চিকিত্‍সা
রোগনিরাময় কলা, আধুনিক চিকিত্‍সাবিদ্যার বিবর্তন ও ক্যান্সার
মূল এ বি এম ফজলুল করীম

আধুনিক চিকিত্‍সাবিদ্যাকে, বিশেষ করে ক্যান্সার বিষয়ে চিকিত্‍সাবিদ্যার উদ্ভব ও বিবর্তনকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়৷ বিষয়টিকে আমি কিভাবে দেখি এ প্রবন্ধটি হচ্ছে তার উপস্থাপন৷ আমরা সবাই জানি, প্রথম যুগে চিকিত্‍সা নেবার জন্য মানুষ ধর্মগুরুদের শরণাপন্ন হতো৷ যিশু খ্রিস্ট এর সর্বোত্তম উদাহরণ৷ ধমর্ীয় বিশ্বাসের অসাধারণ প্রশান্তিদায়ক শক্তি এবং সম্ভবতঃ নিরাময়ের মতাও রয়েছে, বিশেষত মানসিক রোগীদের েেত্র৷ এমনকি বর্তমানেও প্রচলিত চিকিত্‍সা ব্যর্থ হলে ধমর্ীয় বিশ্বাস অনেক রোগীরই মনোবল যোগাতে পারে৷
কয়েক বছর আগে আমেরিকার বিখ্যাত গ্রীন জার্নাল Cancer এ-অন্তত পাঁচ বছর আগে ক্যান্সার থেকে আরোগ্যলাভ করেছেন-এমন সব রোগীদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়৷ এর পূর্বে এই ধরনের বিজ্ঞান ও সংখ্যাভিত্তিক নিবন্ধ সারা বিশ্বেই খুব কম প্রকাশিত হয়েছে৷ অনেক রকম বিশ্লেষণের পর লেখকবৃন্দের উপসংহার হল, আরোগ্যলাভ-করা সব রোগীরই কিছু বৈশিষ্ট্য একই রকমের, যেমন এরা সবাই আশাবাদী, সহযোগিতাপ্রবণ এবং উচ্চ মানসিক ও নৈতিক মনোবলের অধিকারী৷ লেখকগণ উপসংহারে এই অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন যে, পৃথিবী অধিকতর বাসযোগ্য স্থানে পরিণত হতো যদি এর সমস্ত অধিবাসী অন্তত একবার ক্যান্সার থেকে আরোগ্য লাভ করতো৷ অনুন্নত দেশের জন্য এই কথাটা আরো বেশী প্রযোজ্য৷ তবে ক্যান্সারের মতো রোগকে জয় করেছে যারা, তারা বেশীর ভাগই ধমর্ীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী৷ ক্যান্সার ছাড়াও মারাত্মক প্রায়-অনিরাময় রোগে ভুগে যারা নিরাময় লাভ করে, তাদের প্রায় সবাই উচ্চ মানসিক ও নৈতিক মনোবলে বলীয়ান এবং ধর্মবিশ্বাসী হয়৷ এদের সবারই থাকে যৌক্তিক আশাবাদ৷ প্রায় সব ধর্মের মূলনীতিই হল, মানুষের মনমানসিকতায় কিছুটা যৌক্তিক অনুভূতি জাগিয়ে তোলা৷
ক্যান্সার রোগী দেখা আমার প্রতিদিনের কাজ৷ আমি রোগীদের মধ্যে আশাবাদ জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করি যাতে সমস্ত আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চিকিত্‍সাব্যবস্থার বাইরেও তারা তাদের আশাবাদ ও বিশ্বাস থেকে কিছুটা উপকৃত হতে পারে৷ এই অভ্যাসটা আমার বহুদিনের৷ প্রায় ত্রিশ বত্‍সরের কর্মজীবন কেটেছে বস্তুবাদী ইউরোপে৷ আমি সেখানে বা এখানেও প্রায়ই পরিসংখ্যান দিয়ে রোগীদেরকে বলার চেষ্টা করি, আপনার নিরাময়ের সম্ভাবনা শতকরা বিশ বা পঞ্চাশ বা আশি বা পঁচানব্বই ভাগ৷ কিন্তু সবার উপরে বসে আছেন একজন, যিনি ঠিক করেন আপনি কি ভালো হয়ে যাওয়ার দলে পড়বেন, না বাকি অনিরাময়ের ভাগে পড়বেন; সেটা আশি, পঞ্চাশ, বিশ বা পাঁচ ভাগ এর যে কোন একটাতে হতে পারে৷ আমার প থেকে চেষ্টার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছতে হবে, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমার কোনো প্রতিশ্রুতি বা গ্যারান্টি দেবার মতা নেই৷ বিগত বছরগুলোতে আমি শুনেছি, আমার ইউরোপীয় রোগীদের একাংশের মধ্যে হলেও আমি বিশ্বাস ও আশার সঞ্চার করতে পেরেছি৷ বাংলাদেশে তো প্রায় সবাই ধর্মবিশ্বাসী এবং তারা সর্বশক্তিমানের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে প্রায় পুরোমাত্রার নিয়তিবাদী বা fatalist
চিকিত্‍সাবিজ্ঞানের বিকাশের প্রশ্নে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, চিকিত্‍সকদের হাতে চিকিত্‍সার কাজটি কিন্তু শুরু হয়নি৷ কিছু অঞ্চলে তা শুরু হয়েছিল ধমর্ীয় পুরোহিতদের হাতে৷ কিছু অঞ্চলে ডাকিনীবিদ্যা বা ভুডু পদ্ধতিতে চিকিত্‍সা দেওয়া হতো৷ এখনো কোথাও কোথাও এসবের চর্চা হয়৷ যারা এ-চর্চা করেন তাঁদের সবারই একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এঁদের রয়েছে চমত্‍কার communication বা যোগাযোগ-স্থাপনের মতা৷ এঁরা সহজেই রোগীদের আস্থা অর্জন করে সম্মানভাজন হতে পারেন৷ তাঁদের প্রশান্তিদায়ক ব্যক্তিত্ব রোগীর জন্য নিরাময়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে৷ আসলে এসব বৈশিষ্ট্যই চিকিত্‍সকদের সাধারণ গুণ হওয়া উচিত৷ আজকের যুগের চিকিত্‍সা শাস্ত্রে communication বা চিকিত্‍সকের প েরোগীদের আস্থা অর্জনকারী যোগাযোগ অত্যাবশ্যক৷ বাংলাদেশে এর অভাব সহজেই ল্য করা যায়৷ অথচ আশেপাশের দেশের চিকিত্‍সকরা একই ধরনের বা কখনো কখনো আরো নিম্নমানের চিকিত্‍সা দিয়েও রোগীদের আস্থা অর্জন করেন৷ এর প্রধান কারণ এসব বিদেশী চিকিত্‍সকদের communication -এর মতা আমাদের দেশের চিকিত্‍সকদের চেয়ে অনেক বেশী৷
The Art of Healing অথবা রোগনিরাময়ের কলা সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে নিরাময়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিবর্তিত হয়েছে৷ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত স্বাস্থ্যবিধির নীতি মানুষ আবিষ্কার করেছে বেশ কয়েক যুগ আগে৷ তবে সেগুলো বিবর্তিত হচ্ছে নিয়মিত৷ এর মূল কারণ হচ্ছে রোগের উত্‍স সম্পর্কে মানুষের বৈজ্ঞানিক ধারণা জন্ম নিয়েছে৷ প্রথমে জানা গেল অনেক রোগের কারণ হচ্ছে জীবাণু৷ এল প্রতিষেধক এবং একই সাথে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের আর্থিক মতা৷ টিকা দিয়ে রোগ নিবারণ করা যায় এটা প্রমাণিত হল৷ সময়ের সাথে সাথে জীবাণু ধ্বংসের জন্য আবিষ্কার হলো অ্যান্টিবায়োটিক৷ শুধু জীবাণু নয়, খাদ্যে কিছু উপাদানের অভাবেও রোগ হতে পারে৷ আবিষ্কার হল ভিটামিন৷ ভিটামিন প্রয়োগে কিছু রোগ নিবারণ এবং নিরাময় করা গেল৷ এই নিয়মগুলো ক্যান্সারের চিকিত্‍সাতেও বিবর্তন এনেছে৷ প্রথমে সার্জারি, পরে রেডিয়েশন