সচেতনতার রহস্য
এ. এম. হারুন অর রশীদ

রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'বাংলাভাষা পরিচয়' প্রবন্ধে লিখেছেন,
মানুষ যেমন জানবার জিনিস ভাষা দিয়ে জানায়, তেমনি তাকে জানাতে হয় সুখ-দুখ, ভালো-লাগা মন্দ-লাগা, নিন্দা-প্রশংসার সংবাদ৷ ভাবে-ভঙ্গীতে, ভাষা-হীন আওয়াজে, চাহনিতে, হাসিতে, চোখের জলে এইসব অনুভূতির অনেকখানি বোঝানো যেতে পারে৷ (রবীন্দ্র রচনাবলী, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ ৫৭৬)

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই ভালো-লাগা, মন্দলাগা ইত্যাদি ব্যাপারগুলি কেমন করে ঘটে? সচেতনতা বা কনসাসনেস বোধহয় বিজ্ঞানের সবচেয়ে দুর্জ্ঞেয় সমস্যা যাকে বলা হয়েছে জীববিজ্ঞানের জটিলতম দিগন্ত৷ সমস্যাটা এই, মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে স্নায়বিক প্রক্রিয়াসমূহ কেমন করে চেতনার সৃষ্টি করে তা জানা খুবই দুরূহ৷ যে অসংখ্য উদ্দীপনা আমাদের মস্তিষ্কে অনবরত হাজির হয়, যেমন শিশুর হাসি, গোলাপের গন্ধ অথবা বেটোফেনের প্যাস্টোরাল সিম্ফনির সুর-লহরী, এসব কিছু স্নায়বিক-জীববৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার এক অবিশ্বাস্য পরম্পরা সৃষ্টি করে যা চূড়ান্ত পর্যায়ে একটা একীভূত, সুশৃঙ্খল, সুসমঞ্জস, অভ্যন্তরীণ, ব্যক্তিগত সচেতন অবস্থা বা সংবেদনার জন্যে দায়ী৷
এখন প্রশ্ন হলো আমাদের মস্তিষ্কের গ্রাহকযন্ত্রে বহিরাগত উদ্দীপনার উপস্থিতি এবং সবশেষে সচেতনতার অনুভূতি এই দু'য়ের মধ্যে ঠিক কি কি ঘটে? অন্তর্বতর্ী প্রক্রিয়াসমূহ থেকে ঠিক কিভাবে 'সচেতনতা' উদ্ভূত হয় যার জন্যে আমরা নিজেদের মানুষ বলে পরিচয় দেই? শুধু অনুভূত অবস্থাসমূহের ব্যাপার এটা নয়, যা রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এর মধ্যে অন্তভর্ুক্ত রয়েছে আরো অনেক স্বতঃপ্রবৃত্ত কার্যাবলী এবং অন্তনর্ীল সব প্রক্রিয়া, যেমন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য দুশ্চিন্তা অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেতা৷ আমাদের জাগ্রত জীবনের সব মুহূর্ত_বহুকাল আগে দেখা সুন্দরী নারীর মুখচ্ছবি অথবা অতি সমপ্রতি এক বঙ্গসন্তানের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি নিয়ে আনন্দবোধ_এসব কিছুই সৃষ্টি হয় মস্তিষ্কের অসংখ্য নিউরনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে৷ আমরা যতদূর জানি তা হলো এই যে প্রাসঙ্গিক ঘটনাগুলি ঘটে ুদ্রাতিুদ্রের জগতে_সাইনাপ্সের জগতে, নিউরন-স্তবকের জগতে, কোষগুচ্ছের জগতে৷ আমাদের সচেতন জীবনের সবকিছু ঐ অতিদূরবতর্ী ুদ্রাতিুদ্রের নানা প্রক্রিয়ায় সংগঠিত হয়, কিন্তু কেমন করে তা ঘটে সে-সম্বন্ধে আমাদের ধারণা নিতান্তই অস্পষ্ট৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ অধ্যাপক, প্রতিশ্রুতিশীল, মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী প্রিয় বন্ধু গিয়াসউদ্দীন আহমেদের স্মৃতির উদ্দেশে

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আছে,
আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ
চুনি উঠল রাঙা হয়ে৷
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পুবে পশ্চিমে৷
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম 'সুন্দর',
সুন্দর হল সে৷

তাই কি? আমি গোলাপকে সুন্দর বলতেই সে সুন্দর হয়ে গেল এটা কি বিজ্ঞান স্বীকার করে? বোধহয় চেতনার এই দুর্বোধ্যতার জন্যেই আইনস্টাইনের সঙ্গে কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছিলেন,

সত্য যা সর্বজনীন সত্তার সঙ্গে অঙ্গীভূত তা আসলে মানবিক, তা না হলে আমরা ব্যক্তি হিসেবে যা সত্য বলে বুঝতে পারি তাকে কখনও সত্য বলতে পারি না৷ অন্তত যে-সত্যকে বৈজ্ঞানিক সত্য বলা হয় এবং যে-সত্যে শুধু যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পৌঁছান যায়, অন্যবক্তব্য বা চিন্তার আনুষঙ্গিকতা যা মানবিক, সেই সত্য বলা যায় না৷ (আইনস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথের সাাত্‍কার, নিউইয়র্ক টাইমস, ১০ আগস্ট ১৯৩০)

রবীন্দ্রনাথ এখানে মানবিক সত্য এবং বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা বলছেন এবং বলছেন যে, মানবিক সত্য সর্বজনীন সত্তার সঙ্গে জড়িত_এসব কথার অর্থ কি? মনে হয় এজন্যেই দার্শনিকেরা প্যানসাইকিজম বা সর্বব্যাপী মনস্তত্বের কথা বলেন যেখানে সব কিছু ওই সর্বজনীন চেতনার অংশীদার৷ আধুনিক গবেষণা অবশ্য বলে যে মনের অন্তর্নিহিত কোন বিশেষ বস্তু বা স্থান সুনির্দিষ্ট করা যায় না৷ আসলে মন বলে যদি সত্যিই কিছু থেকে থাকে তবে তা রাসায়নিক মৌলিক পদার্থ দিয়েই তৈরী, যেমন কার্বন, হাইড্রোজেন, অঙ্েিজন, নাইট্রোজেন, গন্ধক, ফসফরাস_যার সঙ্গে রয়েছে কিছু বিরল ধাতুর সংমিশ্রণ৷ মস্তিষ্কের সংগঠনে এমন কিছু নেই যাকে আমাদের মানসিক প্রক্রিয়ার মূল উত্‍স বলে চিহ্নিত করা যায়৷
যা সত্যিকারের অনন্যসাধারণ এবং তুলনাহীন তা হল আমাদের মস্তিষ্কের নিখুঁততম সংগঠন৷ উল্লেখিত ঐসব অতিপরিচিত মৌলিক পদার্থ তৈরী করে অবিশ্বাস্য জটিল সব অণু যা দিয়ে তৈরী জটিলতর সব সংগঠন এবং এই সব সংগঠনই রয়েছে আমাদের জীবন্ত সব টিসু্য বা কলার অসংখ্য কোষের কন্দরে কন্দরে৷ মানুষের মত এমন এক জটিলতম জীবন্ত সংগঠনের অভ্যন্তরে রয়েছে প্রায় ২০০ ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মৌলিক কোষ৷ আবার ঐ সব কোষেরই একটা বিশেষতম এবং অনন্যসাধারণ কোষ হল স্নায়ু-কোষকণিকা বা নিউরন৷ এই নিউরন স্নায়ুকোষকণিকা তিনটি ব্যাপারে অসাধারণ_প্রথমত এর পরিবর্তনশীল আকৃতি, দ্বিতীয়ত এর বৈদু্যতিক এবং রাসায়নিক কার্যপদ্ধতি এবং তৃতীয়ত এর অপূর্ব সংবেদনশীলতা৷ কোন এক কোষ-জালির একটি নিউরন কিভাবে অন্য এক নিউরনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে তার নির্ধারিত কাজ করে আমাকে আপনাকে সংবেদনশীল মানুষে পরিণত করে তা চিন্তা করলেও স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়৷
কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিক কিভাবে কাজ করে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা এখনও সম্ভব নয়৷ অবশ্য মোটামুটি একটা ধারণা দেয়া যায়৷ যেকোন বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখের রেটিনা বা অপিটের আলোকসংগ্রাহক কোষে আঘাত করে৷ এখানেই থাকে সেই বিখ্যাত 'দণ্ড এবং মোচাকার কোষ' বা 'রড অ্যান্ড কোণ' যা দিয়ে তৈরী হয় অপিট কোষের পাঁচটি স্তর৷ এর প্রথমটি থেকে সংকেতটি অগ্রসর হয়ে যায় অন্যসব স্তরে যাদের নাম সমান্তরাল, দ্বিমেরু, অ্যামাক্রিন এবং স্নায়ুগ্রন্থিকোষ৷ স্নায়ুগ্রন্থিকোষ ধীরে ধীরে অপটিক্ নার্ভ বা দর্শন-স্নায়ুতে পর্যবসিত হয় এবং আলোক-সংকেতটি দর্শন-স্নায়ু বরাবর অগ্রসর হয়ে দৃশ্য-বিভাজক বা অপটিক কিয়াজমে চলে আসে৷ এই বিভাজক-রেখা পার হয়ে সংকেত চলে আসে মস্তিষ্কের মধ্যবতর্ী অঞ্চলে যার নাম পাশ্বর্িক জেনিকুলেট কেন্দ্রীণ_ল্যাটারাল জেনিকুলেট নিউকিয়াস বা এলজিএন৷ এই এলজিএন একটা অনুপ্রচার কেন্দ্র বা রিলে সেন্টার যেখান থেকে আলোর সংকেতটি দৃষ্টিশক্তির কর্টেঙ্ বা বাহিরাবরণে এসে হাজির হয় ঠিক আমাদের মাথার করোটির পিছন দিকে৷ এক সময়ে দৃষ্টিশক্তির বহিরাবরণ বা কর্টেঙ্কে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হত_ ১৭, ১৮ এবং ১৯৷ আজকাল সাতটি দৃষ্টিশক্তির অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়_ভি১, ভি২ ইত্যাদি৷
যাই হোক আলোকসংকেত এইসব বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে অগ্রসর হয়ে এবং এলজিএন থেকে পুনঃসরবরাহকৃত সংকেত সংগ্রহ করে সব শেষে সমগ্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটা সচেতন দৃশ্যভিত্তিক অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করে৷ কিন্তু ঐ অভিজ্ঞতা বা অনুভূতিটি ঠিক কিভাবে সৃষ্টি হয় এটাই মস্তিষ্ক-গবেষণার মূল বিষয়৷
তারো আগে নিউরন বা স্নায়ুকণিকা ঠিক কিভাবে কাজ করে তা কিছুটা ব্যাখ্যা করা যায়৷ একটি নিউরন কোষ অন্য-যে-কোন কোষের মতই, যার থাকে একটা সেল মেমব্রেন বা কোষীয় আবরণ এবং একটা অভ্যন্তরীণ নিউকিয়াস বা কেন্দ্রীণ৷
অবশ্য নিউরনকে অন্যকোষ থেকে পৃথক করা যায় দেহসাংগঠনিক এবং শরীরবৃত্তিক উভয় প্রকার প্রভেদ অনুসারেই৷ নিউরনের বিভিন্ন প্রকার রয়েছে৷ কিন্তু সবচেয়ে পরিচিত নিউরনের রয়েছে একটা লম্বাটে, সুতারমত অভিপেণ বা অ্যাঙ্ন৷ এই অ্যাঙ্ন বা প্রপেণ থাকে নিউরনের একপাশে এবং অন্যপাশে থাকে কন্টকিত, ুদ্র ুদ্র সুতার মতো তন্তুগুচ্ছ যাদের বলে ডেনড্রাইট বা কণ্টকতন্ত্র৷ প্রতিটি নিউরন বা স্নায়ুকণা তার ডেনড্রাইট বা কণ্টকতন্ত্র দিয়ে সংকেত সংগ্রহ করে, কোষের অভ্যন্তরে বা সোমায় তা প্রক্রিয়াজাত করে এবং তারপর তা অ্যাঙ্ন মারফত্‍ পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট পরবতর্ী নিউরনে৷
স্নায়ুকণিকা বা নিউরন সংকেত পাঠায় একটা বৈদু্যতিক অভিঘাত বা ইমপালস্ হিসেবে প্রপেণ বা অ্যাঙ্নের মাধ্যমে৷ কিন্তু মজার ব্যাপার এই যে, একটা নিউরনের প্রপেণ সরাসরি অন্য নিউরনের ডেনড্রাইট বা কণ্টকতন্ত্রর সঙ্গে সংযুক্ত থাকে না৷ প্রকৃতির এ এক আশ্চর্য সূচীকর্ম! যে বিন্দুতে আলোক সংকেত এক কোষ থেকে পরবতর্ী কোষে পরিচালিত হয় সেখানে রয়েছে একটা ুদ্র বিভাজন রেখা, যাকে বলে সাইন্যাপসীয় বা সংযোজী ফাটল৷ সাইন্যাপস্ বা সংযোজন হলো অ্যাঙ্নের বা প্রপেণের পৃষ্ঠতলে একটা স্ফোটক যার নাম বুটন বা সাইন্যাপ্সীয় চাবি, যা ব্যাঙের ছাতার মতো বেরিয়ে থাকে৷ এটাই ডেনড্রাইটের পৃষ্ঠতলে কাঁটার মতো স্ফোটকের সঙ্গে আটকে থাকে৷ বুটন এবং পরবতর্ী সাইন্যাপ্সীয় ডেনড্রাইট পৃষ্ঠতলের মধ্যবতর্ী অঞ্চলটিই হল সাইন্যাপ্সীয় ফাটল, এবং যখন নিউরন উদ্দীপিত হয় ও শেলবর্ষণ করে (বা ফায়ার করে) তখনই ঐ ফাটলের উপর দিয়ে সংকেতটি চলে যায়৷
আলোক সংকেত সরাসরি বৈদু্যতিক সংযোগের মাধ্যমে বুটন এবং ডেনড্রাইটীয় পৃষ্ঠতলের মধ্যে পরিচালিত হয় না বরং তা পরিবাহিত হয় স্বচ্ছ পরিবাহী বা ফুইডের অবমুক্তির মাধ্যমে৷ এই পরিবাহীকে বলে স্নায়বিক পরিবাহক বা নিউরোট্র্যান্স্মিটার৷ যখন বৈদু্যতিক সংযোগ কোষ-দেহ থেকে অ্যাঙ্নের মধ্যে দিয়ে বুটনের শেষ প্রান্তে চলে আসে তখন সাইন্যাপ্সীয় বিভাজনে স্নায়বিক পরিবাহক-পরিবাহীর অবমুক্তি ঘটে৷ এই পরিবাহী মাধ্যমই সাইন্যাপ্সীয় ডেনড্রাইটিক অঞ্চলে সংগ্রাহকের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে৷ এই সংযোগের ফলেই যেন একটা দরজা খুলে যায় এবং আয়ন অর্থাত্‍ বিদু্যত্‍-বাহিত পরমাণু বা পরমাণুগুচ্ছ ডেনড্রাইটীয় অঞ্চলের দিক থেকে নির্গত হয় অথবা সেই দিকে প্রবেশ করে, যার ফলে ডেনড্রাইটের বিদু্যত্‍-আধান পরিবর্ধিত হয়৷
সুতরাং ব্যাপারটা এই রকম : অ্যাঙ্ন অঞ্চলে একটা বৈদু্যতিক সংকেত আসে যার ফলে সাইন্যাপ্সীয় বিভাজনে রাসায়নিক পরিচালন ঘটে এবং এভাবে ডেনড্রাইটীয় অঞ্চলে বৈদু্যতিক সংযোগের উদ্ভব হয়৷ কোষটি তার ডেনড্রাইট থেকে এক গুচ্ছ সংকেত পায় যা কোষ দেহে একত্রিত হয় এবং এই যোগাযোগের ভিত্তিতে কোষ তার সংশ্লিষ্ট পরবতর্ী কোষে উদ্দীপনা বর্ষণ-হার বা ফায়ারিং-এর হার নিয়ন্ত্রিত করে৷
নিউরন উত্তেজক সংকেত, যা উদ্দীপন বর্ষণ-হার বৃদ্ধি করে অথবা সংবাধক সংকেতের বর্ষণ-হার হ্রাস করে, এই উভয়কেই গ্রহণ করে৷ আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে যদিও প্রতিটি নিউরন উত্তেজক ও সংবাধক উভয়প্রকার সংকেতই পায় কিন্তু পাঠায় শুধু একধরনের সংকেতই৷ যতদূর আমাদের জানা আছে, প্রতিটি নিউরন হয় উত্তেজক অথবা সংবাধক নিউরন হতে পারে_উভয় প্রকারের নয়৷
এটা ভাবলে সত্যিই আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় যে, আমাদের মানসজগত সম্বন্ধে এই যে সহজীকৃত বিবরণ দেয়া হল সেটাই আমাদের সচেতন অস্তিত্বের নিউরনভিত্তিক সম্পূর্ণ বর্ণনা৷ এখানে আয়ন প্রণালী, গ্রাহক এবং বিভিন্ন প্রকারের স্নায়বিক পরিচালকের বিস্তৃত বিবরণ দেয়া হয় নি৷ কিন্তু মূল কথা হল এই যে, আমাদের সমগ্র মানসজগত্‍ তথা সমগ্র মেধাবুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত হয় ঐ নিউরনের বৈদু্যতিক-রাসায়নিক আচরণ দিয়েই, আবার ঐ আচরণও শুধু উদ্দীপন-বর্ষণ-হার বাড়ানো এবং কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ৷ আমরা যখন কোন সুন্দর ও মধুর স্মৃতি মস্তিষ্কে সঞ্চয় করে রাখি তখন নিউরনের মধ্যবতর্ী সাইন্যাপ্সীয় সংযোগস্থলেই এই সঞ্চয়টা করা হয়৷
আসলে মস্তিষ্ক হল বিশ্বের জটিলতম ব্যবস্থার অন্যতম৷ বিবর্তনের মাধ্যমে কোটি কোটি বছর ধরে যেসব সংগঠন তৈরী হয়েছে তারই সবচেয়ে আশ্চর্যজনক প্রকাশ মানুষের এই মস্তিষ্ক৷ আধুনিক স্নায়ু-বিজ্ঞানের আবির্ভাবের পূর্বেই আমরা জানতাম যে মস্তিষ্কই মূল ব্যবস্থা যা মানুষের অনুভব, সংবেদন এবং চিন্তার জগতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে৷ কিন্তু ঠিক কি ভাবে অনুভব, সংবেদন এবং চিন্তা অন্যান্য মস্তিষ্ক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এটা আজ পর্যন্ত পুরোপুরি জানা সম্ভব হয় নি৷

