়ে তোলা৷'১৪৯
প্রকৃতপ েএক ধরনের 'সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ'-এর ধারণার ভিত্তিতে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' জন্মলাভ করেছিল৷ পরবর্তীতে ভারতের মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর বিকাশের প্রক্রিয়ায় এই 'সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ'-এর মতবাদ ক্রমান্বয়ে পরিপূর্ণতা অর্জন করে ৷ সর্বভারতীয় মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াসহ ভারতের বিত্তবান শ্রেণীগুলোর সর্বভারতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল এই রাজনৈতিক মতবাদের ভিত্তি৷ কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এই সর্বভারতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রথম থেকেই অত্যন্ত সচেতন ছিলেন৷ "তাঁরা (অর্থাত্ ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা) ভাবতেন যেহেতু তাঁরা সমগ্র জাতির অর্থনৈতিক ন্যায় এবং সাম্যের জন্য সংগ্রাম করে চলেছেন, সেহেতু তাঁদের প েবিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ন্যায় ও সাম্যের লড়াইকে উত্সাহ দেওয়া ঠিক হবে না৷ তাঁরা এমন কোন কাজ করতে রাজি ছিলেন না, যার ফলে যুগের দাবি অনুযায়ী জনগণকে একটা অখণ্ড জাতীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করার বদলে জাতির বিভক্ত হয়ে যাবার পথ প্রশস্ত হয়ে পড়ে৷"১৫০ 'দ্বিতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনেই দাদাভাই নওরোজী এই নিয়ম ঠিক করে দিয়েছিলেন, 'জাতীয় কংগ্রেস নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবে শুধু সে সব বিষয়ের মধ্যে যেগুলোতে গোটা জাতি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে৷'১৫১
এখানে উলি্ল্লখিত 'সমগ্র জাতির অর্থনৈতিক ন্যায় এবং সাম্যের জন্য সংগ্রাম' ছিল মূলত বিত্তবান শ্রেণীগুলোর স্বার্থের জন্য সংগ্রাম৷ এরা নিজেরা শুধু নিজেদেরকেই 'সর্বভারতীয় জাতি' বলে মনে করতো৷ এ কারণেই এদের 'সমগ্র জাতির' জন্য সংগ্রামে 'সমগ্র জাতির' যাঁরা ৯০ শতাংশ সেই কৃষকের সংগ্রাম ও স্বার্থ কোনদিনই স্থান পায় নি৷ কৃষকের শত্রু শুধু ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদই ছিল না, একই সাথে অন্যতম প্রধান শত্রু ছিল ইংরেজসৃষ্ট জমিদার-মহাজন-বণিক-করদরাজন্যতন্ত্র৷ সুমিত সরকার কৃষি-পণ্যের মাধ্যমে কৃষক-শোষণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন : "ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনাকে উপো করা হত৷... চাষীদের বাধ্য করা হতো তাদের উত্পন্ন দ্রব্য বিক্রি করতে আর বিদেশী রপ্তানী সংস্থার মাধ্যমে তা চালান করা হতো...ভারতীয় জমিদার ও মহাজনদের শোষণও তার জন্য দায়ী৷ বহু ভারতীয় ছিল অধস্তন সুবিধাভোগী ও ঔপনিবেশিক শোষণের দালাল৷ জাতীয়তাবাদীরা সাধারণভাবে এসব উপো করতেন৷"১৫২
ব্রিটিশ মালিকানাধীন শিল্পের মতই ভারতীয় মালিকানাধীন শিল্পেও শ্রমিকদের জীবন ছিল দুর্বিষহ৷ 'ভারতীয় মালিকানাধীন কারখানায় কর্মরত ভারতীয়দের দুর্দশা নিয়ে জাতীয়তাবাদীরা সচরাচর মাথা ঘামাতে রাজি হতেন না৷'১৫৩ ১৮৭৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় এক পাশবিক বিবৃতি ছাপা হয়েছিল, 'এই উদীয়মান শিল্পের ধ্বংসের চেয়ে, এই সকল শিল্পে যারা কর্মরত, তাদের অধিকতর মৃতু্যর হার অনেক বেশী বাঞ্ছনীয়৷'১৫৪
তথাকথিক জাতীয়তাবাদীরা তথা কংগ্রেস বহুজাতিক ভারতের পাহাড়-অরণ্যবাসী ও আদিবাসী এবং তুলনামূলক অনগ্রসর ও নিপীড়িত জাতিসমূহের সমতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকেও নাকচ করে দিয়েছিল৷ বহুজাতিক ভারতে 'সর্ব-ভারতীয় জাতি ও জাতীয়তাবাদ' ধারণাটিই ছিল সাম্রাজ্যবাদের দালাল মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াসহ ইংরেজসৃষ্ট বিত্তবানদের চাপিয়ে-দেওয়া অবাস্তব ধারণা৷ এটা সম্পূর্ণ সঠিক যে ব্রিটিশ-ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যকে উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজন ছিল সমস্ত শোষিত-নিপীড়িত শ্রেণী, জাতি ও জনগণের সর্বভারতীয় ঐক্য ও সংগ্রাম৷ এজন্য আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিপীড়িত জাতি ও জনগণের সাথে ঐক্য-সমন্বয় এবং সমর্থন-সহযোগিতা ছিল অপরিহার্য৷ কিন্তু কংগ্রেস তথা 'জাতীয়তাবাদী'-দের রাজনীতি ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত৷ এঁরা বরং ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের শাসনকেই আশীর্বাদ বলে মনে করতো৷
রবীন্দ্রনাথের েেত্রও এটা প্রযোজ্য৷ জাতীয় সম্মানের প্রশ্নকে সামনে এনে তিনি ইংরেজের অন্ধ অনুকরণ ও 'ইংরাজ ছদ্মবেশ ধারণ'কে বিরোধিতা করলেও, তাঁর সাথে অনুকরণকারী সম্প্রদায়টির মূল অবস্থানে পার্থক্য নেই৷ উভয় পরে ল্য 'দুই জাতির মিলনসাধনের...অন্তরায়' দূর করা অর্থাত্ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় জনগণের মধ্যে আপোস-সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা এবং এভাবে প্রকারান্তরেও সেই শাসন-শোষণ টিকিয়ে রাখা৷ উভয়পই সাম্রাজ্যবাদের অনুগত৷ তবে এটা অনস্বীকার্য যে রবীন্দ্রনাথ এখানে ভারতবর্ষীয় সত্তা ও স্বাতন্ত্র্যের স্পষ্ট প্রবক্তা৷
ইংরেজের বিপরীতে নিজের এই ভারতবর্ষীয় সত্তা-স্বাতন্ত্র্যকে ঊধের্্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বেশ ভাবাবেগের সাথেই বলেছেন : "আজ আমি বলিতেছি, ভারতবর্ষের দীনতম মলিনতম কৃষককেও আমি ভাই বলিয়া আলিঙ্গন করিব, আর ঐ-যে রাঙা সাহেব টমটম হাঁকাইয়া আমার সর্বাঙ্গে কাদা ছিটাইয়া চলিয়া যাইতেছে উহার সহিত আমার কানাকড়ির সম্পর্ক নাই৷"