এবং সবশেষে কেমোথেরাপির সহায়তায় নিরাময় সংখ্যা বেশ বৃদ্ধি পায়৷ বর্তমানে সববিষয়েই বিবর্তন ও বিপ্লবী পরিবর্তন এসেছে৷ তবে প্রথমে কেমো, পরে সার্জারি ও সবশেষে প্রয়োজনবোধে রেডিয়েশন দেওয়ায় শুধুমাত্র রোগ নিরাময় সংখ্যাই বাড়েনি, তার সাথে কমেছে রোগীর ব্যথাবেদনা, তাত্‍ণিক বা অনেক পরের পাশর্্বপ্রতিক্রিয়া, জটিলতা এবং Sequelae;সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উন্নত হয়েছে রোগীদের জীবন যাত্রার মানে বা quality of life -এ৷
বিকাশের এ পর্যায়ে চিকিত্‍সাবিজ্ঞানীরা আত্মসমালোচনা শুরু করলেন৷ সবেেত্রই সংখ্যাভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ চর্চা শুরু হয়৷ সকল মানদণ্ডকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়৷ তুলনামূলক পরীণপদ্ধতির মাধ্যমে অর্থাত্‍ Randomized Controlled Trial এর সহায়তায় অধিকতর উন্নত চিকিত্‍সা পদ্ধতির অনুসন্ধান শুরু হয়৷ এ পর্যায়টি এখনো শেষ হয় নি৷ এই পদ্ধতির মূল ল্য হল, একটি রোগের প্রায় সব বিতর্কের অবসান ঘটায়-এমন উত্তম চিকিত্‍সা নির্ণয় করা৷ চিকিত্‍সাবিদ্যা প্রায়ই বিতর্কিত হয় যখন একটি রোগের চিকিত্‍সায় দুটো প্রায় সমক ফল দাবি করা হয়৷ একদল বলতে পারেন তাঁদের চিকিত্‍সা পদ্ধতিটাই সবচেয়ে ভাল, কিন্তু অন্য চিকিত্‍সকদল সেটা নাও মানতে পারেন৷ পরীা করেই কোন চিকিত্‍সা সর্বোত্তম, সেটা বিচার করা হয়৷ একজনকে এক চিকিত্‍সা আরেকজনকে অন্য চিকিত্‍সা দিয়ে বছরের পর বছর বিভিন্ন হাসপাতালে এর ফলাফল কম্পিউটারের সাহায্যে বিচার-বিশ্লেষণ করে অবশেষে তা প্রকাশ করা হয়৷ আমি নিজে দু'টি Randomized Controlled Trial শুরু করেছিলাম ১৯৮৩ সালে৷ ১৯৯৬ সাল থেকে এই চিকিত্‍সা দু'টির ফলাফল প্রকাশিত হতে থাকে; এই বছরও অর্থাত্‍ ২০০৬ সালেও একটা চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে৷ মোট এগারটি নিবন্ধ এই রিসার্চগুলোর উপর ছাপা হয়েছে৷
এই trial গুলোতে ইউরোপের ২৯টি দেশের চিকিত্‍সাবিজ্ঞানীরা অংশ নিয়েছেন৷ এই বিষয়ে এই পদ্ধতির ফলে চিকিত্‍সা শাস্ত্রে Evidence-Based Medicine অর্থাত্‍ সা্য প্রমাণভিত্তিক সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিত্‍সা পদ্ধতি নির্ণয়ের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন শুরু হয়েছে৷ ভবিষ্যতে Evidence-Based Medicine বা EBM -এর ফলে একরোখা চিকিত্‍সকদের একগুঁয়েমী চিন্তা, ধ্যানধারণা বা কম ফলদায়ক চিকিত্‍সা পদ্ধতির অবসান ঘটবে বলে আশা করা যাচ্ছে৷