নিউরনের কর্মপদ্ধতি

একটা বস্তু বা ব্যবস্থা হিসেবে মস্তিষ্ক একটি অনন্যসাধারণ যন্ত্র_তার সংযোগশীলতা, তার গতিময়তা, কর্মপদ্ধতি এবং দেহের অন্যান্য অংশের সঙ্গে বা বিশ্বের সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ এসব কোনো কিছুই বিজ্ঞানের অন্যকোন কিছুর মত নয়৷ এই অনন্য-সাধারণতাই মস্তিষ্কের কর্মপদ্ধতি আলোচনার েেত্র একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ৷ আজ পর্যন্ত মস্তিষ্কের যে ছবি আমরা তৈরি করতে পেরেছি তা মোটেই সম্পূর্ণ নয়, কিন্তু মস্তিষ্কের একটি পূর্ণাঙ্গ নক্শা ছাড়া যে সচেতনতার রহস্য সমাধান করা যাবে না সেটাও আমরা বুঝি৷
বয়স্ক একজন মানুষের মস্তিষ্কের ওজন প্রায় দেড় কেজি যার মধ্যে আছে প্রায় এক হাজার কোটি স্নায়ুকোষ বা নিউরন৷ ল কোটি বছরের বিবর্তনের পর মানুষের মস্তিষ্ক আজ যে-পর্যায়ে পৌঁছেছে তা প্রকৃতির এক অনবদ্য সূচীকর্ম৷ এর বাইরের দিকে রয়েছে ঢেউ খেলানো এক বহিরাবরণ বা সেরিব্রাল কর্টেঙ্_যেখানে আছে প্রায় ৩০০ কোটি নিউরন এবং প্রায় এক মিলিয়ন-বিলিয়ন সংযোগ জালি বা সাইন্যাপ্স৷ প্রতি সেকেন্ডে একটা করে গুণলেও ৩ কোটি বছরে আমরা এদের গণনা করে শেষ করতে পারব না৷ অন্যদিকে সম্ভাব্য স্নায়বিক বর্তনী গুণতে গেলে আমরা সম্মুখীন হব এক অতি-জ্যোতির্বিদ্যাসুলভ বিপুল সংখ্যার জগতে_দশঘাতের এক নিযুত! আমাদের জ্ঞাত বিশ্বের অণু-পরমাণুর সংখ্যা মোটে দশঘাত ৭৯!
নিউরন দেখা যায় বিভিন্ন আকৃতির এবং তাদের রয়েছে বৃরে মতো এক প্রপেণ বা ডেনড্রাইট যা আগেই বলা হয়েছে সাইন্যাপ্সীয় সংযোগ রা করে৷ নিউরনের একটি মাত্র দীর্ঘতর প্রপেণও থাকে যার নাম অ্যাঙ্ন বা অ এবং এই অ্যাঙ্ন হয় ডেনড্রাইটের সঙ্গে অথবা কোষদেহের সঙ্গে অথবা অন্য আর এক নিউরনের সঙ্গে সাইন্যাপ্সীয় সংযোগ বজায় রাখে৷ মস্তিষ্কে বিভিন্ন প্রকারের ঠিক কতগুলি নিউরন আছে তা আমরা জানি না, কিন্তু মনে হয় প্রায় পঞ্চাশ প্রকারের নিউরন থাকতে পারে৷ কোন নির্দিষ্ট প্রকারের নিউরন প্রলম্বিত ডেনড্রাইট এবং অ্যাঙ্নের দৈর্ঘ্য আর তার শাখাপ্রশাখার নক্শা কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু মোটামুটি তারা প্রায় একই রকমের হয়৷ অন্যদিকে একই ধরনের কোষের মধ্যে দুটো কোষ কখনও এক রকমের হয় না৷
ুদ্রাতিুদ্রের জগতে নিউরনীয় সব বিচিত্র নক্শার একটা বৈশিষ্ট্য হল তাদের ঘনত্ব ও বিস্তার৷ একক নিউরনের ব্যাস প্রায় ৫০ মাইক্রন_এক মিলিমিটারের হাজার ভাগের এক ভাগ, কিন্তু তার অ্যাঙ্নের দৈর্ঘ্য এক মাইক্রন থেকে শুরু করে এক মিটার পর্যন্ত হতে পারে৷ মস্তিষ্কের বহিরাবরণ বা সেরিব্রাল কর্টেঙ্বে মত কোষ-সমাহার এক অচিন্ত্যনীয় ঘনত্বে অবস্থান করে৷ গল্পি স্টেইন দিয়ে রঞ্জিত করে অণুবীণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে গেলে ঘন কালো পিণ্ড হিসেবেই তাদের দেখা যায়৷ নিউরনের মধ্যে পরিকীর্ণ থাকে নিউরন নয় বা অনিউরন কোষ_যাদের বলে গি্লয়া৷ এদের কাজ হল স্নায়ুকোষগুলির সহায়ক হিসেবে পুষ্টিসাধনের কাজ করা, কিন্তু এরা সরাসরি সংকেত প্রেরণের কাজে অংশ গ্রহণ করে না৷ কোন কোন েেত্র গি্লয়ার সংখ্যা নিউরনের সংখ্যার তুলনায় বেশি৷
আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এই নিউরন-অরণ্যের পুষ্টিসাধনের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ শোণিত সরবরাহ৷ ধমনীর মাধ্যমে কৈশিক নালীর ঘন জালিতে শোণিত সরবরাহ করা হয় এবং তার থেকেই মস্তিষ্ক পায় অঙ্েিজন ও গ্লুকোজ, যা সব সময় প্রয়োজন আমাদের দেহের সর্বাপো সক্রিয় জীবন্ত দেহযন্ত্রটির বেঁচে থাকার জন্য৷ প্রত্যেকটি নিউরন পর্যন্ত শোণিত সরবরাহ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একটা অকল্পনীয় সুন্দর ব্যবস্থা যার তুলনা হয় না, এবং বলাই বাহুল্য মস্তিষ্কের সাইন্যাপ্সীয় কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে জড়িত ঐ শোণিত সরবরাহ এবং অঙ্েিজনেশনের সঙ্গেই৷ বাস্তবিক প েজীবন্ত মানুষের মস্তিষ্কের ছবি তোলার আধুনিক পদ্ধতি নির্ভর করে এই শোণিত সরবরাহ এবং অঙ্েিজনেশনের পরিবর্তনের ব্যাপারটাকেই আলোকচিত্রায়ন করে৷
মস্তিষ্কের ঘন জালির নিউরন-নিকুঞ্জের বিস্তৃতি এবং তাদের প্রাবরণ_অর্থাত্‍ একটার উপর আর একটা ডেনড্রাইট বৃ ও অ্যাঙ্নের প্রপেণ_এই জটিল ব্যবস্থা বোঝা যে কত দুরূহ তা বলাই বাহুল্য৷ ত্রেবিশেষে নিকুঞ্জ সৃষ্টিকারী একটি অ্যাঙ্নের স্থানিক বিস্তৃতি এমনকি এক ঘন মিলিমিটারেরও বেশি হতে পারে৷ আবার ঐ নিকুঞ্জের সঙ্গে প্রাবরণ ঘটায় অন্য নিউরণের সৃষ্ট অসংখ্য নিকুঞ্জ তাদের সব জটিল শাখা প্রশাখা নিয়ে৷ এই প্রাবরণ অনেক সময়ে স্থানিক ত্রিমাত্রিক জগতের শতকরা ত্রিশ ভাগও হতে পারে৷ আমাদের সবচেয়ে ঘন জঙ্গলেও কোনো গাছই এই পরিমাণ প্রাবরণ সহ্য করবে না৷
আসলে অ্যাঙ্নীয় নিকুঞ্জ যখন প্রাবরণ তৈরী করে তখন তারা সাইন্যাপ্সের বা সংযোগের একটা বিশাল বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করে যার ফলে মস্তিষ্কের কোষ সমষ্টির প্রতি ঘন আয়তনে একটা অনন্যসাধারণ সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তববাদী চিত্রকর্মের সৃষ্টি হয়৷ যদিও একটি স্নায়ুকোষের সম্পূর্ণ নিকুঞ্জের ছবিটি অাঁকা যায় তবু আমাদের কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই কি করে সাইন্যাপ্সের জগতে অসংখ্য প্রতিবেশী কোষের পরিকীর্ণ নিকুঞ্জের ুদ্রাতিুদ্রের দেহ-সংগঠন তৈরী হয়৷
নিউরনের কোষ সংক্রান্ত সাধারণ কার্যকলাপ, যেমন শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ, জীন সম্পর্কিত বংশগতির কাজ এবং প্রোটিন সংশ্লেষণের কাজ, এসব কাজই দেহের অন্যান্য কোষের মতই, কিন্তু নিউরনের বিশেষ কাজ হল সাইন্যাপ্সের মাধ্যমে যোগাযোগ রার সমতা৷ এটাই মানুষের সচেতনতা সৃষ্টি করে বলে মনে করা হয়৷ আগেই বলা হয়েছে নিউরন দু'ধরনের কাজ করে_উত্তেজক এবং সংবাধক, এবং ুদ্রাতিুদ্রের পর্যায়ে নিউরনের সাইন্যাপ্সের থাকে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সংগঠন৷ অথচ এই দুই কাজের মূল প্রক্রিয়া একই রকমের, যার মধ্যে রয়েছে বৈদু্যতিক ও রাসায়নিক সংকেত প্রেরণ৷ যদিও কোন কোন েেত্র সাইন্যাপ্স বৈদু্যতিক পদ্ধতিতে কাজ করে কিন্তু মানুষের মস্তিষ্কে সাইন্যাপ্সের বেশিরভাগই কাজ করে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়৷ প্রায় সব েেত্র প্রাক্-সাইন্যাপ্সীয় নিউরন এবং উত্তর-সাইন্যাপ্সীয় নিউরনের মধ্যে থাকে একটা বিভাজন যেটাই আসলে সাইন্যাপ্স প্রবাহী মাধ্যম৷
নিউরনের অভ্যন্তর বাইরের সাপে েঋণ বিদু্যত্‍ আহিত৷ একটি পটাশিয়াম বা সোডিয়াম আয়ন কোষ ঝিলি্লর একটা বিশেষ অংশ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে কোষটি পূর্বের তুলনায় কম ঋণ বিদু্যতায়িত হয়ে যায়, কেননা ঐ আয়ন ধন বিদু্যত্‍-সম্পন্ন৷ এর ফলে কোষের মধ্যে যে বিদু্যত্‍-বিভবের সৃষ্টি হয় তাকে বলে কার্য-বিভব বা পোটেনশিয়াল৷ এই কার্যবিভব অ্যাঙ্ন বা অ বরাবর নিচের দিকে নামতে থাকে এবং যখন সেটা সাইন্যাপ্স অঞ্চলে পৌঁছায় তখন তা স্নায়ু-পরিচালক বা নিউরো ট্র্যান্সমিটার অবমুক্ত করে দেয়৷ এই অবমুক্তি ঘটে প্রাক্-সাইন্যাপ্সীয় নিউরনের একসারি ভেসিকল বা আধার থেকে৷
নিউরন যদি উত্তেজক প্রকৃতির হয় তাহলে অবমুক্ত স্নায়বিক পরিচালকগুলি সাইন্যাপ্সীয় বিভাজন পার হয়ে যায় এবং উত্তর-সাইন্যাপ্সীয় নিউরনের বিশেষ সংগ্রাহকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে ঐ উত্তর-সাইন্যাপ্সীয় নিউরনকে পূর্বের তুলনায় কম ঋণ-বিদু্যতায়িত করে দেয়৷ এই ভৌত প্রক্রিয়া ঘটে কয়েকশ' মিলিসেকেন্ড সময়ে৷ এই ধরনের অসংখ্য ঘটনার পর উত্তর-সাইন্যাপ্সীয় নিউরন যদি যথেষ্ট পরিমাণ কম ঋণ-বিদু্যতায়িত হয়ে যায় তখন তা উদ্দীপিত অবস্থায় চলে আসে৷ অর্থাত্‍ সেই পর্যায়ে নিউরনের নিজস্ব কর্মবিভব সৃষ্ট হয় যার ফলে সে সংশ্লিষ্ট অন্য নিউরনে তার ঐ সংকেত প্রেরণ করার মতা অর্জন করে৷ এটাই উত্তেজক নিউরনের মূল কার্যপদ্ধতি৷ সংবাধক নিউরণও একইভাবে কাজ করে, কিন্তু তা উত্তর-সাইন্যাপ্সীয় নিউরনের বৈদু্যতিক আধার এমনভাবে পরিবর্তন করে যাতে উদ্দীপণ বর্ষণ বা ফায়ারিং না হয়৷
নিউরন সংযোগের এই ুদ্রাতিুদ্রের সংগঠন যত জটিলই হোক না কেন, এই জটিলতা বৃদ্ধি পায় দেহাভ্যন্তরে বিভিন্ন বিক্রিয়ার সংখ্যার আনুপাতিক বৃদ্ধির কারণে, যা অবশ্যই সাইন্যাপ্সীয় পরিবহণ গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে৷ আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক মৌলিক পদার্থ, যাদের বলা হয় স্নায়বিক পরিবাহক এবং স্নায়বিক নিয়ামক৷ এরা বিভিন্ন সংগ্রাহকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক পথ-পরিক্রমার সঙ্গে সক্রিয়৷ এইসব নিউরোপরিবাহক এবং তাদের সংগ্রাহকদের রাসায়নিক পরিচয়, তাদের অবমুক্তির সংখ্যায়ন এবং তাদের দেশ-কালে বৈদু্যতিক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে নিউরনের সাড়া দেয়ার সূচনালগ্নটি থেকে একটা আশ্চর্যজনক জটিল এবং পরবতর্ী কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে৷ তাছাড়া নিউরো-পরিবাহকের অবমুক্তির ফলে শুধু যে বৈদু্যতিক সংকেত প্রেরণই ঘটে তা নয়, জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তনও ঘটে এবং এমনকি অভিল্য নিউরনে জীন অভিব্যক্তিও ঘটতে পারে৷ মোটকথা আণবিক জটিলতা এবং তার ফলে সৃষ্ট গতিময়তা পরিবর্তনের আরো কয়েক ধাপ পেরিয়ে উপরিপাতন ও স্নায়বিক দেহ সংগঠনের সূচীকর্ম, যার ফলে সৃষ্টি হয় মস্তিষ্কের ঐতিহাসিক অনন্যসাধারণতা৷ রূপালঙ্কার হিসেবে বলা যায় যে, আমরা আমাদের মাথায় ত্রিকালের মহাদেবের মতো একটা বিশাল অরণ্য জটাজাল বহন করি যে অরণ্য তুলনাহীন৷
আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের একটা অসুবিধা হল এই যে, এখন অনেকেই মনে করেন যে মানুষের মন আসলে একটা কম্পিউটার৷ মানুষের মস্তিষ্ক একটা ডিজিটাল কম্পিউটার এই ধারণা আজকাল এত ব্যাপক যে, এ ব্যাপারে কোন আলোচনাই মনে হয় অরণ্যে রোদন৷ বলা হয় যে কম্পিউটারের হার্ডওয়ারের সঙ্গে সফ্টওয়ারের যা সম্পর্ক, মনের সঙ্গে মস্তিষ্কের সেই সম্পর্ক৷ মস্তিষ্ক হল হার্ডওয়ার৷ আর মন হল সফ্টওয়ার৷ অর্থাত্‍ মন হল একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম মাত্র৷ এখানে আর কিছুই নেই৷ এটাকেই বলে সবল-কৃত্রিম-মেধার তত্ত্ব, যার বিপরীতে আছে দুর্বল-কৃত্রিম-মেধার তত্ত্ব৷ এই দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কম্পিউটারকে বলা হয় একটা প্রয়োজনীয় যন্ত্র যা দিয়ে মনের অনুকরণ বা সিমুলেশন করা সম্ভব যেমন করা সম্ভব আবহাওয়ার নক্শা প্রস্তুত করা৷
কিন্তু মন যে কম্পিউটার নয় তার সহজ কারণ হল কম্পিউটার এমন একটা যন্ত্র যা প্রতীককে নিপুণভাবে পরিচালন বা ম্যানিপুলেট করে৷ কম্পিউটারের েেত্র এই প্রতীক হল ড় এবং ১, কিন্তু অন্য যে-কোন প্রতীক দিয়েও এ কাজ চলত৷ অ্যালান টিউরিং বলেছিলেন যে, কম্পিউটার একটা যন্ত্র যার থাকে একটা মাথা বা হেড এবং একটা ফিতা বা টেপ৷ ফিতার উপর লেখা হয় ড় এবং ১৷ মেসিন ঠিক চারটি কাজ করতে পারে৷ ফিতাকে একঘর বাঁম দিকে বা এক ঘর ডান দিকে সরাতে পারে৷ একটা ড় মুছে দিয়ে সেখানে ১ লিখতে পারে এবং ১ মুছে দিয়ে সেখানে শূন্য লিখতে পারে৷ এইসব কাজ যন্ত্র করতে পারে সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে, যেমন 'গ শর্তের অধীনে ক কাজ কর'৷ এই ধরনের নিয়মকে বলে প্রোগ্রাম৷ আধুনিক কম্পিউটারের এই সব শর্ত বা প্রোগ্রাম ড় এবং ১ সংকেত মাধ্যমে লিখে রাখা হয় এবং যন্ত্রটি ঐ প্রোগ্রাম অনুসরণ করে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে৷
কম্পিউটার নিঃসন্দেহে বিংশ শতাব্দীর মেধাভিত্তিক অর্জনের একটা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য উদাহরণ এবং তার এই মোটামুটি সীমিত মতা দিয়েও এত কাজ করা যে সম্ভব এটাই একটা বিস্ময়ের ব্যাপার৷ কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, কম্পিউটার শুধু কিছু প্রতীকের নিপুণ ব্যবহার করার যন্ত্র মাত্র৷ এই অর্থে কম্পিউটার দিয়ে এক গুচ্ছ কাজের বাক্যরীতিগত বা সিনট্যাকটিকাল ব্যবহারের উপায় ছাড়া আর কিছু নয়৷ কিন্তু আমরা জানি যে, মানুষের মন শুধুমাত্র পদান্বয়ী কার্যকলাপের যন্ত্রমাত্র নয়৷ মনের আরো যা আছে তা হলো তার আধেয় বা কনটেন্ট৷ আমরা যখন বাংলা বলি তখন প্রত্যেকটি শব্দের অর্থ আমরা বুঝি৷ ভাষার এই বাগার্থিক বা সিম্যানটিক তাত্‍পর্য যে-কোনো শিশু তার মায়ের কোল থেকেই শেখে, কিন্তু কম্পিউটারে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রাম মাতৃভাষা আমাদের মনে যে-বাগার্থিক ঝংকার সৃষ্টি করে তার ধারে কাছেও যেতে পারে না৷ বাক্যরীতি আর বাগার্থ কখনও এক হতে পারে না এবং তাই প্রোগ্রাম কখনও মন হতে পারে না৷