ইংরেজ শাসনে কৃষকই যে ভারতের দীনতম মলিনতম অংশ তা তাঁর অজ্ঞাত ছিল না৷ কিন্তু তবুও তিনি 'ইংরাজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে কৃষকদের প েবা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলেন নি৷ এখন তিনি তাঁর সর্বভারতীয় সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজনে 'ভারতবর্ষের' এই 'দীনতম মলিনতম কৃষককেও ভাই বলিয়া আলিঙ্গন'-এর ঘোষণা দিচ্ছেন৷ এতে কৃষকের কোন লাভ নেই৷ কারণ রবীন্দ্রনাথ তথা বিত্তবানদের এই সাম্রাজ্যবাদপন্থী 'সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ'-এর মতবাদ কৃষকের শ্রেণীস্বার্থকে বাতিল করে দেয় এবং তাঁকে তাঁর মিত্রদের সাথে ঐক্যের ভিত্তিতে মুক্তি অর্জনের সংগ্রাম থেকে বিচু্যত করে ফেলে৷ উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ভারতবর্ষে এমনটিই ঘটেছিল৷ একই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন: "ইংরাজ পীপল-নামক একটা পদার্থকে যমের মত ভয় করে, আমরাও সেইজন্য পাঁচজনকে কোনোমতে জড়ো করিয়া পীপল সাজিয়া গলা গম্ভীর করিয়া ইংরাজকে ভয় দেখাই৷"
১৮৯০ সালে বোম্বাই-এর লাট রিয়াই ভারতের বড়লাট ল্যান্সডাউনকে লিখেছিল, "অরণ্য-নীতি, আবগারি (অন্তশুল্ক) নীতি, লবণ কর, ... ভূমি রাজস্বের কড়াকড়ি_এসব আমাদের ঘৃণার পাত্র করে তুলেছে৷...এদেশীয় শিতি লোকেরা কি চায় তা আমরা ভালভাবেই জানি...অশিতিদের মনোভাব কি তা আমরা জানি না৷"১৫৫ ইংরেজ আসলে মাটির তলার এই আগুনকেই ভয় করত৷ রবীন্দ্রনাথও জানতেন ইংরেজের আতঙ্ক কোথায় নিহিত৷ 'দীনতম মলিনতম কৃষক,' অরণ্যচারী আদিবাসী, শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী, যাঁরা ছিলেন 'পীপল'-এর মূল উপাদান, তাঁদেরকেই ইংরেজের যত ভয়৷ 'পীপল'কে ইংরেজের এই 'যমের মত ভয়' জনগণের আপোসহীন অব্যাহত সংগ্রামেরই ফল ও স্বীকৃতি৷ তিনি লিখেছেন, 'আমরাও...পাঁচজনকে কোনোমতে জড়ো করিয়া পীপল সাজিয়া গলা গম্ভীর করিয়া ইংরাজকে ভয় দেখাই৷' এই যখন ভীত-সন্ত্রস্ত ইংরেজের অবস্থা, তখন প্রয়োজন ছিল ভারতের ল-কোটি জনগণের কাছে আরো বৃহত্তর পরিসরে সমাবেশিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরা, যাতে করে ল-কোটি মানুষের গর্জনে ও সংগ্রামে আতঙ্কিত ইংরেজের ঔপনিবেশিকতা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়৷ কিন্তু তিনি ইংরেজের ঔপনিবেশিক অধীনতার প৷ে তাই জনগণের প্রশ্নে তিনি পুরোপুরী নেতিবাচক এক অবস্থান গ্রহণ করেছেন৷
১৭
'ইংরাজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভারতবর্ষীয় সত্তা ও স্বাতন্ত্র্যকে ঊধের্্ব তুলে ধরার জন্য যে 'বিদ্রোহ'-এর ঘোষণা দিয়েছেন, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতি-বিদ্রোহ, কারণ তা ইতিহাসের অগ্রগতির চাকাকে পিছনে ঘুরাতে চেয়েছে৷ তিনি লিখেছেন :
আমরা অনেকণ ঊর্ধ্বে লোলুপ দৃষ্টিপাত করিয়া অবশেষে ধীরে ধীরে ঘরে ফিরিবার উপক্রম করিতেছি৷ আমাদের এই চির-উপবাসী ুধিত স্বভাবের মধ্যেও যেটুকু মনুষ্যত্ব অবশিষ্ট ছিল তাহা ক্রমে বিদ্রোহী হইয়া উঠিতেছে৷
আমরা বলিতে আরম্ভ করিয়াছি_তোমরা কি এতই শ্রেষ্ঠ৷...মানুষের প্রকৃত আধ্যাত্মিক সভ্যতা, সেই সভ্যতায় আমরা তোমাদের অপো অনেক শ্রেষ্ঠতর৷ অধ্যাত্মবিদ্যার ক-খ আমরা তোমাদিগকে শিখাইতে পারি৷...হিন্দুজাতির শ্রেষ্ঠতা ধারণা করিবার শক্তিও তোমাদের নাই৷ আমরা পুনরায় চু মুদ্রিত করিয়া ধ্যানে বসিব৷ আজ হইতে তোমাদের য়ুরোপের সুখাসক্ত চপল সভ্যতার বাল্যলীলা হইতে সমস্ত দৃষ্টি ফিরাইয়া আনিয়া কেবলমাত্র নাসাগ্রভাগে নিবিষ্ট করিয়া রাখিলাম৷ তোমরা কাছারি করো, আপিস করো, দোকান করো, নাচো, খেলো, মারো-ধরো, হুটোপুটি করো এবং সিমলার শৈলশিখরে বিলাসের স্বর্গপূরী নির্মাণ করিয়া সভ্যতামদে প্রমত্ত হইয়া থাকো৷
দরিদ্র বঞ্চিত মানব আপনাকে এভাবে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে৷ যে শ্রেষ্ঠতার সহিত প্রেম নাই সে শ্রেষ্ঠতা সে কিছুতেই বহন করিতে সম্মত হয় না৷...এইরূপ শুষ্ক শ্রেষ্ঠতা বাধ্য হইয়া বহন করিতে হইলে ক্রমশ ভারবাহী মূঢ় পশুর সমতুল্য হইয়া যাইতে হয়৷
ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে প্রার্থনা ও প্রত্যাশা পূরণ না-হওয়ার দীর্ঘ অভিমান ও হতাশা থেকে এই 'বিদ্রোহ'-এর ঘোষণা৷ কারণ তিনি বলছেন, 'অনেকণ ঊর্ধ্বে লোলুপ দৃষ্টিপাত করিয়া অবশেষে ধীরে ধীরে ঘরে ফিরিবার উপক্রম করিতেছি৷' রবীন্দ্রনাথের এই 'বিদ্রোহ' ইংরেজের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য নয়, বরং ইংরেজের বিরুদ্ধে উত্থিত জনসাধারণের চেতনাকে পিছনে টেনে এনে হাজার হাজার বছরের পুরনো প্রতিক্রিয়াশীল আর্যধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার ঘোরে আচ্ছন্ন করার জন্য৷ ভারতীয়রা 'পুনরায় চু মুদ্রিত করিয়া ধ্যানে' বসবে এবং ঔপনিবেশিকতার বাস্তব জগত থেকে 'সমস্ত দৃষ্টি ফিরাইয়া আনিয়া কেবলমাত্র নাসাগ্রভাগে নিবিষ্ট' করবে৷ আর ইংরেজ? ইংরেজ কাছারি করবে, আপিস করবে, বাণিজ্য করবে, ঔপনিবেশিক শোষণ-শাসন চালিয়ে যাবে৷ সুতরাং তাঁর 'বিদ্রোহ'-এর পরিণাম হচ্ছে ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের স্বৈরাচার ও শোষণের মঞ্চটাকে উন্মুক্ত ও নিষ্কণ্টক করে দেওয়া৷
'ইংরাজ ও ভারতবাসী' রচনার নয় বছর পর ১৯০২ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ভারতবর্ষের ইতিহাস' প্রবন্ধে লিখেছেন :
য়ুরোপীয় সভ্যতা যে ঐক্যকে আশ্রয় করিয়াছে তাহা বিরোধমূলক; ভারতীয় সভ্যতা যে ঐক্যকে আশ্রয় করিয়াছে তাহা মিলনমূলক৷ য়ুরোপীয় পোলিটিক্যাল ঐক্যের ভিতরে যে বিরোধের ফাঁস রহিয়াছে...তাহা ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, রাজায়-প্রজায়, ধনীতে-দরিদ্রে, বিচ্ছেদ ও বিরোধকে সর্বদা জাগ্রত করিয়াই রাখিয়াছে৷
...ফরাসী বিদ্রোহ গায়ের জোরে মানবের সমস্ত পার্থক্য রক্ত দিয়া মুছিয়া ফেলিবে এমন স্পর্ধা করিয়াছিল, কিন্তু ফল উল্টা হইয়াছে_য়ুরোপের রাজশক্তি, ধনশক্তি, জনশক্তি ক্রমেই অত্যন্ত বিরুদ্ধ হইয়া উঠিতেছে৷...