সামপ্রতিক কালের আরেকটা খুব উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় প্রবণতা হচ্ছে, রোগীদের জীবনযাপনের মান পর্যালোচনা৷ একই রোগের দু'টি ভিন্ন বিতর্কিত চিকিত্‍সা থাকতে পারে৷ দু'টি কার্যকারিতার মধ্যে হয়ত তেমন কোন পার্থক্য নেই৷ এেেত্র চিকিত্‍সকদের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে চিকিত্‍সার পর রোগীদের quality of life -এর মান৷ চিকিত্‍সকদের বর্তমান প্রবণতা হল শুধু নিরাময় নয়, এর সাথে রোগ উপশমের পর জীবনযাত্রার মানটা কেমন দাঁড়াবে তার উপর গুরুত্ব দেয়া৷ একটা উদাহরণ দিলে ভালভাবে এই বক্তব্যটি উপলব্ধি করা যাবে৷ আগেই আমার নিজের দুটি Randomized Controlled Trial এর কথা বলেছি৷ এর একটাতে প্রায় দশ বছর পর দেখা গেল যে, দুটি চিকিত্‍সাই ফলের দিক থেকে সমক৷ তবে একটি চিকিত্‍সার ফল অন্যটির মতো হলেও রোগীদের জীবনযাত্রার মান অনেক ভাল৷ এর অর্থ হলো ফলাফল এক হলেও জীবনযাত্রার মান বা quality of life -এর উন্নয়নে যে-চিকিত্‍সা ভালো সেই চিকিত্‍সাটিই রোগীদের জন্য সর্বোত্তম৷
নিজের দেশের কথা বলি৷ আমাদের এ দেশে এটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা যে, একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্‍সক কোনও রোগীকে সাধারণত কোনও আলোচনা ছাড়াই একটি চিকিত্‍সাপদ্ধতি গ্রহণ করতে উপদেশ দান করেন৷ অথচ শুধু রোগী নয়, তার সঙ্গে-আসা পরিবারের সদস্যদের কাছেও চিকিত্‍সাপদ্ধতিটির বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করা হয় না৷ অতীতে উন্নত বিশ্বেও প্রায় একই নিয়ম চালু ছিল৷ ডাক্তারের গুরুবাক্য সবাই নত মাথায় মেনে নিত৷ কয়েক বছর আগেও স্তন ক্যান্সার চিকিত্‍সায় সুপার-র্যাডিকেল সার্জারি ছিল চিকিত্‍সার প্রধান উপায়৷ আরিক অর্থে বুকের অর্ধেক অংশ কেটে ফেলা হতো৷ গর্বিত শল্যচিকিত্‍সক বিশাল বক্তৃতা ক েএকটা রোগীর শুধু স্তন নয়, বুকের অনেকাংশ কেটে ফেলে দিয়ে তার স্লাইড বা ছবি শ্রোতাদের দেখিয়ে নিজের কৃতিত্ব জাহির করতেন৷ এই চিকিত্‍সাতে রোগীটির মানসিক অবস্থা কি হলো তা কখনই আলোচিত হত না৷ তার জীবনযাত্রার মান কতটা নিম্নগামী হলো তার কোনও হিসাবই রাখা হতো না৷
অথচ বর্তমানে বক্তাদের বক্তৃতায় স্থান পেয়ে থাকে অপারেশনের পর প্রায় স্বাভাবিক স্তনের ছবি৷ এমনকি একবার বা দু'বার ছাপা হয়েছে : একটি মা ও সন্তানের ছবি৷ মা চিকিত্‍সার পর তার শিশুকে স্তন পান করাচ্ছেন৷ বর্তমানে চিকিত্‍সকের প্রধান ল্য দ্রুত রোগনির্ণয় এবং শল্যচিকিত্‍সার দ্বারা শুধুমাত্র স্তনের ক্যান্সার ও তার চারপাশের সামান্য অংশ অপসারণ করা৷ এর ফলে রোগীর অঙ্গহানি হয় না৷ জীবনধারণের মানও উন্নত থাকে৷ যেসব বিশেষজ্ঞ শল্যচিকিত্‍সক পুরানো র্যাডিকেল বা সুপার-র্যাডিকেল অপারেশনের পপাতী, পরিণামে তাঁরা রোগী হারাতে শুরু করেন৷ যেসব শল্যচিকিত্‍সক অঙ্গ সংরণ করে অপারেশন করছেন রোগীরা তাঁদেরকেই বেশী পছন্দ করছে৷ অবশ্য এটা উন্নত বিশ্বের কথা৷ দু'টি পদ্ধতির ফলাফল ও কার্যকারিতা একই রকম, তবে জীবনযাত্রার মান ছোট অপারেশনের ফলে অনেক উত্তম৷ এ বিষয়ে আমার একটি পুস্তিকা ১৯৯৩ সালে আমস্টার্ডাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে৷