সচেতনতার দর্শন

মস্তিষ্কের গবেষণায় আজকাল আমরা যেটুকু অগ্রগতি লাভ করেছি তা যত্‍সামান্য মনে হতে পারে, কেননা সচেতনতা ঠিক কিভাবে সৃষ্টি হয় সে-প্রশ্নের উত্তর দেয়া আজো সম্ভব হয় নি৷ প্রতিদিন রাতে আমরা যখন ঘুমোতে যাই তখন কোন কিছু আমাদের ত্যাগ করে এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার সময়ে আবার তা ফিরে আসে_সেটাই সচেতনতা৷ স্কুলের বাচ্চাকে যখন বলা হয় পড়াশোনায় মন দাও তখন এটাই বলা হয় যে, বিপ্তি চিন্তাধারা বন্ধ করে পড়াশোনার প্রতি মনোসংযোগ কর৷ অর্থাত্‍ মানুষ তার মনকে একমুখী করতে পারে এবং গভীরভাবেই তা করতে পারে_এটাই সচেতনতার প্রাথমিক শর্ত৷
কিন্তু তবু এখনও অনেকে মনে করেন যে, মনোসংযোগ বা সচেতনতা ঠিক মৌলিক অর্থে বোঝা যায় নি৷ এই না-বোঝার কারণ যে দার্শনিক মহলে চিন্তাভাবনার অভাব তা মোটেই নয়৷ রেনে দেকার্তের সময় থেকেই খুব কম ব্যাপারই দার্শনিকদের এতটা ব্যাপৃত রেখেছে, যেমনটা রেখেছে বিমূর্ত সচেতনতার এই সমস্যা৷ রেনে দেকার্ত বা তাঁর দু'শ বছর পরে উইলিয়াম জেমস্ মনে করতেন সচেতনতা হল চিন্তা করার মতা৷ বাংলায় আমরা বলি মগ্নচৈতন্য যার অর্থ চিন্তায় চেতনা-হারা৷ রেনে দেকার্তের 'কোজিটে এর্গো সুম'_আমি চিন্তা করি তাই আমার অস্তিত্ব আছে_এটাই তাঁর 'প্রিমা ফিলসফিয়া' বা কেন্দ্রীয় দর্শন৷ উইলিয়াম জেমস বলতেন চিন্তার ধারার কথা_স্ট্রিম অব কনাসাসনেস৷ 'আমি সচেতন তাই আমার অস্তিত্ব আছে'_এই ধারণাকে সলিপসিজম বা আত্ম জ্ঞানবাদিতা বলে, যার অর্থ হল অন্যকোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই শুধু আমার নিজস্ব চেতনা ছাড়া৷ বিজ্ঞানী হিসেবে এ ধারণায় আস্থা রাখা কষ্টকর, কেননা পৃথিবীর যে কোনো দেশে যখন খুশী পরীা করে আমি আপনি সকলেই পদার্থবিজ্ঞানের যে-কোন আইন যাচাই করতে পারি৷ সুতরাং পদার্থবিজ্ঞানের আইন মানুষের চেতনাপ্রসূত হলেও তার যথার্থতা সর্বকালে সর্বত্র পরীতি সত্য৷ আসলে মন থেকে শুরু করলে বস্তুর উপরে মনকে প্রাধান্য দেয়া হয়; ধারণাকে, অনুভূতিকে, চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়া হয়৷ অর্থাত্‍ একথায় সচেতনতাকে মূল বলে ধরা হয়৷ এভাবে শুরু করলে ভাববাদী দার্শনিককে অবশ্য বস্তুর অস্তিত্বই কষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে হবে৷ সেটা যে উল্টোটার চেয়ে খুব সহজ তা নয়৷
দেকার্ত মনে করতেন মানসিক এবং বস্তুগত জগতের মধ্যে একটা পরম পার্থক্য রয়েছে৷ তাঁর কাছে বস্তুর আছে ব্যপ্তি, যা স্থান দখল করে তাকে ভৌত ব্যাখ্যার অধীন করা যায়, কিন্তু মনের বৈশিষ্ট্য হল এই যে তা আমাদের সচেতন করে বা আমাদের চিন্তা করায়৷ তাঁর ধারণা অনুসারে মানসিক বস্তুটির অস্তিত্ব থাকে প্রতিটি মনে৷ এভাবেই দেকার্ত দ্বৈতবাদের সৃষ্টি করেছিলেন, যা বেশ সহজ ও আকর্ষণীয়, এবং এই তত্ত্ব দিয়ে দেহ ও মনের সম্পর্কও সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়৷ দেকার্তের সময় থেকে দার্শনিকেরা দ্বৈতবাদ এবং সংশ্লিষ্ট নানা বিকল্প মতবাদ নিয়ে আলোচনা করেছেন৷
অন্যদিকে আধুনিককালে দার্শনিকেরা বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন এবং বলছেন যে মন এবং চেতনা মস্তিষ্কের কাজের সঙ্গে অভিন্ন৷ কোনো কোনো বস্তুবাদী দার্শনিক এমনকি চেতনার জ্ঞানতাত্তি্বক (অনটোলজিকাল) অথবা এপিসটোমিক
অস্তিত্বকেও স্বীকার করতে চান না৷ তাঁরা মনে করেন সত্যিকার অর্থে মস্তিষ্কের নিউরন বর্তনীর কার্যকারিতা ছাড়া আর কিছুই নেই যা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন৷ অনেকে এটাও মনে করেন যে, আমরা যদি মস্তিষ্কের নিউরনীয় কার্যপ্রণালী নিখুঁতভাবে বুঝতে পারি তাহলে সচেতনতার ধারণাটাই অদৃশ্য হয়ে যাবে৷ যেমন পদার্থবিজ্ঞান থেকে ইথারের ধারণাটাই বাতিল হয়ে গিয়েছে৷ সুতরাং দেহ-মনের সমস্যার সমাধানে বলা হচ্ছে যে, চেতনার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা প্রয়োজন৷
অবশ্য এই বক্তব্য গ্রহণ করা বেশ শক্ত৷ তাই অনেকে বলেন যে, মস্তিষ্কে সচেতনতার সৃষ্টি ভৌত ঘটনার মাধ্যমেই, কিন্তু চেতনা ভৌত ঘটনায় পর্যবসিত হয় না বরং তার থেকেই উদ্ভূত হয়, যেমন দু'টি হাইড্রোজেন এবং একটি অঙ্েিজন পরমাণু মিলে পানির সৃষ্টি হয়৷ এ ধরনের বক্তব্যে অবশ্য সচেতনতার একটা অবশিষ্ট অবস্থান বা মর্যাদা থেকে যায়, অন্তত ব্যাখ্যার েেত্র৷ তবে এই বাস্তববাদীরা জোর দিয়ে বলেন যে, 'সচেতনতার' এমন কোনো বস্তু নেই যা মস্তিষ্কের বস্তু থেকে আলাদা৷ দেহ-মন সমস্যার উপরে এই দার্শনিক বিতর্ক আজকাল অত্যন্ত জটিল রূপ পরিগ্রহ করেছে যাকে পূর্বের কার্টেশীয় এবং উত্তর-কার্টেশীয় বিতর্কের সঙ্গে তুলনা করা যায়৷ এর সঙ্গে আরো আছে স্পিনোজার দ্বৈতরূপ তত্ত্ব, মেলব্রাঞ্চের আকস্মিকতার তত্ত্ব, যুক্তিবাদী আচরণবাদ, প্রতীকী মহাপ্রতিভাস তত্ত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি৷
দার্শনিক চিন্তাভাবনার অঢেল প্রাচুর্য সত্ত্বেও বলা যায় যে? শুধু দার্শনিক যুক্তি দিয়েই দেহ-মনের সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে মনে হয় না৷ আসলে এটা জীব-বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা, যা বিজ্ঞানের চিরাচরিত পথ ধরেই একদিন সমাধান হবে বলে আমরা আশা করতে পারি৷ কেমন করে ভৌত মস্তিষ্কের বারি সচেতনতার দ্রাারসে পরিণত হয় এখনও তা আমরা জানি না৷ কিন্তু একদিন যে জানতে পারব সে-সম্বন্ধেও আমাদের কোন সন্দেহ নেই৷
চার্লস শেরিংটনের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করা যায়, 'আমি যখন আকাশের দিকে দৃষ্টি ফেরাই আমি দেখি সমান করা আকাশের গম্বুজ, সূর্যের উজ্জ্বল থালা এবং নিচে শতশত দৃশ্যমান বস্তু৷ কি সব পদপে মিলে এটা সম্ভব করল? সূর্য থেকে আলোক রশ্মি চোখের মধ্যে প্রবেশ করে অপিটে ফোকাস করল এবং এভাবে একটা পরিবর্তন হল যা মস্তিষ্কের উপরিভাগের স্নায়ু স্তরে চলে গেল৷ সূর্য থেকে আমার মস্তিষ্কে-আসা এইসব ঘটনার পরম্পরা সবটাই ভৌত৷ প্রতিটি পদপে একটা করে বৈদু্যতিক প্রতিক্রিয়া৷ কিন্তু এর পরে এল একটা বিশেষ পরিবর্তন যা এ পর্যন্ত সব পরিবর্তন থেকে ভিন্ন এবং যা আমরা মোটেই ব্যাখ্যা করতে পারি না৷ একটা দর্শনীয় দৃশ্য মনের সামনে হাজির হল; আমি গম্বুজাকৃতি আকাশ এবং সেখানে সূর্য আর তার সাথে হাজারো জিনিষ প্রত্য করলাম৷ বাস্তবিকপ েআমি আমার চারদিকে সুন্দর পৃথিবীর একটা ছবি দেখলাম৷'*