ভারতবর্ষীয় আর্য যে শক্তি পাইয়াছে সেই শক্তির চর্চা করিবার অবসর ভারতবর্ষ অতি প্রাচীনকাল হইতে পাইয়াছে৷ ঐক্যমূলক যে সভ্যতা মানবজাতির চরম সভ্যতা, ভারতবর্ষ চিরদিন ধরিয়া বিচিত্র উপকরণে তাহার ভিত্তিনির্মাণ করিয়া আসিয়াছে৷...ভারতবর্ষ সমস্তই গ্রহণ করিয়াছে সমস্তই স্বীকার করিয়াছে...যদি ধর্মকেই মানবসভ্যতার চরম আদর্শ বলিয়া স্থির করা যায়, তবে ভারতবর্ষের প্রণালীকে শ্রেষ্ঠতা দিতে হইবে৷...এই ঐক্যবিস্তার ও শৃঙ্খলাস্থাপন কেবল সমাজব্যবস্থায় নহে, ধর্মনীতিতেও দেখি৷ গীতায় জ্ঞান প্রেম ও কর্মের যে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য-স্থাপনের চেষ্টা দেখি তাহা বিশেষভাবে ভারতবর্ষের৷...পৃথিবীর সভ্যসমাজের মধ্যে ভারতবর্ষ নানাকে এক করিবার আদর্শরূপে বিরাজ করিতেছে, তাহার ইতিহাস হইতে ইহাই প্রতিপন্ন হইবে৷...ইতিহাসের ভিতর দিয়া যখন ভারতের সেই চিরন্তন ভাবটি অনুভব করিব তখন আমাদের বর্তমানের সহিত অতীতের বিচ্ছেদ বিলুপ্ত হইবে৷
রবীন্দ্রনাথ ইউরোপীয় সভ্যতাকে সমালোচনা করছেন, কারণ 'তাহা বিরোধমূলক', সেখানে 'রাজায়-প্রজায়, ধনীতে-দরিদ্রে, বিচ্ছেদ ও বিরোধ৷' তিনি বুর্জোয়া ফরাসী বিপ্ল্লবের আদর্শেরও বিরোধী, কারণ 'ফরাসী বিদ্রোহ গায়ের জোরে মানবের সমস্ত পার্থক্য রক্ত দিয়া মুছিয়া ফেলিবে এমন স্পর্ধা করিয়াছিল৷' এককথায় তিনি শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এবং নিপীড়কের বিরুদ্ধে নিপীড়িতের সংগ্রাম, শোষিত-নিপীড়িতের সবল উত্থান ও বিপ্ল্লবের বিরোধী৷ তিনি বলছেন, 'ভারতীয় সভ্যতা...মিলনমূলক', প্রাচীন 'আর্য শক্তি'র 'ঐক্যমূলক...সভ্যতা মানবজাতির চরম সভ্যতা' এবং 'ভারতবর্ষ নানাকে এক করিবার আদর্শরূপে বিরাজ করিতেছে৷' স্বাভাবিকভাবেই এই 'মিলনমূলক', 'ঐক্যমূলক' ও 'নানাকে এক করিবার' সভ্যতা ও দর্শনের ধারক-বাহকরূপে তিনি যে ঔপনিবেশিক ইংরেজ ও পরাধীন ভারতবাসীর এবং শোষক-শোষিতের ঐক্য-মিলনের প েদাঁড়াবেন, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই৷
প্রকৃতপ েএই দাঁড়ানোটা হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও শোষক-নিপীড়কদের বিদ্যমান একাধিপত্যের প েদাঁড়ানো৷ যদি তাঁর অভিমত অনুযায়ী প্রাচীন আর্যসভ্যতা 'মানবজাতির চরম সভ্যতা' হয়, তাহলে বিশ্ব মানবসমাজের নতুনতর বিকাশের আর প্রয়োজন পড়ে না, বলতে হয় সবকিছুই হাজার হাজার বছরের পুরনো বেদ-গীতা-উপনিষদে আছে৷ তিনি বলেছেন, 'ভারতবর্ষ সমস্তই গ্রহণ করিয়াছে সমস্তই স্বীকার করিয়াছে৷' সুতরাং রবীন্দ্রনাথও ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদকে গ্রহণ করেছেন এবং ভারতবর্ষের জন্য আবশ্যক ঘোষণা করেছেন, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ তাঁর মতবাদ অনুসারে, 'ধর্ম...মানবসভ্যতার চরম আদর্শ৷' সুতরাং তাঁর দর্শন অনুযায়ী ধর্মই হয়ে দাঁড়ায় সভ্যতা তথা ইতিহাসের নির্ধারক শক্তি৷ রবীন্দ্রনাথ এখানে সমস্ত প্রগতিশীলতা-বিরোধী এক চরম রণশীল মতবাদ ও দর্শনকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন৷ ১৮৯৩ সালে রবীন্দ্রনাথ 'ইংরেজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে যে দার্শনিক মতবাদ পেশ করেছিলেন, ১৯০২ সালে তিনি বরং তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন৷
এখানে যে প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ তা হল, তিনি কি প্রকৃতপইে ইউরোপীয় সভ্যতার শিার বিপরীতে স্বতন্ত্র এক ভারতীয় ভাবধারাকে ঊধের্্ব তুলে ধরেছিলেন? প্রকৃত সত্য তা নয়৷ তিনি ইউরোপের যা কিছু প্রগতিশীল-বিপ্ল্লবী এবং শোষিত মানুষের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী, কেবলমাত্র সে সবকেই বর্জন করেছিলেন৷ তিনি বর্জন করেছিলেন শ্রেণীসংগ্রামের ও বিপ্লবের আধুনিক ইউরোপীয় মতবাদকে, এমনকি বুর্জোয়া ফরাসী বিপ্লবকে৷ কিন্তু তিনি যে আর্যশক্তি-সভ্যতা, রণশীল ঐতিহ্যপন্থা, ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদ এবং ধর্মভিত্তিক ইতিহাসবোধকে ধারণ করেছেন, তাও ইউরোপীয় সভ্যতার উদ্ভাবন ও শিা৷ তবে তা সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সৃষ্ট ও আবিষ্কৃত৷
