আমরা আরো একটি স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করলাম, ইতিমধ্যে আমাদের অগ্রগতির মাইলফলকে উন্নতির নানা চিহ্ন উত্কীর্ণ হয়েছে৷ চিহ্নগুলো অস্পষ্টও নয়৷ দালানকোঠা প্রচুর উঠেছে, প্রতিনিয়ত উঠছে৷ মোবাইল ফোনের ব্যবহার দাঁড়িয়েছে আকাশচুম্বী৷ ভোগ-উপভোগের সীমাপরিসীমা নেই৷ বিদেশ থেকে বাংলাদেশীদের পাঠানো টাকার পরিমাণ বেড়েছে৷ কেবল যে তৈরী পোশাক তা নয়, ওষুধপত্রও আমরা রপ্তানী করছি৷ খাদ্য উত্পাদন স্থবির হয়ে থাকে নি৷ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সূচকও খারাপ নয়৷
কিন্তু যে প্রশ্নটা বারবার আসে, আসা দরকার, এলে ভালো, সেটা হলো এসব উন্নতিতে জীবনযাত্রার গুণগত মান কতটা বাড়লো৷ বলাই বাহুল্য, পরিমাণের বৃদ্ধি মানেই যে গুণের বৃদ্ধি এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই৷ মাথাপিছু আয়ের হিসাব দিয়েও উন্নতির উত্কর্ষ বোঝানো যাবে না৷ ধরা যাক বিদু্যতের সরবরাহ, সেটা যদি না বেড়ে থাকে তাহলে উন্নতির হাঁকডাক অর্থহীন শোনাবে, শোনাচ্ছেও৷ কর্মসংস্থানের একেবারে অপরিহার্য েেত্র অগ্রগতি যে সামান্যই ঘটেছে সেটাও একটি ভ্রূকুটি বটে৷ পানির সঙ্কট বাড়ছে৷ পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা অপ্রতুল৷
নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে বলা চলে, মেয়েরা তো বটেই ছেলেরাও নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে না৷ নিরাপত্তা বিধানে নিয়োজিত বাহিনীসমূহের সদস্যদেরকে নিজের বাড়ির দরজায় দেখলে কোনো নাগরিকই বলতে পারবেন না যে তিনি নিরাপদ বোধ করছেন৷ শিশু বেড়ে ওঠে অবহেলায়, প্রবীণদের অবজ্ঞা চলে নিরন্তর৷ এসবই নিষ্ঠুর সামাজিক বাস্তবতা৷
বড় একটা জিজ্ঞাস্য এটা যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবাহ নিবিড়ভাবে নির্ভর করে যে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর তা কী সত্যি সত্যি বিদেশীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে? গেলে আমাদের অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? খুলনার মংলা বন্দরকে উন্নত করলে দেশের অর্থনীতির প্রভূত উপকার হতো, অথচ সেই বন্দরকে ম্রিয়মান করে রাখা হচ্ছে৷ কাজটা যে শুভবুদ্ধির পরিচায়ক এমন তো বলা যাবে না৷ বন্দর নিয়ে চিন্তা করাটা একেবারেই অত্যাবশ্যকীয়৷
উন্নতির বিদ্যমান ধারাপ্রবাহটি যে মোটেই মানবিক নয় তার নিশ্চিত প্রমাণ হলো এই উন্নতির প্রকোপে নদীর দুর্দশা৷ প্রায় সব নদীরই এপাড় ওপাড় দখল হয়ে গেছে, কোনো কোনটি শুকিয়ে গেছে, আর কিছু কিছু নদীর পানি অচিন্ত্যনীয় রূপে দূষিত৷ যেমন ঢাকা শহরের চারটি নদী_বুড়িগঙ্গা, শীতল্যা, বালু ও তুরাগ তো উন্নতির বর্জ্য বহন করে মৃতু্যশয্যায় শায়িত হয় নি, বলা হচ্ছে যে তারা মারাই গেছে৷