* চার্লস শেরিংটন, ম্যান অন হিজ নেচার, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ১৯৫১





বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য গণমুখী বিচারব্যবস্থা
মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

থিসিস বা অভিসন্দর্ভ নয়৷ আবার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাস কিংবা পদ্ধতির ভালোমন্দের পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনাও নয়৷ এটা সম্পূর্ণ বিবরণমূলক রচনা৷ তো, আইনজীবীর সনদ পেয়ে ডিসেম্বর ১৯৬০ সালে রাজশাহী জেলা আদালতে আমার ওকালতি জীবনের সূত্রপাত৷ তারপর জানুয়ারী ১৯৬৯ সালে হাইকোর্টে আইনব্যবসা শুরু করি৷ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি পদে নিয়োগ পাই এবং জানুয়ারী ২০০২ সালে যখন আপিল বিভাগের বিচারপতি তখন আমার জজিয়তি জীবনের তথা ৪০ বছরের কর্মজীবনের সমাপ্তি ঘটে৷ ওকালতি ও জজিয়তি জীবনে আমার মনে দাগ-কাটা কিছু ঘটনাবলীকে কষ্টি করে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য যে বিচারব্যবস্থাটি চালু আছে তাকে এখানে যাচাই করব৷ তবে প্রস্তাবটির মুখবন্ধ হিসেবে একটা কৈফিয়ত্‍ দেয়া জরুরি মনে করি৷ আমার আইনব্যবসা সিভিল বা দেওয়ানী মোকদ্দমাতেই প্রধানত সীমাবদ্ধ ছিল, যদিও বিচারপতি হিসেবে আমাকে কয়েক বছর ফৌজদারী মোকদ্দমাও নিষ্পত্তি করতে দেয়া হয়৷ যাচাই কষ্টিটিতে তাই এই সীমাবদ্ধতার ত্রুটি থাকবে৷
দৈনিক সংবাদপত্রগুলির প্রতিবেদন থেকে পাওয়া বিচারব্যবস্থার সংপ্তি হালচাল শুরুতেই বলতে হয়৷ কোনো বিনোদন স্পট না হলেও সুপ্রিম কোর্টসহ আদালতগুলোর প্রাঙ্গণে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে আসতে দেখা যায়৷ দেশে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ দিন দিন বাড়ছে৷ ফলে বাড়ছে মামলার সংখ্যাও, যদিও মামলা সংক্রান্ত কাজে আদালতে আসাটা বাদী কিংবা বিবাদী উভয়ের জন্যই কষ্টকর৷ উভয়কেই মামলা চালানোর জন্য প্রচুর টাকা খরচ করতে হয়৷
এদিকে আদালতে জমছে মামলার স্তূপ৷ বাদী-বিবাদী উভয়কেই মামলার জটে পড়তে হচ্ছে৷ মামলার জটের কারণে নির্ধারিত তারিখে অনেক বিচারপ্রাথর্ীকে তার মামলার শুনানি না হওয়ার জন্য আদালতে এসে অযথা বারবার ঘুরে যেতে হচ্ছে৷ মামলার তারিখ বারবার পিছিয়ে যাওয়াতে সাীদেরকে আদালতে আনা-নেয়ার েেত্র বিচারপ্রাথর্ীরা বিড়ম্বনায় পড়ছেন৷ এমনিতেই অনেকে আদালতে কারো বিরুদ্ধে সাী দিতে চান না৷ সা্য দিতে এসে বারবার ফিরে যাওয়ার পর সে সাী আর আদালতে সহজে আসতে নারাজ৷ অথচ সাী-প্রমাণ ছাড়া যেমন বিচার চলে না তেমনি মোকদ্দমা চালাতে আইনজীবীকে নিযুক্ত করতে হয় এবং তার ফি গুণতে হয় মোকদ্দমার নির্ধারিত প্রতিটি তারিখে৷
সিভিল মোকদ্দমাগুলির বিচার দেওয়ানী কার্যবিধি কতর্ৃক নির্দিষ্ট পদ্ধতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়৷ ইংরেজ শাসন আমলে ১৯০৮ সালে দেওয়ানী কার্যবিধি প্রণীত হয় এবং সেটা এ যাবত্‍কাল কার্যকর বহাল আছে, যদিও সময়ের প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে সামান্য সংশোধন করা হয়েছে, তবে মূল চরিত্রটির কোনো রদবদল হয় নি৷ বাদীর প েআদালতে আরজি দাখিল হলে একটি দেওয়ানী মোকদ্দমার কার্যক্রম শুরু হয়৷ অতঃপর আরজি ও সেটার বিরুদ্ধে বিবাদী কতর্ৃক আদালতে দাখিল করা জবাব এবং এই দুটিতে লিখিত বিতর্কিত বক্তব্যগুলির ভিত্তিতে মোকদ্দমাটির বিচার্য বিষয়গুলি আদালত কতর্ৃক নির্দিষ্ট হয়৷ তাছাড়া নিজ নিজ বক্তব্য প্রমাণের জন্য বিবদমান পদেরকে মৌখিক ও দালিলিক সাী আদালতে উপস্থিত করতে হয়৷ আরজি কিংবা জওয়াবের মুসাবিদা করা, সা্য-প্রমাণের প্রসাঙ্গনুগতা, সাীদের জবানবন্দি নেয়া কিংবা জেরা করা এবং সবশেষে উপস্থাপিত সা্য-প্রমাণ ও প্রাসঙ্গিক আইনের ব্যাখ্যা প্রদানপূর্বক সওয়াল জবাব পেশ করা, ইত্যাদিসহ মোকদ্দমা চলাকালীন তাবত্‍ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন আইনজীবী অত্যাবশ্যক৷ কারণ এগুলোর বিষয়ে দেওয়ানী কার্যবিধি কতর্ৃক নির্ধারিত নিয়মকানুন মোটেই সরল নয়৷ উপরন্তু আপিল কিংবা রিভিশন নিষ্পত্তিকালে হাইকোর্টগুলি কোনো কোনো েেত্র বিধিগুলোর ব্যাখ্যা বিষয়ে একমত হয় নি কিংবা পূর্বে প্রদত্ত ব্যাখ্যা পরবতর্ীকালে বদলে দিয়েছে ও দিচ্ছে৷
দেখা যাচ্ছে মোকদ্দমা দায়ের এবং সেটা পরিচালনার ও বিপকে মোকাবিলা করার জন্য একজন আইনজীবীর প্রয়োজন এবং দেওয়ানী কার্যবিধি বিষয়ে সে আইনজীবীর স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরী৷ দেওয়ানী কার্যবিধির রয়েছে দেড় শতাধিক ধারা, অর্ধশত অর্ডার ও অর্ডারগুলির অন্তর্গত সহস্রাধিক রুলের এক বিশাল ভাণ্ডার এবং সেগুলি কেবলমাত্র পড়ে আয়ত্ত করা যায় না, তার জন্য ব্যবহারপটু হওয়াও দরকার৷ সুতরাং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আইনজীবী হিসেবে সনদ পাওয়ার ব্যবস্থাটি এমন করা যার ভিত্তিতে ওই ব্যক্তি মামলা পরিচালনায় উপযুক্ত বিবেচিত হবেন৷ শুধু তাই-ই নয়, যেহেতু বিচারপ্রাথর্ী মক্কেলের প্রতি আইনজীবীর সম্পর্কটি বিশ্বস্ত ও আস্থাশীল হতেই হবে, সেহেতু একজন আইনজীবীর চরিত্র যেন দোষমুক্ত হয় সেটাও নিশ্চিত হতে হবে৷
ইংরেজ আমলে উপরোক্ত দুটি মৌল আবশ্যকতার ভিত্তিতে জেলা আদালতে একজন আইনজীবী হিসেবে সনদ পাওয়ার বিধি তৈরী করা হয়েছিল৷ আইনজীবী সনদপ্রাথর্ীকে এক বছরের কর্মদিবসে বিচারকাজে নির্ধারিত সময়টিতে আদালতে উপস্থিত থাকতে হতো৷ হাজিরা খাতাটি জেলা জজের রুমের পাশর্্বরুমে রাখা হতো এবং সনদপ্রাথর্ীদের সেখানে উপস্থিত হওয়ার সময় উল্লেখে হাজিরা খাতার নির্দিষ্ট ছকে স্বার করতে হতো৷ আদালতে বসার আগমুহূর্তে জজ সাহেব খাতাটি নিজ রুমে এনে যারা সেখানে স্বার করেন নি তাদের নির্ধারিত ছকে লাল কালিতে অনুপস্থিত লিখতেন৷ আবার আদালতের বিচার কাজের নির্ধারিত সময় শেষে খাতাটি পাশর্্বরুমে রাখা হতো এবং অপর একটি নির্দিষ্ট ছকে আদালত ত্যাগের সময় উল্লেখে স্বার করতে হতো৷ তা না করলে পূর্বের ছকে স্বার করলেও সেদিন অনুপস্থিত ধরা হতো৷ আমি বিভিন্ন কারণে ১৭ দিন আদালতে উপস্থিত হতে না-পারায় আদালতের পরের ১৭টি কর্ম দিবসে হাজিরা দেয়ার পর জেলা জজ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন যে, আমি এক বছর যাবত্‍ কর্মদিবসে আদালতে উপস্থিত থেকেছি৷ যেহেতু এই এক বছর সকাল-বিকাল আমাকে আদালতে উপস্থিত থাকতে হয়েছে, সেহেতু জেলা জজ আদালত ও অধীনস্থ আদালতগুলিতে উপস্থিত থেকে সিনিয়র আইনজীবীরা কীভাবে সাীদের জবানবন্দি নেন কিংবা তাদেরকে জেরা করেন এবং কীভাবে সওয়াল-জবাব করেন অথবা আপিলগুলোতে কীভাবে সওয়ালজবাব হয় তা প্রথমদিকে বাধ্য হয়ে এবং পরে আগ্রহ নিয়ে পর্যবেণ করতে থাকি৷
আবার যে সিনিয়র আইনজীবীর সাথে যুক্ত ছিলাম তাঁকে সার্টিফিকেট দিতে হয় আমি তাঁর চেম্বারে নিয়মিত এক বছর যাবত্‍ শিানবিশ হিসেবে উপস্থিত থেকেছি৷ তারপর এক মাস যাবত্‍ জেলা জজ কতর্ৃক স্বারিত আদালতের নোটিশ বোর্ডে একটি বিজ্ঞপ্তি সাঁটা হলো যাতে বলা হলো আমি আইনজীবীর সনদপ্রাথর্ী এবং আমার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তির নীতিঘটিত দুষ্টতার অভিযোগ থাকলে সেটা জানাতে পারেন৷ উপরোক্ত শর্ত পূরণ হওয়ায় এবং নির্ধারিত ফিস দেয়ার পরে বার কাউন্সিল কতর্ৃক আমাকে জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে সনদ দেয়া হয়৷ চার বছর আইন ব্যবসা করার পরে বিধিঅনুযায়ী উপযুক্ত হওয়ায় ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেব সনদ পাওয়ার আবেদন করি এবং এজন্য আমাকে দু'জন বিচারপতির নিকট মৌখিক পরীা দিতে হয়৷ সরকারি গেজেটে সাতদিন পরপর চারবার সনদপ্রাপ্তিতে আমার নীতিঘটিত দুষ্টতার কারণে কারো আপত্তি আছে কিনা তা জানানোর আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হলো এবং কোনো আপত্তি না-পাওয়ায় নির্ধারিত ফিস প্রদানে ঢাকা হাইকোর্টের আইনজীবীর সনদ লাভ করি৷
একটি দেশে আইনের শাসন চলমান থাকার প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে সে-দেশে এক দল আইনজানা ও সত্‍ আইনজীবী তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া জারি থাকবে৷ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বর্তমান থাকলে সেটার সাথে সমান তালে এই ব্যবস্থাও থাকে৷ কিন্তু প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হয় তখনই যখন দেশটিতে স্বৈরশাসন ভর করে৷ একজন স্বৈরশাসক সবচেয়ে বেশি ভয় পায় আইনজানা আইনজীবীকে৷ তাই একজন আইনজীবীর আইন জানতে দেশে-বিদেশে প্রকাশিত আইনবিষয়ক বইগুলি পড়ার আগ্রহ ও অভ্যাস থাকা দরকার এবং সে-রকম পড়ুয়া স্বভাবতই আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সচেতন মানসিকতা অর্জন করেন৷ উল্লেখ্য, আইউব খান রাষ্ট্রীয় শাসন মতা বন্দুকের নলে দখল করে উপরোক্ত প্রক্রিয়াটি নিজ স্বার্থে বদলে দিয়েছেন৷ আইনজীবীর সনদ পেতে হলে আদালতে এক বছর হাজিরা দেয়ার ও নীতিঘটিত দুষ্টতা সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করার শর্ত দুটি তিনি বাদ দিলেন৷ শুধু তাই-ই নয়, সিনিয়রের চেম্বারে শিানবিশী সময়কাল এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করলেন৷ তখন আর আইনজীবীর প েসনদ পাওয়ার জন্য হাতে-কলমে বিচারপদ্ধতি শেখার কোনো প্রয়োজন থাকল না৷ এর ফলে অন্যপেশায় কিংবা কাজে নিযুক্ত থেকেও অনুরোধ করে কিংবা অন্যভাবে রাজি করিয়ে একজন সিনিয়র আইনজীবীর কাছে থেকে শিানবিশী সনদ পাওয়ার অতিসহজ প্রক্রিয়া চালু হয়ে গেল৷ অন্যদিকে হাইকোর্টের আইনজীবীর সনদ পাওয়া আরও সহজ হয়ে গেল৷ জেলা আদালতে দু'বছর কাল আইনব্যবসা করার পর একজন আইনজীবী আবেদন করলেই নির্ধারিত ফিস প্রদানের পর হাইকোর্টের আইনজীবীর সনদ পেয়ে যান৷
বাংলাদেশ ১৯৮২-৯০ সালতক স্বৈরশাসকের কবলে পড়েছিল৷ সে সময়ও একই ব্যাপার ঘটে৷ হাইকোর্ট বিভাগকে ছয় টুকরো করে একটুকরো ঢাকায় রেখে বাকি পাঁচ টুকরোকে দেশের পাঁচ জায়গায় পাঠিয়ে দেয়া হলো৷ এতে যে কী সর্বনাশ হলো সেটা সঙ্গে সঙ্গে অনেকের উপলব্ধি হয় নি৷ বরং অনেকেই ভেবেছেন এটা তো ভালই ব্যবস্থা৷ লোকজনের উচ্চ আদালতে বিচার চাওয়া সুগম ও সুলভ হলো৷ এই ধারণা দেয়ার কূটাবরণে আসলে উদ্দেশ্য ছিল আইনে দ ও শ্রদ্ধাশীল আইনজীবী তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা৷ ইংল্যান্ডের একজন খ্যাতনামা বিচারপতি লর্ড ডেনিং তাঁর লেখা 'দি চেঞ্জিং ল' বইটির মুখবন্ধে বলেছেন, 'লোকজনের ধারণা আইনগুলো স্পষ্ট এবং সেগুলো কেবল সংসদ কতর্ৃক পরিবর্তন করা যায়৷ সত্যটি হচ্ছে আইনগুলি প্রায়শ অস্পষ্ট থাকে এবং এগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত কিংবা হয়তো আমার বলা উচিত, বিচারপতিগণ কতর্ৃক পূর্ণতর করা হয়৷ তত্ত্বীয় মতে বিচারপতিগণ আইন প্রণয়ন করেন না৷ তাঁরা সেগুলোর অর্থ পরিষ্কার করেন৷ কিন্তু কেউ জানেন না আইনটি কী হতে পারে যে পর্যন্ত না বিচারপতিরা তার অর্থ পরিষ্কার করেন, অতএব বলা যায় যে তাঁরা এটা প্রণয়নই করেন৷'