কোম্পানীর শাসনের প্রথম আমলে উইলিয়াম জোনসের (১৭৪৬-৯৪) মত ইংরেজ বুদ্ধিজীবীরা তাদের গবেষণার মধ্য দিয়ে ভারতের প্রাচীন আর্য ঐতিহ্য ও সংস্কৃত ভাষার গৌরব 'আবিষ্কার' করেছিলেন৷ ১৮১৭ সালে উপনিবেশবাদী ঐতিহাসিক জেমস মিল (১৭৭৩-১৮৩৬) প্রকাশ করেন ছয় খণ্ডে রচিত তাঁর গ্রন্থ History of British India ৷ এতে তিনি ভারতের অতীতকে হিন্দু যুগ, মুসলমান যুগ এভাবে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করেন এবং প্রাচীন 'হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতি' ও এর বিপরীতে 'মুসলমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি' উদ্ভাবন করেন৷ এভাবে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হয় ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের এক ধর্মভিত্তিক ব্যাখ্যা৷ এদের 'আবিষ্কার' অনুসারে ধর্মই হয়ে দাঁড়ায় ভারতের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কারণ৷ জেমস মিল কিংবা মেকলের (১৮০০-৫৯) মত উপনিবেশবাদী পণ্ডিতদের মতে, ভারতের অতীত ছিল গৌরবহীন অচলায়তন এবং জনসাধারণের প্রকৃত কোন ইতিহাস ছিল না৷ এদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় জনগণের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধকে ভূলুণ্ঠিত করা৷ ইংরেজের ভারত-দখলই যে ভারতবর্ষের প্রথম পরাধীনতা, এই সত্যকে ঘোলা করার জন্য এরা প্রচার করে ইংরেজদের পূর্বেই ভারত তথা হিন্দুরা পরাধীন হয়েছিল মুসলমান বিজেতাদের হাতে এবং ইংরেজরা বরং আধুনিক ভারতের নির্মাতা৷ সম্পূর্ণ বিকৃত ও ভ্রান্ত ছিল এই ইংরেজ-নির্মিত ইতিহাস৷ বাস্তবে 'হিন্দু বা মুসলমান সভ্যতা ও সংস্কৃতি' ও 'হিন্দু বা মুসলমান যুগ' 'হিন্দু বা মুসলমান জাতি' এ জাতীয় কোনকিছু কখনও বিরাজ করে নি৷ আর একজন পণ্ডিত ম্যাঙ্মুলার, যিনি জন্মসূত্রে জার্মান, ব্রিটিশ শাসকদের প্রত্য সহায়তায় তাঁর দীর্ঘ গবেষণার মধ্য দিয়ে ১৮৬০-র দশকে বেদ, উপনিষদ ধর্মগ্রন্থাদিসহ প্রাচীন আর্যসমাজের গৌরবকে 'পুনরুদ্ধার' ও 'পুনঃপ্রতিষ্ঠিত' করেন৷
১৮৭৯ সালে মাদ্রাজে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকা থেকে আগত মাদাম ব্লাভাটস্কি ও অলকটের নেতৃত্বে 'অদ্ভুত ও বেশ খানিকটা সন্দেহজনক'১৫৬ থিওসফিক্যাল সোসাইটি৷ ্িবপিনচন্দ্র পাল লিখেছেন: "এই থিওসফিক্যাল সোসাইটি আমাদের জনসাধারণকে বলল, অতীত বা অতীতের উত্তরাধিকার নিয়ে লজ্জা পাওয়ার পরিবর্তে ভারতীয়দের এজন্য গর্বিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে৷ কারণ তাঁদের প্রাচীন মুনি-ঋষি ও সন্ন্যাসীরা ছিলেন সর্বোচ্চ সত্যের প্রবক্তা এবং প্রাচীন শাস্ত্রাদি ছিল সর্বোচ্চ মানবিক দু্যতি ও জ্ঞানের ভান্ডার৷...আধুনিক জগতের সবচেয়ে অগ্রসর লোকদের কাছ থেকে আসা এই নতুন বাণী...তাত্ণিকভাবে আমাদের মধ্যে নিজেদের আত্মমূল্যায়নকে উজ্জীবিত করল এবং সৃষ্টি করল জাতীয় আত্মবিশ্বাস...আমরা আমাদের বর্তমান ও মধ্যযুগীয় ধারণাসমূহের ও প্রতিষ্ঠানাদির ত্রুটি স্বীকার এবং আধুনিক ইউরোপীয় মতাদর্শে সেগুলোর সংস্কার ও পুনর্গঠনের পরিবর্তে দৃঢ়ভাবে সেগুলোকে রায় উত্থিত হলাম৷"১৫৭
থিওসফি আন্দোলন ভারতের কোন কোন অংশে বিত্তবান ও শিতি সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল৷ "তার মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি সম্বন্ধে সম্ভ্রম এবং সর্বভারতীয় সংহতি বোধ জাগ্রত হয়ে উঠেছিল৷"১৫৮ নেহেরু তাঁর বাল্যজীবনে তিনবছর থিয়োজফির শিা নিয়েছিলেন৷ তিনি লিখেছেন, "তের বছর বয়সে আমি থিয়োজফিক্যাল সোসাইটির সভ্য হইলাম৷ স্বয়ং মিসেস বেসান্ত আমাকে দীা দিলেন এবং কয়েকটি রহস্যময় মুদ্রা শিখাইয়া দিলেন৷ আমি এক অপূর্ব ভাবাবেগ অনুভব করিলাম৷ আমি কাশীতে থিয়োজফি সম্মেলনে যোগ দিয়াছিলাম এবং শ্মশ্রুবদন কর্নেল অলকটকে দেখিয়াছিলাম৷...আমার স্পষ্ট মনে আছে থিয়োজফিতে অনুপ্রাণিত হইয়া আমার চোখে মুখে একটা নিরীহ ও নিস্তেজ ভাব দেখা দিল৷ ধার্মিকদের মধ্যে, থিয়োজফি নরনারীদের মধ্যে ইহা সচরাচর দেখা যায়৷ আমি একজন ধর্মসাধক, এই ধারণায় সর্বদা ডগমগ করিতাম৷ আমার ভাবভঙ্গী দেখিয়া সমবয়সী ছেলেমেয়েরা আমার সহিত মিশিতে চাহিত না৷...ইহার কিছুদিন পরেই...থিয়োজফির সহিত আমার সম্পর্কও ফুরাইল৷"১৫৯
আইরিশ জাতি-উদ্ভূত এ্যানি বেসান্ত ছিলেন থিওসফি নেত্রী এবং পরে তিনি কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতৃত্বে পরিণত হয়েছিলেন৷ প্রকৃতপ েজন্মলগ্ন থেকেই কংগ্রেস রাজনীতিতে থিওসফিস্টদের প্রভাব ছিল বেশ ব্যাপক৷