গত দশ বত্‍সর যাবত্‍ আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি যাতে আমাদের দেশের রোগীদের জন্য অঙ্গনাশকতামূলক চিকিত্‍সা বন্ধ হয়৷ মনে হয় তাতে কিছুটা সফল হয়েছি৷ তবে দুঃখের বিষয়, এখনও কিছু কিছু চিকিত্‍সক এই পদ্ধতি না-মেনে পুরনো পদ্ধতিই অনুসরণ করেন৷ তাঁদের বক্তব্য হল, দ্রুত ছড়িয়ে-পড়া স্তনের ক্যান্সারের জন্য অঙ্গহানির চিকিত্‍সার ফল বেশী ভাল৷ কথাটা একেবারে মিথ্যা নয়৷ তবে এঁরা ভুলে যান যে, কেমোথেরাপির সাহায্যে ক্যান্সারটিকে অনেক ছোট করা যায় এবং তারপর ছোট অপারেশন করা সহজ হয়৷ তাতে অনেক কম অঙ্গহানি হতে পারে এবং রোগ ছড়িয়ে যাবার সম্ভাবনাও কমে যায়৷
বর্তমানে উন্নত দেশের রোগী এবং তাদের পরিবার quality of life  কে আরো বেশী গুরুত্ব দিয়ে চিকিত্‍সকের ভূমিকা বিষয়ে অধিকতর সচেতন৷ তাঁরা সবকিছু আগেই জানতে চান৷ আধুনিক চিকিত্‍সাবিদ্যার বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে রোগীর সক্রিয় অংশগ্রহণ৷ এর অর্থ হলো, বর্তমানে উন্নত দেশে সমাজের অলিখিত একটি সংবিধান রচিত হয়েছে৷ এ সংবিধান চিকিত্‍সক সমাজকে আরো বেশী যোগাযোগ স্থাপনে পারদশর্ী হতে নির্দেশ দেয়; হতে বলে আরো মনোযোগী এবং রোগীদের চাহিদার ব্যাপারে সতর্ক৷ এর ফলে আজ চিকিত্‍সাপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে৷
বর্তমানে প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত৷ তবে নতুন নতুন আবিষ্কৃত প্রযুক্তি খুবই ব্যয়বহুল৷ এই ব্যয়ের কারণটি চিকিত্‍সাবিজ্ঞানের বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ উন্নত দেশের সরকারও এ খরচ যোগাতে ব্যর্থ হচ্ছে৷ উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, এঙ্-রে-এর জন্য খরচ ১০ ডলার, সিটি-স্ক্যান-এর জন্য ২০০ ডলার এবং এম আর আই করতে ৪০০ ডলার প্রয়োজন৷ চিকিত্‍সার জন্য এই ৩০ বা ৪০ গুণ বর্ধিত খরচ রোগী ও চিকিত্‍সক উভয়কেই বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে এবং অনেক বেশী হারে রোগী আরোগ্য লাভ করছে৷ আপাতদৃষ্টিতে এই ধরনের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়বৃদ্ধির কারণে সরকার একে প্রায় অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছে৷ বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা ও প্রশাসক অনেক সময় মনে করে যে, ৮০ বছর বয়স্ক ক্যান্সার বা তেমন ধরনের মারাত্মক রোগীকে নিরোগ করা সম্ভব হলেও গগনচুম্বী স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানো প্রয়োজন৷ এদের ধারণা তাতে রোগীর মৃতু্য হলেও চিকিত্‍সকদের উচিত অন্যদিকে মনোনিবেশ করা৷ চিকিত্‍সকরা সবাই এই মতবাদের বিরুদ্ধাচরণ করেন৷