বিচারপতিদেরকে তাঁদের এই কর্তব্য পালনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা সাহায্য করে থাকেন এবং এটা বিচারকার্যের স্বাভাবিক নিয়ম৷ ইংরেজ আমলে আদালতে এই স্বাভাবিক নিয়মটির প েদুটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়৷ এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে স্যার তেজ বাহাদুর সাপ্রুকে একটি আপিলের শুনানিকালে বিচারপতি বলেছিলেন, 'আমি কখনও জানতাম না আইন এমনটি৷' স্যার সাপ্রু তড়িত্‍ উত্তর দিয়েছিলেন, 'মান্যবর, আইনে এমন কোনো অনুমিতি নেই যে একজন বিচারক অবশ্যই আইন জানবেন৷' মুম্বাই হাইকোর্টের একজন বিচারপতি তাঁর বেঞ্চে একটি আপিল শুনানিকালে ব্যারিস্টার বি আয়েঙ্গারের উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেন, 'আপনার আইনের যুক্তিতর্ক আমি বুঝতে অপারগ৷' উত্তরে আয়েঙ্গার বলেছিলেন, 'হঁ্যা, মান্যবর, আইন বুঝতে একজন আইনজীবীর প্রয়োজন হয়৷'
উপরোক্ত বক্তব্যের উদাহরণ হিসেবে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত রিট বেঞ্চে প্রথম যে কেসটির আমি শুনানি করেছিলাম তার বিবরণ দেই৷ রিট আবেদনকারী ফায়ার ব্রিগেড অফিসের একজন মেকানিক ছিলেন৷ আঞ্চলিক ফায়ার অফিসারের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়৷ শেষে বিভাগীয় তদন্তের পর চাকরিচু্যত হন৷ রিটি পিটিশনে আমি অজুহাত দেখাই যে, বিভাগীয় তদন্তকর্তা ছিলেন ওই ব্যক্তি, যার সঙ্গে আবেদনকারী দুর্ব্যবহার করেছেন বলে বলা হয়েছিল৷ কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে একজন অভিযোগকারী তাঁর অভিযোগের বিচারক হতে পারেন না৷ বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন যে, এটাও আইনে স্বীকৃত যে বিভাগীয় তদন্তকালে ওই আপত্তি না করে তদন্তকার্যে অংশ নেওয়ায় রিট আবেদনকারী এখন আর এ আপত্তি উত্থাপন করতে পারেন না৷ আমি উত্তরে বলি, যে েেত্র বৈরী মনোভাব অপ্রকাশ্য (ষধঃবহঃ) সেেেত্র অভিযুক্তকে তদন্তকর্তার নিয়োগে প্রথমেই আপত্তি করতে হবে, কিন্তু যে েেত্র বৈরিতা প্রকাশ্য (ঢ়ধঃবহঃ) সেেেত্র তদন্তকালে আপত্তি না জানালেও তদন্তকার্য বেআইনি বলে গণ্য হবে এবং এেেত্র এটা পেটেন্ট৷
আমার যুক্তি শুনে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বললেন, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়৷ আমি আবার ওই একই কথা বললাম৷ বিচারপতি উচ্চস্বরে বললেন, পুনরায় বলাই অর্থহীন৷ আমি আবার ওই কথা বললাম৷ বিচারপতি এবার রাগতস্বরে আমাকে বসতে বললেন৷ আমি বসার পূর্বে আবার ওই কথা বললাম এবং শেষে আমার যুক্তিটির পইে রায় হলো৷ এই রায়টি কতর্ৃক বিশেষ েেত্র সাধারণ নিয়মের একটি ব্যতিক্রমী নিয়ম নির্দিষ্ট হলো৷
একজন মানব শিশু এক-তাল কাদার মতো থাকে যতদিন না সে হাঁটতে ও কথা বলতে শেখে৷ তারপর মা-বাবা, খেলার সাথী ও সহপাঠীরা তার চরিত্র গঠনে সাহায্য করে৷ সঙ্গে যোগ দেয় তার পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থান৷ কৈশোরকালেই একজন শিশু পরিণত বয়সে কী বৃত্তি গ্রহণ করবে অর্থাত্‍ সে গায়ক না অভিনেতা না চিত্রকর না অন্য সাধারণ পেশাজীবী হবে তা মোটামুটি স্থির হয়ে যায়৷ তবে সে আইনজীবী হবে কি না তা স্থির হয় আরো পরে৷ যে কোনো শিল্পীর সঙ্গে একজন আইনজীবীকে তুলনা করা যায়৷ একজন গায়ককে কিংবা অভিনেতাকে অথবা চিত্রকরকে তাদের নিজ নিজ শিক একই শিা দেন, কিন্তু শিাথর্ীরা নিজ অন্তর্নিহিত গুণ ও অধ্যবসায়ের কারণে একই মানের হন না৷ কেউ অতি উচ্চমানের, কেউ মধ্যমমানের আবার কেউ নিম্নমানের শিল্পী হয়ে থাকেন৷ আইন পেশা গ্রহণকারীদের েেত্র এই একই কথা খাটে৷
এই যে মানের কথা বলছি, সেটা অন্য পেশাজীবীদের মান বলতে যা বোঝায় তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা৷ অর্থাত্‍ আমরা যে অর্থে একজনকে বলি সত্‍, মিতাচারী, ভদ্র_অনুরূপ অন্তর্নিহিত পেশাগত গুণের ভিত্তিতে একজন শিল্পী বা আইনজীবীর মান নির্ধারণ করা হয়৷ অন্য পেশাজীবী ব্যক্তিদের পরস্পরের মান নির্ধারিত হয় তাদের মধ্যে কে কাজ সম্পাদনে কী পরিমাণ দ, অর্থাত্‍ দৃশ্যমান বাস্তব কর্ম দাঁড়ায় ব্যক্তির মান নির্ধারণের মাপকাঠি৷ শিা সমাপ্ত হওয়ার পরেও একজন শিল্পী কিংবা একজন আইনজীবীর শিাজীবন শেষ হয় না৷ তাঁকে নিজ নিজ েেত্রর পূর্বসূরীদেরকে অনুসরণ করতে হয়৷ সুপ্রিম কোর্টের একজন অ্যাডভোকেট কোর্টরুমে বসে যখন সিনিয়র অ্যাডভোকেটের আর্গুমেন্ট শোনেন, তাঁর বাচনভঙ্গি, তাঁর অঙ্গভঙ্গি ল্য করেন এবং শেষে নিজে অনুসরণ করেন তখন কেবল ওই সিনিয়রকেই নয়, পূর্ববতর্ী সিনিয়রকেও অনুসরণ করা হয়ে যায়৷ অর্থাত্‍ এভাবেই একশো বছরের ধারা এক সিনিয়র থেকে অন্য সিনিয়রে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে৷ একে প্রফেশনাল ট্রাডিশন বলা হয় এবং এটা রপ্ত করার সুযোগ ও সময় যদি না দেয়া হয় তাহলে মানসম্মত অ্যাডভোকেট তৈরি হয় না৷
হাইকোর্ট বিভাগকে খণ্ড করে দেশের পাঁচ জায়গায় পাঠানোর ফলে কি সর্বনাশ হলো সেটা বুঝাতে মুখবন্ধ হিসেবে এতণ যা বললাম তাতে এটা পরিষ্কার যে মফস্বলের হাইকোর্টগুলিতে ঢাকা থেকে সিনিয়র আইনজীবীরা স্থায়ীভাবে না যাওয়ায় সেখানে তখন মানসম্মত আইনজীবী তৈরী হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়৷ শুধু তাই-ই নয়, যাতায়াত করা ও খরচের দিক থেকে সহজ হওয়ায় সেখানে অতিরিক্ত সংখ্যক মোকদ্দমা দায়ের হতে থাকে৷ পরবতর্ীকালে প্রবল আন্দোলনের মুখে যখন সেগুলি বিলুপ্ত হয়ে ঢাকায় আবার একটি হাইকোর্ট বিভাগ হলো তখন ওইসব আইনজীবী তাঁদের মোকদ্দমার বস্তাসহ ঢাকায় স্থায়ী হলেন এবং মোকদ্দমার সংখ্যাধিক্যে হাইকোর্ট বিভাগ তালগোল পাকানো বিশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হলো৷
এই-ই শেষ নয়৷ পরবতর্ীকালে রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থে বিচারপতি নিয়োগ দেয়ার জন্য আইনজীবী আগের তুলনায় যথেষ্ট পাওয়া গেল৷ এই নিয়োগ দেয়াই কেবল নয়, কোনো উপযুক্ত ব্যক্তি দু'বছর যাবত্‍ অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করলেও রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থে আগের প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্তকে স্থায়ী বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় নি৷ সংবিধান যখন প্রণীত হয় তখন ৯৮ অনুচ্ছেদে বলা ছিল যে, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অস্থায়ী কিংবা স্থায়ী বিচারপতিদেরকে নিয়োগ দেয়া হবে৷ কিন্তু ইতিপূর্বে ওই অনুচ্ছেদের 'প্রধান বিচারপতির সহিত পরামর্শ করিয়া' শব্দগুলি বিলুপ্ত হওয়ায় বিচারপতি নিয়োগে গুণগত মান যাচাইয়ের স্বাভাবিক নিয়মটি উপো করা হয়৷ অথচ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেতে কিংবা মেয়াদকালের শেষে তার স্থায়ী বিচারপতির নিয়োগ পেতে যোগ্য কিনা সেটা জানার ও বিবেচনা করার একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি হচ্ছেন প্রধান বিচারপতি৷ নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের দুটি পৃথক ও স্বাধীন বিভাগ এই মূলনীতির প্রোপটে বিচারপতিদের নিয়োগ বিষয়টি যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে বিচার নির্বাহ করা ও বিচারপতিদের নিয়োগ দেয়া দুটি অভিন্ন বিষয় বিধায় প্রধান বিচারপতিই হচ্ছেন বিচারপতিদের প্রকৃত নিয়োগকর্তা৷
বাংলাদেশের সংবিধানে উলি্লখিত যোগ্যতানুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারপতি পদে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়৷ একজন অতিরিক্ত বা অস্থায়ী বিচারপতি তাঁর কার্যমেয়াদের মধ্যে পদত্যাগ করলে অথবা অপসারিত হলে কিংবা মেয়াদ শেষে বিচারপতি পদে নিয়োগ না পেলে বিচারপতি হিসেবে তাঁর আর সাংবিধানিক কোনো পরিচয় কিংবা দায় থাকে না৷ সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের ১ উপ-অনুচ্ছেদে বলা ছিল, 'কোনো ব্যক্তি বিচারক পদে দায়িত্ব পালন করিয়া থাকিলে উক্ত পদ হইতে অবসর গ্রহণের কিংবা অপসারিত হইবার পর তিনি কোন আদালতে কিংবা কতর্ৃপরে নিকট ওকালতি বা কার্য করিতে পারিবেন না অথবা প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে বহাল হইবেন না৷' যেহেতু বিচারপতির পদটি উচ্চতম মর্যাদাসম্পন্ন যা সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু একজন বিচারপতির অন্যকোনো পদ গ্রহণ না করার দায় থাকা প্রয়োজন৷ অন্যভাবে বলা যায়, একজন বিচারপতির আজীবন সম্মান রার উদ্দেশ্যেই এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছিল৷
অথচ ১৯৭৬ সালে প্রধান সামরিক প্রশাসকের এক প্রজ্ঞাপন দ্বারা সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদটি এই মর্মে সংশোধন করা হয় যে, একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পরও বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় লাভজনক পদে নিয়োগ পেতে পারবেন৷ এটার উদ্দেশ্য কী ছিল, যার লোভাতুর টোপটি এখনও আছে, সেটা অতি সহজেই অনুমান করা যায়৷ তত্‍কালে পাকিস্তানী সামরিক শাসকের বেড়াজাল থেকে রক্তয়ী মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও পুনরায় সামরিক শাসনের কবলে পতিত হওয়ায় বিচারপতিগণ কতর্ৃক এই অনভিপ্রেত সর্বনাশা ব্যবস্থাকে সমর্থন করা একান্ত জরুরী ছিল৷
আমি যখন জেলা আদালতে আইনজীবীর সনদ পেলাম তখন চলছিল আইন ব্যবসায়ের মন্দা কাল৷ দেওয়ানী আদালতে কোনো মোকদ্দমা দায়ের হচ্ছিল না৷ কারণ সরকার কতর্ৃক ইতিপূর্বে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করা হয়েছে৷ সরকার আর জমির প্রজার মাঝখানে এক বা একাধিক খাজনা আদায়কারীর স্বত্ব বিলুপ্ত হওয়ায় সরকারের সরাসরি অধীনস্থ এই সমস্ত প্রজাদের নামে সরেজমিনে তদন্ত করে খতিয়ান তৈরী হচ্ছিল৷ এটার গোড়ায় গলদ ছিল এবং প্রজাদের সর্বনাশ হচ্ছিল৷ পরবতর্ীকালে অশুদ্ধ খতিয়ানগুলি সংশোধনের জন্য প্রচুর মোকদ্দমা দায়ের হতে থাকে৷ অতঃপর জজ আদালত ও উচ্চ আদালতে মামলার জট বাঁধতে থাকে৷ জমির স্বত্বের দাবি ও পাল্টা দাবির নিষ্পত্তি করার উপযুক্ত জায়গাগুলি ছিল নিম্ন আদালত, জজ আদালত, হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট৷ এদের পরিবর্তে এই ভারটি সরকারের কানুনগো ও সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের উপর এসে পড়লো৷ ফলে টাকা নেয়া শুরু হলো এবং নিজের জমি নিজের নামে খতিয়ানে রেকর্ড করানোর জন্য টাকা দিতে হলো, অর্থাত্‍ প্রজাদেরকে নিজের জমি নিজেকে কিনতে হলো৷