উনিশ শতকের শেষে এই যে ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদ, সে সম্পর্কে শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, "এই 'সুসংবদ্ধ হিন্দুধর্মের' আধুনিক ধারণাটি ব্যাপকভাবেই উনিশ শতকের পশ্চিমী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা সৃষ্ট৷ ঐতিহাসিকভাবে 'হিন্দুত্ব' শব্দটি নানাপ্রকার অর্থ প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হত, সাধারণভাবে এর মাধ্যমে বোঝানো হত 'এদেশীয়' বা ভারতীয়৷...উনিশ শতকের শেষে আদমশুমারিতে যখন ভারতীয়দেরকে তাদের ধর্মীয় অবস্থান চিহ্নিত করতে বলা হয়, তখনও জনসাধারণের মধ্যে হিন্দুধর্ম একটি সুনির্দিষ্ট সীমানা-বদ্ধ ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত ছিল না৷ এ কারণে ১৮৮১ সালের আদমশুমারিতে 'ধর্ম'-এর জন্য নির্দিষ্ট পংক্তিতে অনেকে 'হিন্দু'-র পরিবর্তে তাদের সম্প্রদায় বা জাত উল্লেখ করেছিল৷ সংজ্ঞা নিয়ে এই ধরনের সমস্যা আদমশুমারি কর্মকর্তাদের অন্ততপ ে১৯০১ সাল পর্যন্ত ভুগিয়েছিল৷ এই হিন্দুধর্ম তাই ঔপনিবেশিকতার সৃষ্টি হিসেবেই প্রতীয়মান হয়...৷ আশীষ নন্দী দেখিয়েছেন, সুসমন্বিত হিন্দুধর্মের ধারণা 'জ্ঞানালোকত্তর ইউরোপের সাংস্কৃতিক ঔদ্ধত্যের দ্বারা সৃষ্ট' ...৷"১৬০
বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, "বাস্তবত ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ পুরো দশকজুড়ে ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার এক শক্তিশালী স্রোতধারা দেখা দেয়, যা শুধু বাংলায় নয় সারা ভারতবর্ষে প্রগতির আন্দোলনকে বিপর্যস্ত করে৷"১৬১ বিপিনচন্দ্র পাল তাঁর বক্তব্যে 'আধুনিক ইউরোপীয় মতাদর্শের' কথা বলেছেন৷ তখন ইউরোপে সবচেয়ে আধুনিক মতাদর্শ ছিল সমাজতন্ত্রের মতাদর্শ৷ ইউরোপ ও আমেরিকার পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীরা তখন শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন ও সমাজতন্ত্রের মতাদর্শের ফলে আতঙ্কগ্রস্ত৷ বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার, বিশেষত ডারউইনের বিবর্তনবাদ চার্চ ও ধর্মীয় মতবাদের ভিত্তিটাকেই উপড়ে ফেলতে চাইছে৷ তাই পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদীরা তাঁদের নিজেদের অর্থাত্ বুর্জোয়া ফরাসী বিপ্লবের চেতনাকেও ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আদিম, মধ্যযুগীয় ও পচনশীল বিভিন্ন ধর্মীয় ভাবধারাকে পুনর্জীবিত করে এবং উপনিবেশগুলোতেও তা পাচার করে৷ জেমস মিল, ম্যাঙ্মুলার, ব্ল্ল্লাভাটস্কি, অলকট এঁরা ছিলেন ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের মতাদর্শগত প্রবক্তা৷ ম্যাঙ্মুলার ছিলেন ডারউইনের বিবর্তনবাদের তীব্র বিরোধী৷
ভারতে নব-উদ্ভূত মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী, বণিকতন্ত্র, জমিদার-মহাজন-রাজন্যবর্গের 'সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ'-এর রাজনীতির সাথে ভারতবিজেতা প্রাচীন আর্যতন্ত্রের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পুনরুত্থানবাদ সংগতিপূর্ণ ছিল৷ তাদের প্রয়োজন ছিল এমন এক মতাদর্শ যা রূপের দিক থেকে সর্বভারতীয় অথচ কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তিসংগ্রামে প্রয়োজনীয় প্রগতিশীল মতবাদ ও চেতনার পরিপন্থী৷ "নতুন উদ্ভূত শ্রেণীর মধ্যে...ইউরোপীয়দের বিপরীতে ভারতীয় হিসেবে হীনমন্যতাবোধ ছিল৷ ...ইতিমধ্যে নতুন শ্রেণী তাদের আত্মমর্যাদার সমর্থনে উপায় অন্বেষণ করতে শুরু করল৷ তারা তা খুঁজে পেল ইউরোপীয়দের রচনাবলীতে, যা ভারতের অতীত ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক অর্জনসমূহকে গৌরবমণ্ডিত করে তুলে ধরেছিল৷ সংস্কৃতজ্ঞ-পণ্ডিত স্যার উইলিয়াম জোনস এবং ম্যাঙ্মুলার তাদের অন্তর্নিহিত আত্মবিশ্বাসকে পুনর্জীবিত করলেন৷"১৬২
ব্রিটিশের সহযোগিতায় ইতিমধ্যে সাম্রাজ্যবাদ-অনুগত মুসলমান-পুনরুত্থানবাদও সৃষ্টি হয়েছিল৷ হান্টারের ইন্ডিয়ান মুসলমানস বইটি এেেত্র অনুঘটক৷ ১৮৮৮ সালে ভাইসরয় ডাফরিন ভারতের মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের বর্ণনা করেছিলেন এইভাবে, "৫ কোটি মানুষের এক জাতি, এদের ধর্মীয় সামাজিক রীতিনীতি এক এবং তাদের মনে পড়ে সেই দিনগুলির কথা যখন, দিল্ল্লীর মসনদে বসে, হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী অবধি তারা একচ্ছত্র শাসন চালাত৷"১৬৩ ভারতের মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা কখনও জাতি হিসেবে বিরাজ করে নি৷ সুতরাং ডাফরিনের এই মন্তব্য 'ধর্মভিত্তিক জাতিত্ব ও রাজনীতি'কে প্ররোচিত করার অসত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা বলার অপো রাখে না৷
ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের 'আবিষ্কৃত' এই ধর্মীয় পুনর্জীবনবাদ এবং ইতিহাস ও সমাজের ধর্মভিত্তিক ব্যাখ্যা ইংরেজসৃষ্ট অনুগত ভারতীয় বিত্তবানশ্রেণী ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী শিতি সম্প্রদায়ের কুসংস্কার, বিশ্বাস ও মতাদর্শগত অস্ত্রে পরিণত হয়৷ যেমন বিবেকানন্দ সে-সময়ে ঘোষণা করেছিলেন, "ধর্ম আমাদের বল, ধর্ম আমাদের শক্তি, ধর্ম আমাদের জাতীয় জীবন৷...যদি আপনি এ ধর্ম ত্যাগ করেন, তাহলে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যাবেন৷...ভারতীয় মন প্রথমে ধর্মভাবাপন্ন তারপরে অন্যকিছু...আমার প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে আধ্যাত্মিকতার যেসব রত্ন আমাদের ধর্মশাস্ত্রে, কিছু লোকের অন্তরে অথবা মঠমন্দিরে বা অরণ্যে নিহিত আছে, সেইসব রত্নকে প্রকাশ করা৷...সমগ্র ভারতের সব লোকই আর্য ছাড়া আর কিছুই নয়৷...সত্যযুগের প্রারম্ভে একটিমাত্র বর্ণ ছিল এবং সে বর্ণ হচ্ছে ব্রাহ্মণ৷"১৬৪ তিনি বলেছিলেন, "ম্যাঙ্মুলার ছিলেন বৈদান্তিকের বৈদান্তিক৷"১৬৫
'ইংরাজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধে সম্ভবত ম্যাঙ্মুলার সম্পকের্ই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "বিদেশে থাকিয়া জার্মান একাগ্রতার সহিত আমাদের সংস্কৃত শাস্ত্রের অনুশীলন করিয়াছে স্বেেত্র উপস্থিত থাকিয়া ইংরাজ তেমন করে নাই৷"
জেমস মিল ও ম্যাঙ্মুলার দু'জনের কেউ কখনও ভারতবর্ষে আসেন নি এবং ভারতীয় কোন ভাষাও তাঁরা জানতেন না৷ কিন্তু ভারতবর্ষে তাঁদের মতাদর্শগত প্রভাব ছিল বিপুল৷ রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, 'হিন্দুজাতির শ্রেষ্ঠতা ধারণা করিবার শক্তিও তোমাদের নাই'_তখন এটা স্পষ্ট যে তিনিও জেমস মিলের মত উপনিবেশবাদীদের সৃষ্ট ধর্মভিত্তিক ইতিহাস-চেতনায় দীতি ছিলেন৷ তাঁর আধ্যাত্মিকতা, প্রাচীনপন্থা ও ধর্মবাদ কোনটাই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ছিল না৷ এমনকি তাঁর ঈশ্বরও ছিল ইংরেজ-অনুগামী৷ তিনি লিখেছেন,
কিন্তু কে বলিতে পারে এই মানসিক বিদ্রোহই বিধাতার অভিপ্রেত নহে৷ ... বোধ করি তাহার অভিপ্রেত এই যে, আমরা ইংরাজি সভ্যতার জ্ঞানালোকে নিজের স্বাতন্ত্র্যকেই সমুজ্জ্বল করিয়া তুলিব৷
তাহার লণও দেখা যায়৷ ইংরাজের সহিত সংঘর্ষ আমাদের অন্তরে যে-একটি উত্তাপ সঞ্চার করিয়া দিয়াছে তদ্বারা আমাদের মুমূর্ষু জীবনীশক্তি পুনরায় সচেতন হইয়া উঠিতেছে৷...দীর্ঘ প্রলয়রাত্রির অবসানে অরুণোদয়ে যেন আমরা আমাদেরই দেশ আবিষ্কার করিতে বাহির হইয়াছি৷ স্মৃতিশ্রুতি-কাব্যপুরাণ-ইতিহাসদর্শনের প্রাচীন গহন অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছি_পুরাতন গুপ্তধনকে নূতন করিয়া লাভ করিবার ইচ্ছা৷...বিপুল আশায় উত্সাহিত হইয়া আমাদের সমুদয় প্রাচীন পুঁথিপত্রগুলি সেই উত্তাপের কাছে আনিয়া ধরিতেছি_যদি পূর্ব অর ফুটিয়া উঠে তবেই পৃথিবীতে আমাদের গৌরব রতি হইতে পারে_নচেত বৃদ্ধ ভারতের জরাজীর্ণ দেহ সভ্যতার জ্বলন্ত চিতায় সমর্পণ করিয়া লোকান্তর ও রূপান্তর প্রাপ্ত হওয়াই সদগতি৷
সতর্ক রবীন্দ্রনাথ এটা স্পষ্ট করছেন, তাঁর ধর্মীয় পুনরুত্থানবাদ ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের শত্রু বা বিরোধী নয়৷ সম্ভবত পুনরুত্থানবাদীদের যে-অংশ তখন তুলনামূলকভাবে অধিকতর কট্টর-রণশীল ও বেশ পরিমাণে ইংরেজ-শাসন বিরোধী ছিল, তাদের সাথে রবীন্দ্রনাথ নিজের পার্থক্যরেখা টানছেন৷ তখন কট্টর-রণশীল, চরম হিন্দু পুনরুত্থানবাদী এবং একই সাথে বেশ পরিমাণে কংগ্রেসের আপোসনীতির ও ব্রিটিশ-শাসনের সমালোচক পত্রিকা ছিল যোগেশচন্দ্র বসু ও কৃষ্ণচন্দ্র ব্যানার্জির পরিচালনাধীন বঙ্গবাসী পত্রিকা৷ বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জনকারী এই পত্রিকার_ "প্রচারসংখ্যা ছিল কুড়ি হাজার, যেখানে সংস্কারধর্মী ব্রাহ্ম পত্রিকা 'সঞ্জীবনী'-র প্রচারসংখ্যা ছিল চার হাজার৷"১৬৬
এ ধরনের ইংরেজ-বিরোধী হিন্দুত্ববাদীদের সাথে নিজ পার্থক্য তুলে ধরার জন্যই সম্ভবত তিনি বলছেন, 'এই মানসিক বিদ্রোহই বিধাতার অভিপ্রেত নহে৷... বোধ করি তাঁহার অভিপ্রেত এই যে, আমরা ইংরাজি সভ্যতার জ্ঞানালোকে নিজের স্বাতন্ত্রকেই সমুজ্জ্বল করিয়া তুলিব৷' অর্থাত্ আর্যবাদী ভারতীয় স্বাতন্ত্র্য ও সাম্রাজ্যবাদ দুটোই তিনি চাইছেন৷ তিনি 'ইংরাজি সভ্যতার জ্ঞানালোকে' থেকে 'স্মৃতিশ্রুতি-কাব্যপুরাণ-ইতিহাসদর্শনের প্রাচীন গহন অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ' করে 'পুরাতন গুপ্তধনকে নূতন করিয়া লাভ করিবার ইচ্ছা' ব্যক্ত করছেন৷্ এভাবেই তাঁর মতে, পৃথিবীতে ভারতবর্ষের 'গৌরব রতি হইতে পারে_নচেত বৃদ্ধ ভারতের জরাজীর্ণ দেহ সভ্যতার জ্বলন্ত চিতায়' ভস্মীভূত হয়ে যাবে৷ আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে আদিম ধর্ম ও ঈশ্বরের এ এক সার্থক সংশ্লেষণ এবং রবীন্দ্রনাথ তথা কংগ্রেসের 'সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদ'-এর এক যথার্থ প্রতিচ্ছবি৷
