কবি আমিনুল ইসলামের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ মহানন্দা এক সোনালী নদীর নাম৷ কবি এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় যেমন আপন স্মৃতির এ্যালবামকে একটি একটি করে পাতা খোলার মতো দেখিয়েছেন পাঠককে, তেমনি পরম মমতায় নিজেকে মেলে ধরেছেন ভাবে-ভাষায়-উপমায়৷ কবির বাল্য কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতি কবিতাগুলির ভূমিতল, এবং নাগরিক অভিজ্ঞতার আলোকে মাটি ও মানুষকে দেখা সেই ভূমিরই ফসল৷ প্রকৃতি যে কতোভাবে একজন সৃজনশীল মানুষকে মুগ্ধ ও প্রাণিত করতে পারে এই গ্রন্থে সংকলিত কবিতাগুলো তার প্রমাণ৷ উত্তরাঞ্চলের এক গ্রাম্য কিশোরের হাত ধরে আধুনিক শব্দরূপকে পাঠক পেঁৗছে যান মহানন্দার তীরে৷
মহানন্দা উত্তরবঙ্গের নদী৷ কালের সাী, সভ্যতার নিয়ামক৷ এই বিজ্ঞানের যুগে জীবনে ও কাব্যে সবুজ প্রকৃতি যখন প্রায়-উপেতি কিংবা শাহরিক নান্দনিকতায় আচ্ছন্ন, তখন আমিনুল ইসলাম কাব্যসংকলনের নাম রেখেছেন মহানন্দার নামে৷ নাম কবিতার শেষে আপে করেছেন 'আমাদের একজন অদ্বৈতমল্ল নেই; থাকলে আমরাও পেতাম/ কালের স্রোতে মহানন্দা এক সোনালী নদীর নাম৷'
বোঝা যায়, মহানন্দার মতো নদী ও নদীমাতৃক শৈশবকে কবি ভুলতে পারেন নি৷ মহানন্দাতীরের এই মুগ্ধ যুবক এক পলকের জন্যে এটা ভোলেন না যে, তিনি যান্ত্রিক যুগের অমানবিক সম্পর্কহীনতার মানববিশ্বে বেঁচে আছেন৷ কবিতায় কবির জৈবিক ও মানসিক বেড়ে ওঠার ছবি, প্রেম ও হতাশার হাহাকার, ব্যক্তি-মানুষ ছাড়িয়ে গণমানুষের প্রত্যাশার উচ্চারণ যেন মিলেমিশে ভিড় করে আছে৷ 'শেকড় ছুঁয়ে' কবিতাটিতে কবি যখন বলেন, 'সত্তার গভীরে বারুদের গন্ধে টের পাই/ আমার শেকড়-সংশ্লিষ্টতায় যে মাটিজল/ তা কোনো এক উত্তাল অতীতে পুড়েছিল/ পোড়ামাটি নীতির লোভী বর্বর অনলে/,' তখন কবির সমাজ ভাবনার স্বচ্ছতা, মৃত্তিকা-সংলগ্নতা বিষয়ে নিঃসন্দেহ না হয়ে উপায় থাকে না৷
কবির কবিতার পরতে পরতে খুঁজে পাওয়া যাবে এমন এক গ্রামীণ কিশোরকে যে বিলাতের 'টেমসের জলের কাছে' গিয়েও সেখান থেকে ফিরে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন জন্মমাটির জীবনচিত্রে,
দেখি দু'পাশে দুলিয়ে নজরুলবাবরি
বয়াতি আবদুর রহমান মাতিয়ে তুলেছে স্বয়ংসৃষ্ট
ভিড়ের আসর৷
আমিনুল ইসলাম, মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম, টিমওয়ার্ক পাবলিকেশন, ঢাকা, ৫০ টাকা
আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ কবির প্রিয় অনুষঙ্গ; অথচ ব্যর্থতার গ্লানি কবির মনে ত এঁকেছে৷ 'ভোরের হাওয়ায় ভাসে বাংলাদেশ' কবিতায় দেখি_
একটু এগিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বিজয়স্তম্ভ
যেন দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হার না-মানা দিন! ওপাশে
দুবলহাটির বাতাসে চড়ে ভেসে আসে আস্তান মোল্লার কণ্ঠ
'না! আর খাজনা বৃদ্ধি নয়, তোমার জুলুম আর সইব না রাজা৷'
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অমতার অনবদ্য রূপক 'থুথু' কবিতাটি৷ 'আমরা থুথু দিই৷ ওয়াক থু!/ দেখুন_আমাদের হাল আমলের অভ্যাস/ আপনারা যারা বিদেশি, দয়া করে/ ভয় পাবেন না৷ আমরা কিন্তু/ ভিনদেশি কাউকে থুথু দিই না৷'
গ্রন্থের নাম-কবিতাটি যেন কবির বরেন্দ্রভূমির হাহাকারেরই অন্য নাম৷ তাঁর দুঃখ এই যে, 'আহা! আমের ট্রাকে/ যদি তার নেয়া যেতো কিছুটাও রুগ্নতার রাজধানী ঢাকায়/ জান্নাত-স্বর্গ-হেভেন! কী আর বেশি পাবেন মহাগ্রন্থসমূহে!'
জীবন থেকে সমূহ পাঠগ্রহণের সুস্পষ্ট ঘোষণা মিলে যেমন এই কবিতাটিতে, তেমনি গোটা কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতায়ই৷ কবির ভালবাসা, যন্ত্রণা, ব্যঙ্গময় ভাবপ্রকাশের তী্নতা সবকিছু একাকার হয়ে পাঠকের চেতনায় প্রতিবাদী আঘাত হানে৷ প্রেমের কবিতাগুলিও এই তীব্র অনুভূতির আঘাতে জর্জরিত৷ বোঝা যায়, কবির যন্ত্রণা জাতির সমূহ ব্যর্থতায়; কবির কষ্ট বরেন্দ্রভূমির বিষণ্নতায়, সমস্ত ভূভাগের হতাশায়৷
তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, কবিতার বিন্যাসে কবি কি ইচ্ছে করেই মাঝে মধ্যে মাধুর্য ভেঙেছেন? মনে হয়, জীবনের স্বাভাবিকতা কাব্যিভূত করতেই কবির এই প্রয়াস, যা সর্বত্র সমান সাফল্য বয়ে আনে নি৷ ছন্দের ব্যাপারে যত্নবান হলে বোধ করি ভাল হয়৷ অবশ্য মাত্রাবৃত্ত ছন্দে কবির সাফল্য প্রমাণ করে৷
কাব্যের কিছু কিছু উপমা ও চিত্রকল্প পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে_যেমন,
১. অঙ্েিজনে ভরে আসে বুক! আহা! আমের ট্রাকে
যদি তার নেয়া যেতো কিছুটাও রুগ্নতার রাজধানী ঢাকায়!
২. আমনের েেত অাঁচল উঁচিয়ে
ভোরের হাওয়ায় ভাসে বাংলাদেশ!
এমন উদাহরণ বিস্তর দেওয়া যাবে৷ সর্বোপরি কবির শব্দ ব্যবহারের স্বাতন্ত্র্য তাঁর উপমা-চিত্রকল্পকেও ভিন্নতর মাত্রায় দাঁড় করিয়েছে৷