এর অনেক বছর পরে তখনকার সময়ের রাজস্ব মন্ত্রীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় এবং কথা হয়৷ আমি তাঁকে জানাই, সরেজমিনে প্রজার খতিয়ান প্রস্তুত করায় প্রজারা সর্বস্বান্ত হয়েছেন৷ ঘুষ দিয়ে নিজের নামে নিজের জমি খতিয়ানে রেকর্ড করাতে হয়েছে অথবা ঘুষ দিয়ে অন্যকেউ জমি রেকর্ড করিয়ে নেয়ায় খতিয়ান সংশোধন করার জন্য আদালতে মোকদ্দমা করে সর্বস্বান্ত হতে হয়েছে৷ কাজেই সরকারের উচিত ছিল জমিদার ও অন্যান্য খাজনা স্বত্বভোগীদের কাছে তাদের প্রজাদের তালিকা চাওয়া এবং সেমতে প্রজাদের খতিয়ান প্রস্তুত করা এবং তালিকা অনুযায়ী তাদেরকে তিপূরণ দেয়া৷ বড় বড় যে কয়জন কলকাতায় বসবাসকারী অনুপস্থিত জমিদার ছিলেন, তাঁদের প্রজাদের জন্য উচ্চপর্যায়ের কর্মচারী দিয়ে খতিয়ান প্রস্তুত করা যেত৷ আমি উদাহরণ দেই, ইংরেজ আমলে আই.সি.এস. অফিসারদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সি.এস. খতিয়ানগুলি রেকর্ড করা হয়৷ প্রাক্তন মন্ত্রী উত্তরে বলেন, তা হলে সব জমিদার তাদের সমস্ত খাসজমি পত্তন দিয়ে দিত, সরকার কোনো খাস জমিই পেত না৷ সরকার কেবল প্রজা আর তাদের দেয়া খাজনা পেত৷
কিন্তু শেষে কি হলো? সরকারের তহশিলদাররা ধনী জমির মালিকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সব খাস জমি লোপাট করল আর ভূমিহীনরা ভূমিহীনই থেকে গেল৷ আর যা ইতিপূর্বে বলেছি, সরকার কতর্ৃক সরাসরি প্রজাদের খতিয়ান প্রস্তুত করায় অনেক প্রজা সর্বস্বান্ত হলেন৷
ধরা যাক কালু শেখ গরীব প্রজা৷ তার কৃষি জমির পরিমাণ এক বিঘার সামান্য বেশী৷ তার পিতা জমিদারের কাছে সেই জমি পত্তন নিয়েছিল এবং ইংরেজ আমলে প্রস্তুত সি.এস. খতিয়ানে সেমত রেকর্ড হয়েছিল৷ পিতা মারা যাওয়ার পর কালু শেখ জমিদারকে খাজনা দিয়েছে এবং নিশ্চয়ই তা জমিদারের সেরেস্তার রেকর্ডে পাওয়া যেত৷ কিন্তু সরকার কতর্ৃক খাজনা প্রস্তুতকালে সরকারের কর্মচারীর কাছে সে-রেকর্ড ছিল না৷ তিনি দেখতে চান প্রজাস্বত্ব প্রমাণের জন্য জমিদারকে খাজনা দেয়ার প্রজার অংশের দাখিলা বা রশিদগুলি৷ সেগুলি তার পিতা ও সে শোবার ঘরের বারান্দার খড়ের চালের বাঁশের বাতায় গুঁজে রাখতো৷ কালু শেখ এই অবস্থায় দাখিলাগুলির একটিও খুঁজে পেল না৷ অথচ জমিদারের কাছে খাজনা দিতে গেলে আগের দাখিলা দেখাতে হতো না৷ খাজনা-আদায়ী খাতা দেখে জমিদারের তহশিলদার খাজনা দাবী করতো এবং প্রজা তার পুরাটা কিংবা আংশিক সাধ্যমত শোধ করতো৷
এখন উপায় কী! কালু শেখ বাজার থেকে চারটি খাজনার দাখিলা কিনে এনে প্রাইমারি স্কুলের একজন পরিচিত ছাত্রকে দাখিলা লিখে দিতে বলল এবং ছাত্রটি পেন্সিল দিয়ে দাখিলা ফর্ম পূরণ করে দিল৷ দাখিলাগুলি দেখলেই বোঝা যায় এগুলি নকল৷ এদিকে কালু শেখের জমির দাখিলা না-থাকার বিষয়টি জেনে যায় তার পাশের জমির প্রজা একজন ধনী কৃষক৷ সে কালু শেখের জমি হস্তগত করার জন্য নিজ নামে কয়েকটি দাখিলা অভিজ্ঞ প্রাক্তন তহশিলদারকে দিয়ে জাল করে নেয়৷ তা ছাড়া সে ঘুষ দিল৷ ফলে কালু শেখ জমি হারাল৷ তার জমি ঐ ধনী লোকের নামে প্রজার খতিয়ানে রেকর্ড হয়ে গেল৷
শেষে বাধ্য হয়ে কালু শেখ মুন্সেফ (বর্তমানে সহকারী জজ) আদালতে ওই খতিয়ান অশুদ্ধ গণ্যে তার পৈত্রিক জমিতে স্বত্ব প্রচারের ডিক্রির প্রার্থনায় মোকদ্দমা ঠুকে দেয়৷ বিচার-অন্তে মুন্সেফ মোকদ্দমা ডিসমিস করলেন এই যুক্তিতে যে, যদিও উভয়পরে দাখিলা জাল, কিন্তু আইনে বাদী প্রমাণ করতে বাধ্য এবং সে ব্যর্থ হওয়ায় বিবাদীও যে তার দাবী প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে তা ধর্তব্য নয়৷ এরপর কালু শেখ আমার চেম্বারে আসে এবং আমি জেলা জজ আদালতে তার প েআপিল দায়ের করি৷ কালু শেখের বিপ েমুন্সেফের ওই যুক্তিটি আইনের দৃষ্টিতে সঠিক ছিল৷ আপিল শুনানির সময়ে ওই যুক্তিটি খণ্ডনের চেষ্টা না-করে জেলা জজকে নিবেদন করি যে, উভয়প জাল দাখিলা দিয়ে জমির স্বত্ব দাবী করছে, কিন্তু কালু শেখের দাখিলা জাল করার একটা ভিত্তি আছে, সেটা হচ্ছে তার পিতার নামে লিপিবদ্ধ সি.এস. খতিয়ান যেটা ইংরেজ আমলে স্বীকৃত শুদ্ধ রেকর্ড৷ জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করার পর সরকার কতর্ৃক সরাসরি খতিয়ান প্রস্তুত না-করলে দাখিলা জাল করার তার দরকার ছিল না৷ অথচ এই জমিটি শুধু অন্যায়ভাবে হস্তগত করার জন্য বিবাদী তার দাখিলাগুলি জাল করেছে৷ জেলা জজ কালু শেখের অনুকূলে রায় দিলেন৷
ইসরাইল মণ্ডলের পৈত্রিক বসতভিটার পরিমাণ ১২ কাঠা৷ সে এই জমির পূর্বাংশের ৩ কাঠা জমি সেলিম শেখকে বার্ষিক ১২ টাকা খাজনায় কোর্ফা পত্তন দিয়েছিল৷ জমিদারী প্রথার সময় জমিদারের পত্তন দেয়া সরাসরি প্রজাস্বত্বের নাম ছিল রায়ত৷ আবার রায়ত তার জমি খাজনা দেয়ার স্বত্বে কাউকে পত্তন দিলে তার প্রজাস্বত্বের নাম ছিল কোর্ফা৷ ওই জমিতে সেলিম বাঁশের বেড়ার আর খড়ের চালের ঘর নির্মাণ করে বাস করত৷ ইসরাইলের বসতঘর একই রকম এবং উভয়েই নিরর৷ সরকার জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত করার পর প্রজাদের নামে খতিয়ান প্রস্তুত করার সময় ুদ্র জমিদার ইসরাইলের একমাত্র প্রজা সেলিমের দাখিলার প্রয়োজন হলো৷ এতকাল নিরর প্রজা তার জমিদারকে খাজনা দিয়েছে, কিন্তু দাখিলা নিতে হবে কিংবা নিরর জমিদার তার একমাত্র প্রজাকে দাখিলা দিতে হবে একথা কারো মনে হয় নি৷ গ্রামের এক মাতব্বরের পরামর্শে সেলিমের অনুকূলে ইসরাইল ওই ৩ কাঠা জমি বিক্রির দলিল রেজিস্টারি করে দিল এবং দলিলে জমির মূল্য লেখা হলো ৫০ টাকা৷ পরে সম্ভবত ওই মাতব্বরেরই যুক্তিতে ইসরাইলের বোন, যে স্বামীগৃহে অন্যত্র বাস করত, ওই বিক্রিত জমি অগ্র-ক্রয়ের জন্য দলিলে লেখা বিক্রিত মূল্য ৫০ টাকা ও আইন অনুযায়ী তিপূরণ বাবদ ৫ টাকা মোট ৫৫ টাকা জমা দিয়ে সেলিমের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের করে৷ এদিকে এতদিনে জমির মূল্য অনূ্যন তিন হাজার টাকা ও বসত গৃহের মূল্য দুই হাজার টাকা বৃদ্ধি পায়৷ উল্লেখ্য সেলিম পনের বত্‍সর সেখানে বাস করেছে৷ মামলার ফল দাঁড়ায় আদালতে জমা দেয়া ৫৫ টাকা নিয়ে সেলিমকে জমি-বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়৷
যদি কোনো যৌথ সম্পত্তির একজন মালিক নিজেদের বাইরে অন্যকারো কাছে তার অংশটি বিক্রি করে, তবে তার শরিক বিক্রিত অংশটি নিজে ক্রয় করার জন্য মোকদ্দমা করতে পারে৷ ওই অগ্র-ক্রয় মোকদ্দমাটিতে সেলিম তার প েএকজন আইনজীবী নিযুক্ত করেছিলেন যিনি মোকদ্দমাটির চূড়ান্ত শুনানির তারিখের কয়েকদিন আগে সেলিমের বিপ েরায় অনিবার্য জেনে মোকদ্দমার নথি ফেরত দেন৷ এরপর সেলিম আমার চেম্বারে আসে৷ আমার পরামর্শ মতো তার বরাবর যে বিক্রয় দলিল রেজিস্ট্রি করেছে সেটা ছুতা এবং ওই জমিতে তার প্রজাস্বত্ব আছে এই মর্মে ইসরাইল মোকদ্দমা দায়ের করে৷ অতঃপর আমার আবেদনমত অগ্র-ক্রয়ের মোকদ্দমার সঙ্গে এই মোকদ্দমাটি যৌথভাবে নিষ্পত্তি হয় এবং ইসরাইলের অনুকূলে রায় হয়৷ এটার জন্য ইসরাইল অনর্থক খরচান্ত হয়৷
১৯০৮ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল অর্থাত্‍ জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত দেওয়ানী মোকদ্দমার সংখ্যা যা ছিল সেটা মুন্সেফ (বর্তমানে সহকারী জজ) আদালত কতর্ৃক মোটামুটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হতো৷ আবার মোকদ্দমার ওই সংখ্যার কারণে সনদ পাওয়ার পরই সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নতুন আইনজীবী হিসেবে মোকদ্দমা পাওয়া সহজ ছিল না৷ সনদপ্রাপ্তির পূর্বে এক বছরের শিানবিশী সময় তো পার করতেই হতো৷ একই সঙ্গে যারা এল.এলবি. ডিগ্রি পাশ করেছিলাম তার মধ্যে আমি সর্বপ্রথম ১৯৫৯ সালের শেষ দিকে এবং অন্যরা পরের বছর শিানবিশী শুরু করেছিলাম৷ কারণ ইতিপূর্বে বলেছি তখন ছিল আইনব্যবসায়ের মন্দা কাল৷ সনদ পাওয়ার পরের বছরটিতে আমি মোট বারটি এবং তার পরের বছরে চবি্বশটি মোকদ্দমা পেয়েছিলাম৷ সেসব ছিল অল্প ফিসের নগণ্য মোকদ্দমা৷
এদিকে প্রজাদের ল ল রেন্ট রোল খতিয়ান অশুদ্ধভাবে তৈরী হওয়ার পর সেগুলি সংশোধন করার জন্য মোকদ্দমা দায়েরের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ অপরদিকে আইনে স্নাতক হওয়ার ছ'মাস পরই একজন সিনিয়র আইনজীবীর চেম্বারে শিানবিশী থাকার সার্টিফিকেট জোগাড় করা সনদ পাওয়ার একমাত্র শর্ত হওয়ায় আইনজীবীদের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে৷
আমি যখন জেলা বারে যোগ দেই, মোকদ্দমার স্বল্পতার কারণে আমার হাতে তখন প্রচুর সময় ছিল৷ তখন ও বিশেষ করে ইতিপূর্বে আদালতে এক বছরের শিানবিশী কালে বার লাইব্রেরীতে ল' রিপোর্টগুলো পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম৷ সত্যি বলতে কি বিকেল পাঁচটার আদালতের হাজিরা খাতায় স্বার দেবার নিয়মের কারণে প্রথমে সময় কাটাবার উপায় হিসেব ল' রিপোর্টগুলো পড়তে শুরু করেছিলাম৷ পরে উপজীব্য বিষয় হওয়ায় সেগুলো পঠনে আগ্রহ জন্মে৷ হাইকোর্টে আইনব্যবসা যখন শুরু করি তখন সেখানেও মোকদ্দমার সংখ্যা বেশি ছিল না এবং নিয়মিত আইন ব্যবসায়ে নিয়োজিত অ্যাডভোকেটদের সংখ্যা ছিল ৫০ জনের মতো৷ ফলে সেখানেও আইনজীবীদের মোকদ্দমার সংখ্যা কম থাকায় বার লাইব্রেরীতে বই পড়ার যথেষ্ট সুযোগ ও সময় পেয়েছিলাম৷
রাজশাহী শহরের পাশর্্ববতর্ী গোদাবাড়ী থানায় কয়েক ঘর সাঁওতাল চাষী পরিবার বাস করেন৷ এঁরা পুরুষানুক্রমে এই এলাকায় বসতি স্থাপন করে বনজঙ্গল কেটে চাষাবাদ করে আসছেন৷ এঁরা প্রকৃতির কোলে মানুষ, তাই প্রকৃতির মতোই এঁদের মন সরল, প্রতারণা কিংবা ধূর্ততা জানেন না৷ জমিদার কতর্ৃক প্রদত্ত খাজনা আদায়ী রশিদ বা দাখিলা জাল করে একজন বাঙালী চাষী এক সাঁওতাল চাষীর জমি নিজ নামে খতিয়ানে রেকর্ড করে নিলে সেটার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা করার জন্য ওই সাঁওতাল চাষী আমার চেম্বারে আসেন৷ ওই জমি সংক্রান্ত ইংরেজ আমলে প্রস্তুত সি. এস. খতিয়ানটি সাঁওতাল চাষীর পিতামহের নাম রায়তি প্রজা হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকায় সদ্যপ্রস্তুত খতিয়ানটি যে অশুদ্ধ তা প্রমাণ করা সহজ ছিল৷ আমার মক্কেলের সঙ্গে আলাপে জানলাম জমিটি তাঁর দখলে আছে৷ সুতরাং নালিশী জমিতে তাঁর স্বত্ব থাকা ও সদ্যপ্রস্তুত খতিয়ানটি অশুদ্ধ মর্মে ঘোষণামূলক ডিক্রির প্রার্থনায় একটি মোকদ্দমা দায়ের করি৷ এই মোকদ্দমায় একটি নির্দিষ্ট কোর্ট ফি দিতে হয়৷ কিন্তু স্বত্ব সাব্যস্তপূর্বক দখল স্থিরতা কিংবা দখল উদ্ধারের মোকদ্দমায় নালিশী জমির বাজার মূল্যের অনুপাতে কোর্ট ফি দিতে হয় যা ওই নির্দিষ্ট কোর্ট ফি-এর চেয়ে অনেক বেশী৷
অবশেষে মোকদ্দমাটির চূড়ান্ত শুনানি শুরু হলো৷ আমার মক্কেল মোকদ্দমার বাদী সাঁওতাল চাষীকে বিবাদীপরে আইনজীবী যখন জেরাতে প্রশ্ন করলেন জমিতে কি তাঁর দখল আছে? তখন তিনি উত্তরে না বললেন৷ আমি তো হতবাক হয়ে গেলাম৷ এই উত্তর দেয়ার অর্থ মোকদ্দমাটি সরাসরি ডিসমিস হবে, কারণ ঘোষণামূলক ডিক্রি প্রার্থনার মোকদ্দমার গ্রহণযোগ্যতার শর্তই হচ্ছে নালিশী জমি বাদীর দখলে থাকতে হবে৷ পরদিন বিবাদীপরে সাীদের জবানবন্দি ও জেরা হবে মর্মে আদালত আদেশ দিলেন৷ রাত্রে চেম্বারে আমার মক্কেলকে জিজ্ঞেস করে জানলাম নিচু জমি হওয়ায় বর্ষকালে ২/৩ মাস জলমগ্ন থাকায় কোনো আবাদ করা যায় না, এখন বর্ষকাল তাই ওই প্রশ্নটির উত্তরে সে না বলেছে৷