অন্য সবকিছুর মতো উন্নতিরও একটা দর্শন থাকে৷ বাংলাদেশে উন্নতির যে দর্শনটি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সেটি হলো অন্যসব বিবেচনাকে পদদলিত করে ব্যক্তিকে বড় করে তোলার৷ একজন বড় হবে নয়জনকে দাবিয়ে দিয়ে, নীতি এটাই৷ কিন্তু এর ফলে ওই একজনের উন্নতি যে মোটেই নিরাপদ হচ্ছে না, এমনকি সেটাও বিবেচনার মধ্যে আসছে না৷ উন্নয়নে-আহত ওই নয়জনের কারণে উন্নতিকে ঘরে বাইরে পাহারাদারের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে৷ বস্তি উচ্ছেদ করেও কূল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার নতুন বস্তি বসছে৷ পরিবেশ অদূষিত থাকছে না, প্রতিনিয়ত নোংরা হচ্ছে৷ উন্নতদের প েএসব সহ্য করা কঠিন হতো যদি তাদের বিবেক না-থাকুক অন্তত কিছুটা চুলজ্জা থাকতো৷
সর্বত্র তত্পরতা চলছে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তি-মালিকানায় তুলে দেবার৷ ব্যক্তি-মালিকানায় সবকিছু ভালো চলে এমনটা প্রচার করা হচ্ছে৷ কিন্তু ব্যক্তি মালিকানা আসলে যে কী জিনিস সে নিয়ে তো আমরা যখন অনুন্নত ছিলাম তখনো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি৷ সেটা হলো নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে আবর্জনাগুলো প্রতিবেশীর আঙ্গিনায় নিপে করা, আর প্রতিবেশী যদি নিজের চেয়ে ধনী হয় তবে আবর্জনা রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসা৷ ব্যক্তিমালিকানা ওই কাজটাই বেশ পরিচ্ছন্নভাবে সম্পন্ন করছে, নিজেকে সুশ্রী করে বর্জ্যগুলোকে ফেলছে রাস্তা অথবা নদীতে৷
এই ধরনের উন্নতির পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য৷ যাঁরা দেশের ভবিষ্যত নিয়ে ভাবেন এবং নিজেদেরকে দেশপ্রেমিক বলে বিবেচনা করেন তাঁদের জন্য তাই একটি প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে উন্নতির এই ধ্বংসাত্মক ধারার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো; এবং উন্নতি যাতে সামাজিক হয়, সমষ্টির স্বার্থে লাগে, ব্যক্তির মুক্তি যাতে সমষ্টির শত্রুতার পরিবর্তে সহযোগিতা লাভ করে, সেটা নিশ্চিত করা৷
একথা কিছুতেই ভুললে চলবে না যে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকশিত হয় সামাজিকতা ও মননশীলতার একত্র অনুশীলনে৷ সেটা না-ঘটলে মানুষ আর মানুষ থাকে না, বন্য প্রাণীতে পরিণত হয়৷ আমাদের এই জনপদ জঙ্গলে পরিণত হোক এটা নিশ্চয়ই আমরা চাইবো না৷ সামাজিকতা ও মননশীলতা বৃদ্ধির প্রধান উপায় হচ্ছে সাংস্কৃতিক কাজকে জোরদার করা৷ পাড়ায়-মহল্লায় গ্রন্থাগার ও পাঠাগার চাই৷ দরকার খেলার মাঠ, প্রয়োজন নাটক, বিতর্ক, গান, নৃত্য, পত্রিকাপ্রকাশ, প্রদর্শনীসহ বহু ধরনের আয়োজন৷ সেই সঙ্গে আবশ্যক হচ্ছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং টেলিভিশনে অবাধ আলোচনা৷ বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো বৈষয়িক উন্নতি যত বাড়ছে ব্যক্তির সামাজিকতা ও মননশীলতার জগতটা ততই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে৷ ছোট হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী৷ ব্যাপারটা মোটেই উপেণীয় নয়৷
নতুন দিগন্তের সকল পাঠক, লেখক ও শুভানুধ্যায়ীর জন্য বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা রইলো৷