কিছুকাল আগেও চিকিত্‍সকরা চিরায়ত চিকিত্‍সা পদ্ধতির অর্থাত্‍ রোগীর শয্যার পাশে বসে চিকিত্‍সাসেবা দেবার তুলনায় বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ও কম্পিউটারের উপর বেশী নির্ভরশীল ছিলেন৷ রোগের ইতিহাস মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং রোগীকে যত্নের সাথে পরীা-নিরীা করাকে আধুনিক চিকিত্‍সকরা সনাতন পদ্ধতি বলে ভাবতেন৷ কিছু কিছু চিকিত্‍সক রোগীকে পূর্বেই-প্রস্তুত কাগজে রক্ত, মূত্র, এঙ্-রে, সিটি-স্ক্যান, এম আর আই ইত্যাদি পরীা করানোর জন্য উপদেশ দিতেন এবং এখনও দেন৷ তবে বর্তমানে বেশীর ভাগ চিকিত্‍সকই রোগী বা রোগিনীর পুরো ইতিহাস শোনা ও রেকর্ড করার দিকে নজর রাখতে পছন্দ করেন৷ জটিল রোগ-নির্ণয়ের জন্য আধুনিক চিকিত্‍সক ও চিকিত্‍সাবিজ্ঞানীদের হাতে অবশ্যই আধুনিক ব্যবস্থা থাকতে হবে৷ পাশাপাশি পুরো পরীা-নিরীার খরচের বিষয়টিও মাথায় রাখা চাই৷ এটিই হল কার্যকর মূলধনের সাশ্রয়ী ব্যবহার, সকল উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্যসেবার বিবর্তনের একটি ধারা৷ এভাবে কতর্ৃপ ও সরকারী মন্ত্রণালয়ের সংস্পর্শে এসে চিকিত্‍সকরা management বা ব্যবস্থাপনাকে সাহায্য করতে পারেন৷ তবে এর বিরুদ্ধে আবার অনেক চিকিত্‍সকই সোচ্চার৷ তাঁরা ম্যানেজমেন্টের দিকটা সরকারের হাতে ছেড়ে দিয়ে তাঁদের প্রধান কাজ অর্থাত্‍ রোগ-নিরাময়ের দিকেই অকান্ত পরিশ্রম করে যেতে চান৷
ডাক্তারের কাজ রোগীকে নিরাময় করা৷ ডাক্তারদের এই মন-মানসিকতা বিদেশে যথেষ্ট প্রাধান্য পেলেও সরকার ও স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয় এর বিপ৷ে চিকিত্‍সক এবং রোগীর মধ্যে মানবিক সমন্বয় ছাড়া রোগীর কল্যাণ ও সন্তুষ্টি লাভ অসম্ভব৷ সবকিছুই হচ্ছে রোগীদের জন্য, এ সত্যটি উপলব্ধি করতে হবে সরকার, হাসপাতাল, চিকিত্‍সক এবং স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট সকল কমর্ীকে৷ এ প্রসঙ্গে কয়েক দশক আগে মহাত্মা গান্ধীর একটি উক্তি অত্যন্ত সময়োপযোগী৷ এক চিকিত্‍সকের জবানীতে তিনি তাঁর মনোভাব অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন৷ আমি এই উক্তিটি অনেক সময় প্রচার করি : "আমাদের অঙ্গনে একজন রোগী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাগত, তিনি আমাদের উপর নির্ভরশীল নন, আমরা তাঁর উপর নির্ভরশীল, তিনি আমাদের কাজের অন্তরায় নন, বরং তিনিই আমাদের কাজের উদ্দেশ্য, তিনি আগন্তুক নন বরং আমাদের পেশার অংশ, সেবা করে আমরা তাকে অনুগ্রহ করছি না, সেবা করার সুযোগ দিয়ে তিনিই আমাদেরকে ধন্য করছেন৷"
এই দর্শন আধুনিক চিকিত্‍সকদের চিকিত্‍সার প্রধান উদ্দেশ্য বোঝার জন্য যথার্থ৷ চিকিত্‍সাবিজ্ঞান বর্তমানে সামপ্রতিক আবিষ্কারের সমস্ত উপকরণ, যেমন আধুনিক সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও পরিসংখ্যান সূত্রাবলী ব্যবহার করার জন্য উদগ্রীব৷ কিন্তু নিরাময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিটি ভুললে চলবে না৷ চিকিত্‍সকদেরকে অবশ্যই