এদিকে সরল মানুষটির সরল উত্তরে তার সর্বনাশ হয়ে গেছে৷ কারণ বিবাদীপ এখন বলার সুযোগ পেয়ে গেছে যে, সে বার বছরের অধিককাল যাবত্‍ জমিটি জবর দখল করছে যার ফলে বাদীর স্বত্ব থাকলেও সেটা লোপ পেয়েছে৷ আমার তখন পূর্বে পড়া প্রিভি কাউন্সিলের একটি রায়ের কথা মনে পড়ে৷ রায়টিতে জমিতে বার বছরের ঊধের্্ব বিরুদ্ধ দখলজনিত স্বত্ব উদ্ভবের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এই মর্মে যে, যদি বছরের কোনো সময় ওই জমি দখলভোগ করা না-যায় তবে ওই সময়টিতে জমির স্বত্ব প্রকৃত মালিকের নিকট বর্তাবে৷ অর্থাত্‍ এইরূপ জমিতে জবর দখলকারী ব্যক্তি কখনও একটানা বার বছরের ঊধের্্ব বিরুদ্ধ দখলজনিত স্বত্ব দাবী করতে পারবে না৷ পরদিন আমি চাতুরী করে বিবাদীকে সরাসরি না-করে ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলাম, নালিশী জমিতে তো সারা বছরই চাষাবাদ হয়৷ আমি জানতাম বিবাদী একজন অসত্‍ লোক৷ সে সরল এক সাঁওতালের জমি অন্যায়ভাবে ভোগদখল করার চেষ্টা করছে৷ কাজেই তাকে অতিচালাক হতেই হবে এবং সে কারণে সে ভাববে আমি চাইছি হঁ্যা-বোধক উত্তর৷ তাই সে না বোধক সত্যটিই বললো, না, বছরে ২/৩ মাস বর্ষাকালে কোনো চাষাবাদ করা যায় না৷ এই উত্তরটিতেই আমার মক্কেলের অনুকূলে ভাগ্যনির্ধারণ হয়ে গেল যখন আমি প্রিভি কাউন্সিলের ওই রায়টি আদালতে পেশ করলাম৷ নালিশী জমি বর্তমানে জলমগ্ন থাকায় বাদী বলেছেন সেটা তাঁর দখলে নাই৷ এটা বাস্তব ঘটনা, কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে সেটা তাঁর দখলেই আছে এবং তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় বিবাদী ইতিপূর্বে জবর দখলে ছিল তাহলে তার সে-দখল আইনের দৃষ্টিতে আর নেই৷ অতঃপর আমার মক্কেলের অনুকূলে মোকদ্দমাটিতে রায় হয়৷
কর্মজীবনের পাঠশালার অভিজ্ঞতার যে-বিবরণটুকু দিলাম তাতে দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থার পদ্ধতিগত কোনো ত্রুটির জন্য নয়, দেশের একক শাসক কিংবা শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কারণেই এই ব্যবস্থাটিতে ত্রুটিবিচু্যতি দেখা দিয়েছে৷ বিচার পদ্ধতির কীভাবে উন্নয়ন করা যায় এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার জন্য সময় সময় আইন কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং বোধ করি ভবিষ্যতেও হবে৷ উন্নয়ন শব্দটি এখন সব কাজ ও অকাজের আগে বিশেষণ হিসেবে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে৷ এ পর্যন্ত কমিশনগুলোর যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে তাদের প্রত্যেকটিতে দেখা যাবে হয় দেওয়ানি কার্যবিধির কোনো কোনো অংশ সংশোধন কিংবা পরিবর্তন করার অথবা কোনো অংশের পাশাপাশি বিকল্প পদ্ধতি সংযোজন করার সুপারিশ করা হয়েছে৷
যাঁরা এই সুপারিশগুলো তৈরি করছেন দেখা যাচ্ছে বিচারব্যবস্থায় ত্রুটি-বিচু্যতির উপরোক্ত কারণগুলি তাঁদের জানা নেই৷ দেওয়ানী কার্যবিধি আমাদের দেশে প্রায় এক শত বছর ধরে কার্যকর আছে৷ সময়ের তাগিদে কোনো কোনো অংশ সংশোধন, সংযোজন কিংবা বিলুপ্ত হওয়ায় আমরা এই পদ্ধতিতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি৷ শুধু তাই-ই নয়, ইংরেজ শাসক এটা শ্রীলঙ্কা ও বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) এবং পরবতর্ীকালে মালয়েশিয়া ও নাইজেরিয়াতেও চালু করেছিল এবং ওই দেশগুলোতে এটার কারণে বিচারব্যবস্থায় বাংলাদেশের অনুরূপ ত্রুটি-বিচু্যতি যে দেখা দিয়েছে তা নয়৷
নিম্ন আদালতগুলোতে যে দুনর্ীতি দেখা যাচ্ছে এবং মামলাগুলির নিষ্পত্তিতে দেরি ও খরচ হচ্ছে তার প্রধান কারণটি হচ্ছে নির্বাহী বিভাগের বেড়াজালে বিচার বিভাগকে আটকে রাখা, এবং সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ২২ অনুচ্ছেদের বাক্যটি 'রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবে'_সেটাকে উপো করা৷ ব্যক্তিগতভাবে আমার জানা একটি ঘটনার কথা বলছি৷ তখনকার আইনমন্ত্রীর নির্দেশমত একজন সহকারী বিচারক রায় দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে এক বছরের মধ্যে তিনবার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হয়েছিল৷ বদলি হওয়ার কিংবা পদোন্নতি না-পাবার ভয়ে কোনো বিচারক যদি অন্যায্য রায় দেন তবে সেটা কি আসলে ওই কর্মব্যক্তিই করলেন বলা যায় না?
সঠিক অর্থে সেটাই বলা যায় এবং কর্তাভজা ব্যবস্থাটি থাকার কী কুফল ঘটে সেটা বলছি৷ বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ গাঁটছড়া বাঁধা অবস্থায় থাকার অর্থ বিচারব্যবস্থাও বু্যরোক্রেসির অংশ হয়েই থাকা৷ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার স্বার্থে ইংরেজ শাসনামলে যে বু্যরোক্রেসি বা আমলাদের পরিচালিত শাসনব্যবস্থা চালু করা হয় সেটা ১৯৪৭ সালের পর থেকে এমনকি ১৯৭১ সালের পরও বাংলাদেশে চালু রয়েছে এবং এই শাসনব্যবস্থা তথা আমলাদের চরিত্র ঔপনিবেশিককালের আদি যুগ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সময় থেকে একটুও বদলায়নি বরং দাপট বেড়েছে৷ ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত অয় কুমার ঘোষাল তাঁর একটি গবেষণামূলক গ্রন্থে লিখেছেন, 'পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবস্থা চালু থাকার কারণে আমলাদের কর্মদতা উত্‍সাহ না-পাওয়ার কারণে চাকরি েেত্র তাদের মধ্যম ধরনের মান বজায় রাখার প্রবণতা দেখা যায়৷ কোনো গুরুতর সমস্যা সমাধানে তাদের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত আগ্রহ দেখা যায় না, যদি না সেটার জন্য চাপ দেয়া হয় এবং তখন সে কাজটি একজন সুবিধাবাদীর মতোই সম্পন্ন করা হয়৷'
আমি এখন একটি সরল প্রশ্ন আশা করছি৷ তবে কি বিচার বিভাগ স্বাধীন করলে, প্রধান বিচারপতির পরামর্শে বিচারপতিরা নিয়োগ পাবার ব্যবস্থাটিকে সংবিধানে পুনরায় প্রতিস্থাপিত করলে ও আইনজীবীদের সনদ পাওয়ার নিয়মগুলো পুনঃপ্রবর্তন করলে বিচার ব্যবস্থা ঠিকঠাক হয়ে যাবে? সেটা তো অবশ্যই করণীয় কাজ৷ কিন্তু সেটাও যথেষ্ট নয়৷ এতদিনে পদ্মা মেঘনা যমুনা দিয়ে বিস্তর জল গড়িয়ে গেছে৷ বাংলার জনসাধারণ রক্তয়ী মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন৷ অতএব বাংলার সাধারণ মানুষের জন্য গণমুখী বিচার ব্যবস্থা চাই-ই এবং এটাই আমার স্মারক বক্তৃতায় শিরোনাম৷
ঔপনিবেশিক শাসনে ন্যায় কিংবা উপযুক্ত বিচার পাওয়া জনগণের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত ছিল না এবং এর মাত্রা বিচারপ্রাথর্ীর সামাজিক অবস্থানভেদে শাসকের দয়ার ওপর নির্ভর করত৷ একটি স্বাধীন দেশে কিন্তু ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদ বিবেচনার বাইরে সকল নাগরিকই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী থাকেন৷ এটা সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার এবং তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া জরুরী এই বিধান যে, শাসনব্যবস্থার মতো বিচার কাজেও জনগণের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে৷
তাই দেওয়ানী কার্যবিধিতে জনগণের সম্পৃক্ততা ব্যবস্থাটি সংযোজন করার বিষয়টি আলোচনা করা যাক৷ কিন্তু এটা সফল হবে না যতদিন না জনকতর্ৃত্বের সরকার তথা স্থানীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত না হয়৷ বাংলাদেশের সংবিধানের নির্বাহী বিভাগ শিরোনামে চতুর্থ ভাগের অন্তর্গত ৪৮ থেকে ৬০ অনুচ্ছেদগুলোর বিন্যাস বা পরিকল্পনা ল্য করা যাক৷ এগুলোকে তিনটি উপশিরোনামে তিনটি পরিচ্ছেদে শ্রেণীভাগ করা হয়েছে৷ ৪৮ থেকে ৫৪ অনুচ্ছেদগুলি ১ম পরিচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি উপশিরোনামে অন্তভর্ুক্ত করা হয়েছে৷ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা, এই উপশিরোনামের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রয়েছে ৫৫ থেকে ৫৮ অনুচ্ছেদগুলি৷ তৃতীয় পরিচ্ছেদের উপশিরোনাম হচ্ছে স্থানীয় শাসন এবং এতে আছে ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদ দুটি৷ সুতরাং সংবিধান প্রণেতাগণের আকাঙ্ায় ছিল জনগণের আকাঙ্ার প্রতিই স্বীকৃতি, অর্থাত্‍ অঙ্গীকার এই যে গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রটির যে প্রাসাদ তৈরী হবে তার ভিত্তি হবে স্থানীয় শাসন৷ খাঁটি নির্ভেজাল গণতন্ত্রের সংজ্ঞা তিনটি শর্তের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত৷ প্রথম শর্তটি হচ্ছে, এটা জনগণের জন্য৷ দ্বিতীয়টি, এটার মালিকানা জনগণের, এবং তৃতীয়টি, এটাতে জনগণের কতর্ৃত্ব থাকবে৷ তবে তৃতীয় শর্তটি অনুপস্থিত থাকলে অপর দুটি শর্ত গণতন্ত্রের খোলসে রূপ নেয়, পূর্ণ গণতন্ত্র হয় না৷ তৃতীয় শর্তবিহীন যে শাসনব্যবস্থা সেটাতে থাকে আমলাতান্ত্রিক সংগঠনগুলোর প্রবল রাজত্ব৷ সেখানে জনগণের আদৌ উপস্থিতি নেই কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, জনগণের প্রবেশাধিকার নেই৷ মতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে সমাজে অন্যায়, অনাচার ও মতার দাপট দেখা দেয় যা আমরা এখন শুধু দেখছি না, যার আমরা ভুক্তভোগীও বটে৷ কাজেই সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত স্থানীয় শাসনব্যবস্থা চালু হলে প্রত্যেকটি স্থানীয় শাসনের এলাকায় একটি দেওয়ানী ও অপরটি ফৌজদারী আদালত থাকবে এবং বিচারকার্যে জনগণের সম্পৃক্ত করার কাজটি সম্ভব হবে৷
স্থানীয় শাসনের সবচেয়ে বড় সুফল হলো সুনির্দিষ্ট এলাকাটিকে কেন্দ্র করে নাগরিক সমাজ গড়ে ওঠা৷ মতা বিকেন্দ্রীকরণ হওয়ায় রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে ওঠে এবং তখন ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড জনমতের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুরাগ-বিরাগের গণ্ডির বাইরে যাবার সুযোগ পায় না৷ বিচারব্যবস্থার কেন দরকার হয়? নাগরিক সমাজ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত৷ তারা বিপরীত স্বার্থে নানা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত৷ তাই সকলের স্বার্থে ভারসাম্য রার জন্য বিচারব্যবস্থার আবশ্যক৷ কিন্তু বিচারব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ার আদালতটি সমাজনিরপে স্থানে থাকায় সেটা বিবদমান পদের একটি যুদ্ধত্রে হিসেবে এবং কার্যবিধিও ব্যক্তিনিরপে হওয়ায় সেটা চতুর বাদী কিংবা বিবাদী কিংবা তাদের আইনজীবীর একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ তাই এখনকার বিচারব্যবস্থায় সাী প্রমাণে অসততা ও যুক্তিতর্কে চতুরতা প্রদর্শনে সুযোগ থাকে৷