প্রবন্ধের শেষ অংশে রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসীর করণীয়কে তুলে ধরেছেন:
অতএব, সকল দিক পর্যালোচনা করিয়া রাজাপ্রজার বিদ্বেষ শমিত রাখিবার প্রকৃষ্ট উপায় এই দেখা যাইতেছে, ইংরাজ হইতে দূরে থাকিয়া আমাদের নিকটকর্তব্যসকল পালনে একান্তমনে নিযুক্ত হওয়া৷ কেবলমাত্র ভিা করিয়া কখনোই আমাদের মনের যথার্থ সন্তোষ হইবে না৷ আজ আমরা মনে করিতেছি ইংরাজের নিকট হইতে কতকগুলি অধিকার পাইলেই আমাদের সকল দুঃখ দূর হইবে৷ ভিাস্বরূপ সকল অধিকারগুলি যখন পাইব তখনো দেখিব, অন্তর হইতে লাঞ্ছনা কিছুতেই দূর হইতেছে না_বরং যতদিন না পাইয়াছি ততদিন যে সান্ত্বনাটুকু ছিল সে সান্ত্বনাও আর থাকিবে না৷ আমাদের অন্তরের শূন্যতা না পুরাইতে পারিলে কিছুতেই আমাদের শান্তি নাই৷ আমাদের স্বভাবকে সমস্ত ুদ্রতার বন্ধন হইতে মুক্ত করিতে পারিলে তবেই আমাদের যথার্থ দৈন্য দূর হইবে এবং তখন আমরা তেজের সহিত, সম্মানের সহিত, রাজসাাতে যাতায়াত করিতে পারিব৷
রবীন্দ্রনাথ 'রাজাপ্রজার বিদ্বেষ শমিত' করতে চান৷ এটা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম সারবস্তু৷ তিনি সংগ্রাম-সংঘাতের প্রক্রিয়ায়, 'প্রজা'র বিজয়ের মধ্য দিয়ে রাজা-প্রজার দ্বন্দ্বের মীমাংসা চান না৷ প্রকৃতপ েতিনি যা চান তা হল, 'প্রজার বিদ্বেষ শমিত' করা৷ তিনি বলছেন, 'ভিাস্বরূপ সকল অধিকারগুলি যখন পাইব৷' কিন্তু ভিাস্বরূপ কোন অধিকার পাওয়া যায় না৷ অধিকার সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে আনতে হয়, এবং তা রা ও ভোগ করতে হয়_মানব ইতিহাসের এই সত্য তিনি ধারণ করতে সম ছিলেন না৷ ভিা, অসহায়ত্ব, আত্মসমর্পণ ও নতজানু হওয়া ব্যতীত তিনি জনগণের সামনে অন্যকোনকিছু উপস্থাপন করতে অসমর্থ৷ ভারতবাসীকে তিনি বলছেন, ইংরেজ থেকে দূরে থাকতে৷ কিন্তু ইংরেজ কি তার শোষণ-লুন্ঠনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করবে বা ভারতবাসীর কাছ থেকে দূরে থাকবে? তাঁর মন্ত্র হচ্ছে, ইংরেজের শোষণ-নিপীড়নকে বিনা প্রতিরোধে দাসসুলভ উপায়ে মাথা পেতে নেওয়ার মন্ত্র৷ 'অন্তরের শূন্যতা' পূরণ, 'আমাদের স্বভাবকে সমস্ত ুদ্রতার বন্ধন হইতে মুক্ত' করার নির্দেশনা তিনি দিয়েছেন৷ কিন্তু কি ভাবে? তাঁর মতবাদ থেকে যে দিশা বেরিয়ে আসে তা হল, 'অন্তরের শূন্যতা' পূরণ কিংবা 'ুদ্রতার বন্ধন' থেকে মুক্তি-অর্জন সম্ভব ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে পরিহার করে সন্ন্যাস, ধর্ম ও প্রাচীন ঐতিহ্যে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে৷ ইংরেজ আমলে 'অন্তরের শূন্যতা'র প্রধান কারণ ছিল পরাধীনতার গ্লানি এবং 'ুদ্রতার বন্ধন' ছিল তা মাথা পেতে মেনে নেওয়া৷ ইংরেজের দাসত্বের বিরুদ্ধে আপোসহীন মুক্তির সংগ্রামই ছিল সমস্ত 'অন্তরের শূন্যতা' ও 'ুদ্রতার বন্ধন' থেকে ভারতবাসীর মুক্ত হওয়ার একমাত্র পথ৷ এভাবেই 'যথার্থ দৈন্য' দূর করা সম্ভব হত৷
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিরোধী৷ তাঁর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য বরং 'তেজের সহিত, সম্মানের সহিত, রাজসাাতে যাতায়াত' করা, সোজা ভাষায় ইংরেজ শাসকদের কিছুটা মর্যাদাসম্পন্ন দাসে পরিণত হওয়া৷
তবে রবীন্দ্রনাথ মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর তত্কালীন সংকট ও সম্ভাবনাকে দুটোকেই চিহ্নিত করেছেন৷ প্রবন্ধের শেষে তিনি লিখেছেন :
শিখদের শেষ গুরু গোবিন্দ যেমন বহুকাল জনহীন দুর্গম স্থানে বাস করিয়া, নানা জাতির নানা শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া, সুদীর্ঘ অবসর লইয়া আত্মোন্নতিসাধনপূর্বক ...নির্জন স্থান হইতে বাহির হইয়া আসিয়া আপনার গুরুপদ গ্রহণ করিয়াছিলেন, তেমনি আমাদের যিনি গুরু হইবেন তাঁহাকেও খ্যাতিহীন নিভৃত আশ্রমে অজ্ঞাতবাস করিতে হইবে; পরম ধৈর্যের সহিত গভীর চিন্তায় নানা দেশের জ্ঞানবিজ্ঞানে আপনাকে গড়িয়া তুলিতে হইবে;...তাহার পরে তিনি বাহির হইয়া আসিয়া যখন আমাদের চিরপরিচিত ভাষায় আমাদিগকে আহ্বান করিবেন, আদেশ দান করিবেন, তখন আর কিছু না হউক আমাদের চৈতন্য হইবে...৷
আমাদের সেই গুরুদেব আজিকার দিনের এই উদভ্রান্ত কোলাহলের মধ্যে নাই৷ ...তিনি সমস্ত মত্ততা হইতে, মূঢ় জনস্রোতের আবর্ত হইতে, আপনাকে সযত্নে রা করিতেছেন...তিনি নিভৃতে শিা করিতেছেন এবং একান্তে চিন্তা করিতেছেন; আপনার জীবনকে মহোচ্চ আদর্শে অটল উন্নত করিয়া তুলিয়া চারি দিকের জনমণ্ডলীকে অল্যে আকর্ষণ করিতেছেন৷...অসাধ্য বটে, কিন্তু এ দেশের লোকের যিনি উন্নতি সাধন করিবেন অসাধ্যসাধনই তাঁহার ব্রত৷