healer বা ভিষকের গুণাবলী অর্জন করতে হবে৷ একজন চিকিত্‍সক যখন প্রযুক্তি, সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও পরিসংখ্যানের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হন আসলে তখন তিনি নিজের অস্তিত্বই ভুলে যান৷ ভুলে যান যে তিনি একজন চিকিত্‍সক; তাঁর প্রধান কর্তব্য রোগীকে নিরাময় করা এবং ল্য রাখা যে, নিরাময়ের পর রোগীর বা রোগিনীর জীবনযাত্রার মান যাতে উঁচু থাকে৷ এসময়ে চিকিত্‍সকের ভেতর থাকা প্রয়োজন সমমর্মিতা, ধৈর্য্য ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত চিকিত্‍সার জ্ঞান ও দতা৷ বিশ্বের সাথে তাল রেখে সর্বণ জানতে হবে কোন চিকিত্‍সা তাঁর রোগীদের জন্য সর্বোত্তম৷ আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একটু পরিশ্রম করে (টাকার জন্য রাত-দিন রোগী না-দেখে) কিছুটা পড়াশুনা করলেই সেটা সম্ভব৷
ইনফরম্যাটিঙ্, পরীালব্ধ তথ্য এবং Evidence-Based Medicine -এর উপাত্ত নিয়ে পর্বতপ্রমাণ কাগজের স্তূপ বা কম্পিউটারের ফলাফল জমে ওঠে৷ এতে ক্রমশ চিকিত্‍সকের মনের ওপর প্রবল চাপের সৃষ্টি হয়৷ একসময় তিনি ভুলে যেতে পারেন তাঁর গবেষণার বিষয় কি, মানুষ না ইঁদুর৷ আমি কিন্তু 'জ্ঞানের জন্য পরীণ' এই পদ্ধতির বিরোধী নই৷ বর্তমানে বিদ্যমান বিভিন্ন চিকিত্‍সা পদ্ধতির মধ্যে কোনটি সবচেয়ে উত্তম তা জানার জন্য ব্যাপক পরিসরে র্যানডোমাইজড ট্রায়াল-এর বিকল্প নেই৷ কোনটি ভাল তা নির্ধারণের জন্য গুরুত্ব আরোপ করতে হবে রোগীর জীবনধারণের মানের উপর৷ এভিডেন্স-বেইজড মেডিসিন-এর গুরুত্ব এ ব্যাপারে অপরিসীম৷ সব বিষয়ে সর্বোত্তম চিকিত্‍সা পদ্ধতির objective অথবা নৈর্ব্যক্তিক উত্তর জানতে হয়ত আরো কয়েক দশক সময় লাগতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যত্‍ প্রজন্মের চিকিত্‍সাবিজ্ঞানীদেরকে অবশ্যই জানতে হবে এই প্রশ্নের উত্তর, অর্থাত্‍ সবচেয়ে ভাল চিকিত্‍সা কোনটি৷ আমাদের যা করতে হবে তা হল পরীামূলক চিকিত্‍সাবিজ্ঞানের মধ্যে দিয়ে এই প্রশ্নের মূল ও সঠিক উত্তর জানা৷ তাহলেই সম্ভব সমাজের চোখে চিকিত্‍সকদের সম্মান পুনরুদ্ধার করা৷
বর্তমান পৃথিবীর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক গোলযোগের মধ্যেও চিকিত্‍সকদের এমনভাবে চলতে হবে যেন তাঁদেরকে শুধু ফি-সংগ্রাহক বলে মনে না হয়৷ একজন মহত্‍ ভিষকের গুণাবলী তাঁদেরকে অর্জন করতে হবে৷ মহাত্মা গান্ধীর বাণী, উন্নত মনমানসিকতা ও মানুষকে সহায়তা করার শপথ হয়ত আমাদেরকে এ-ল্য অর্জনে সাহায্য করবে৷

ইংরেজী থেকে অনুবাদ মাহবুবুর রহমান ও আমিনুর রহমান

নেদারল্যান্ডসের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের বিশেষজ্ঞদের বার্ষিক সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ থেকে (১৯৯৮)



  © Notun Diganta 2007.
All Rights Reserved
Powered by headoffice