এই গুরুতর প্রথম ত্রুটিটি দূর করতে চাইলে স্থানীয় শাসনের কেন্দ্রে আদালত স্থাপন করতে হবে৷ যেহেতু ওই কেন্দ্রে স্থানীয় শাসনের ও সমাজের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, সেহেতু আদালত প্রাঙ্গণ সমাজনিরপে না হয়ে সেটাও সমাজের অন্যসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মিলেমিশে যাবে৷ সেখানে সাী প্রমাণে অসততার কৌশল নিলে সমাজে ধিক্কৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে৷ দ্বিতীয় ত্রুটি থেকে রা পেতে হলে বিচারপদ্ধতিতে জুরি প্রথা সংযোজিত করতে হবে৷ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে দেওয়ানী কী ফৌজদারী বিচারে জুরিপ্রথা চালু আছে৷ তাই নাগরিক সমাজ থেকে মনোনীত জুরিবর্গের তালিকা তৈরী করতে হবে৷ আদালতের মামলার সত্যবিষয় নির্ণয় করার জন্য তাদের মধ্যে থেকে তিন কিংবা পাঁচজন শপথবদ্ধ জুরির সাহায্যে বিচারক মামলাটি নিষ্পত্তি করবেন৷ যেহেতু জুরিরা স্থানীয় নাগরিক সমাজের অন্তভর্ুক্ত, সেহেতু মামলার কার্যক্রম ব্যক্তিনিরপে হওয়ার আশঙ্কা থাকবে না৷ বিচারিত অবস্থার মধ্যে বিচারক থাকবেন অবশ্যই পপাতশূন্য মানসিকতা নিয়ে, কারণ সেটা তার স্থানীয় সমাজের সঙ্গে দায়বদ্ধতা থাকার বাধ্যবাধকতা৷
শুরুতেই বলেছি দেওয়ানী বিচারব্যবস্থাই হবে আমার আলোচ্য বিষয়৷ তবে ফৌজদারী বিচারব্যবস্থায় সবচেয়ে অবহেলিত অথচ জরুরী হচ্ছে দণ্ড প্রদানের বিষয়টি, যেটা বিচারপতি হিসেবে কয়েক বছর ফৌজদারী আপিল মোকদ্দমাগুলি নিষ্পত্তি করার আমার অভিজ্ঞতার ছাঁকনিতে চালা যায়৷ ফৌজদারী মামলায় একজন বিচারকের রায়ের প্রথম বিচার্য বিষয় হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির নির্দিষ্ট একটি বা একাধিক ধারার আওতায় আনীত অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে কি না তা বিবেচনা করা৷ সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক হলে পরবতর্ী বিচার্য বিষয় হচ্ছে, ওই দণ্ডবিধির ধারার আওতায় কী পরিমাণ শাস্তি প্রদান সমুচিত হবে৷ তদন্ত শেষে পুলিশ কর্তৃক প্রদত্ত অভিযোগনামার ভিত্তিতে সাধারণত বিচারকার্য শুরু হয়৷ আসামী আদালতে উপস্থিত হলে বিচারক তাকে জামিনে মুক্তি দেন অথবা হাজতে পাঠান৷ পরবতর্ী স্তরে মামলাটির শুনানি শুরু হলে সাীদের সা্য ও জেরা লিপিবদ্ধ করা হয়৷ তারপর উভয়পরে যুক্তিতর্ক শোনা হয়৷ সবশেষে বিচারক তাঁর রায়ে অভিযুক্তকে শাস্তি অথবা অব্যাহতি দেন৷
রায় কীভাবে লিখতে হবে? ফৌজদারী কার্যবিধির একমাত্র ৩৬৭ ধারাই এ-বিষয়ে নির্দেশ দেয় : "৩৬৭৷ রায়ের ভাষা, রায়ের বিষয়বস্তু, বিকল্প রায় : ১. এই বিধিতে নিম্নরূপ বিধান ব্যক্ত না থাকিলে এইরূপ প্রত্যেকটির রায় আদালতের হাকিম কতর্ৃক বা তাহার শ্রুতলিখন হইতে আদালতের ভাষায় বা ইংরেজী ভাষায় লিখিত হইবে এবং উহাতে বিচার্য বিষয়সমূহ, সেই সম্পর্কে সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্তের কারণসমূহ থাকিবে এবং হাকিম যখন নিজ হাতে উহা না লিখেন তখন রায়ের প্রত্যেকটি পৃষ্ঠায় তিনি স্বার করিবেন৷ ২. আসামী যে অপরাধে ও দণ্ডবিধি বা অন্যকোন আইনের যে ধারায় দণ্ডিত হইল এবং তাহাকে যে দণ্ড দেওয়া হইল, রায়ে তাহা স্পষ্ট উল্লেখ থাকিবে৷ ৩. দণ্ডবিধি অনুসারে দণ্ড দেওয়া হইলে অপরাধটি উক্ত বিধির দুইটি ধারার মধ্যে কোন ধারার অন্তভর্ুক্ত অথবা একই ধারার দুইটি অংশের মধ্যে কোন অংশের অন্তভর্ুক্ত সেই সম্পর্কে সন্দেহ থাকিলে আদালত স্পষ্টরূপে উহা প্রকাশ করিবেন এবং বিকল্প রায় প্রদান করিবেন৷ ৪. রায়ে আসামীকে খালাস দেওয়া হইলে, যে অপরাধ হইতে আসামীকে খালাস দেওয়া হইল, রায়ে তাহার উল্লেখ করিতে হইবে এবং নির্দেশ দিতে হইবে যে, তাহাকে মুক্তি দেওয়া হউক৷ ৫. আসামী যদি মৃতু্যদণ্ডে দণ্ডনীয় কোন অপরাধে দণ্ডিত হয় অথবা তত্‍পরিবর্তে তাহাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কয়েক বত্‍সর মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তাহা হইলে আদালত রায়ে উক্ত দণ্ডদানের কারণ উল্লেখ করিবেন৷"
এ কথা জানা দরকার যে, ফৌজদারী কার্যবিধি শতাধিক বছর আগে ১৮৯৮ সালের মার্চ মাসে প্রণীত হয় এবং উদ্ধৃত ধারাটির এ যাবত্‍কাল কোনো সংশোধন বা সংযোজন ঘটে নি৷ ধারাটিতে এমন কোনো নির্দেশ নেই যে, অপরাধী সাব্যস্ত করার পর একটি নির্দিষ্ট তারিখে দণ্ড নির্ধারণ বিষয়ে আর একটি শুনানি হবে; বরং ধারাটি এই নির্দেশ দেয় যে, দোষী সাব্যস্ত ও দণ্ড নির্ধারণ একইসঙ্গে করে রায়ে লিখতে হবে৷ ধারাটিতে উপরোক্ত নির্দেশের অভাব থাকাটি আধুনিক ভাবধারার আলোকে একটি গুরুতর ত্রুটি৷
হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি থাকাকালীন ত্রুটিটি উল্লেখ করে আমি কয়েকটি সুপারিশসহ একটি ফৌজদারী আপিলে রায় দেই যা 'বাংলাদেশ ল' ক্রনিকলস'-এর ৪র্থ খণ্ডের ২৬৪-৬৫ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে৷ রায়টিতে মন্তব্য করি যে, ভারতীয় সংসদ কতর্ৃক ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কার্যবিধি পুনর্লিখিত হয়ে তাতে কয়েকটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে৷ এর মধ্যে একটি ধারা হচ্ছে, আদালত কতর্ৃক কোনো অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তার দণ্ডের মেয়াদ বিষয়ে সে বা তার আইনজীবী আদালতে যুক্তি পেশ করবেন এবং তারপর আদালত দণ্ডের মেয়াদ নির্ধারণ করবেন৷ উপরন্তু ভারতীয় সংসদ ১৯৫৮ সালে 'দি প্রবেশন অব অফেন্ডারস অ্যাক্ট' (অপরাধীদের অবো আইন) প্রণয়ন করেছে৷ যেসকল অপরাধী মৃতু্যদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ করে নি এবং অপরাধটি তাদের প্রথম অপরাধ তাদেরকে তিরস্কার করে ছেড়ে দেয়ার অথবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মুচলেকা দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দেয়ার মতা আদালতকে এই আইন দিয়েছে৷ মুচলেকা দেয়া অবোধীন অপরাধীদের ওপর নজর রাখার জন্য এই আইনে অবেণ-কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থা করেছে৷
দণ্ড প্রদান বিষয়ে পুরাতন মতটি হচ্ছে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় একজন অপরাধীকে শাস্তি দিতে হবে৷ এই মতটিতে অপরাধকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং অপরাধী ব্যক্তি গৌণ বিধায় শাস্তি নির্ধারণকালে তাকে বিবেচনায় আনা হয় না৷ আধুনিককালে এই মতটি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে৷ এখন দণ্ড নির্ধারণে অপরাধীকে একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনায় আনা হয়৷ মত দুইটির মধ্যে তফাত্‍ এই যে, প্রাচীন মতে দণ্ডটিকে অপরাধের উপযুক্ত হতে হবে এবং আধুনিক মতে দণ্ডটিকে অপরাধী ব্যক্তির উপযুক্ত হতে হবে৷
আধুনিক মতের ভিত্তিতে একজন অপরাধীকে শাস্তি দিতে হলে তার বিষয়ে দণ্ডপূর্ব তদন্ত করে প্রতিবেদন বিচারকের সামনে উপস্থিত করা আবশ্যক৷ বর্তমানে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার বিচারব্যবস্থায় দণ্ডপূর্ব তদন্ত একটি প্রচলিত নিয়ম৷ কিন্তু ভারতীয় আইনজ্ঞগণ তাঁদের দেশে এই পদ্ধতি কার্যকর করা সফল হবে কিনা সে-বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন৷ কারণ তাঁদের মতে তাঁদের দেশে তদন্ত কর্মকর্তাদের প েঅসত্‍ হওয়ার খুবই সম্ভাবনা রয়েছে৷ তবে তাঁরা এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, দণ্ডপূর্বক শুনানির জন্য ভারতীয় ফৌজদারি কার্যবিধিতে একটি ধারা সংযোজন করায় তা আধুনিক মতের সঙ্গে অনেকটা সংগতিপূর্ণ হয়েছে৷
এত আলোচনার পরও আরো একটি সমস্যা থাকছে৷ সেটা হলো দণ্ড প্রদানের মাপকাঠি কী হবে? প্রশ্নটি প্রথমত আত্মনিষ্ঠ (ংঁনলবপঃরাব) এবং দ্বিতীয়ত বিষয়নিষ্ঠ উত্তর দেওয়া আবশ্যক৷ একটি দ্বৈত বেঞ্চে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি থাকাকালীন একটি রায়ে আমি আত্মনিষ্ঠ উত্তরটি দেই এভাবে যে, দণ্ডাদেশ অবশ্যই এত সদয় হবে না যা অপরাধের মাত্রার তুলনায় খুবই কম, অন্যদিকে এত কঠোরও হবে না যার ফলে একজন অপরাধীকে এমন এক না-ফেরা অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হবে যে, সে সমাজের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠবে এবং কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হয়ে বরং এই ধারণা পোষণ করবে যে তার প্রতি রূঢ় ব্যবহার করা হয়েছে৷ রায়টি 'মেইনস্ট্রিম ল' রিপোর্টসে'র ১ম খণ্ডের ৫৯-৬১ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে৷
এখন প্রশ্নটির বিষয়নিষ্ঠ (ড়নলবপঃরাব) উত্তর দেয়া যাক৷ সকল আদালতের বিচারকদের কাছে যেমন দণ্ড প্রদানে সমতা আশা করা যায় না, তেমনি আদালতগুলোর দণ্ডাদেশে অসংগতিপূর্ণ থাকাও অভিপ্রেত নয়৷ এই বিষয়ে আমেরিকার বিচারকগণ একটি কার্যকর কৌশল গ্রহণ করেছেন৷ সেখানে প্রতিটি স্থানীয় আদালতের বিচারকগণের সমন্বয়ে একটি দণ্ড প্রদান-বিষয়ক পরিষদ আছে এবং প্রায়শ বিচারকগণ পরিষদে মিলিত হয়ে স্ব স্ব কোর্টে বিচারাধীন ফৌজদারী মোকদ্দমাগুলিতে দণ্ড নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করেন এবং দণ্ডাদেশ কী হওয়া উচিত্‍ তা স্থির করেন৷
এই পদ্ধতিতে অবশ্য একটি ত্রুটি আছে৷ একটি বিচারাধীন মোকদ্দমায় পরিষদ কতর্ৃক দণ্ড পূর্বাহ্নেই নির্ধারিত হওয়ায় দণ্ডপূর্ব শুনানি কেবল আনুষ্ঠানিক হয়ে পড়বার সম্ভাবনা থাকে৷ এই ত্রুটি দূরীকরণে কয়েকজন আইনজ্ঞ একটি প্রস্তাব রেখেছেন৷ তাঁদের মতে, যেহেতু দণ্ড প্রদানে আইনীজ্ঞান অপো ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক বিষয়ক এবং মানসিক-বিষয়ক জ্ঞান অধিকতর প্রয়োজন এবং তদুপরি যেহেতু একজন বিচারক মামলার সংখ্যার চাপে ব্যস্ত থাকেন, সেহেতু দণ্ডবিধির আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী কি না কেবল সে-বিষয়ে রায় দিবেন৷ কিন্তু দণ্ড নির্ধারণ করবেন ওইসকল বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে-গঠিত একটি পরিষদ৷
উপরোক্ত প্রস্তাবটিও সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়৷ কারণ এতে দণ্ড প্রদানের ভার দেয়া হয়েছে একটি পরিষদকে, যেখানে কোনো বিচারক থাকছেন না৷ কিছু আইনজ্ঞরা এরও একটি সমাধান দিয়েছেন৷ একজন বিচারক অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করার পর তাকে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন শাস্তি দিবেন৷ পরবতর্ীকালে উপরোক্ত পরিষদ শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধীর ব্যবহারাদি বিবেচনা করে ওই দণ্ডকালের মধ্যবতর্ী সময়ে ছাড়া পাওয়ার তারিখ নির্ধারণ করতে পারবেন৷ ১৯৩৭ সালে হেগ শহরে তুলনামূলক আইন-বিষয়ক মহাসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে শেষোক্ত পদ্ধতিটির অনুকূলে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল৷




সমাজ-রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র আয়োজিত সাহিত্যিক এম. ইব্রাহিম দ্বিতীয় স্মারক বক্তৃতা হিসাবে প্রদত্ত৷ ২৩ ডিসেম্বর ২০০৬



  © Notun Diganta 2007.
All Rights Reserved
Powered by headoffice