রাজনীতির েেত্রও ধর্মীয় গুরুবাদ থেকে বের হতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ৷ ধর্ম তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে৷ এ অর্থে তাঁর চেতনা আধুনিক গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে অসংগতিপূর্ণ৷ তাঁর রাজনৈতিক নেতার আদর্শও ধর্মীয় গুরু বা সন্ন্যাসী, যিনি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে 'জনহীন দুর্গমস্থানে,' 'নানা জাতির নানা শাস্ত্র অধ্যয়ন'-এ সুদীর্ঘকাল লিপ্ত থেকে 'আত্মোন্নতিসাধন' করবেন৷ সামাজিক অনুশীলন এবং জনগণের জীবন-সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন আত্ম-উন্নয়নের এক ভাববাদী মতবাদের তিনি প্রবক্তা৷
এটা বাস্তব যে, ভারতের মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী তখনও তার নেতা সৃষ্টি করতে সম হয় নি৷ এই ভবিষ্যত্ নেতার এক প্রতিচিত্রই এখানে অঙ্কন করেছেন রবীন্দ্রনাথ৷ রবীন্দ্রনাথের কাঙ্তি এই নেতা ভারতবর্ষে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন গান্ধী৷ রবীন্দ্রনাথ এখানে যেমন বলেছেন, গান্ধী হয়ত অবিকল তা ছিলেন না৷ কিন্তু ধর্ম, প্রাচীন এতিহ্য, রণশীলতা এবং 'মূঢ় জনস্রোতের আবর্ত' তথা আন্দোলনকে প্রশমিত করার প্রশ্নে তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের কাঙ্তি নেতার প্রায় প্রতিমূর্তি৷ আজও গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ তাই বিদ্যমান ভারতীয় রাষ্ট্রের দুই প্রধানতম আদর্শগত স্তম্ভ৷
[ চলবে ]
তথ্যসূত্র
১২৬. অরবিন্দ পোদ্দার, প্রাগুক্ত, পৃ ৫৬
১২৭. নেপাল মজুমদার, প্রাগুক্ত, পৃ ৯১
১২৮. প্রগতি প্রকাশন, ভারতবর্ষের ইতিহাস, মস্কো ১৯৮৬, পৃ ৪৭৯ এবং সুপ্রকাশ রায়, বিদ্রোহী ভারত, কলকাতা, ১৯৮৯, পৃ ৭১-৭৫ থেকে গৃহীত তথ্যাদি
১২৯. অমর দত্ত, উনিশ শতকের শেষার্ধে বাঙলাদেশে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, কলকাতা ১৯৯৪, পৃ ২৬
১৩০. ঐ, পৃ ২৬
১৩১. ঐ, পৃ ২৬
১৩২. সুপ্রকাশ রায়, বিদ্রোহী ভারত, কলকাতা, ১৯৮৯, পৃ ৭৫
১৩৩. ভারতবর্ষের ইতিহাস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৮৬, পৃ ৪৭৮-৪৭৯ থেকে গৃহীত তথ্যাদি
১৩৪ সুকোমল সেন, ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস, কলকাতা ২০০৩, পৃ ৭৪ থেকে গৃহীত তথ্যাদি
১৩৫. সুপ্রকাশ রায়, ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস, কলকাতা, ১৯৭০, পৃ ১৯৪
১৩৬. সমর কুমার মলি্লক, আধুনিক ভারতের রূপান্তর: রাজ থেকে স্বরাজ: ১৮৫৭-১৯৪৭, কলকাতা, ২০০৪-২০০৫, পৃ ৯২
১৩৭. John Hobson, Imperialism, 1902, http://www.fordham.edu/halsall/mod/1902hobson.html ১৩৮. ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা এর দ্বিতীয় জার্মান সংস্করণের ভূমিকা, ২১ জুলাই ১৮৯২ তে লিখিত
১৩৯. জে. ডি. বার্নাল, ইতিহাসে বিজ্ঞান, প্রথম খণ্ড, কলকাতা ১৯৯৪, পৃ ৩৬৪
১৪০. লেনিন, 'সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর', মস্কো, ১৯৭৯, লেনিন নির্বাচিত রচনাবলী, পৃ ১০৩
১৪১. ঐ, পৃ ১০৪
১৪২. Nick Beams, World War 1, The breakdown of Capitalism, Part 3, http://www.wsws.org ১৪৩. R. Palme Dutt, India Today, Calcutta 1979, p 9১৪৪. ঐ, প্রাগুক্ত, p 9
১৪৫. অমলেশ ত্রিপাঠি, ভারতের মুক্তিসংগ্রামের চরমপন্থী পর্ব, কলকাতা ১৯৯১, পৃ ৫৮
১৪৬. R. P. Dutt, প্রাগুক্ত, p 308 ১৪৭. সমর কুমার মলি্লক, প্রাগুক্ত পৃ ৮৩
১৪৮. R. P. Dutt, প্রাগুক্ত, p 148১৪৯. বিপানচন্দ্র, মৃদৃলা প্রমুখ, পৃ ৫৬
১৫০. বিপানচন্দ্র, ভারতের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ ৫১১
১৫১. বিপানচন্দ্র, মুদুলা প্রমুখ, প্রাগুক্ত, পৃ ৫৭
১৫২. Sumit Sarkar, প্রাগুক্ত, পৃ ৮৭
১৫৩. ঐ
১৫৪. ঐ
১৫৫. ঐ, প্রাগুক্ত, পৃ ১১
১৫৬. ঐ, প্রাগুক্ত, পৃ ৭২
১৫৭. R. C. Majumdar, History of the Freedom Movement of India, vol 1, Calcutta, 1997, p 298১৫৮. অমলেশ ত্রিপাঠি, স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস, কলকাতা, ১৩৯৮, পৃ ৩৭
১৫৯. জওহরলাল নেহেরু, আত্মচরিত, কলকাতা, ১৯৯১, পৃ ১০-১২
১৬০. Shekhar Bandyopadhyay, প্রাগুক্ত, পৃ ২৪৫
১৬১. বিনয় ঘোষ, বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, ঢাকা, জুলাই ২০০৩, পৃ ২৬১
১৬২. Percival Spear, প্রাগুক্ত, পৃ ১৬৭
১৬৩. Sumit Sarkar, প্রাগুক্ত, পৃ ২০
১৬৪. বিবেকনন্দ রচনাসমগ্র, কলকাতা ১৯৯৪, দ্বিতীয় খন্ড, ভারতের ভবিষ্যত্, পৃ ২৩৭-২৪০
১৬৫. ঐ, অধ্যাপক ম্যাঙ্মুলার প্রসঙ্গে, পৃ ৬০৯
১৬৬. Sumit Sarkar, প্রাগুক্ত, পৃ ৭১